ট্রেনের শেষ কামরায় পা রাখতেই অর্কের মনে হল, সে যেন কোনও ঘরে নয়, বরং একটা গভীর কবরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
কামরার দেওয়াল কালচে। জানলার কাচে জমে আছে কুয়াশা। মেঝের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পুরোনো টিকিট, ছেঁড়া চিঠি, ভাঙা ঘড়ি আর শিশুদের খেলনা। প্রতিটি জিনিসের গায়ে ধুলো জমলেও অর্কের মনে হল, এগুলো যেন কেউ কিছুক্ষণ আগেই ব্যবহার করেছে।
পিউ তার মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মহিলার চোখে এখনও আতঙ্ক।
“এই কামরাটা কোথায় নিয়ে যাবে আমাদের?” তিনি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন।
অর্ক উত্তর দিতে পারল না।
কারণ কামরার একেবারে শেষ প্রান্তে, জানলার পাশে, একজন মানুষ বসে ছিলেন।
ধূসর শার্ট। পরিচিত কাঁধ। ডান হাতের কবজিতে পুরোনো ঘড়ি।
অর্কের বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।
“বাবা?”
লোকটি ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।
সেই মুখ—যে মুখ বহু বছর আগে শেষবার দেখেছিল অর্ক। বাবার চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
“এত দেরি করলি কেন, অর্ক?”
অর্কের পা যেন মেঝেতে আটকে গেল।
“কিন্তু তুমি তো… তুমি তো মারা গেছ!”
বাবা মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ, আমি মারা গেছি। কিন্তু তোর মনে আমার যে অংশটা রয়ে গেছে, সেটা তো মরেনি।”
অর্ক ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
“তাহলে তুমি এখানে কী করে?”
“আমি এখানে নেই, বাবা। তুই যে স্মৃতিগুলো এত বছর ধরে এড়িয়ে গিয়েছিস, তার মধ্যেই আমি আটকে আছি।”
অর্কের চোখে জল এসে গেল।
“সেই রাতে কী হয়েছিল? তুমি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে?”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর জানলার বাইরে তাকালেন।
“সেদিন আমি তোকে খুঁজতে গিয়ে এই স্টেশনে নেমেছিলাম। তুই যখন ওই লোকটার সঙ্গে চলে গেলি, আমি বুঝেছিলাম কিছু একটা ঠিক নেই। আমি তোকে খুঁজতে গিয়ে একটা দরজার সামনে পৌঁছেছিলাম। দরজার ওপারে তুই আর পিউ ছিলি।”
“তাহলে তুমি আমাদের উদ্ধার করোনি কেন?”
বাবার মুখে গভীর বেদনা ফুটে উঠল।
“আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু দরজাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই লোকটা আমাকে একটা শর্ত দিয়েছিল—আমি যদি তোর স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাই, তাহলে তোকে বাস্তব পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।”
অর্ক হতবাক হয়ে গেল।
“তুমি রাজি হয়েছিলে?”
“আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”
“কিন্তু তুমি তো আমাকে বলোনি!”
“বলতে পারিনি। তোর মনে আমার স্মৃতি যতদিন ছিল, ততদিন এই ট্রেন তোকে পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি। তুই বাড়ি ফিরে গিয়েছিলি। কিন্তু তোর মনের একটা অংশ এই স্টেশনে আটকে রইল। তুই বড় হলি, জীবন শুরু করলি, বিয়ে করলি। আর আমি তোর স্মৃতির গভীরে অপেক্ষা করলাম।”
অর্কের মাথা ঘুরতে লাগল।
তাহলে এত বছর ধরে যে অপরাধবোধ তাকে তাড়া করেছে, তার পিছনে ছিল আরও বড় একটা সত্যি। তার বাবা তাকে ফেলে যাননি। বরং তাকে বাঁচানোর জন্য নিজের অস্তিত্বের একটা অংশ বিসর্জন দিয়েছিলেন।
“তাহলে তুমি এখন আমার সামনে এসেছ কেন?”
বাবা অর্কের হাত ধরলেন।
“কারণ তুই অবশেষে ফিরে এসেছিস। তুই পিউকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিস। তুই নিজের অপরাধবোধকে সত্যি বলে মেনে নেওয়া বন্ধ করেছিস। এখন তুই চাইলে এই যাত্রার শেষ করতে পারিস।”
“কী করতে হবে?”
বাবা জানলার দিকে ইশারা করলেন।
“ওই লোকটার কাছ থেকে শেষ টিকিটটা নিতে হবে।”
“কোথায় পাব সেটা?”
“যেখানে সব হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি জমা থাকে।”
ঠিক তখনই ট্রেনের দরজা খুলে গেল।
কামরার বাইরে দাঁড়িয়ে সেই মুখোশধারী রেলকর্মী।
তার হাতে একটা কালো টিকিট।
“যাত্রা শেষ করতে চাস, অর্ক?”
অর্ক বাবার হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“হ্যাঁ।”
লোকটি হেসে উঠল।
“তাহলে একটা জিনিস মনে রাখিস—ফেরার টিকিটের দাম দিতে হয়। তুই যদি বাড়ি ফিরতে চাস, তবে তোর বাবার সব স্মৃতি ভুলে যেতে হবে।”
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।
“সব স্মৃতি?”
“হ্যাঁ। তোর শৈশব, বাবার সঙ্গে কাটানো দিন, তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর মুখ—সব। তুই আর কোনওদিন তাঁকে মনে করতে পারবি না। তোর কাছে তিনি এমন একজন মানুষ হয়ে যাবেন, যাঁর অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ নেই।”
বাবা শান্ত গলায় বললেন, “অর্ক, তুই চাইলে রাজি হতে পারিস। আমি চাই তুই বেঁচে থাকিস।”
অর্ক বাবার দিকে তাকাল।
“তাহলে তোমাকে হারিয়ে ফেলব?”
“আমাকে ভুলে গেলেও তুই যে ভালোবাসা পেয়েছিস, সেটা তোর জীবনের অংশ হয়ে থাকবে।”
অর্ক মাথা নাড়ল।
“না। আমি তোমাকে ভুলে বাড়ি ফিরতে চাই না।”
মুখোশধারী লোকটি হেসে উঠল।
“তাহলে তুই চিরকাল এই ট্রেনে আটকে থাকবি!”
অর্ক দৃঢ় গলায় বলল, “তুমি একটা কথা বুঝতে পারছ না। কাউকে ভালোবাসা মানে তাকে আঁকড়ে ধরে রাখা নয়। আর কাউকে মনে রাখা মানে সারাজীবন তার মৃত্যুর মধ্যে আটকে থাকা নয়।”
সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তোমাকে ভুলব না। কিন্তু তোমার জন্য আমার জীবনটাও থামিয়ে রাখব না।”
কামরার মধ্যে হঠাৎ একটা অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে পড়ল।
বাবার মুখে হাসি ফুটল।
“এই কথাটাই তোকে এতদিন ধরে বলতে চেয়েছিলাম।”
মুখোশধারী লোকটি পিছিয়ে গেল।
“না! এই স্মৃতিগুলো আমার!”
অর্ক বুঝতে পারল, লোকটির শক্তি তৈরি হয়েছে মানুষের শোক, অপরাধবোধ আর বিচ্ছেদের ভয় থেকে। মানুষ যখন অতীতকে ছেড়ে সামনে এগোতে পারে না, তখনই সে সেই যন্ত্রণাকে নিজের শিকল বানিয়ে ফেলে।
অর্ক বাবার দিকে হাত বাড়াল।
“চলো, বাবা। এবার বাড়ি ফিরি।”
বাবা মাথা নাড়লেন।
“আমি তোর সঙ্গে যেতে পারব না, অর্ক। আমার সময় শেষ হয়েছে।”
“কিন্তু—”
“তুই আমাকে মনে রাখিস। শুধু আমার শেষ দিনটাকে নয়, আমার সঙ্গে কাটানো সব দিনকে মনে রাখিস। তোর প্রথম সাইকেল চালানো, বৃষ্টির দিনে একসঙ্গে ভিজে বাড়ি ফেরা, তোর পরীক্ষার ফল দেখে আমার হাসি—এসবই তো আমার জীবন। শুধু আমার মৃত্যু দিয়ে আমাকে চিনিস না।”
অর্ক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
বাবার শরীর ক্রমশ আলোর মতো স্বচ্ছ হয়ে উঠছিল।
“বাবা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।”
“আমিও তোকে ভালোবাসি, বাবা।”
তারপর বাবার অবয়ব ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কামরার মেঝেতে পড়ে রইল তাঁর পুরোনো ঘড়িটা।
অর্ক ঘড়িটা তুলে নিল।
ঘড়ির কাঁটা এতদিন থেমে ছিল এগারোটা চল্লিশে।
এবার কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলতে শুরু করল।
মুখোশধারী লোকটি এবার আর রেলকর্মীর পোশাকে রইল না। তার শরীরের ওপরের পোশাক ছিঁড়ে পড়ল। মুখের সব চামড়া মিলিয়ে গেল। অন্ধকারের মধ্যে দেখা গেল একটা কঙ্কালসার অবয়ব, যার বুকের ভেতর অসংখ্য টিকিট ঘুরপাক খাচ্ছে।
প্রতিটি টিকিটে লেখা একেকটি নাম।
একেকটি তারিখ।
একেকটি অসমাপ্ত যাত্রা।
“তুই ভাবছিস, আমাকে হারিয়ে দিয়েছিস?” সে গর্জে উঠল। “আমি এই স্টেশনের প্রতিটি দরজায় আছি। প্রতিটি হারানো স্মৃতিতে আছি। কেউ কাউকে হারালেই আমি ফিরে আসব!”
অর্ক শান্তভাবে বলল, “হয়তো তুই আবার আসবি। কিন্তু আমার অপরাধবোধকে আর তোর অস্ত্র হতে দেব না।”
পিউ সামনে এগিয়ে এল।
“আমার মাকেও তুই আর আটকে রাখতে পারবি না।”
পিউয়ের মা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
তখনই কামরার সব যাত্রী একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। বৃদ্ধ তাঁর ভাঙা ঘড়িটা খুলে মেঝেতে রাখলেন। যুবতী সাদা কাপড়ে মোড়া জিনিসটি বুকের কাছে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলেন। অন্য যাত্রীরা নিজেদের পকেট থেকে পুরোনো চিঠি, ছবি আর টিকিট বের করে মেঝেতে রাখতে লাগলেন।
অর্ক বুঝতে পারল, এই মানুষগুলোও তাদের স্মৃতির বন্দি।
সে উচ্চস্বরে বলল, “আপনারা সবাই আপনাদের নাম মনে করুন! আপনারা কোথা থেকে এসেছেন, কাকে ভালোবেসেছেন, কাকে হারিয়েছেন—সব মনে করুন। কিন্তু নিজেদের হারিয়ে যাওয়া মানুষদের জন্য নিজেদের জীবনকে শাস্তি দেবেন না!”
প্রথমে কেউ উত্তর দিল না।
তারপর বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন, “আমার নাম নীরদ সেন। আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছিলাম। কিন্তু আমি শুধু একজন শোকাহত বাবা নই। আমি নীরদ সেন।”
যুবতী চোখের জল মুছে বললেন, “আমার নাম মধুরিমা। আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মেয়ের স্মৃতি আমাকে বাঁচতে শিখিয়েছিল।”
একজন একজন করে সবাই নিজেদের নাম বলতে লাগলেন।
কামরার আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
মুখোশধারী লোকটি চিৎকার করে উঠল। তার বুকের ভেতর ঘুরতে থাকা টিকিটগুলো একে একে আগুনের মতো আলো ছড়িয়ে ছাই হয়ে গেল।
“থামো! তোমরা সবাই আমাকে ভুলে যাবে!”
অর্ক তার দিকে তাকাল।
“আমরা তোকে ভুলে যাব না। কিন্তু তোকে আমাদের জীবন চালাতে দেব না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।
দীর্ঘ, গভীর, অদ্ভুত এক শব্দ।
স্টেশনের নামফলক কেঁপে উঠল। “স্মৃতিপুর” লেখা অক্ষরগুলো একে একে খসে পড়ল। তার জায়গায় ফুটে উঠল নতুন নাম—
ফেরার পথ।
মুখোশধারী লোকটি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার শরীরের অন্ধকার ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল।
শেষবারের মতো সে অর্কের দিকে তাকাল।
“তুই কি জানিস, আমি কেন এত মানুষকে আটকে রেখেছিলাম?”
অর্ক চুপ করে রইল।
লোকটি ফিসফিস করে বলল, “কারণ আমি নিজেও বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার মেয়ের মৃত্যুকে মেনে নিতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম, সবাইকে আটকে রাখলে কেউ আর কাউকে হারাবে না।”
তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।
“আমি ভুল করেছিলাম।”
অর্কের মনে তার জন্য সামান্য দুঃখ জাগল। কিন্তু সে জানত, দুঃখ মানেই অন্যায়কে ক্ষমা করে দেওয়া নয়।
লোকটির অবয়ব সম্পূর্ণ মিলিয়ে যাওয়ার আগে সে একবার বলল, “শেষ ট্রেনটা এবার সত্যিই বাড়ি ফিরবে।”
তারপর সব নীরব।
ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।
কিন্তু এবার জানলার বাইরে অন্ধকার মাঠের বদলে দেখা যাচ্ছিল ভোরের আকাশ। দূরে গাছের মাথায় আলো ফুটছে। কোথাও কোথাও ছোট ছোট বাড়ির জানলা খুলছে। মানুষজন দিনের কাজ শুরু করছে।
অর্ক জানলার পাশে বসে ছিল। তার হাতে বাবার পুরোনো ঘড়ি।
পিউ তার পাশে বসে মায়ের হাত ধরে আছে।
“কাকু,” পিউ বলল, “আমরা কি সত্যিই বাড়ি ফিরছি?”
অর্ক মৃদু হাসল।
“হ্যাঁ। এবার সত্যিই।”
“আপনি কি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন?”
“কথা দিয়েছিলাম। এবার কথা রাখব।”
পিউ জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পরে সে বলল, “আমার মনে হয়, মা আমাকে চিনতে পারবেন না। এত বছর কেটে গেছে।”
তার মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“মায়েরা সন্তানকে শুধু মুখ দেখে চেনে না, মা। তুই আমার কাছে যত দিনই হারিয়ে থাকিস, তুই আমার মেয়েই থাকবি।”
পিউ মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
অর্ক তাদের দেখে নিজের মায়ের কথা ভাবল। কত দিন মাকে ফোন করা হয়নি! কতবার কাজের ব্যস্ততায় তাঁর কথা এড়িয়ে গেছে! বাড়ি ফিরে সে প্রথমেই মাকে ফোন করবে বলে ঠিক করল।
হঠাৎ ট্রেনের স্পিকারে ঘোষণা ভেসে এল—
“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, পরবর্তী স্টেশন—বারাসত। যাঁদের যাত্রা শেষ হয়েছে, তাঁরা অনুগ্রহ করে নিজ নিজ জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নামবেন।”
অর্ক জানলার বাইরে তাকাল।
স্টেশনটা পরিচিত। চায়ের দোকান, লাল বেঞ্চ, প্ল্যাটফর্মের পুরোনো ঘড়ি—সব যেন আগের মতোই আছে।
ট্রেন থামল।
দরজা খুলে গেল।
অর্ক প্রথমে নামল। তারপর পিউ আর তার মা।
প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই পিউ থমকে দাঁড়াল। সে মাটিতে হাত ছুঁয়ে দেখল, তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।
“মা, আমরা বাড়ি ফিরে এসেছি!”
মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
অর্ক একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিল। তার বুকের মধ্যে বহু বছর ধরে জমে থাকা একটা ভার যেন নেমে গেল।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে মেঘলার নাম।
অর্ক তাড়াতাড়ি ফোন ধরল।
“হ্যালো, মেঘলা!”
ওপাশ থেকে কান্না আর রাগ মেশানো গলা ভেসে এল।
“তুমি কোথায়? সারারাত ফোন বন্ধ! আমি থানায় ফোন করতে যাচ্ছিলাম!”
অর্ক চোখ বন্ধ করল।
“আমি ঠিক আছি। বাড়ি ফিরছি।”
“কোথায় আছ?”
অর্ক প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকাল।
“বারাসত স্টেশনে।”
মেঘলা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
“তুমি তো শিয়ালদহ থেকে বারাসত লোকাল ধরেছিলে। এত রাত হয়ে গেল কেন?”
অর্ক উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল।
তার মনে হল, পুরো রাতের কথা বললে মেঘলা বিশ্বাস করবে কি না সে জানে না। কিন্তু আজ সে আর সত্যি থেকে পালাবে না।
“একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। বাড়ি ফিরে সব বলব।”
মেঘলা এবার নরম গলায় বলল, “তাড়াতাড়ি এসো। আমি অপেক্ষা করছি।”
ফোন কেটে অর্ক ঘড়ির দিকে তাকাল।
ঘড়ির কাঁটা এবার সকাল পাঁচটা পঁয়তাল্লিশে থেমে আছে।
সে হেসে ফেলল।
হয়তো কিছু সময় আর কখনও ফিরে আসে না। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে আটকে থাকা মানুষও একদিন মুক্তি পেতে পারে।
কয়েক দিন পর অর্ক পিউ আর তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেল।
বারাসতের সেই নীল দরজার বাড়িটা এখনও আছে। ছোট্ট উঠোনে তুলসীগাছ, বারান্দায় শুকোতে দেওয়া জামাকাপড়, আর জানলার পাশে পুরোনো একটা কাঠের চেয়ার।
পিউ এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চেষ্টা করছে। সে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার আগে অর্ক তাকে একটা নতুন ব্যাগ উপহার দিল।
পিউ ব্যাগটা খুলে দেখে অবাক হয়ে গেল।
ভেতরে একটা ছোট্ট ট্রেনের খেলনা।
“এটা কী, কাকু?”
“মনে রাখার জন্য।”
পিউ ভয় পেয়ে গেল।
“আমি আবার ওই ট্রেনে যেতে চাই না!”
অর্ক তার মাথায় হাত রাখল।
“ওই ট্রেনটার কথা মনে রাখার জন্য নয়। মনে রাখার জন্য যে, কোনও পথ যত দীর্ঘই হোক, একদিন বাড়ি ফেরা যায়।”
পিউ একটু ভেবে খেলনাটা হাতে নিল।
তারপর হেসে বলল, “আমি বড় হয়ে রেলগাড়ির চালক হব।”
“কেন?”
“যাতে কোনও ছোট্ট মেয়ে বা ছেলে ভুল ট্রেনে উঠে হারিয়ে না যায়।”
অর্কের চোখ ভিজে উঠল।
“তাহলে তুই খুব ভালো চালক হবি।”
সেদিন বাড়ি ফিরে অর্ক মায়ের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলল। ছোটবেলার গল্প, বাবার কথা, নিজের ভয়, নিজের অপরাধবোধ—সব খুলে বলল।
মা তার হাত ধরে বললেন, “তুই ছোট ছিলি, অর্ক। সবকিছু তোর দোষ ছিল না।”
এই কথাটা সে জীবনে বহুবার শুনেছে। কিন্তু এবার যেন সত্যিই বিশ্বাস করতে পারল।
রাতে মেঘলার পাশে শুয়ে অর্ক জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। দূরে কোনও ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
তার বুকের মধ্যে এক মুহূর্তের জন্য পুরোনো আতঙ্ক ফিরে এল।
মেঘলা তার হাত ধরল।
“কী হয়েছে?”
অর্ক মাথা নাড়ল।
“কিছু না। একটা ট্রেন যাচ্ছে।”
“ভয় লাগছে?”
অর্ক কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “একটু। কিন্তু এবার আমি জানি, সব ট্রেনেই হারিয়ে যেতে হয় না।”
মেঘলা তার কাঁধে মাথা রাখল।
ঘরের আলো নিভে গেল।
বাইরে ভোরের আগে সেই গভীর নীরবতা।
আর বহু বছর পর অর্ক প্রথমবার কোনও দুঃস্বপ্ন ছাড়াই ঘুমিয়ে পড়ল।
তারপর কেটে গেল আরও ছয় মাস।
একদিন সকালে অর্ক অফিস যাওয়ার জন্য স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল। প্ল্যাটফর্মে মানুষের ভিড়, চায়ের দোকানে ধোঁয়া উঠছে, ঘোষণায় ট্রেনের সময় জানানো হচ্ছে।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটি বেঞ্চের ওপর।
সেখানে পড়ে আছে একটা পুরোনো কাগজ।
অর্ক কাগজটা তুলে নিল।
সেটা একটা রেলওয়ের টিকিট।
টিকিটের তারিখ—১৭ অক্টোবর, ২০০৪।
যাত্রীর নামের জায়গাটা ফাঁকা।
কিন্তু গন্তব্যের জায়গায় লেখা—
“বাড়ি।”
অর্কের বুকের মধ্যে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।
সে চারদিকে তাকাল।
কেউ তাকে দেখছে না। কেউ টিকিটটার খোঁজও করছে না।
তারপর প্ল্যাটফর্মের লাউডস্পিকারে একটা অচেনা কণ্ঠস্বর শোনা গেল—
“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, শেষ ট্রেনটি আর কোনওদিন এই স্টেশনে ফিরবে না। যাঁরা এখনও কাউকে হারিয়ে খুঁজছেন, তাঁদের অনুরোধ করা হচ্ছে, নিজেদের জীবনে ফিরে যান।”
অর্ক ধীরে ধীরে টিকিটটা ভাঁজ করল।
তারপর প্ল্যাটফর্মের পাশের ডাস্টবিনে ফেলে দিল।
টিকিটটা বাতাসে উড়ে মাটিতে পড়ল।
কিন্তু এবার সেটি আর অদৃশ্য হল না।
সেটি সেখানেই রইল—একটি পুরোনো কাগজের মতো, যার আর কাউকে আটকে রাখার ক্ষমতা নেই।
অর্ক ট্রেনে উঠল।
ট্রেন চলতে শুরু করল।
জানলার বাইরে সকালের আলো ছড়িয়ে পড়ল শহরের ওপর।
আর অর্ক বুঝল, জীবনের সব যাত্রার গন্তব্য কোনও স্টেশন নয়। কখনও কখনও গন্তব্য হল সেই মুহূর্ত, যখন মানুষ নিজের অতীতকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে শেখে।
সেদিন থেকে অর্ক আর শেষ ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করেনি।
কারণ সে অবশেষে বুঝেছিল—কিছু ট্রেন আমাদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির কাছে নিয়ে যায়, আর কিছু ট্রেন আমাদের ফিরিয়ে আনে জীবনের কাছে।
— সমাপ্ত —