সকাল ন’টা বেজে পঁয়তাল্লিশ।
ঋতব্রত সেনের ঘরের দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।
সে আগের রাতের মেমোরি কার্ডটি বালিশের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল। সারা রাত তার ঘুম হয়নি। মাথার মধ্যে বারবার ফিরে এসেছে ২০১৩ সালের সেই অস্পষ্ট দৃশ্য—কাচের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি, কালো আংটি, আর অনন্যার কণ্ঠ।
দরজা খুলতেই একজন নিরাপত্তাকর্মী বলল, “চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় হয়েছে। আপনার সঙ্গে চলতে হবে।”
“কোথায়?”
“মূল পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে।”
“ডক্টর ঈশিতা থাকবেন?”
“আপনাকে সেখানে গিয়েই জানতে হবে।”
ঋতব্রত কোনও প্রতিবাদ করল না। তার মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটি অন্য দিনের মতো হবে না। এই গবেষণাকেন্দ্র তাকে এত দিন প্রশ্নের মধ্যে আটকে রেখেছে। আজ সে প্রশ্ন করবে, আর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত থামবে না।
করিডর পেরিয়ে তারা একটি লিফটের সামনে এল। লিফটের বোতামে কোনও তলার নম্বর নেই। শুধু তিনটি চিহ্ন—একটি বৃত্ত, একটি বর্গ এবং একটি ত্রিভুজ।
নিরাপত্তাকর্মী ত্রিভুজের ওপর আঙুল রাখল।
লিফট নেমে যেতে শুরু করল।
ঋতব্রত বুঝতে পারল, তারা মাটির ওপরের তলাগুলি ছেড়ে নিচে যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ পর লিফট থামল। দরজা খুলতেই সে দেখতে পেল একটি প্রশস্ত করিডর। দু’পাশের দেওয়াল ধূসর, আলো মৃদু, আর প্রতিটি দরজার ওপর কোনও নাম নয়—একটি করে সংখ্যা লেখা।
০১২। ০২৮। ০৪১। ০৫৯।
করিডরের শেষ প্রান্তে একটি বড় দরজা।
সেখানে লেখা—
মূল পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র — প্রবেশাধিকার সীমিত।
দরজাটি খুলতেই ঋতব্রত স্তব্ধ হয়ে গেল।
ঘরের মাঝখানে একটি গোল টেবিল। তার চারপাশে পাঁচটি চেয়ার। দেওয়ালে কোনও আয়না নেই, কোনও ক্যামেরাও চোখে পড়ছে না। টেবিলের ওপরে পাঁচটি ফাইল রাখা।
একটি ফাইলের ওপর লেখা—ঋতব্রত সেন।
দ্বিতীয়টির ওপর—অনন্যা দত্ত।
তৃতীয়টি—ডক্টর ঈশিতা রায়।
চতুর্থটি—প্রকল্প পরিচালক।
পঞ্চমটির ওপর কোনও নাম নেই।
ঋতব্রত ঘরে ঢুকতেই পেছনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
“বসুন।”
কণ্ঠটি ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে এল।
সেখানে বসে আছেন একজন বয়স্ক মানুষ। ধূসর চুল, পাতলা ফ্রেমের চশমা, গাঢ় নীল পোশাক। ঋতব্রত তাঁকে আগে কখনও দেখেনি। কিন্তু মানুষটির ডান হাতের অনামিকায় কালো আংটি।
ঋতব্রতর বুকের মধ্যে যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল।
২০১৩ সালের স্মৃতিতে কাচের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির হাতেও এমন আংটি ছিল।
“আপনি কে?” ঋতব্রত জিজ্ঞেস করল।
বয়স্ক মানুষটি মৃদু হাসলেন।
“আমার নাম অধ্যাপক অরিন্দম বসু। এই গবেষণাকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রজেক্ট আয়নার প্রধান নকশাকার।”
“আপনি কি ২০১৩ সালের পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?”
“আমি শুধু যুক্ত ছিলাম না। পরীক্ষাটি আমার পরিকল্পনায় তৈরি হয়েছিল।”
ঋতব্রত চেয়ারে বসল না।
“তাহলে আপনি জানেন, অনন্যার সঙ্গে কী ঘটেছিল।”
“অবশ্যই।”
“সে কোথায়?”
অধ্যাপক বসু ফাইলগুলির দিকে তাকালেন।
“তার আগে আপনাকে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।”
ঋতব্রতর মুখ কঠিন হয়ে গেল।
“আর কোনও প্রশ্নের উত্তর দেব না, যতক্ষণ না আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।”
অধ্যাপক বসু মাথা নাড়লেন।
“এই প্রতিক্রিয়াটি প্রত্যাশিত ছিল। তবে আপনি ভুল বুঝছেন। আজ আপনাকে পরীক্ষার অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়, একজন সাক্ষী হিসেবে এখানে ডাকা হয়েছে।”
“কিসের সাক্ষী?”
“একটি ব্যর্থ পরীক্ষার।”
তিনি টেবিলের প্রথম ফাইলটি খুললেন। সেখানে ঋতব্রতর পুরোনো ছবি, চিকিৎসা-সংক্রান্ত কিছু নথি, পরীক্ষার ফলাফল এবং বহু বছরের পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট।
“আপনি জানেন, প্রজেক্ট আয়না আসলে কী?”
“মানুষের স্মৃতি ও আত্মপরিচয় নিয়ে গবেষণা।”
“এটাই প্রকাশ্য ব্যাখ্যা। প্রকৃত উদ্দেশ্য আরও জটিল। আমরা জানতে চেয়েছিলাম, একজন মানুষ নিজের পরিচয় সম্পর্কে কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তার স্মৃতি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, অপরাধবোধ এবং অন্যের স্বীকৃতি—এই চারটি বিষয় কীভাবে তার আত্মপরিচয় তৈরি করে।”
“এ জন্য কাউকে অস্বীকার করতে হবে?”
“প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম, একটি নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে সামান্য মতবিরোধ সৃষ্টি করলেই যথেষ্ট হবে। কিন্তু গবেষণার কিছু সদস্য সীমা অতিক্রম করেন।”
“কিছু সদস্য?”
“হ্যাঁ। তাঁরা পরীক্ষাটিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যান, যেখানে একজন অংশগ্রহণকারীর অভিজ্ঞতা অস্বীকার করে তার সামাজিক অবস্থান ভেঙে দেওয়া হয়।”
ঋতব্রত টেবিলে হাত রাখল।
“আপনারা অনন্যার সঙ্গে সেটা করেছিলেন।”
“হ্যাঁ।”
অধ্যাপক বসু কোনও অজুহাত দিলেন না।
এই স্বীকারোক্তি ঋতব্রতকে বিস্মিত করল। সে ভেবেছিল, আরও অনেক ঘুরিয়ে কথা শুনতে হবে।
“কেন?”
অধ্যাপক বসু বললেন, “কারণ অনন্যা গবেষণার একটি মৌলিক ত্রুটি ধরে ফেলেছিল।”
“কী ত্রুটি?”
“আমরা ধরে নিয়েছিলাম, মানুষের স্মৃতিকে সামাজিক প্রভাবের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু অনন্যা দেখিয়েছিল, কোনও কোনও পরিস্থিতিতে মানুষ ভুল স্মৃতি গ্রহণ না করেও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ, সে সত্যি মনে রেখেও একা হয়ে যেতে পারে।”
“এটা তো গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল।”
“হতে পারত। কিন্তু সেই সময় প্রকল্পের অর্থদাতা সংস্থার কাছে আমরা একটি নির্দিষ্ট ফলাফল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। অনন্যার বক্তব্য আমাদের গবেষণার কাঠামোকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।”
“তাই আপনারা তার অস্তিত্ব অস্বীকার করলেন?”
“তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর নথি থেকে তার অংশগ্রহণের তথ্য মুছে ফেলা হয়।”
“আপনারা কি বুঝতে পেরেছিলেন, এতে তার কী হতে পারে?”
অধ্যাপক বসু দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“না। অথবা বলা ভালো, আমরা বুঝতে চাইনি।”
ঋতব্রত প্রথমবার চেয়ারে বসল।
তার রাগ কমেনি। বরং এত বছরের অস্পষ্ট স্মৃতি যেন একটি নির্দিষ্ট আকৃতি পেতে শুরু করেছে।
“আমাকে আবার এখানে আনা হয়েছে কেন?”
অধ্যাপক বসু দ্বিতীয় ফাইলটি খুললেন।
“কারণ আপনি সেই সময় এমন একটি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন, যা আমাদের গবেষণার পূর্বাভাসের বাইরে ছিল।”
“আমি অনন্যাকে সমর্থন করিনি।”
“আপনি তাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেননি। কিন্তু আপনি নিজের স্মৃতি পুরোপুরি প্রত্যাহারও করেননি। পরবর্তী সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন, আপনি তার মুখ মনে করতে পারছেন না, নাম মনে করতে পারছেন না, কিন্তু তার অনুপস্থিতিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারছেন না।”
ঋতব্রতর মনে পড়ল, ভিডিওতে তার সেই বাক্য—‘আমি জানি না। কিন্তু আমি জানি, সে ছিল।’
অধ্যাপক বসু বললেন, “আপনি তখনও নিশ্চিত ছিলেন না। কিন্তু আপনার সন্দেহটুকু আমাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ আমাদের পরীক্ষার লক্ষ্য ছিল মানুষকে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্দেহ করতে শেখানো। অথচ আপনি সন্দেহ করেও নিজের অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ বাতিল করেননি।”
“তাই আমাকে আবার ফিরিয়ে আনলেন?”
“আপনাকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত আমার ছিল না।”
ঋতব্রত চোখ তুলে তাকাল।
“তাহলে কার?”
অধ্যাপক বসু তৃতীয় ফাইলটি তাঁর দিকে এগিয়ে দিলেন।
তার ওপর লেখা—ডক্টর ঈশিতা রায়।
“ঈশিতা রায়,” তিনি বললেন, “এই প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক।”
ঋতব্রত ফাইলটি খুলল।
প্রথম পাতায় ঈশিতার ছবি। দ্বিতীয় পাতায় তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা। তৃতীয় পাতায় গবেষণার বিবরণ।
চতুর্থ পাতায় এসে ঋতব্রত থমকে গেল।
২০১৩ সালের গবেষণা: সহকারী পর্যবেক্ষক।
তার নিচে একটি নোট—
“পরীক্ষার সময় অংশগ্রহণকারী ০৭৪-এর বক্তব্যকে অবিশ্বস্ত হিসেবে চিহ্নিত করার সুপারিশে উপস্থিত।”
ঋতব্রতর আঙুল ফাইলের ওপর স্থির হয়ে গেল।
“ঈশিতা সেই পরীক্ষায় ছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“তিনি তো বলেছিলেন, তখন এখানে কাজ করতেন না।”
অধ্যাপক বসু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তিনি বলেছিলেন, তখন তিনি এই গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করতেন না। কথাটি আক্ষরিক অর্থে সত্যি। গবেষণাটি হয়েছিল অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু তিনি সেই গবেষণাদলের সদস্য ছিলেন।”
“অর্থাৎ তিনি সত্যি কথার আড়ালে মিথ্যে লুকিয়েছেন।”
“এটাই বলা যেতে পারে।”
ঋতব্রত উঠে দাঁড়াল।
“আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলব।”
অধ্যাপক বসু বললেন, “তিনি আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।”
১. ঈশিতার স্বীকারোক্তি
পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পাশের ঘরে ডক্টর ঈশিতা রায় একা বসেছিলেন।
ঋতব্রত ঢুকতেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
“আপনি সব জেনে গেছেন?”
“সব নয়। তবে এটুকু বুঝেছি, আপনি আমাকে সত্যিটা বলেননি।”
ঈশিতা চুপ করে রইলেন।
“আপনি ২০১৩ সালের পরীক্ষায় ছিলেন। আপনি জানতেন অনন্যার সঙ্গে কী ঘটেছিল। তবু এত দিন আমাকে কিছু বলেননি।”
“আমি আপনাকে সবটা বলতে পারিনি।”
“কেন?”
“কারণ আমি নিজেও সেই ঘটনার অংশ ছিলাম।”
ঋতব্রতর গলায় তিক্ততা।
“আপনি কি অনন্যাকে অস্বীকার করেছিলেন?”
ঈশিতা মাথা নিচু করলেন।
“হ্যাঁ।”
একটি মাত্র শব্দ।
কোনও ব্যাখ্যা নেই। কোনও অজুহাত নেই।
“আপনি কেন করেছিলেন?”
“আমি তখন গবেষণার সহকারী। আমার বয়স ছিল চব্বিশ। অধ্যাপক বসুর নির্দেশে কাজ করতাম। আমাকে বলা হয়েছিল, অনন্যা পরীক্ষার নিয়ম ভাঙছে। সে অন্য অংশগ্রহণকারীদের প্রভাবিত করছে। তার বক্তব্যের কারণে গবেষণার ফলাফল নষ্ট হচ্ছে।”
“আপনি কি তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“সে কী বলেছিল?”
ঈশিতা চোখ বন্ধ করলেন।
“সে বলেছিল, গবেষণার লক্ষ্য যদি সত্যিই মানুষের স্মৃতি বোঝা হয়, তাহলে অংশগ্রহণকারীদের এমনভাবে চাপ দেওয়া উচিত নয়, যাতে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করতে বাধ্য হয়। সে বুঝতে পেরেছিল, কিছু প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই নির্ধারণ করা হচ্ছে।”
“তারপর?”
“আমাকে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে বলা হয়। সেখানে অনন্যার আচরণকে অস্থিতিশীল এবং বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করতে বলা হয়েছিল।”
“আপনি লিখেছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
ঋতব্রত কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
“আপনি জানেন, আপনার এই স্বীকারোক্তি অনন্যার ক্ষতি পূরণ করবে না?”
“জানি।”
“আপনি জানেন, আমি উনিশ বছর বয়সে আপনার মতো শিক্ষিত মানুষদের কথা বিশ্বাস করেছিলাম?”
“জানি।”
“তাহলে আমাকে কেন ফিরিয়ে আনা হল?”
ঈশিতা এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালেন।
“কারণ আমি আর সেই ভুলকে আড়াল করতে চাইনি।”
“তাহলে আপনি নিজে সত্যিটা প্রকাশ করতে পারতেন।”
“চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু প্রকল্পের নথি ও নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে পুরোপুরি ছিল না। যখন আমি বর্তমান পরিচালক হই, তখন দেখি পুরোনো তথ্যের বড় অংশ মুছে ফেলা হয়েছে। কিছু তথ্য আলাদা সার্ভারে রাখা। অনন্যার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনও নিশ্চিত রেকর্ড নেই।”
“আপনি পুলিশে যাননি কেন?”
ঈশিতা চুপ করে গেলেন।
ঋতব্রত বুঝতে পারল, এখানেই তাঁর স্বীকারোক্তির সবচেয়ে কঠিন অংশ।
“আপনি ভয় পেয়েছিলেন,” সে বলল।
“হ্যাঁ।”
“নিজের চাকরি হারানোর ভয়? নাকি নিজের অপরাধ প্রকাশ পাওয়ার ভয়?”
ঈশিতা উত্তর দিলেন না।
ঋতব্রত বলল, “আপনি দুটোই ভয় পেয়েছিলেন।”
ঈশিতা ধীরে মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। দুটোই।”
ঘরের মধ্যে দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল।
তারপর ঈশিতা বললেন, “আপনাকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি আপনার পুরোনো সাক্ষাৎকারগুলো দেখেছিলাম। আপনার মধ্যে অপরাধবোধ ছিল। কিন্তু আপনি অনন্যাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেননি। আমি ভেবেছিলাম, আপনি ফিরে এলে হয়তো এমন কিছু মনে করতে পারবেন, যা নথিতে নেই।”
“আপনি আমাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, নাকি আমার স্মৃতিকে আবার পরীক্ষা করতে?”
“প্রথমে ভেবেছিলাম, দুটোই করা সম্ভব। পরে বুঝেছি, আমি আবারও একই ভুল করছি। আপনার সম্মতি ছাড়া আপনাকে একটি পরীক্ষার মধ্যে নিয়ে এসেছি।”
ঋতব্রতর চোখে কঠোরতা ফিরে এল।
“আপনি ভুল বুঝেছেন। আমার স্মৃতি ফেরানোর চেষ্টা করা ভুল নয়। কিন্তু আমাকে না জানিয়ে আমার জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ভুল।”
“আমি জানি।”
“না, আপনি জানেন না। আপনি এখনও মনে করছেন, সত্যিটা বুঝতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সত্যি জানার অধিকার আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এক জিনিস নয়।”
ঈশিতা ধীরে চেয়ারে বসলেন।
“তাহলে এখন আপনি কী চান?”
ঋতব্রত বলল, “আমি অনন্যাকে খুঁজে পেতে চাই। তার নিজের মুখে শুনতে চাই, কী ঘটেছিল। আর আমি চাই, আপনারা যে নথি মুছে দিয়েছেন, সেগুলো উদ্ধার করা হোক।”
“এটা সম্ভব হতে পারে।”
“কীভাবে?”
ঈশিতা টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি ছোট্ট চাবি বের করলেন।
“প্রকল্পের মূল সার্ভার এখানে নেই। গবেষণাকেন্দ্রের নিচে একটি পুরোনো ডেটা ভল্ট আছে। সেখানে মূল পরীক্ষার কাঁচা তথ্য রাখা হয়েছিল। সেটি এখন বন্ধ।”
“কেন?”
“কারণ সেই সার্ভারে এমন তথ্য রয়েছে, যা প্রকল্পের প্রকাশ্য প্রতিবেদনের সঙ্গে মেলে না।”
“আর অনন্যার তথ্য?”
“সেখানেই থাকার কথা।”
ঋতব্রত চাবিটির দিকে তাকাল।
“আপনি আমাকে সেখানে নিয়ে যাবেন?”
ঈশিতা বললেন, “হ্যাঁ। তবে একটা বিষয় আপনাকে আগে জানাতে হবে।”
“কী?”
“সার্ভারের তথ্য দেখার পর আপনার নিজের স্মৃতি সম্পর্কে এমন কিছু জানতে পারেন, যা আপনার পছন্দ হবে না।”
ঋতব্রত শান্ত গলায় বলল, “আমি আমার অতীতের সুন্দর সংস্করণ খুঁজছি না। আমি জানতে চাই, সত্যিই কী ঘটেছিল।”
ঈশিতা চাবিটি তার হাতে দিলেন।
“তাহলে চলুন।”
২. ডেটা ভল্ট
ডেটা ভল্টটি গবেষণাকেন্দ্রের সবচেয়ে নিচের স্তরে।
দরজা খুলতে দুটি অনুমতি লাগে—একটি পরিচালক হিসেবে ঈশিতার, অন্যটি প্রতিষ্ঠাতার পুরোনো নিরাপত্তা চাবি। ঈশিতার কাছে প্রথমটি ছিল। দ্বিতীয়টি তিনি কোথায় পাবেন, তা জানতেন না।
ঋতব্রত নিজের পকেট থেকে মেমোরি কার্ডটি বের করল।
“এটা আমি আমার ঘরে পেয়েছি।”
ঈশিতা কার্ডটি দেখে চমকে উঠলেন।
“এটা আপনার কাছে এল কীভাবে?”
“দেওয়ালের প্যানেলের ভেতরে লুকোনো ছিল।”
তিনি কার্ডটি হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলেন।
“এটা পুরোনো নিরাপত্তা-প্রোটোকলের অংশ। কিন্তু এখানে তো শুধু ডেটা থাকার কথা।”
“এটা দিয়ে দরজা খোলা যাবে?”
“সম্ভবত।”
দরজার পাশে একটি ছোট্ট যন্ত্রে কার্ডটি প্রবেশ করানো হল। কয়েক সেকেন্ড পর সবুজ আলো জ্বলে উঠল।
দরজাটি খুলে গেল।
ভেতরে ঢুকেই ঋতব্রত বুঝল, এই জায়গাটি আধুনিক গবেষণাকেন্দ্রের বাকি অংশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কোনও কাচের দেওয়াল নেই। কোনও ডিজিটাল বিজ্ঞাপন নেই। সারি সারি ধাতব ক্যাবিনেট, পুরোনো কম্পিউটার, নথি রাখার বাক্স এবং একটি কেন্দ্রীয় সার্ভার র্যাক।
দেওয়ালে একটি সতর্কবার্তা—
মূল তথ্যের কোনও পরিবর্তন অনুমোদিত নয়।
ঈশিতা একটি পুরোনো কম্পিউটার চালু করলেন।
“এখানে প্রতিটি গবেষণার কাঁচা তথ্য রাখা হত। পরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জন্য আলাদা কপি তৈরি করা হত।”
“অর্থাৎ মূল তথ্য আর প্রকাশিত তথ্য আলাদা?”
“হ্যাঁ।”
“সেটাই তো সমস্যা।”
ঈশিতা উত্তর দিলেন না।
কম্পিউটার চালু হলে একটি তালিকা ফুটে উঠল। গবেষণার বছর, অংশগ্রহণকারীর নম্বর, পরীক্ষার ধরন—সবকিছু সাজানো।
ঋতব্রত ২০১৩ সালের ফাইলটি খুঁজে পেল।
MEMORY STUDY — RAW DATA — ARCHIVE 13
ফাইল খুলতেই একটি সতর্কবার্তা এল।
সতর্কতা: কিছু তথ্য ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল। অনুমোদিত ব্যবহার ছাড়া দেখা নিষিদ্ধ।
ঋতব্রত বলল, “এত দিন আপনারা এই সতর্কবার্তার আড়ালে সব লুকিয়ে রেখেছেন?”
ঈশিতা বললেন, “গোপনীয়তা প্রয়োজনীয়। কিন্তু গোপনীয়তার নামে অন্যায় আড়াল করা যায় না।”
ফাইলের ভেতরে অনেকগুলি উপফাইল।
০৬৭। ০৭৪। ০৮১। ০৯২।
ঋতব্রত ০৭৪ খুলল।
প্রথমে অনন্যার ব্যক্তিগত তথ্য। তারপর সাক্ষাৎকার, পরীক্ষার ফলাফল, পর্যবেক্ষণ নোট।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিটি ছিল শেষের দিকে।
ভিডিও: FINAL GROUP SESSION
ঋতব্রত ভিডিওটি চালাল।
সাদা ঘর। গোল টেবিল। সাতজন অংশগ্রহণকারী। ক্যামেরার সামনে বসে আছে অনন্যা।
গবেষক বলছেন, “আজকের সেশনে প্রত্যেককে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনন্যার বক্তব্য সম্পর্কে আপনাদের মতামত জানাতে হবে।”
অনন্যা উঠে দাঁড়াল।
“আমি শুধু একটি কথা বলতে চাই। আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন কি না, সেটা আপনাদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু আপনারা যদি আমাকে অবিশ্বাস করেন, তাতে আমার অভিজ্ঞতা মিথ্যে হয়ে যাবে না।”
গবেষক বললেন, “আপনি কি মনে করেন, অন্য ছয়জন ভুল?”
“আমি মনে করি, তাঁদের কাছে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে, যা আমার কাছে নেই। আর আমাকে এমন কিছু করতে বলা হয়েছে, যা তাঁদের বলা হয়নি।”
“আপনি কি প্রমাণ দিতে পারবেন?”
অনন্যা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “আমি প্রমাণ দিতে পারব। কিন্তু তার আগে আপনারা স্বীকার করুন যে আপনারা আমাকে আলাদা তথ্য দিয়েছেন।”
গবেষক ক্যামেরার বাইরে কারও দিকে তাকালেন।
তারপর বললেন, “আপনার বক্তব্যের কোনও সমর্থন আমরা পাইনি।”
অনন্যা টেবিলের চারপাশে তাকাল।
“ঋতব্রত?”
ভিডিওতে ঋতব্রত মাথা তুলল।
সে তখন তরুণ। চোখে দ্বিধা।
“তুমি কি মনে করো, আমি মিথ্যে বলছি?”
ঋতব্রত উত্তর দিতে পারছিল না।
অনন্যা আবার বলল, “তুমি তো জানো, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলেছিলাম।”
ঘরের সব চোখ ঋতব্রতর দিকে।
একজন অংশগ্রহণকারী বলল, “আমরা কেউই ওকে চিনি না।”
আরেকজন বলল, “ওর কথা শুনে নিজের স্মৃতি নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে।”
তৃতীয়জন বলল, “যদি সত্যিই ও এখানে থাকে, তাহলে আমাদের কারও মনে নেই কেন?”
ঋতব্রতর মুখে যন্ত্রণা স্পষ্ট।
তারপর সে বলল, “আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি।”
ঘরের ভেতর নীরবতা।
অনন্যার চোখে আশার আলো ফুটল।
ঋতব্রত আবার বলল, “কিন্তু আমি নিশ্চিত নই, আমার স্মৃতি ঠিক আছে কি না।”
অনন্যার মুখ থেকে আশার আলো মিলিয়ে গেল।
গবেষক বললেন, “আপনি কি আপনার বক্তব্য প্রত্যাহার করছেন?”
ঋতব্রত দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “আমি শুধু বলছি, আমি নিশ্চিত নই।”
ভিডিওটি কয়েক সেকেন্ড চলল।
তারপর পর্দায় একটি নতুন অংশ ফুটে উঠল—যেটি আগের কোনও ভিডিওতে ছিল না।
ঘরের দরজা খুলে একজন প্রবীণ গবেষক প্রবেশ করলেন। তাঁর হাতে একটি নথি। তিনি টেবিলের কাছে এসে বললেন, “অংশগ্রহণকারী ০৭৪-এর গবেষণায় অংশগ্রহণ এখানেই শেষ। তাঁর বক্তব্যকে আর কোনও মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।”
ঋতব্রত তাঁকে চিনতে পারল।
অধ্যাপক অরিন্দম বসু।
কিন্তু ভিডিওতে অধ্যাপক বসু আরও একটি কথা বলেছিলেন।
“যারা তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন, তাঁদেরও পরবর্তী সাক্ষাৎকারে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।”
ঋতব্রতর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
কারণ সে বুঝতে পারল, অনন্যাকে অস্বীকার করার পরও সে পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না। তার সন্দেহটুকুও গবেষকদের নজরে ছিল।
ভিডিওর শেষে অনন্যাকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হল।
যাওয়ার আগে সে একবার পিছন ফিরে তাকাল।
তার চোখ সরাসরি ক্যামেরার দিকে।
সে বলল, “একদিন তোমরা নিজেরাই বুঝবে, মানুষকে মুছে ফেলা যায় না। শুধু তার কথা শোনার পথ বন্ধ করা যায়।”
ভিডিও শেষ।
ঋতব্রতর চোখ ভিজে উঠেছিল।
কিন্তু এবার সে কান্নাকে দুর্বলতা বলে মনে করল না।
সে জানত, অনন্যার সঙ্গে যা ঘটেছিল, তার জন্য সে একা দায়ী নয়। তবু নিজের অংশের দায় এড়িয়ে যাওয়ার অধিকারও তার নেই।
“আরও একটি ফাইল আছে,” ঈশিতা বললেন।
পর্দায় একটি নথি খুলল।
PARTICIPANT 067 — FOLLOW-UP REVIEW
তার ভেতরে একটি পুরোনো মূল্যায়ন।
“অংশগ্রহণকারী ০৬৭ সামাজিক চাপের মুখে নিজের স্মৃতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছে। তবে সে সম্পূর্ণভাবে প্রচলিত বয়ান গ্রহণ করেনি। দীর্ঘমেয়াদে তার মধ্যে স্মৃতির খণ্ডিত পুনরাবির্ভাব, অপরাধবোধ এবং অতীতের ঘটনাকে পুনর্ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখা যেতে পারে।”
ঋতব্রত স্তব্ধ হয়ে গেল।
নথির নিচে আরও একটি লাইন—
“ভবিষ্যতে, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে, তাকে পুনরায় গবেষণায় যুক্ত করার সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে।”
“তাহলে আমাকে এত বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে?”
ঈশিতা নথিটি পড়ে বললেন, “এই নথি থেকে মনে হচ্ছে, আপনার পুরোনো তথ্য সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু আপনার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, এমন প্রমাণ আমি দেখছি না।”
“আমাকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল?”
“সম্ভবত ভবিষ্যৎ পুনর্মূল্যায়নের কথা লেখা ছিল। কিন্তু কবে এবং কীভাবে, তা আমি জানি না।”
ঋতব্রত আরেকটি ফাইল খুলল।
সেখানে একটি ভিডিও নেই। একটি অডিও ফাইল।
শিরোনাম—
ANANYA — PERSONAL STATEMENT
সে চালু করল।
অনন্যার কণ্ঠ ভেসে এল।
“আমার নাম অনন্যা দত্ত। আমি এই গবেষণায় অংশ নিতে রাজি হয়েছিলাম, কারণ ভেবেছিলাম মানুষের স্মৃতি নিয়ে কাজ করা হবে। কিন্তু এখানে এসে বুঝলাম, গবেষকেরা শুধু স্মৃতি বোঝার চেষ্টা করছেন না। তাঁরা এটাও দেখতে চান, মানুষ কত সহজে অন্যের স্বীকৃতির জন্য নিজের অভিজ্ঞতা বদলে ফেলতে পারে।”
একটু বিরতি।
“আমি জানি, আমার কথা বিশ্বাস করা কঠিন হবে। আমি জানি, যখন সবাই বলবে আমি ভুল, তখন আমার নিজেরও সন্দেহ হবে। কিন্তু আমি একটি জিনিস বুঝেছি—কোনও ঘটনার স্মৃতি দুর্বল হতে পারে, অসম্পূর্ণ হতে পারে, এমনকি ভুলও হতে পারে। তবু কোনও মানুষকে অস্বীকার করার আগে প্রমাণের দায় শুধু সেই মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।”
ঋতব্রত নিঃশ্বাস আটকে শুনছিল।
“যদি আমার সঙ্গে কিছু ঘটে, তাহলে আমার বক্তব্যকে সত্য ধরে নেবেন না। আবার মিথ্যেও ধরে নেবেন না। আমার বক্তব্য যাচাই করুন। অন্যদের বক্তব্যও যাচাই করুন। কারণ সত্যি কখনও শুধু সেই মানুষের হাতে থাকে না, যে সবচেয়ে জোরে কথা বলে।”
অডিও থেমে গেল।
ঋতব্রত অনেকক্ষণ কোনও কথা বলতে পারল না।
অনন্যা তাকে কোনও অন্ধ বিশ্বাসের দাবি করেনি।
সে শুধু চেয়েছিল, তার বক্তব্যকে যাচাই করা হোক।
ঋতব্রত ধীরে বলল, “এটাই তো হওয়া উচিত ছিল।”
ঈশিতা মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু আপনারা করেননি।”
“না।”
ঋতব্রত কম্পিউটারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “এবার করব।”
৩. অনন্যার বর্তমান
ডেটা ভল্টের শেষ ফোল্ডারে একটি অদ্ভুত নথি পাওয়া গেল।
কোনও নাম নেই। কোনও তারিখ নেই।
শুধু একটি কোড—
EXTERNAL SUBJECT 074-A
ঋতব্রত নথিটি খুলল।
এটি একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের রেকর্ড। নামটি আংশিকভাবে মুছে দেওয়া। কিন্তু তারিখগুলি ২০১৩ সালের ঘটনার পরবর্তী কয়েক মাসের।
একটি নোটে লেখা—
“অংশগ্রহণকারী ০৭৪-কে গবেষণাকেন্দ্র থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর তার মানসিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য স্বাধীন চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়। গবেষণা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ না করার শর্তে পরবর্তী সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
“তারপর?” ঋতব্রত জিজ্ঞেস করল।
ঈশিতা পরের নথিটি খুললেন।
সেখানে একটি ঠিকানা ছিল। একটি ছোট মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নাম। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগের রেকর্ড নেই।
“এখান থেকে আমরা খোঁজ শুরু করতে পারি,” ঈশিতা বললেন।
“আপনি জানেন, ওই প্রতিষ্ঠান এখনও আছে কি না?”
“জানি না।”
“তাহলে আমাদের খুঁজতে হবে।”
ঋতব্রত ফাইলটির কপি তৈরি করতে গেল। কিন্তু কম্পিউটারে একটি সতর্কবার্তা এল।
EXPORT DENIED. ADMINISTRATOR AUTHORISATION REQUIRED.
ঈশিতা নিজের পরিচয়পত্র ব্যবহার করলেন। তবুও অনুমতি মিলল না।
পর্দায় নতুন বার্তা—
প্রকল্প পরিচালকের অনুমতি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ঈশিতা হতভম্ব হয়ে গেলেন।
“অসম্ভব। আমার প্রবেশাধিকার কীভাবে বাতিল হল?”
ঠিক তখনই ঘরের স্পিকার থেকে অধ্যাপক বসুর কণ্ঠ ভেসে এল।
“ডক্টর রায়, আপনি যে সীমা অতিক্রম করছেন, সে সম্পর্কে আপনাকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।”
ঈশিতা সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
“আমি মূল তথ্য উদ্ধার করছি।”
“আপনি অনুমোদিত প্রক্রিয়া ভঙ্গ করছেন।”
ঋতব্রত স্পিকারের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনারা কি এখনও সত্যিটা লুকোতে চাইছেন?”
অধ্যাপক বসুর কণ্ঠ শান্ত।
“আমি চাই, অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে কেউ যেন ভুল সিদ্ধান্তে না পৌঁছয়।”
“তাহলে আমাদের মূল তথ্য দেখতে দিন।”
“কিছু তথ্য ব্যক্তিগত। সেগুলি প্রকাশ করা যায় না।”
ঋতব্রত বলল, “ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা দরকার। কিন্তু একজন মানুষের বক্তব্য মুছে দেওয়া আর তার ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা এক জিনিস নয়।”
কোনও উত্তর এল না।
তারপর স্পিকারে অন্য একটি কণ্ঠ ভেসে উঠল।
একজন নারীর কণ্ঠ।
“ঋতব্রত?”
সে চমকে উঠল।
কণ্ঠটি খুব স্পষ্ট নয়। তবু তার বুকের ভেতর বহু বছরের পুরোনো অনুভূতি জেগে উঠল।
“অনন্যা?”
“তুমি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছ?”
“হ্যাঁ। তুমি কোথায়?”
“সেটা এখন বলতে পারব না।”
“তুমি কি নিরাপদে আছ?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
“আমি এখন নিরাপদ। কিন্তু এই কথোপকথন দীর্ঘ করা যাবে না।”
ঋতব্রত দ্রুত বলল, “আমি তোমার ফাইল পেয়েছি। তোমার বক্তব্য শুনেছি। আমি জানি, আমি তখন তোমাকে সমর্থন করতে পারিনি।”
অনন্যার কণ্ঠে ক্লান্তি।
“আমি জানি।”
“আমি দুঃখিত।”
“তোমার দুঃখপ্রকাশ শুনতে আমি যোগাযোগ করিনি।”
ঋতব্রত থেমে গেল।
অনন্যা বলল, “আমি চাই না, তুমি আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য নিজের স্মৃতিকে জোর করে সাজাও। আমি চাই, তুমি যা জানো না, সেটা জানো না বলো। যা মনে আছে, সেটা বলো। আর যা যাচাই করা সম্ভব, সেটা যাচাই করো।”
ঋতব্রত ধীরে বলল, “আমি সেটাই করছি।”
“ভালো। তাহলে শোনো। প্রজেক্ট আয়নার আসল সমস্যা শুধু পুরোনো পরীক্ষায় ছিল না। এর নতুন পর্যায়েও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।”
“কী পদ্ধতি?”
“মানুষকে এমন পরিস্থিতিতে রাখা হচ্ছে, যেখানে তাদের সামনে দুটি অসম্পূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তারপর তাদের বলা হয়, একটি বেছে নিতে। তারা যদি একটি বেছে নেয়, অন্য বক্তব্যটি ধীরে ধীরে অবিশ্বাস্য বলে চিহ্নিত হয়। এভাবে গবেষকেরা শুধু স্মৃতি নয়, মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন।”
ঋতব্রত টেবিলের ওপর রাখা পাঁচটি ফাইলের দিকে তাকাল।
“তাহলে আজকের মূল্যায়নও সেই পরীক্ষা?”
“হ্যাঁ।”
“আমাকে তোমার আর ঈশিতার মধ্যে একজনকে বেছে নিতে বলা হয়েছে।”
“আমি জানি।”
“কিন্তু আমি কাউকে বেছে নেব না।”
অনন্যা একটু নীরব থেকে বলল, “এটাই ওরা আগে থেকে অনুমান করেনি।”
“তুমি কীভাবে জানলে?”
“কারণ এবার তুমি তাদের তৈরি করা প্রশ্নের বাইরে ভাবছ।”
ঋতব্রত জিজ্ঞেস করল, “তোমাকে কোথায় পাওয়া যাবে?”
“আমি তোমাকে একটা পথ দেখাতে পারি। কিন্তু তার আগে তোমাকে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
“কী সিদ্ধান্ত?”
“তুমি কি সত্যিটা প্রকাশ করতে প্রস্তুত, এমনকি যদি সেই সত্যে তোমার নিজের ভুলও প্রকাশ পায়?”
ঋতব্রত এক মুহূর্তও দেরি করল না।
“হ্যাঁ।”
“তাহলে মূল সার্ভারের নথি বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কোরো না। বরং এমনভাবে নথির সত্যতা যাচাই করো, যাতে কেউ বলতে না পারে তুমি সেগুলি বদলে দিয়েছ।”
ঈশিতা বললেন, “আমরা নথির ডিজিটাল স্বাক্ষর, সময়ের রেকর্ড এবং মূল সংরক্ষণ-তথ্য যাচাই করতে পারি।”
অনন্যা বলল, “ঠিক তাই। আর একটি কথা—প্রতিটি নথির সঙ্গে তার উৎসও সংরক্ষণ করো। শুধু স্ক্রিনশট নয়। মূল ফাইল, পরিবর্তনের ইতিহাস এবং কারা সেটি ব্যবহার করেছে, সেই তথ্যও দরকার।”
ঋতব্রত মাথা নাড়ল।
“তুমি এত কিছু জানলে কীভাবে?”
“কারণ আমি এত বছর ধরে নিজের বক্তব্য প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন আমার একটা কথা মনে রেখো—আমার বক্তব্যও যাচাই করবে।”
ঋতব্রতর চোখ ভিজে উঠল।
এই কথাটিই তাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল।
অনন্যা তার কাছে অন্ধ আনুগত্য চায়নি। সে চেয়েছে সত্য যাচাই করার স্বাধীনতা।
হঠাৎ স্পিকারের শব্দ কেটে গেল।
ঋতব্রত চিৎকার করে বলল, “অনন্যা! তুমি কি আবার যোগাযোগ করবে?”
কোনও উত্তর এল না।
তারপর পর্দায় একটি শেষ বার্তা ফুটে উঠল—
“সাক্ষীকে নয়, প্রমাণকে অনুসরণ করো।”
৪. পঞ্চম ফাইল
ঋতব্রত ও ঈশিতা দ্রুত ডেটা ভল্টের তথ্য যাচাই করতে শুরু করলেন।
ঈশিতা পুরোনো গবেষণার মূল নথিগুলির ডিজিটাল স্বাক্ষর পরীক্ষা করলেন। ঋতব্রত নথির সময়, পরিবর্তনের ইতিহাস এবং সংরক্ষণের রেকর্ড মিলিয়ে দেখতে লাগল।
তাদের হাতে থাকা তথ্য থেকে একটি স্পষ্ট ছবি তৈরি হতে শুরু করল।
প্রথমত, অনন্যা দত্ত সত্যিই ২০১৩ সালের গবেষণায় অংশ নিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, তার বক্তব্যকে অবিশ্বস্ত বলে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্তটি গবেষণার মূল পরিকল্পনার অংশ ছিল না। এটি পরে নেওয়া হয়েছিল।
তৃতীয়ত, অনন্যার অংশগ্রহণের তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
চতুর্থত, ঋতব্রতর নিজের বক্তব্যও অসম্পূর্ণভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছিল। তার “আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি” অংশটি মূল ভিডিওতে ছিল, কিন্তু প্রকাশিত সারাংশে সেটি উল্লেখ করা হয়নি।
পঞ্চমত, অনন্যাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের আগে কোনও স্বাধীন পর্যালোচনা করা হয়নি।
ঋতব্রত পর্দার দিকে তাকিয়ে বলল, “এগুলোই তো প্রমাণ।”
ঈশিতা বললেন, “এগুলো প্রাথমিক প্রমাণ। এগুলিকে স্বাধীনভাবে যাচাই করাতে হবে।”
“কাকে দিয়ে?”
“গবেষণার বাইরের কোনও স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দলকে। প্রয়োজনে আইনগত কর্তৃপক্ষকেও জানাতে হবে।”
ঋতব্রত মাথা নাড়ল।
“তাহলে আমরা এগুলো প্রকাশ করব।”
“সতর্কভাবে। কারও ব্যক্তিগত তথ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রকাশ করা যাবে না।”
“আমি বুঝেছি।”
ঠিক তখনই কম্পিউটারের পর্দায় পঞ্চম ফাইলটি নিজে থেকে খুলে গেল।
যে ফাইলটির ওপর কোনও নাম ছিল না।
ঋতব্রত ও ঈশিতা দু’জনেই তাকালেন।
প্রথম পাতায় লেখা—
PROJECT MIRROR — GOVERNANCE REVIEW
দ্বিতীয় পাতায় গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালন কাঠামো। তৃতীয় পাতায় অর্থায়নের উৎস। চতুর্থ পাতায় গবেষণার উদ্দেশ্য।
তারপর একটি তালিকা।
প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমিটি: পাঁচজন।
তালিকায় চারটি নাম দৃশ্যমান।
অধ্যাপক অরিন্দম বসু।
ডক্টর ঈশিতা রায়।
প্রশাসনিক পরিচালক সমীরণ পাল।
গবেষণা উপদেষ্টা মীরা সেন।
পঞ্চম নামটি ঢাকা।
ঋতব্রত নামটির ওপর কার্সর রাখতেই একটি ছোট্ট বার্তা ফুটে উঠল—
IDENTITY SEALED BY SUBJECT REQUEST.
“সাবজেক্টের অনুরোধে পরিচয় গোপন?” ঋতব্রত বলল।
ঈশিতা বললেন, “এটা অস্বাভাবিক। সাধারণত গবেষণার পরিচালন কমিটির সদস্যদের পরিচয় এভাবে গোপন রাখা হয় না।”
ঋতব্রত ফাইলের নিচে থাকা নথিগুলি খুলল।
সেখানে একটি অডিও সংযুক্ত ছিল। শিরোনাম—
GOVERNANCE MEETING — 2024
অডিও চালু হল।
প্রথমে কয়েকজন মানুষের কথোপকথন। তারপর একটি কণ্ঠ বলল, “আমরা যদি প্রজেক্ট আয়নার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করি, তাহলে পুরোনো পরীক্ষার ফলাফল নতুন অংশগ্রহণকারীদের সামনে তুলে ধরা যাবে না।”
আরেকজন বলল, “কিন্তু পুরোনো তথ্য গোপন রাখলে গবেষণার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।”
প্রথম কণ্ঠ বলল, “তাই পুরোনো তথ্যকে ব্যক্তিগত আর্কাইভে রাখা হবে। নতুন পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের শুধু প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হবে।”
তারপর তৃতীয় কণ্ঠ।
“ঋতব্রত সেনকে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব নিয়ে কী সিদ্ধান্ত?”
ঋতব্রতর শরীর শক্ত হয়ে গেল।
অডিওতে উত্তর এল, “সে এখনও নিজের স্মৃতি নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে। তার মধ্যে অপরাধবোধ আছে। কিন্তু সে নিজের অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ বাতিল করেনি। তাকে ফিরিয়ে আনা হলে আমরা দেখতে পারব, দীর্ঘ সময় পর নতুন তথ্য পেলে সে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়।”
আরেকজন বলল, “তার সম্মতি?”
প্রথম কণ্ঠটি উত্তর দিল, “প্রকল্পে অংশগ্রহণের জন্য সম্মতি নেওয়া হবে। কিন্তু পুরোনো পরীক্ষার সঙ্গে সংযোগটি প্রথমেই জানানো হবে না। তাতে তার প্রতিক্রিয়া প্রভাবিত হতে পারে।”
ঈশিতা মুখে হাত দিলেন।
“এটা সম্পূর্ণ অনৈতিক।”
ঋতব্রত বলল, “তবু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।”
অডিওর শেষে সেই প্রথম কণ্ঠ আবার বলল, “আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রজেক্ট আয়নার উদ্দেশ্য শুধু স্মৃতি পরীক্ষা নয়। আমরা দেখতে চাই, সত্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে মানুষ কাকে বিশ্বাস করে—নিজেকে, অন্যকে, নাকি প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে।”
অডিও বন্ধ হয়ে গেল।
ঋতব্রত কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।
তারপর বলল, “এই সভায় পঞ্চম ব্যক্তি কে ছিলেন?”
ঈশিতা উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু ফাইলটির শেষ পাতা খুললেন।
সেখানে একটি ডিজিটাল স্বাক্ষর ছিল। নামটি এখনও ঢাকা। কিন্তু স্বাক্ষরের সময়ের পাশে একটি নোট—
“মূল সিদ্ধান্তে সম্মতি। তবে অংশগ্রহণকারী ০৬৭-এর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করার শর্তে।”
ঋতব্রতর মাথায় যেন বজ্রপাত হল।
কেউ একজন তাকে এই গবেষণায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তে অংশ নিয়েছিল। সেই মানুষটি তার ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখার শর্ত দিয়েছিল।
সে কি অনন্যা?
নাকি এমন কেউ, যে তার অতীত সম্পর্কে অনেক কিছু জানে?
ঋতব্রত বলল, “নামটি খুলতে হবে।”
ঈশিতা চেষ্টা করলেন। কিন্তু পর্দায় সতর্কবার্তা এল—
ACCESS DENIED.
তারপর পুরো কম্পিউটার বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরের আলো একবার ঝলসে উঠল।
দূরে কোথাও অ্যালার্ম বাজতে শুরু করল।
ঈশিতা উঠে দাঁড়ালেন।
“আমাদের এখান থেকে বেরোতে হবে।”
“কেন?”
“ডেটা ভল্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়েছে। অনুমতি ছাড়া নথি খোলার কারণে পুরো স্তরটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”
ঋতব্রত মেমোরি কার্ডটি পকেটে রাখল।
“নথিগুলির কপি?”
“কিছু তথ্য অস্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। কিন্তু সব নয়।”
তারা দরজার দিকে এগোলেন।
দরজা বন্ধ।
ঈশিতা নিজের পরিচয়পত্র ব্যবহার করলেন। কোনও ফল হল না।
আবার চেষ্টা করলেন।
পর্দায় লেখা—
DIRECTOR ACCESS SUSPENDED.
ঋতব্রত ধীরে বলল, “অধ্যাপক বসু আমাদের আটকে দিয়েছেন।”
ঈশিতা মাথা নাড়লেন।
“সম্ভবত।”
ঠিক তখনই ঘরের এক কোণে থাকা পুরোনো স্পিকার থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
“আপনারা ভুল জায়গায় সত্য খুঁজছেন।”
অধ্যাপক অরিন্দম বসু।
ঋতব্রত স্পিকারের দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে সঠিক জায়গাটা কোথায়?”
“মানুষের স্মৃতিতে নয়। মানুষের সিদ্ধান্তে।”
“আপনি কী বলতে চাইছেন?”
“আপনি অনন্যাকে খুঁজছেন। কিন্তু আপনি এখনও জানেন না, সে আপনাকে কেন বেছে নিয়েছে।”
ঋতব্রতর চোখ সরু হয়ে এল।
“আমি তাকে বেছে নিইনি। সে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।”
“আপনি কি নিশ্চিত?”
এই প্রশ্নটি শুনে ঋতব্রত থমকে গেল।
অধ্যাপক বসু বললেন, “আপনি যে রেকর্ডার পেয়েছেন, সেটি কে রেখেছিল? আপনার ঘরের প্যানেলের ভেতরে সেটি কে লুকিয়েছিল? যে বার্তাগুলি আপনি পেয়েছেন, সেগুলি সত্যিই অনন্যা পাঠিয়েছে, নাকি অন্য কেউ তার পরিচয় ব্যবহার করেছে?”
ঋতব্রত কোনও উত্তর দিল না।
কারণ প্রশ্নগুলি যুক্তিসঙ্গত।
সে এতক্ষণ অনন্যার কণ্ঠ শুনেছে বলে ধরে নিয়েছে, কণ্ঠটি অনন্যারই। কিন্তু সেটি যাচাই করেনি।
অধ্যাপক বসু বললেন, “আপনি নিজেই তো বলেছিলেন, প্রমাণকে অনুসরণ করবেন। তাহলে আপনার কাছে যে কণ্ঠ পৌঁছেছে, তার সত্যতা যাচাই করলেন না কেন?”
ঋতব্রতর বুকের ভেতর ধীরে ধীরে রাগ জমতে লাগল।
“আপনি আমাকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন।”
“হতে পারে। কিন্তু আপনি নিজেও কি নিজের অপরাধবোধের কারণে অনন্যাকে খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তাড়িত হচ্ছেন না?”
ঋতব্রত চুপ করে গেল।
অধ্যাপক বসু বললেন, “আপনি যদি সত্যিই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চান, তাহলে আপনাকে নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তুলতে হবে।”
এই কথাটি ঋতব্রতর কাছে নতুন ছিল না।
অনন্যাও তাকে একই কথা বলেছিল।
কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে, এই নীতির সবচেয়ে কঠিন দিক হল—এটি নিজের পছন্দের মানুষটির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হয়।
সে ঈশিতার দিকে তাকাল।
“আমরা যে অডিও শুনলাম, সেটি কি সত্যি?”
ঈশিতা বললেন, “আমরা মূল ফাইলটি পেয়েছি। কিন্তু উৎসের ডিজিটাল স্বাক্ষর যাচাই না করে আমি নিশ্চিত বলতে পারব না।”
“তাহলে সেটাও যাচাই করতে হবে।”
“হ্যাঁ।”
ঋতব্রত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
“আর অনন্যার কণ্ঠের উৎসও।”
স্পিকারের ওপারে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর অধ্যাপক বসুর কণ্ঠ ভেসে এল।
“অবশেষে আপনি সঠিক প্রশ্নটি করছেন।”
৫. যে দরজা বাইরে খোলে
দরজা খুলল না।
ঋতব্রত চারপাশে তাকাল। ডেটা ভল্টে প্রবেশের সময় সে একটি পুরোনো জরুরি নির্গমন পথ দেখেছিল। পথটি মূল সার্ভারের পেছনে। সেখানে একটি লাল হাতল এবং ছোট্ট ধাতব দরজা।
সে ঈশিতাকে বলল, “ওই পথ দিয়ে বেরোনো যাবে?”
“জরুরি পরিস্থিতিতে। কিন্তু সেটি বাইরের করিডরে নয়, রক্ষণাবেক্ষণ কক্ষে খোলে।”
“তাহলে চলুন।”
তারা সার্ভার র্যাকের পাশ দিয়ে এগোলেন। দরজার সামনে একটি সতর্কীকরণ চিহ্ন।
শুধুমাত্র জরুরি অবস্থায় ব্যবহার করুন।
ঈশিতা হাতলটি টানলেন।
দরজা খুলে গেল।
ভেতরে সরু সিঁড়ি। নিচে অন্ধকার। দু’জন সাবধানে নেমে গেলেন।
রক্ষণাবেক্ষণ কক্ষে পৌঁছে তারা একটি ছোট্ট জানালা দেখতে পেলেন। জানালাটি আসল। বাইরে মাটি, ঘাস আর দূরে একটি কংক্রিটের দেওয়াল।
ঋতব্রত জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
এত দিন পর প্রথমবার সে বুঝতে পারল, কাচের শহরের বাইরে প্রকৃত আকাশ আছে।
আকাশের রং নীল নয়, মেঘলা ধূসর। তবু সেটি সত্যিকারের আকাশ।
ঈশিতা একটি দরজা খুললেন। দরজাটি সরু করিডরে নিয়ে গেল। করিডরের শেষে একটি সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই তারা একটি পরিত্যক্ত গবেষণা ভবনের পেছনে এসে দাঁড়ালেন।
দূরে একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। চালকের আসনে কেউ নেই।
ঋতব্রত বলল, “এখান থেকে বেরোনোর রাস্তা কোথায়?”
ঈশিতা বললেন, “প্রধান প্রবেশদ্বার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। আমরা হাঁটতে পারব।”
তারা হাঁটতে শুরু করলেন।
কয়েক মিনিট পর ঋতব্রত থামল।
“ডক্টর রায়, আপনি কি অনন্যার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন?”
ঈশিতা বললেন, “২০১৩ সালের পর নয়। অন্তত সরাসরি নয়।”
“কেন?”
“আমি ভেবেছিলাম, সে হয়তো নিজের জীবন নতুন করে শুরু করেছে। আমি যোগাযোগ করলে পুরোনো ঘটনা আবার তার সামনে ফিরে আসবে।”
“আপনি কি কখনও জানতে চেয়েছিলেন, সে ভালো আছে কি না?”
ঈশিতা মাথা নিচু করলেন।
“হ্যাঁ। কিন্তু আমি ভয় পেয়েছিলাম, সে আমার মুখ দেখতে চাইবে না।”
“সে হয়তো চাইত না। কিন্তু সেটা জানার অধিকার তার ছিল।”
ঈশিতা বললেন, “আপনি ঠিক বলেছেন।”
তারা আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
প্রধান প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি এসে ঋতব্রত দেখতে পেল, বাইরে একটি ছোট্ট প্রশাসনিক ভবন। দরজার পাশে নিরাপত্তারক্ষী। তার হাতে একটি ট্যাবলেট।
ঋতব্রতর মনে হল, তারা যদি বাইরে বেরোয়, তাহলে সব তথ্যের ওপর তাদের প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমনকি তারা যা দেখেছে, তার সত্যতা প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে উঠবে।
“আমাদের আগে নথিগুলির সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে,” সে বলল।
ঈশিতা মাথা নাড়লেন।
“কিন্তু কীভাবে?”
ঋতব্রত পকেট থেকে মেমোরি কার্ডটি বের করল।
“এই কার্ডে কী আছে, সেটা আমরা এখনও জানি না।”
“এটা যদি নিরাপত্তা-প্রোটোকলের অংশ হয়, তাহলে এতে কোনও মূল নথি থাকার কথা নয়।”
“তবু পরীক্ষা করতে হবে।”
তারা প্রশাসনিক ভবনের বাইরে একটি বেঞ্চে বসলেন। ঈশিতা নিজের ফোন বের করলেন। ফোনে নেটওয়ার্ক ফিরে এসেছে, কিন্তু বেশিরভাগ অ্যাপ বন্ধ।
ঋতব্রত ফোনের ক্যামেরা দিয়ে কার্ডটির ছবি তুলল। তারপর কার্ডের গায়ে থাকা সংখ্যাটি বড় করে দেখল।
১৩৪।
তার নিচে খুব ছোট করে আরও একটি চিহ্ন।
একটি বৃত্তের মধ্যে ত্রিভুজ।
ঋতব্রতর মনে পড়ল, লিফটের তিনটি বোতামের কথা।
বৃত্ত। বর্গ। ত্রিভুজ।
সে ফোনে চিহ্নটির ছবি রেখে দিল।
“এই চিহ্নটা কোথায় দেখেছেন?” ঈশিতা জিজ্ঞেস করলেন।
“লিফটে। আর সম্ভবত পুরোনো গবেষণার নথিতেও।”
ঈশিতা বললেন, “এটি প্রকল্পের প্রাথমিক লোগো ছিল। পরে বদলে দেওয়া হয়।”
“কেন?”
“আমি জানি না।”
ঋতব্রত কার্ডটি হাতে নিয়ে বলল, “হয়তো এর সঙ্গে মূল আর্কাইভের সম্পর্ক আছে।”
ঈশিতা বললেন, “সম্ভব। কিন্তু কার্ডটি কোথায় পরীক্ষা করব, সেটাই সমস্যা।”
ঋতব্রত কিছুক্ষণ চিন্তা করল।
তারপর বলল, “আমাদের এমন একজনের সাহায্য দরকার, যে গবেষণাকেন্দ্রের বাইরে থেকে ডিজিটাল তথ্য যাচাই করতে পারে।”
ঈশিতা বললেন, “আমি একজন স্বাধীন ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞকে চিনি। তবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে আমাদের প্রকল্পের বাইরে যেতে হবে।”
“সেটাই তো দরকার।”
ঈশিতা ফোনে একটি নম্বর খুঁজে বের করলেন।
কিন্তু কল করার আগেই তাঁর ফোনে একটি বার্তা এল।
আপনার প্রকল্প-সম্পর্কিত সমস্ত যোগাযোগ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
ঈশিতা অবিশ্বাসের চোখে পর্দার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“ওরা আমার ফোনের যোগাযোগও নিয়ন্ত্রণ করছে।”
ঋতব্রত বলল, “তাহলে অন্য পথ ব্যবহার করতে হবে।”
সে নিজের ফোন বের করল। সেখানে নেটওয়ার্ক দুর্বল, কিন্তু একেবারে বন্ধ নয়।
একটি নম্বর ডায়াল করার আগে সে থামল।
যদি এই নম্বরটি ভুল হয়? যদি সে এমন কাউকে যোগাযোগ করে, যে প্রকল্পেরই অংশ? যদি অনন্যার কণ্ঠও কোনওভাবে তৈরি করা হয়ে থাকে?
সে ফোনটি নামিয়ে রাখল।
ঈশিতা বললেন, “কী হল?”
ঋতব্রত শান্ত গলায় বলল, “আমি আর অনুমানকে প্রমাণ বলে ধরে নেব না। প্রথমে আমাদের এমন একটি তথ্য দরকার, যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়।”
ঠিক তখনই বেঞ্চের পাশে একটি ছোট্ট কাগজ পড়ে থাকতে দেখা গেল।
ঋতব্রত কাগজটি তুলল।
কোনও লেখা নেই। শুধু একটি ঠিকানা এবং একটি সময়।
কলকাতা, শিয়ালদহের কাছে পুরোনো মুদ্রণপাড়া।
আগামীকাল বিকেল চারটে।
ঠিকানার নিচে লেখা—
“কণ্ঠ নয়। মুখ নয়। নথি নিয়ে এসো।”
ঋতব্রত কাগজটি ঈশিতাকে দেখাল।
তিনি বললেন, “এটা কে রেখে গেল?”
ঋতব্রত চারপাশে তাকাল।
দূরে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হাঁটছিল। প্রবেশদ্বারের নিরাপত্তারক্ষী ট্যাবলেটে চোখ রেখেছে। আর কেউ নেই।
“জানি না,” ঋতব্রত বলল।
“তবু কি যাবেন?”
ঋতব্রত কাগজটি ভাঁজ করে পকেটে রাখল।
“যাব। কিন্তু শুধু এই কাগজের ভিত্তিতে কাউকে বিশ্বাস করতে নয়। সেখানে গিয়ে ঠিকানাটি, মানুষটি এবং নথিগুলি যাচাই করতে।”
ঈশিতা বললেন, “আমি আপনার সঙ্গে যাব।”
ঋতব্রত কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
“আপনি কেন যাবেন?”
“কারণ আমি এই অন্যায়ের অংশ ছিলাম। এবার সত্যিটা প্রকাশ করার দায়ও আমার।”
ঋতব্রত মাথা নাড়ল।
“তাহলে একটা শর্ত আছে।”
“কী শর্ত?”
“যদি প্রমাণে দেখা যায়, আপনার বিরুদ্ধে তথ্য আছে, আপনি সেটা লুকোবেন না। আর যদি আমার বিরুদ্ধে তথ্য থাকে, আমিও লুকোব না।”
ঈশিতা বললেন, “আমি রাজি।”
দু’জন উঠে দাঁড়ালেন।
কাচের শহরের উঁচু ভবনটি দূরে দেখা যাচ্ছিল। রোদ পড়ায় তার দেওয়াল চকচক করছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এটি আধুনিক গবেষণার এক অসাধারণ প্রতিষ্ঠান।
কিন্তু ঋতব্রত জানত, কাচ যত স্বচ্ছই হোক, তার ওপারে দাঁড়ানো মানুষটি কী দেখছে, তা বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
আর স্বচ্ছতার দাবি করলেই কোনও প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছ হয়ে যায় না।
৬. সত্যের সাক্ষী
পরদিন বিকেল চারটের কিছু আগে ঋতব্রত ও ঈশিতা কলকাতার পুরোনো মুদ্রণপাড়ায় পৌঁছলেন।
এখানে সরু রাস্তা, পুরোনো বাড়ি, ছাপাখানার দোকান, কাগজের গন্ধ আর ব্যস্ত মানুষের ভিড়। কাচের শহরের নিখুঁত নীরবতার সঙ্গে এই জায়গার কোনও মিল নেই।
ঠিকানাটি একটি ছোট্ট মুদ্রণালয়ের।
দরজার ওপরে লেখা—‘নবপ্রভা প্রিন্টার্স’।
ভেতরে ঢুকতেই একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ তাঁদের দিকে তাকালেন।
“আপনারা কি ঋতব্রত সেন?”
ঋতব্রত বলল, “হ্যাঁ।”
লোকটি দরজার বাইরে তাকিয়ে নিলেন।
“আপনারা দু’জন এসেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“কোনও নথি এনেছেন?”
ঋতব্রত পকেট থেকে মেমোরি কার্ডটি বের করল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে লোকটির হাতে দিল না।
“আগে আপনার পরিচয় দিন।”
লোকটি মৃদু হাসলেন।
“ভালো। অন্তত আপনি এখন প্রশ্ন করতে শিখেছেন।”
তিনি নিজের নাম বললেন—সৌম্যদীপ মিত্র। একসময় গবেষণা-তথ্য সংরক্ষণের কাজে যুক্ত ছিলেন। ২০১৩ সালের পরীক্ষার কিছু মূল নথি ডিজিটাল আর্কাইভে স্থানান্তরের দায়িত্ব তাঁর ওপর ছিল।
“আপনি অনন্যাকে চিনতেন?” ঋতব্রত জিজ্ঞেস করল।
“ব্যক্তিগতভাবে নয়। তবে তার নথি দেখেছিলাম। পরে যখন দেখি, প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তখন সন্দেহ হয়।”
“আপনি কি প্রমাণ করতে পারবেন যে নথিগুলি বদলে দেওয়া হয়েছিল?”
সৌম্যদীপ বললেন, “আমি একা পারব না। কিন্তু মূল সংরক্ষণ-রেকর্ডের কিছু কপি আমার কাছে আছে। সেগুলি স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব।”
“আপনি এত বছর অপেক্ষা করলেন কেন?”
লোকটি চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমার চাকরি, আমার পরিবার—সবকিছু ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারত। আমি নিজেকে বোঝাতাম, আমি তো শুধু তথ্য সংরক্ষণ করতাম। সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায় আমার নয়।”
ঋতব্রতর মনে হল, এই বাক্যটি সে কোথাও শুনেছে।
সে নিজেও একসময় এমনটাই ভেবেছিল।
“আপনি কি জানেন, অনন্যা এখন কোথায়?”
সৌম্যদীপ মাথা নাড়লেন।
“না। তবে আমি জানি, তার বক্তব্যের একটি স্বাধীন রেকর্ড তৈরি করা হয়েছিল। সেই রেকর্ডটি মূল গবেষণার অংশ ছিল না। অনন্যা নিজেই নিজের বক্তব্য রেকর্ড করেছিল, যাতে কেউ তার কথা বদলে দিতে না পারে।”
ঋতব্রত চমকে উঠল।
“সেটা কোথায়?”
“আমার কাছে নেই। কিন্তু তার ডিজিটাল যাচাইয়ের একটি নথি আছে।”
সৌম্যদীপ একটি ফাইল বের করলেন। তাতে অডিওর সময়, ফাইলের আকার, ডিজিটাল স্বাক্ষর এবং সংরক্ষণের তারিখ লেখা।
ঋতব্রত নথিটি মন দিয়ে দেখল।
“এটা কি প্রমাণ করে যে অডিওটি অনন্যারই?”
“একা এই নথি তা প্রমাণ করে না। কিন্তু এটি দেখায়, অডিওটি ২০১৩ সালের সময়েই সংরক্ষণ করা হয়েছিল এবং পরে তৈরি করা কোনও নতুন ফাইল বলে মনে হয় না। আরও পরীক্ষা দরকার।”
ঋতব্রত মাথা নাড়ল।
এটাই সে শুনতে চেয়েছিল।
কেউ বলছে না, সবকিছু নিশ্চিত। কেউ বলছে না, তার বিশ্বাসই যথেষ্ট। বরং প্রমাণের সীমা কোথায়, সেটাও স্পষ্ট করা হচ্ছে।
সৌম্যদীপ বললেন, “আপনি কি জানেন, এই গবেষণার মূল প্রতিবেদন কে লিখেছিলেন?”
“কে?”
“ডক্টর ঈশিতা রায় নন। অধ্যাপক বসুও নন।”
তিনি একটি পুরোনো নথি এগিয়ে দিলেন।
সেখানে গবেষণার মূল প্রতিবেদনের লেখক হিসেবে পাঁচজনের নাম।
চতুর্থ নামটি দেখে ঈশিতা চমকে উঠলেন।
“মীরা সেন?”
সৌম্যদীপ বললেন, “হ্যাঁ। তিনি তখন গবেষণা উপদেষ্টা ছিলেন। পরে তিনি প্রকল্প ছেড়ে চলে যান। তাঁর একটি চিঠিতে লেখা ছিল, গবেষণার ফলাফলকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে তিনি আর যুক্ত থাকবেন না।”
ঋতব্রত জিজ্ঞেস করল, “পঞ্চম নামটি?”
সৌম্যদীপ নথিটির দিকে তাকালেন।
“সেটি এই প্রতিবেদনের কপিতে নেই। কিন্তু মূল স্বাক্ষরিত সংস্করণে থাকার কথা।”
“আপনি কি মূল কপি পেতে পারেন?”
“সম্ভবত। তবে তার জন্য আরও সময় লাগবে।”
ঋতব্রত বলল, “আমরা অপেক্ষা করব।”
সৌম্যদীপ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি কি জানেন, আপনি এখন কী করছেন?”
“প্রমাণ সংগ্রহ করছি।”
“না। আপনি শুধু প্রমাণ সংগ্রহ করছেন না। আপনি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করছেন, যেখানে আপনার পছন্দের সত্যকেও প্রশ্ন করা যাবে।”
ঋতব্রত চুপ করে রইল।
লোকটি বললেন, “এটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। মানুষ সাধারণত নিজের বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন প্রমাণ খোঁজে। কিন্তু সত্যের জন্য কখনও কখনও নিজের বিশ্বাসকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলতে হয়।”
ঋতব্রত জানালার বাইরে তাকাল।
রাস্তার ওপারে একজন বৃদ্ধ কাগজের বান্ডিল নিয়ে হাঁটছেন। একজন দোকানদার ক্রেতার সঙ্গে দরদাম করছেন। একটি শিশু স্কুলব্যাগ নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে।
এই সাধারণ পৃথিবীর মধ্যে কেউ কারও স্মৃতি মুছে দিতে পারে না। কিন্তু কেউ যদি অন্যের বক্তব্য শুনতে অস্বীকার করে, তাহলে তার সত্য প্রকাশের পথ কঠিন হয়ে যায়।
“আমরা কীভাবে এগোব?” ঋতব্রত জিজ্ঞেস করল।
সৌম্যদীপ বললেন, “প্রথমে নথির কপি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে। তারপর এমন একটি তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে গবেষণাকেন্দ্রের কেউ এককভাবে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আর অনন্যার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে হবে, কিন্তু তার সম্মতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা যাবে না।”
ঋতব্রত বলল, “ঠিক আছে।”
সৌম্যদীপ আরও একটি কাগজ বের করলেন।
“এটি অনন্যার বর্তমান অবস্থান নয়। এটি শুধু একটি পুরোনো যোগাযোগের রেকর্ড। এখানে একটি স্বাধীন পরামর্শকেন্দ্রের নাম আছে, যেখানে সে গবেষণা ছাড়ার পর যোগাযোগ করেছিল।”
ঋতব্রত কাগজটি হাতে নিল।
“আমরা সেখানে যাব।”
“যেতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, তারা হয়তো তার তথ্য আপনাদের দেবে না। সেটাই স্বাভাবিক। আপনারা শুধু বার্তা রেখে আসতে পারেন।”
ঋতব্রত মাথা নাড়ল।
“আমি তার সম্মতি ছাড়া কিছু জানতে চাই না।”
সৌম্যদীপের মুখে প্রথমবার স্বস্তির ছাপ দেখা গেল।
“তাহলে হয়তো এবার কাজটা ঠিকভাবে হবে।”
৭. শেষ সিদ্ধান্ত
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে অনেক কিছু বদলে গেল।
ঋতব্রত, ঈশিতা এবং সৌম্যদীপ মিলে পুরোনো গবেষণার নথিগুলি স্বাধীনভাবে যাচাই করার ব্যবস্থা করলেন। একাধিক বিশেষজ্ঞের কাছে ডিজিটাল তথ্য পাঠানো হল। মূল ফাইলের পরিবর্তনের ইতিহাস, প্রকাশিত প্রতিবেদনের সঙ্গে তার পার্থক্য, এবং অনন্যার বক্তব্য বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত—সবকিছু আলাদা করে পরীক্ষা করা হল।
প্রথম পর্যায়ের রিপোর্টে দেখা গেল, গবেষণার প্রকাশিত সারাংশে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়েছিল। অনন্যার অংশগ্রহণের রেকর্ড ছিল, কিন্তু প্রকাশিত প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয়নি। ঋতব্রতর বক্তব্যেরও একটি অংশ বাদ দেওয়া হয়েছিল।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিলেন, শুধু নথি থেকে কারও উদ্দেশ্য পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায় না। কে কেন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা জানতে আরও সাক্ষ্য ও তথ্য দরকার।
ঋতব্রত সেই সতর্কতা মেনে নিল।
সে আর কোনও অসম্পূর্ণ প্রমাণকে চূড়ান্ত সত্য বলতে চায় না।
অন্যদিকে, প্রজেক্ট আয়নার বর্তমান কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হল। স্বাধীন পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। গবেষণাকেন্দ্রের অংশগ্রহণকারীদের জানানো হল, তাঁদের সম্মতি ছাড়া তাঁদের তথ্য অন্য কোনও গবেষণায় ব্যবহার করা যাবে না। কেউ চাইলে গবেষণা থেকে বেরিয়ে যেতে পারবেন।
ঈশিতা নিজের ভূমিকা সম্পর্কে লিখিত বিবৃতি দিলেন। সেখানে তিনি স্বীকার করলেন, ২০১৩ সালের পরীক্ষায় অনন্যার বক্তব্যকে অবিশ্বস্ত হিসেবে চিহ্নিত করার প্রতিবেদনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। তিনি আরও জানালেন, পরে সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব বুঝেও তিনি যথাসময়ে প্রকাশ্যে আপত্তি জানাননি।
অধ্যাপক অরিন্দম বসু প্রথমে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীন পর্যালোচনায় মূল নথির সঙ্গে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পার্থক্য সামনে আসার পর তাঁকেও লিখিত জবাব দিতে হয়।
তদন্ত চলতে থাকল।
কিন্তু ঋতব্রতর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল এক সাধারণ দুপুরে।
তার ফোনে একটি বার্তা এল।
“আমি আপনার বার্তা পেয়েছি। দেখা করতে রাজি আছি। তবে কোনও রেকর্ডিং নয়, কোনও গবেষণা নয়। শুধু কথা।”
বার্তার শেষে নাম—
অনন্যা।
ঋতব্রত দীর্ঘক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর উত্তর দিল—
“আমি রাজি। তুমি যেখানে স্বচ্ছন্দ বোধ করো, সেখানেই দেখা হবে।”
দেখা করার দিন ঠিক হল একটি ছোট্ট পাবলিক লাইব্রেরিতে। শহরের ব্যস্ত রাস্তা থেকে একটু ভেতরে, পুরোনো একটি বাড়ির নিচতলায় লাইব্রেরিটি। জানালার পাশে কয়েকটি কাঠের টেবিল, বইয়ের তাক, আর দেয়ালে ঘড়ি।
ঋতব্রত নির্ধারিত সময়ের দশ মিনিট আগে পৌঁছে গেল।
তার বুকের ভেতর অস্বস্তি। সে বহু বছর ধরে যে মুখটি মনে করার চেষ্টা করেছে, সেই মুখের সঙ্গে দেখা করতে চলেছে। কিন্তু সে জানে না, তার স্মৃতি কতটা সঠিক। হয়তো অনন্যাকে দেখেও সে চিনতে পারবে না।
বিকেল চারটে পাঁচ মিনিটে একজন নারী লাইব্রেরিতে ঢুকলেন।
বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ। সাধারণ পোশাক, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা। তিনি কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালেন।
ঋতব্রত উঠে দাঁড়াল।
নারীটি তার দিকে এগিয়ে এলেন।
“ঋতব্রত?”
“হ্যাঁ।”
“আমি অনন্যা।”
ঋতব্রত তার মুখের দিকে তাকাল।
মুখটি তার স্মৃতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। স্মৃতির মুখ ছিল অস্পষ্ট, সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া। বাস্তবের অনন্যার চোখের কোণে ক্লান্তির রেখা, কপালে কয়েকটি সূক্ষ্ম ভাঁজ। তবু তার হাসির সময় বাঁ গালে যে ছোট্ট টোল পড়ল, সেই মুহূর্তে ঋতব্রতর মনে হল, সে যেন বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
সে ধীরে বলল, “আমি তোমাকে মনে করার চেষ্টা করেছি।”
অনন্যা চেয়ারে বসে বলল, “মনে করতে পেরেছ?”
“কিছুটা। কিন্তু সবটা নয়।”
“সেটাই স্বাভাবিক।”
ঋতব্রতও বসল।
“আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে চাই।”
অনন্যা বলল, “তুমি আগেও ক্ষমা চেয়েছ।”
“কিন্তু এবার আমি জানি, আমি কীসের জন্য ক্ষমা চাইছি।”
“তুমি কি জানো?”
ঋতব্রত কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “আমি তোমাকে মিথ্যেবাদী বলিনি। কিন্তু সবাই যখন তোমাকে অস্বীকার করছিল, তখন আমি নিজের স্মৃতির ওপর আস্থা রাখতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম, চুপ থাকলে হয়তো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া এড়াতে পারব। কিন্তু আমার নীরবতা তোমাকে আরও একা করে দিয়েছিল।”
অনন্যা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“হ্যাঁ,” সে বলল। “তুমি আমাকে একা করে দিয়েছিলে। কিন্তু শুধু তুমি নয়। সেখানে যারা ছিল, যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যারা পরে সব জানার পরও চুপ করে থেকেছিল—তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদা।”
ঋতব্রত মাথা নাড়ল।
“আমি বুঝতে পারছি।”
“তুমি কি এখনও মনে করো, আমি সব সময় ঠিক ছিলাম?”
“না।”
অনন্যা একটু হেসে ফেলল।
“ভালো। কারণ আমি সব সময় ঠিক ছিলাম না। কিছু ঘটনা আমারও ভুল মনে থাকতে পারে। কিছু সিদ্ধান্ত আমি রাগের মাথায় নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি যা দেখেছি, যা অনুভব করেছি, তা যাচাই করার সুযোগ না দিয়ে আমাকে অস্বীকার করা হয়েছিল। সেটাই অন্যায়।”
ঋতব্রত বলল, “আমি তোমার বক্তব্যের রেকর্ড শুনেছি।”
“কোনটি?”
“মূল অডিওটি।”
অনন্যা জানালার বাইরে তাকাল।
“আমি সেই রেকর্ডটি করেছিলাম, কারণ তখন মনে হয়েছিল, আমার নিজের কথার ওপরও আমার আর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। অন্যরা আমার কথা ব্যাখ্যা করছে, আমার আচরণের নাম দিচ্ছে, আমার স্মৃতিকে শ্রেণিবদ্ধ করছে। আমি চেয়েছিলাম, অন্তত একবার নিজের ভাষায় নিজের কথা রেখে যেতে।”
“তুমি কি জানত, সেই রেকর্ড একদিন পাওয়া যাবে?”
“না। আমি শুধু চাইনি, আমার বক্তব্য একেবারে হারিয়ে যাক।”
ঋতব্রত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?”
অনন্যা উত্তর দেওয়ার আগে একটু থামল।
“আমি আমার জীবন নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম। প্রথম কয়েক বছর খুব কঠিন ছিল। নিজের স্মৃতিকে বিশ্বাস করব কি না, সেটা নিয়েও দ্বিধা ছিল। কিন্তু পরে বুঝলাম, প্রতিটি স্মৃতি নিখুঁত হওয়া জরুরি নয়। আমি যা মনে রেখেছি, তার সবটা হয়তো ঠিক নয়। তবু আমার বক্তব্য যাচাই করার অধিকার আছে।”
“তুমি কি কখনও ভেবেছিলে, আবার এই বিষয়টিতে ফিরবে?”
“অনেকবার। কিন্তু আমি চাইনি, আমার জীবন শুধু সেই ঘটনার মধ্যে আটকে থাকুক।”
ঋতব্রত মাথা নাড়ল।
“আমি তোমাকে খুঁজছিলাম, কিন্তু হয়তো তোমার নিজের জীবন সম্পর্কে খুব কম ভেবেছি।”
“হ্যাঁ। তুমি আমাকে একটি উত্তর হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলে। যেন আমাকে খুঁজে পেলেই তোমার অতীতের সব প্রশ্নের সমাধান হবে।”
ঋতব্রত চুপ করে রইল।
কারণ কথাটি সত্যি।
অনন্যা বলল, “আমি তোমার অতীতের কোনও রহস্যের সমাধান নই, ঋতব্রত। আমি একজন মানুষ। আমার নিজের জীবন আছে, নিজের ভুল আছে, নিজের স্মৃতি আছে। তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে পারো, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতাকে তোমার অপরাধবোধের গল্পে পরিণত কোরো না।”
ঋতব্রত ধীরে মাথা নাড়ল।
“আমি চেষ্টা করব।”
“চেষ্টা করাই যথেষ্ট নয়। ভুল হলে সেটা স্বীকার করতে হবে।”
“হ্যাঁ।”
কিছুক্ষণ তারা নীরবে বসে রইল।
তারপর অনন্যা ব্যাগ থেকে একটি পাতলা ফোল্ডার বের করল।
“এখানে আমার কাছে থাকা কয়েকটি নথির কপি আছে। এগুলি তোমাদের তদন্তে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সব নথি প্রকাশ করার আগে আমার সঙ্গে কথা বলবে। কিছু তথ্য আমার ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে যুক্ত।”
ঋতব্রত ফোল্ডারটি নিল না।
“তুমি কি নিশ্চিত, আমাকে দিতে চাও?”
“হ্যাঁ। কারণ এবার আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।”
ঋতব্রত ফোল্ডারটি গ্রহণ করল।
“আমি তোমার শর্ত মেনে চলব।”
অনন্যা উঠে দাঁড়াল।
“আর একটি কথা।”
“বলো।”
“তুমি যে সিদ্ধান্ত নিতে শিখেছ, তার মানে এই নয় যে তুমি আর ভুল করবে না। তার মানে, এবার ভুল হলে তুমি নিজের ভুলকে সত্যি বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে না।”
ঋতব্রত মৃদু হাসল।
“এটাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা।”
অনন্যা বলল, “সেটাই সবচেয়ে জরুরি।”
তারপর সে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে গেল।
ঋতব্রত জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে চলে যেতে দেখল।
এবার সে অনন্যাকে থামাল না। আরও প্রশ্ন করল না। তার কাছ থেকে নিজের অতীতের সব উত্তর আদায় করার চেষ্টা করল না।
কারণ সে বুঝেছে, কাউকে খুঁজে পাওয়া আর কাউকে নিজের অধিকার বলে মনে করা এক নয়।
৮. কাচ ভাঙার শব্দ
ছয় মাস পর প্রজেক্ট আয়নার স্বাধীন পর্যালোচনার প্রতিবেদন প্রকাশিত হল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালের গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম হয়েছিল। একটি অংশগ্রহণকারীর বক্তব্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি। গবেষণার প্রকাশিত ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়েছিল। কিছু সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের ওপর সামাজিক চাপ তৈরি করা হয়েছিল, যা গবেষণার নৈতিক সীমা অতিক্রম করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সব অনিয়মের উদ্দেশ্য এক ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তবে কিছু সিদ্ধান্তের ফলে অনন্যা দত্তের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়েছিল এবং ঋতব্রত সেনসহ অন্য অংশগ্রহণকারীদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল।
অধ্যাপক অরিন্দম বসু পদত্যাগ করলেন। গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালন কাঠামো বদলানো হল। ভবিষ্যতের গবেষণায় স্বাধীন নৈতিক পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করা হল। অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের তথ্য দেখার, সংশোধনের অনুরোধ জানানোর এবং গবেষণা থেকে সরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হল।
ঈশিতা নিজের পদে আর ফিরে গেলেন না। তিনি স্বাধীন তদন্তে সহযোগিতা করলেন এবং নিজের ভূমিকার জন্য প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ করলেন। পরে তিনি গবেষণা-নৈতিকতা নিয়ে কাজ শুরু করলেন।
ঋতব্রত কলকাতায় ফিরে এল।
সে আবার নিজের পুরোনো কাজ শুরু করল। সংখ্যার সঙ্গে কাজ করা তার পেশা। কিন্তু এখন সে জানে, সংখ্যাও কখনও কখনও মানুষের অভিজ্ঞতাকে অসম্পূর্ণ করে তুলতে পারে। একটি গ্রাফে মানুষের সন্দেহ, ভয়, দ্বিধা কিংবা সামাজিক চাপের পুরো ছবি ধরা পড়ে না।
সে প্রজেক্ট আয়নার ঘটনাগুলি নিয়ে একটি বিশদ প্রতিবেদন তৈরি করল। সেখানে নিজের ভূমিকা গোপন করল না। লিখল, কীভাবে সে অনন্যার বক্তব্যকে সমর্থন করতে পারেনি, কীভাবে নিজের স্মৃতি নিয়ে সন্দেহ করেছিল, এবং কীভাবে বহু বছর পরে নতুন তথ্যের সাহায্যে ঘটনাটিকে পুনরায় পরীক্ষা করতে শিখেছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে সে অনন্যাকে দেখাল।
অনন্যা কয়েকটি তথ্য সংশোধন করল। কিছু ব্যক্তিগত অংশ বাদ দিতে বলল। আর একটি জায়গায় লিখল—
“একজন মানুষের স্মৃতি ভুল হতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে ব্যবহার করে তার প্রতিটি বক্তব্য অস্বীকার করা যায় না। একইভাবে, একজন মানুষের যন্ত্রণা সত্যি হলেও তার প্রতিটি ধারণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য হয়ে যায় না। ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়োজন—শোনার ইচ্ছা, যাচাই করার পদ্ধতি এবং নিজের সিদ্ধান্তকে সংশোধন করার সাহস।”
ঋতব্রত এই অংশটি প্রতিবেদনে রেখে দিল।
প্রতিবেদন প্রকাশের দিন সন্ধ্যায় সে একা বসেছিল নিজের ঘরে। জানালার বাইরে শহরের আলো। টেবিলে পুরোনো মেমোরি কার্ডটি রাখা।
১৩৪।
এখনও সে জানে না, কার্ডটির শেষ চিহ্নটির সম্পূর্ণ অর্থ কী ছিল। স্বাধীন পর্যালোচনার সময় সেটি নিয়ে তদন্ত হয়েছিল, কিন্তু কার্ডটি মূল সার্ভারের একটি পুরোনো নিরাপত্তা-ব্যবস্থার অংশ বলেই মনে হয়েছে। এর সঙ্গে কোনও অতিরিক্ত গোপন তথ্য পাওয়া যায়নি।
সে কার্ডটিকে একটি ছোট্ট বাক্সে রেখে দিল।
সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
সব অপরাধের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাও হয়তো কোনও দিন পাওয়া যাবে না।
কিন্তু তার জীবনে একটি পরিবর্তন ঘটেছে।
এখন সে জানে, অনিশ্চয়তা মানেই অসহায়তা নয়। কোনও বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে তাকে প্রশ্ন করা যায়, প্রমাণ খোঁজা যায়, অন্যের বক্তব্য শোনা যায়। ভুল হলে সিদ্ধান্ত বদলানো যায়।
আর সত্যকে রক্ষা করতে হলে শুধু সাহস নয়, পদ্ধতিও দরকার।
কয়েক দিন পর ঋতব্রত আবার সেই লাইব্রেরিতে গেল, যেখানে অনন্যার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল।
জানালার পাশে বসে সে একটি খাতায় লিখল—
“আমি যা মনে করি, তা সব সময় সত্যি নয়। কিন্তু আমি যা মনে করি, তাকে যাচাই করার অধিকার আমার আছে। অন্যেরও আছে। সত্য কোনও মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।”
লেখাটি শেষ করে সে কলম নামিয়ে রাখল।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি বার্তা এল।
অনন্যার কাছ থেকে।
“প্রতিবেদনটি পড়েছি। তুমি নিজের ভুলের কথাও লিখেছ। এটা সহজ নয়। ধন্যবাদ।”
ঋতব্রত উত্তর দিল—
“আমাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমি তোমার গল্পকে নিজের গল্প বানিয়ে ফেলছিলাম।”
অনন্যার উত্তর এল—
“আমরা সবাই কখনও না কখনও তাই করি। গুরুত্বপূর্ণ হল, সেটা বুঝতে পারার পর কী করি।”
ঋতব্রত ফোনটি বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকাল।
বাইরে সন্ধ্যা নামছে। রাস্তার আলো একে একে জ্বলে উঠছে। মানুষের মুখ দেখা যাচ্ছে, আবার ভিড়ের মধ্যে হারিয়েও যাচ্ছে।
তার মনে হল, পৃথিবী নিজেই এক বিশাল কাচের শহর—যেখানে মানুষ অন্যকে দেখে, বিচার করে, কখনও ভুল বোঝে, কখনও নিজের ভুলকে সত্য বলে ধরে রাখে।
কিন্তু কাচের সবচেয়ে বড় বিপদ তার স্বচ্ছতা নয়।
বিপদ হল, আমরা অনেক সময় কাচের ওপারের মানুষটিকে দেখতে দেখতে নিজের প্রতিচ্ছবিকেই সত্যি বলে ভুল করি।
ঋতব্রত এবার সেই প্রতিচ্ছবিকে প্রশ্ন করতে শিখেছে।
আর সে জানে, প্রশ্নের শেষ নেই।
তবু প্রশ্ন করাই শুরু।
কাচের শহরের শেষ দরজাটি খুলেছিল কোনও চাবিতে নয়, কোনও গোপন যন্ত্রে নয়, কোনও অলৌকিক স্মৃতিতে নয়।
সেটি খুলেছিল তখনই, যখন একজন মানুষ নিজের বিশ্বাসকেও যাচাই করার সাহস পেয়েছিল।
— সমাপ্ত —