দ্বিতীয় পর্ব: যে স্মৃতি আমার নয়)।
রাত তখন এগারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি।
কক্ষ ০৬৭-এর সামনে দাঁড়িয়ে ঋতব্রত সেন প্রথমবার অনুভব করল, ভয় সব সময় অন্ধকার থেকে জন্মায় না। কখনও কখনও ভয় জন্মায় অতিরিক্ত আলো থেকে—যেখানে লুকিয়ে থাকার কোনও জায়গা নেই, যেখানে নিজের মুখের প্রতিটি পরিবর্তনও অন্য কারও কাছে তথ্য হয়ে ওঠে।
দরজার পাশে ছোট্ট একটি ডিজিটাল পর্দা। সেখানে লেখা—
PARTICIPANT 067
MEMORY RECONSTRUCTION: PHASE II
STATUS: ACTIVE
ঋতব্রত কার্ডটি যন্ত্রের সামনে ধরতেই দরজাটি নিঃশব্দে খুলে গেল।
ভেতরে একটি টেবিল, দুটি চেয়ার, দেওয়ালজোড়া সাদা পর্দা এবং ছাদের কাছাকাছি একটি কালো ক্যামেরা। ঘরের এক পাশে স্বচ্ছ কাচের দেওয়াল। তার ওপারে আরেকটি ঘর। সেখানে একজন মানুষ বসে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না, কারণ তার মাথায় কালো কাপড়ের মতো একটি আবরণ।
ঋতব্রত দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনল।
তারপর ঘরের স্পিকার থেকে ভেসে এল ডক্টর ঈশিতা রায়ের কণ্ঠ।
“আপনি ঠিক সময়ে এসেছেন।”
“আপনি বলেছিলেন, এখানে এমন একজন আছে, যাকে আমি মনে করতে পারছি না।”
“আমি তা বলিনি। আমি বলেছিলাম, আপনি যাকে অস্তিত্বহীন বলে মেনে নিয়েছিলেন, সে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।”
“দু’টোর মধ্যে পার্থক্য কী?”
“অনেক।”
ঋতব্রত কাচের ওপারের মানুষটির দিকে তাকাল।
“ও কে?”
“এই মুহূর্তে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে পরীক্ষাটি অর্থহীন হয়ে যাবে।”
ঋতব্রত হেসে ফেলল। হাসিটা আনন্দের ছিল না।
“আপনাদের সব কথার পেছনেই একটা পরীক্ষা লুকিয়ে থাকে। আমি জানতে চাই, আমার জীবনে কী ঘটেছিল। আপনারা সেটা জানেন। আর আমাকে উত্তর না দিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া মাপছেন।”
“আপনি ঠিকই ধরেছেন।”
ঈশিতার স্বীকারোক্তিতে সে আরও অস্বস্তি বোধ করল।
“আপনি অন্তত অস্বীকার করলেন না।”
“কারণ এই পর্যায়ে মিথ্যে বলে লাভ নেই।”
ঘরের সাদা পর্দাটি হঠাৎ জ্বলে উঠল।
সেখানে একটি পুরোনো ছবি ফুটে উঠল। ছবিতে কিশোর বয়সের ঋতব্রত। পাশে আরও কয়েকজন তরুণ-তরুণী। পেছনে লেখা—‘স্মৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ গবেষণা, ২০১৩’।
ঋতব্রত ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তার বয়স তখন উনিশ। কলেজের প্রথম বর্ষে পড়ে। অর্থের প্রয়োজন ছিল। সংবাদপত্রে একটি বিজ্ঞাপন দেখে গবেষণায় অংশ নিতে রাজি হয়েছিল। বলা হয়েছিল, কয়েকটি স্মৃতিনির্ভর প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। পারিশ্রমিকও মন্দ ছিল না।
কিন্তু ছবির দিকে তাকিয়ে তার মনে হল, এই ছবিতে এমন কিছু আছে, যা সে দেখতে পাচ্ছে না।
“ছবিটা বড় করুন,” সে বলল।
ছবি বড় হল।
পাঁচজন তরুণ। ঋতব্রত বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয়। তার ডান পাশে একটি চেয়ার। চেয়ারটি খালি।
অথচ ঋতব্রতর মনে হচ্ছিল, সেখানে কেউ বসেছিল।
একজন মেয়ে।
তার চুল কাঁধ ছুঁয়ে থাকত। কথা বলার সময় সে চোখের দিকে তাকিয়ে থাকত। তার হাসির সময় বাঁ গালে ছোট্ট একটি টোল পড়ত।
ঋতব্রত চোখ বন্ধ করল।
মুখটি মনে পড়ছে না।
কিন্তু সেই মানুষটির উপস্থিতি মনে পড়ছে।
“চেয়ারটা খালি কেন?” সে প্রশ্ন করল।
ঈশিতার উত্তর এল না।
“আমি জানি, ওখানে কেউ ছিল।”
“আপনার মনে হচ্ছে, কেউ ছিল।”
“না। আমি জানি।”
“স্মৃতি আর নিশ্চিত বোধ এক জিনিস নয়, ঋতব্রত।”
“আর গবেষণার ফলাফল আর সত্যি এক জিনিস নয়।”
এই প্রথম স্পিকারের ওপারে নীরবতা দীর্ঘ হল।
তারপর ঈশিতা বললেন, “আপনি কি জানেন, মানুষের স্মৃতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী?”
“কী?”
“মানুষ নিজের স্মৃতিকে যতটা বিশ্বাস করে, অন্যের স্মৃতিকে ততটা করে না। আর একাধিক মানুষ একই কথা বললে, নিজের চোখে দেখা ঘটনাকেও সন্দেহ করতে শুরু করে।”
“তাই বলে কাউকে মুছে দেওয়া যায়?”
“একজন মানুষের স্মৃতি থেকে কাউকে পুরোপুরি মুছে দেওয়া কঠিন। কিন্তু সেই মানুষটির স্মৃতিকে অবিশ্বাস্য করে তোলা সম্ভব।”
ঋতব্রতর বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
কাচের ওপারের মানুষটি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
সে দুই হাত তুলে মাথার আবরণটি খুলে ফেলল।
ঋতব্রত মুখটি দেখতে পেল না। তার বদলে কাচের ওপারে জ্বলে উঠল তীব্র সাদা আলো। কয়েক সেকেন্ড পর আলো নিভে গেলে মানুষটি আবার বসে পড়েছে।
কিন্তু এবার কাচের ওপর লেখা ফুটে উঠল—
“তুমি আমাকে চিনতে পারছ না, কারণ তোমাকে চিনতে দেওয়া হয়নি।”
ঋতব্রত কাচের দিকে এগিয়ে গেল।
“তোমার নাম কী?”
কোনও উত্তর এল না।
“তুমি কি ২০১৩ সালের সেই পরীক্ষায় ছিলে?”
কাচের ওপারের মানুষটি মাথা নাড়ল।
হ্যাঁ।
ঋতব্রতর হাত কেঁপে উঠল।
“তাহলে তুমি জানো, কী ঘটেছিল।”
মানুষটি আঙুল তুলে কাচের ওপর আরেকটি বাক্য লিখল—
“তুমি জানো। শুধু নিজের জানা কথাকে বিশ্বাস করতে ভুলে গেছ।”
তারপর ঘরের আলো নিভে গেল।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
আলো ফিরে আসার পর কাচের ওপারের ঘরটি ফাঁকা।
ঋতব্রত দরজার দিকে ছুটল। দরজা খুলল না।
স্পিকারে ঈশিতার কণ্ঠ ফিরে এল।
“শান্ত হোন।”
“ও কোথায় গেল?”
“অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছে।”
“এই ঘরে তো অন্য কোনও দরজা নেই!”
“আপনি যা দেখতে পাচ্ছেন, সেটাই পুরো ঘর নয়।”
ঋতব্রত এবার চিৎকার করে উঠল, “আপনারা আমাকে নিয়ে কী করছেন?”
উত্তর এল শান্ত গলায়।
“আমরা দেখতে চাই, আপনার স্মৃতির ওপর আপনার আস্থা এখনও অক্ষত আছে কি না।”
“আমার স্মৃতির পরীক্ষা করার অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে?”
“এই প্রশ্নটির উত্তর আপনাকে আমাদের কাছ থেকে নয়, নিজের অতীত থেকে খুঁজে নিতে হবে।”
তারপর দরজাটি খুলে গেল।
বাইরে বেরিয়ে ঋতব্রত দেখল, করিডরে একজন কর্মী অপেক্ষা করছে। তার হাতে একটি ট্যাবলেট।
“স্যার, আপনাকে বিশ্রামের ঘরে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে।”
“আমি কোথাও যাব না। ডক্টর ঈশিতার সঙ্গে সরাসরি কথা বলব।”
কর্মীটি কিছু বলল না। শুধু ট্যাবলেটের পর্দাটি ঋতব্রতর সামনে ধরল।
সেখানে একটি ভিডিও চলছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ঋতব্রত একটি ঘরে বসে আছে। সামনে একজন বয়স্ক গবেষক। ঋতব্রত বলছে—
“আমি নিশ্চিত, মেয়েটি এখানে ছিল।”
গবেষক জিজ্ঞেস করছেন, “আপনি কি তার নাম জানেন?”
ঋতব্রত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিচ্ছে—
“মনে পড়ছে না।”
“আপনি কি তার মুখ মনে করতে পারছেন?”
“না।”
“তাহলে কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন যে সে ছিল?”
ভিডিওর ঋতব্রত মাথা নিচু করে।
তারপর বলে—
“আমি জানি না। কিন্তু আমি জানি, সে ছিল।”
ভিডিও থেমে গেল।
ঋতব্রতর মুখ শুকিয়ে গেল।
“এটা কোথায় পেলেন?”
“আপনার গবেষণার আর্কাইভ থেকে।”
“এই ভিডিও আমি আগে দেখিনি।”
“সম্ভবত।”
“সম্ভবত মানে?”
কর্মীটি ট্যাবলেট বন্ধ করে বলল, “আপনার বিশ্রামের ঘর প্রস্তুত।”
ঋতব্রত বুঝতে পারল, এখানে প্রত্যেকটি মানুষ তাকে উত্তর দেওয়ার বদলে আরও একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছে।
আর সেই প্রশ্নগুলির কোনওটিই নিরীহ নয়।
১. ঘুমের আগে যে মানুষটি আসে
ঋতব্রতকে যে ঘরটিতে রাখা হল, সেটি আগের ঘরগুলির তুলনায় অনেক আরামদায়ক। একটি বিছানা, একটি ছোট টেবিল, বই রাখার তাক এবং জানালার মতো দেখতে একটি বড় পর্দা। পর্দায় বাইরে গাছপালা, নীল আকাশ, দূরে পাহাড়—সবই নিখুঁতভাবে সাজানো।
কিন্তু সে জানত, ওটা আসল জানালা নয়।
এই শহরে প্রকৃতির দৃশ্যও নিয়ন্ত্রিত।
টেবিলে একটি খাবারের প্যাকেট এবং পানির বোতল রাখা ছিল। তার পাশে একটি কাগজ।
“পরবর্তী সেশনের আগে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। আপনার স্মৃতিকে জোর করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন না।”
ঋতব্রত কাগজটি ছিঁড়ে ফেলল।
তারপর বিছানায় বসে ফোনটি বের করল। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পথটিও যেন ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
সে মনে মনে ২০১৩ সালের ঘটনাগুলি সাজাতে শুরু করল।
গবেষণাকেন্দ্রটি কলকাতার বাইরে ছিল। নামটা মনে নেই। সেখানে সাত দিন থাকার কথা ছিল। প্রতিদিন কিছু প্রশ্ন, কিছু ছবি, কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজ। প্রথম দু’দিন সব স্বাভাবিক ছিল।
তৃতীয় দিনের পর থেকে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করেছিল।
একদিন দুপুরে সে একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলেছিল। মেয়েটি তাকে বলেছিল, পরীক্ষার একটি অংশে অংশগ্রহণকারীদের পরস্পরের স্মৃতি যাচাই করতে বলা হবে। তার নাম হয়তো নন্দিতা, অথবা নন্দিনী।
তারপরের দিন সকালে ঋতব্রত অন্য অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞেস করেছিল, মেয়েটি কোথায়।
কেউ তাকে চিনতে পারেনি।
গবেষকেরা বলেছিলেন, ওই নামে কোনও অংশগ্রহণকারী ছিল না।
প্রথমে সে ভেবেছিল, হয়তো ভুল করছে। তারপর নিজের নোটবই খুঁজেছিল। সেখানে মেয়েটির নাম লেখা ছিল না। এমনকি আগের দিনের কথোপকথনের কোনও উল্লেখও ছিল না।
কিন্তু একটি জিনিস সে স্পষ্ট মনে করতে পারছিল।
মেয়েটি যাওয়ার আগে তাকে বলেছিল, “যদি কাল সবাই বলে আমি এখানে ছিলাম না, তাহলে তুমি কাউকে বিশ্বাস কোরো না। এমনকী নিজের চোখকেও নয়।”
এই বাক্যটি এত বছর পরেও কীভাবে মনে রয়ে গেল?
সে বিছানা ছেড়ে উঠে টেবিলের কাছে গেল। কাগজের উল্টো দিকে কলম দিয়ে লিখল—
আমি একজন মেয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলাম।
তার নিচে—
আমি তার নাম জানতাম।
আরও নিচে—
আমাকে বলা হয়েছিল, সে কখনও ছিল না।
শেষ বাক্যটি লেখার পর সে থমকে গেল।
কলমের নিব কাগজে স্থির হয়ে রইল।
তার মনে হল, বাক্যটি অসম্পূর্ণ।
আরও কিছু একটা ঘটেছিল।
সে কি মেয়েটিকে বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল?
নাকি কোনও প্রশ্নের উত্তরে এমন কিছু বলেছিল, যার ফলে মেয়েটির ক্ষতি হয়েছিল?
স্মৃতির ভেতর থেকে একটি শব্দ ভেসে এল—
“ভোট।”
ঋতব্রত চোখ বন্ধ করল।
একটি ঘর। গোল টেবিল। কয়েকজন অংশগ্রহণকারী। প্রত্যেকের সামনে একটি করে বোতাম। গবেষক বলছেন, একটি ঘটনার বিষয়ে তাঁদের মতামত দিতে হবে। অধিকাংশ মানুষ যদি একমত হন, তাহলে সেই মতামতকে চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
কিন্তু কী ছিল সেই ঘটনা?
সে মনে করতে পারল না।
তারপর হঠাৎ তার মাথায় তীব্র ব্যথা শুরু হল। সে টেবিলের ধার ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
দরজায় টোকা পড়ল।
“কে?”
কোনও উত্তর নেই।
আবার টোকা।
ঋতব্রত দরজা খুলল।
বাইরে কেউ নেই। মেঝেতে একটি ছোট্ট কালো যন্ত্র পড়ে আছে। যন্ত্রটির পাশে লেখা একটি সংখ্যা—
১৩।
সে যন্ত্রটি তুলে ঘরে নিয়ে এল।
এটি একটি পুরোনো ধরনের অডিও রেকর্ডার। পাশে ছোট্ট বোতাম। কোনও নাম নেই, কোনও নির্দেশ নেই।
ঋতব্রত কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বোতামটি চাপল।
প্রথমে শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর একটি মেয়ের কণ্ঠ।
“যদি তুমি এটা শুনতে পাও, তাহলে বুঝব, তারা আবার তোমাকে ফিরিয়ে এনেছে।”
ঋতব্রতর সমস্ত শরীর জমে গেল।
কণ্ঠটি খুব পরিচিত।
“ঋতব্রত, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না, সেটা তোমার দোষ নয়। কিন্তু তুমি যদি এবারও ওদের কথা বিশ্বাস করো, তাহলে আমার সঙ্গে যা হয়েছিল, সেটাই আবার ঘটবে।”
একটু বিরতি।
“আমার নাম অনন্যা।”
রেকর্ডারের শব্দ থেমে গেল।
ঋতব্রত ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল।
অনন্যা।
নামটি তার মনে যেন বন্ধ দরজায় আঘাত করল। হঠাৎ সে অনুভব করল, কোনও এক বিকেলে এই নামটি সে বহুবার উচ্চারণ করেছে। কোনও এক ঘরে, কোনও এক আলোয়, কোনও এক মানুষের সামনে।
কিন্তু মুখটি এখনও অস্পষ্ট।
রেকর্ডারে আবার শব্দ শুরু হল।
“তুমি হয়তো ভাবছ, আমি কেন তোমাকে খুঁজছি। আমি তোমাকে খুঁজছি না, ঋতব্রত। আমি খুঁজছি সেই মানুষটিকে, যে একবার সত্যি কথা বলেছিল। তারপর তাকে এমনভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল যে সে নিজের সত্যিকেও বিশ্বাস করতে পারেনি।”
তারপর একটি দীর্ঘ নীরবতা।
“তুমি যদি জানতে চাও, আমি কোথায়, তাহলে কাল সকাল ছ’টায় গবেষণাগারের পর্যবেক্ষণ কক্ষে যেও। ওরা তোমাকে সেখানে যেতে দেবে না। কিন্তু তুমি যদি পুরোনো পরীক্ষার নিয়ম মনে করতে পারো, তাহলে দরজাটি নিজেই খুলে যাবে।”
রেকর্ডিং শেষ।
ঋতব্রত যন্ত্রটি বন্ধ করল।
পরীক্ষার নিয়ম?
কোন নিয়ম?
সে জানত না।
কিন্তু এখন তার কাছে অন্তত একটি নাম আছে।
অনন্যা।
২. যে নথিতে কেউ নেই
পরদিন সকাল ছ’টার আগেই ঋতব্রত ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
করিডর ফাঁকা। দেয়ালের ডিজিটাল ঘড়িতে ০৫:৫৬। পর্যবেক্ষণ কক্ষের অবস্থান সে আগের দিন দেখেছিল—দ্বিতীয় তলার শেষ প্রান্তে।
দরজার সামনে পৌঁছে সে থামল।
কোনও হাতল নেই। কেবল একটি ছোট্ট কালো পর্দা। তার ওপর লেখা—
ACCESS RESTRICTED
ঋতব্রত চারপাশে তাকাল।
দরজার পাশে দেয়ালে একটি ছোট্ট বাক্স। বাক্সটির ওপর পাঁচটি বোতাম। প্রতিটি বোতামে একটি চিহ্ন—বৃত্ত, ত্রিভুজ, বর্গ, ক্রস এবং একটি ফাঁকা বৃত্ত।
তার মনে পড়ল, ২০১৩ সালের পরীক্ষায় এমনই পাঁচটি চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছিল।
প্রশ্নটি ছিল, কোন চিহ্নটি অন্য চারটির থেকে আলাদা?
অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী ফাঁকা বৃত্ত বেছে নিয়েছিল। কারণ সেটির ভেতরে কিছু ছিল না।
কিন্তু ঋতব্রত বলেছিল, ফাঁকা বৃত্তই অন্য চারটির মতো। কারণ বাকি চারটি চিহ্নও কাগজের ওপর আঁকা ছিল, তাদের ভেতরে কোনও বাস্তব বস্তু ছিল না। পার্থক্যটি চোখে পড়লেও সেটি অর্থবহ ছিল না।
গবেষকরা তার উত্তরে হাসাহাসি করেছিলেন।
তারপর মেয়েটি—অনন্যা—বলেছিল, “ঠিক উত্তর খোঁজার আগে প্রশ্নটি কে তৈরি করেছে, সেটা ভাবা দরকার।”
ঋতব্রতর বুকের মধ্যে একটা ঝাঁকুনি লাগল।
সে বোতামগুলির দিকে তাকাল।
তারপর পাঁচটির কোনওটিই চাপল না।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বলল, “প্রশ্নটি ভুল।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর একটি যান্ত্রিক শব্দ হল।
দরজাটি খুলে গেল।
ঋতব্রত ভেতরে ঢুকে পড়ল।
পর্যবেক্ষণ কক্ষটি অন্ধকার। দেওয়ালে অসংখ্য পর্দা। প্রতিটি পর্দায় একটি করে ঘর, একজন করে মানুষ। কেউ ঘুমোচ্ছে, কেউ বই পড়ছে, কেউ চুপচাপ বসে আছে।
একটি বড় পর্দায় লেখা—
SUBJECT 067: MEMORY RESPONSE ANALYSIS
তার নিচে ঋতব্রতর বর্তমান ভিডিও ফুটেজ।
আরেকটি পর্দায় তার ২০১৩ সালের ফুটেজ।
তৃতীয় পর্দায় একটি গ্রাফ। গ্রাফের পাশে লেখা—
SOCIAL CONSENSUS PRESSURE: HIGH
PERSONAL MEMORY CONFIDENCE: PERSISTENT
ঋতব্রত দ্রুত কম্পিউটারের কাছে গেল।
একটি ফাইল খোলা ছিল। শিরোনাম—
ANANYA: PARTICIPANT STATUS REVIEW
সে ফাইলটি খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা—
নাম: অনন্যা দত্ত
বয়স: ২১
গবেষণায় অংশগ্রহণ: ২০১৩
অংশগ্রহণকারী নম্বর: ০৭৪
বর্তমান অবস্থা: রেকর্ডে অনুপস্থিত
রেকর্ডে অনুপস্থিত।
মৃত নয়। নিখোঁজ নয়। বহিষ্কৃত নয়।
শুধু অনুপস্থিত।
পরের পাতায় একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন।
“অংশগ্রহণকারী ০৭৪ বারবার দাবি করছে যে পরীক্ষার নকশা সম্পর্কে তাকে অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়েছে। সে অন্য অংশগ্রহণকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। তার বক্তব্যের কারণে দলের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।”
তারপর আরও একটি লাইন—
“অংশগ্রহণকারী ০৬৭ তার বক্তব্যকে সমর্থন করছে।”
ঋতব্রতর হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
আরও নিচে লেখা—
“দলের মধ্যে আস্থা বজায় রাখতে ০৭৪-এর বক্তব্যকে অবিশ্বস্ত হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব গৃহীত।”
প্রস্তাবের পাশে সাতটি স্বাক্ষর।
তারপর একটি টেবিল।
সাতজন অংশগ্রহণকারীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—অনন্যা দত্ত কি কখনও তাঁদের সঙ্গে একই গবেষণায় অংশ নিয়েছে?
ছয়জন উত্তর দিয়েছিল, “না।”
একজন লিখেছিল, “আমি নিশ্চিত নই।”
সেই একজন ঋতব্রত।
শেষ পাতায় একটি ভিডিও সংযুক্ত ছিল।
সে ভিডিওটি চালাল।
একটি সাদা ঘর। মাঝখানে বসে আছে অনন্যা। তার চোখ লাল। সামনে একজন গবেষক।
“আপনি কি স্বীকার করছেন যে আপনি ভুল স্মৃতি তৈরি করেছেন?”
“না।”
“আপনি কি স্বীকার করছেন যে অন্য অংশগ্রহণকারীরা আপনাকে চিনতে পারছে না?”
“তারা আমাকে চিনতে পারছে না বলে আমি কখনও এখানে ছিলাম না, এমন নয়।”
“আপনি কি মনে করেন, ছয়জন মানুষ একই ভুল করতে পারে?”
অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “হ্যাঁ। বিশেষ করে যদি তাঁদের সবাইকে একই তথ্য দেওয়া হয়।”
গবেষক প্রশ্ন করলেন, “তাহলে আপনি বলছেন, সবাই মিথ্যে বলছে?”
“আমি বলছি, তাঁরা যা বিশ্বাস করছেন, তা সত্যি নাও হতে পারে।”
“আপনি কি আপনার বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন?”
অনন্যা সোজা হয়ে বসল।
“না।”
ভিডিওতে এরপর আরও কয়েক মিনিটের কথোপকথন ছিল। কিন্তু তার পর্দা হঠাৎ কালো হয়ে গেল।
তারপর একটি বার্তা—
FILE INCOMPLETE. AUTHORISATION REQUIRED.
ঋতব্রত ফাইলটি বন্ধ করতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আরেকটি নোটিফিকেশন ভেসে উঠল।
আপনি কি মূল পরীক্ষার ফলাফল দেখতে চান?
নিচে দুটি বিকল্প।
হ্যাঁ।
না।
সে ‘হ্যাঁ’ চাপল।
পর্দায় একটি নতুন নথি খুলল। সেখানে গবেষণার উদ্দেশ্য বিস্তারিত লেখা ছিল।
এটি কোনও সাধারণ স্মৃতি পরীক্ষা ছিল না।
গবেষকেরা জানতে চেয়েছিলেন, মানুষের নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বিশ্বাস কতটা বদলানো যায়, যদি তাকে ধারাবাহিকভাবে বিপরীত তথ্য দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের একাংশকে নির্দিষ্ট একটি ঘটনার বিষয়ে একই ভুল তথ্য জানানো হয়েছিল। তারপর তাঁদের প্রত্যেককে অন্যদের বক্তব্য শোনানো হয়।
পরীক্ষার মূল প্রশ্ন ছিল—একজন মানুষ নিজের স্মৃতিকে কতক্ষণ ধরে বিশ্বাস করবে, যখন তার চারপাশের সবাই বলবে সে ভুল?
কিন্তু নথির শেষ অংশে একটি সতর্কীকরণ ছিল।
“মূল প্রোটোকলের বাইরে গিয়ে একজন অংশগ্রহণকারীর ব্যক্তিগত পরিচয় ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রভাবিত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ অনুমোদিত গবেষণা-সীমা অতিক্রম করেছে।”
তার নিচে আরেকটি লাইন—
“ঘটনার জন্য দায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী দলের সদস্যদের পরিচয় আলাদা নথিতে সংরক্ষিত।”
ঋতব্রত সেই নথিটি খুঁজতে গেল।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ।
“ঋতব্রত সেন।”
ডক্টর ঈশিতা রায়ের কণ্ঠ।
“আপনি এখানে কী করছেন?”
ঋতব্রত পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
“আমি সত্যিটা খুঁজছি।”
“আপনার অনুমতি নেই।”
“তাহলে অনুমতি দিন।”
“এটা এত সহজ নয়।”
ঋতব্রত ঘুরে দাঁড়াল।
“অনন্যা দত্ত কে?”
ঈশিতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।
“আপনি ফাইল খুলেছেন।”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে বুঝতে পারছেন, এই গবেষণায় কী ধরনের সমস্যা হয়েছিল।”
“সমস্যা? একজন মানুষকে ছয়জনের সামনে অস্বীকার করানো কি শুধু সমস্যা?”
ঈশিতার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“আমি সেই সময় এখানে কাজ করতাম না।”
“কিন্তু এখন করেন। আর আপনি জানেন, সে কোথায়।”
“আমি জানি না।”
“আপনি মিথ্যে বলছেন।”
ঈশিতা এগিয়ে এসে কম্পিউটারের পর্দা বন্ধ করলেন।
“আপনি এখন যে অবস্থায় আছেন, তাতে প্রতিটি অসম্পূর্ণ তথ্যকে ষড়যন্ত্র মনে হতে পারে। এই গবেষণাকেন্দ্রে অনেক তথ্য আছে, যেগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত নয়।”
“তাহলে অনন্যার রেকর্ডে ‘বর্তমান অবস্থা: রেকর্ডে অনুপস্থিত’ লেখা কেন?”
ঈশিতা এবার সত্যিই অস্বস্তিতে পড়লেন।
“ওটা প্রশাসনিক ভাষা।”
“একজন মানুষ প্রশাসনিক ভাষায় হারিয়ে যায় না।”
“কখনও কখনও যায়।”
কথাটি বলে ঈশিতা যেন নিজেই থমকে গেলেন।
ঋতব্রত বুঝতে পারল, এই উত্তরটি তাঁর প্রস্তুত করা ছিল না।
“আপনি জানেন, অনন্যা কোথায়?”
ঈশিতা চোখ নামিয়ে বললেন, “আমি জানি, আপনাকে এখন এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।”
৩. স্মৃতি আর অপরাধবোধ
ঋতব্রতকে পর্যবেক্ষণ কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হল। তার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি। বরং তাকে নিয়ে যাওয়া হল গবেষণাকেন্দ্রের একটি ছোট কনফারেন্স রুমে।
সেখানে তিনজন মানুষ বসেছিলেন।
একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, একজন চিকিৎসক এবং ডক্টর ঈশিতা।
টেবিলের ওপরে একটি নথি।
“আপনার সাম্প্রতিক আচরণ সম্পর্কে আমরা আলোচনা করেছি,” প্রশাসনিক কর্মকর্তা বললেন। “আপনি অনুমতি ছাড়া নিষিদ্ধ তথ্য দেখেছেন। নিরাপত্তাবিধি ভেঙেছেন।”
ঋতব্রত চুপ করে রইল।
“আপনি কি মনে করেন, এখানে আপনার সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে?”
“আমি মনে করি, আপনারা সত্যিটা লুকোচ্ছেন।”
“আপনার এই ধারণার কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আছে?”
ঋতব্রত টেবিলের ওপর হাত রাখল।
“আপনাদেরই নথিতে অনন্যা দত্তের নাম আছে। তার ভিডিও আছে। তার বক্তব্য আছে। আর আপনারা বলছেন, আমি যা মনে করছি, তা আমার মানসিক অবস্থার ফল।”
চিকিৎসক বললেন, “মানুষের স্মৃতি পুনর্গঠিত হয়। স্মৃতি কোনও ভিডিও রেকর্ডিং নয়।”
“সেটা আমি জানি।”
“তাহলে বুঝতে পারছেন, আপনার বিশ্বাসই শেষ কথা হতে পারে না।”
“আমার বিশ্বাস শেষ কথা নয়। কিন্তু আপনাদের নথিও শেষ কথা নয়।”
ঈশিতা এতক্ষণ চুপ ছিলেন। এবার তিনি বললেন, “আপনি কি মনে করতে পারছেন, পরীক্ষার শেষ দিনে কী ঘটেছিল?”
ঋতব্রত উত্তর দিতে পারল না।
তার মনে হল, সেই দিনটি একটি ঘন কুয়াশার আড়ালে ঢাকা।
“আমি জানি না।”
“আপনাকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছিল। মনে পড়ে?”
“না।”
“আপনি একটি বোতাম চাপেন।”
ঋতব্রতর চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
“কোন বোতাম?”
“আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, অনন্যা দত্তের বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য কি না।”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
ঋতব্রতর মাথার মধ্যে শব্দ হতে লাগল।
একটি টেবিল। ছয়জন মানুষ। সামনে স্ক্রিন। স্ক্রিনে অনন্যার মুখ।
গবেষক বলছেন, “আপনাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত মতামত গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা যা সত্যি বলে মনে করেন, সেটাই নির্বাচন করুন।”
ঋতব্রতর আঙুল একটি বোতামের ওপর।
তার পাশের মানুষ বলছে, “ওর কথা ঠিক নয়।”
আরেকজন বলছে, “ও আমাদের বিভ্রান্ত করছে।”
তৃতীয়জন বলছে, “এতজন কি একসঙ্গে ভুল হতে পারে?”
তারপর ঋতব্রতর নিজের কণ্ঠ।
“আমি নিশ্চিত নই।”
ঈশিতা বললেন, “আপনি অনন্যার বক্তব্যকে সমর্থন করেননি। আবার সরাসরি মিথ্যেও বলেননি। আপনি ‘নিশ্চিত নই’ নির্বাচন করেছিলেন।”
ঋতব্রত চোখ বন্ধ করল।
এটাই কি তার অপরাধ?
সে কি অনন্যাকে অস্বীকার করেছিল? নাকি নিজের ভয় থেকে তাকে সমর্থন করতে পারেনি?
“এরপর কী হয়েছিল?” সে জিজ্ঞেস করল।
ঈশিতা বললেন, “অনন্যাকে গবেষণা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।”
“কেন?”
“তার বক্তব্য গবেষণার নির্ধারিত কাঠামোকে প্রভাবিত করছিল।”
“তারপর?”
“তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা হয়নি।”
“আপনারা তার পরিবারকে জানিয়েছিলেন?”
ঈশিতা উত্তর দিলেন না।
ঋতব্রত উঠে দাঁড়াল।
“আপনারা একজন মানুষকে অস্বীকার করেছিলেন। আর আমি আপনাদের থামাতে পারিনি।”
“আপনি তখন উনিশ বছরের তরুণ ছিলেন,” ঈশিতা বললেন। “আপনাকে এমন একটি পরিস্থিতিতে রাখা হয়েছিল, যেখানে অন্যদের সঙ্গে একমত হওয়াই সহজ মনে হচ্ছিল।”
“সেটা আমার সিদ্ধান্তকে ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু মুছে দিতে পারে না।”
ঈশিতা প্রথমবার তার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন তিনি কোনও পরীক্ষার বিষয় নয়, একজন মানুষকে দেখছেন।
“আপনি কি জানেন, এই প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের উদ্দেশ্য কী?”
“আমার স্মৃতি ফিরিয়ে আনা?”
“শুধু তা নয়। আমরা দেখতে চাই, অতীতের একটি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নতুন তথ্য পেলে আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান। আপনি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন কি না, এবং নিজের অপরাধবোধকে ব্যবহার করে নতুন কোনও ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছন কি না।”
ঋতব্রত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
“আপনারা কি আবার আমাকে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবেন?”
“আমরা চাই, আপনি নিজে সিদ্ধান্ত নিন।”
“কী সিদ্ধান্ত?”
ঈশিতা উত্তর দেওয়ার আগেই কনফারেন্স রুমের দরজা খুলে গেল।
একজন কর্মী ভেতরে এসে ঈশিতার কানে কিছু বলল।
ঈশিতার মুখের রং বদলে গেল।
“কী হয়েছে?” ঋতব্রত জিজ্ঞেস করল।
কর্মীটি বলল, “সাবজেক্ট ০৭৪-এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।”
ঋতব্রতর বুকের ভেতর যেন কেউ মুঠো করে ধরল।
“অনন্যা?”
কর্মীটি তার দিকে তাকাল না।
ঈশিতা উঠে দাঁড়ালেন।
“কোথায়?”
“বাহ্যিক যোগাযোগ চ্যানেল। সিগন্যালটি মাত্র কয়েক সেকেন্ড ছিল।”
“উৎস শনাক্ত হয়েছে?”
“না। তবে একটি বার্তা এসেছে।”
“কী বার্তা?”
কর্মীটি ট্যাবলেটটি এগিয়ে দিল।
পর্দায় লেখা—
“০৬৭-কে বলুন, সে একা নয়। আর এবার যেন সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়।”
ঋতব্রত বার্তাটি পড়ে ঈশিতার দিকে তাকাল।
“অনন্যা বেঁচে আছে।”
ঈশিতা বললেন, “আমরা এখনও সেটা নিশ্চিত করতে পারিনি।”
“আপনি আবারও একই কাজ করছেন।”
“কী কাজ?”
“প্রমাণ সামনে থাকলেও সত্যিটাকে স্বীকার করতে চাইছেন না।”
ঈশিতা কিছু বললেন না।
কিন্তু এবার ঋতব্রত তাঁর নীরবতাকে উত্তর বলে ধরে নিল না।
সে জানত, তাকে আরও জানতে হবে।
আর এই প্রথম তার মনে হল, অনন্যাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য শুধু স্মৃতি ফিরে পাওয়া যথেষ্ট নয়। তাকে বুঝতে হবে, কেন এত বছর ধরে তার নিজের অতীতকে অসম্পূর্ণ রাখা হয়েছে।
৪. ১৩৩ জনের মধ্যে ১৩৪তম মানুষ
সন্ধ্যার পর ঋতব্রতকে তার ঘরে ফিরিয়ে দেওয়া হল।
কিন্তু এবার দরজা বন্ধ হওয়ার আগে সে একটি জিনিস লক্ষ্য করল।
করিডরের দেওয়ালে স্থাপিত ডিজিটাল বোর্ডে গবেষণাকেন্দ্রের বাসিন্দাদের সংখ্যা দেখানো হয়।
বর্তমান নিবন্ধিত বাসিন্দা: ১৩৩
তার নিচে কর্মীদের সংখ্যা।
গবেষণা কর্মী: ৪১
এবং অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা।
সক্রিয় অংশগ্রহণকারী: ৯২
ঋতব্রতর মনে পড়ল, প্রথম দিন ঈশিতা বলেছিলেন, এই কেন্দ্রে মোট ১৩৩ জন মানুষ রয়েছেন।
কিন্তু অংশগ্রহণকারী ০৬৭-এর ফাইলে লেখা ছিল, সে এই প্রকল্পে নতুন নয়। তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
তার মানে, এই ১৩৩ জনের মধ্যে এমন কেউ আছে, যে কাগজে-কলমে অংশগ্রহণকারী হলেও বাস্তবে অন্য কোনও ভূমিকায় রয়েছে।
আর অনন্যার নম্বর ০৭৪।
যদি তার রেকর্ড মুছে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তার পুরোনো পরিচয়টি কোথায়?
সে কি এই ১৩৩ জনের মধ্যেই আছে?
নাকি কেউ এমনভাবে তার পরিচয় বদলে দিয়েছে, যে তাকে চেনার উপায় নেই?
ঋতব্রত ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করল।
তারপর কাগজে লিখল—
১. অনন্যা দত্ত, অংশগ্রহণকারী ০৭৪।
২. ২০১৩ সালের পরীক্ষায় তার অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছিল।
৩. আমি তার বক্তব্যকে সমর্থন করিনি।
৪. বর্তমান গবেষণায় কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
৫. আমাকে বলা হচ্ছে, সিদ্ধান্ত আমাকে নিজেকেই নিতে হবে।
পাঁচ নম্বর পয়েন্টটির নিচে সে দাগ টানল।
তারপর আরও একটি প্রশ্ন লিখল—
আমি যদি আবার ভুল সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে কার ক্ষতি হবে?
কাগজটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হল, এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না।
কিন্তু পরক্ষণেই আরেকটি প্রশ্ন মাথায় এল—
যদি কেউ আমার অপরাধবোধকে ব্যবহার করে আমাকে পরিচালিত করতে চায়, তাহলে আমি কীভাবে বুঝব কোন সিদ্ধান্তটি সত্যিই আমার নিজের?
এই প্রশ্নের উত্তরও তার কাছে নেই।
রাত দশটার দিকে ঘরের পর্দায় একটি বার্তা ফুটে উঠল।
আগামীকাল সকাল ১০টা। চূড়ান্ত মূল্যায়ন।
তারপর দ্বিতীয় লাইন—
আপনাকে একটি সাক্ষ্য নির্বাচন করতে হবে।
তৃতীয় লাইনটি পড়ে ঋতব্রতর সমস্ত শরীর শীতল হয়ে গেল।
দুটি পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে একটিকে আপনি সত্য বলে ঘোষণা করবেন।
নিচে দুটি নাম।
ডক্টর ঈশিতা রায়।
অনন্যা দত্ত।
ঋতব্রত অনেকক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
এটাই তাহলে দ্বিতীয় ধাপের আসল পরীক্ষা।
তাকে আবারও দু’জন মানুষের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে। একজনের বক্তব্য গ্রহণ করলে অন্যজনের বক্তব্য অবিশ্বাস্য হয়ে উঠবে। হয়তো এবারও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সত্য নির্ধারণ করা হবে।
কিন্তু এবার সে আর উনিশ বছরের তরুণ নয়।
এবার সে জানে, মানুষের আত্মবিশ্বাস সত্যের প্রমাণ নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্মতিও সত্যের প্রমাণ নয়। আবার কোনও মানুষের যন্ত্রণা তার প্রতিটি বক্তব্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য করে দেয় না।
তাহলে কীসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে সে?
সে কি অনন্যাকে বিশ্বাস করবে, কারণ তাকে আগে অবিশ্বাস করা হয়েছিল?
নাকি ঈশিতাকে বিশ্বাস করবে, কারণ তিনি অন্তত কিছু সত্য স্বীকার করেছেন?
নাকি এই দুই বিকল্পের বাইরেও কোনও পথ আছে?
ঋতব্রত পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি কাউকে বেছে নেব না।”
কয়েক সেকেন্ড পর পর্দায় উত্তর এল—
আপনাকে একটি নির্বাচন করতেই হবে।
ঋতব্রত ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
“তাহলে আপনাদের পরীক্ষাটাই ভুল।”
পর্দাটি নিভে গেল।
কিন্তু ঘরের এক কোণে, যেখানে দেওয়াল আর মেঝে মিলেছে, সেখানে ক্ষীণ সবুজ আলো জ্বলে উঠল।
ঋতব্রত ঝুঁকে দেখল, দেওয়ালের প্যানেলের একটি অংশ সামান্য আলগা।
সে প্যানেলটি সরাতেই ভেতরে একটি ছোট্ট মেমোরি কার্ড দেখতে পেল।
কার্ডটির ওপর হাতে লেখা একটি সংখ্যা—
১৩৪
তার সঙ্গে কোনও চিঠি নেই। কোনও নির্দেশও নেই।
শুধু কার্ডটি।
ঋতব্রত কার্ডটি নিজের জামার পকেটে রাখল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার মাথায় একটি স্মৃতি ফিরে এল।
২০১৩ সালের পরীক্ষার শেষ দিন।
গবেষকেরা সাতজনকে নিয়ে একটি ঘরে বসেছিলেন। অনন্যাকে তখন ইতিমধ্যেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেককে বলা হয়েছিল, তারা একটি সাধারণ মূল্যায়নে অংশ নিচ্ছে।
কিন্তু ঋতব্রত দেখেছিল, ঘরের পেছনে কাচের ওপারে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
সেই মানুষটি তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
গবেষকেরা বলেছিলেন, সেখানে কেউ নেই।
ঋতব্রত চোখ মুছে আবার তাকিয়েছিল।
মানুষটি তখনও দাঁড়িয়ে।
তারপর সে হাত তুলেছিল।
ঋতব্রতর মনে পড়ল, সেই হাতের আঙুলে একটি কালো আংটি ছিল।
বর্তমানের কাচের শহরে, প্রথম দিন থেকে এখন পর্যন্ত, সে অন্তত তিনজন মানুষের হাতে সেই একই ধরনের কালো আংটি দেখেছে।
একজন নিরাপত্তাকর্মী।
একজন গবেষণা সহকারী।
আর—
ডক্টর ঈশিতা রায়।
ঋতব্রত পকেটের ভেতর মেমোরি কার্ডটির ওপর হাত রাখল।
তারপর খুব আস্তে বলল, “অনন্যা, তুমি যদি সত্যিই বেঁচে থাকো, তাহলে এবার আমি শুধু তোমাকে বিশ্বাস করব না। আমি প্রমাণ খুঁজব।”
ঘরের ক্যামেরাটি ঘুরে তার দিকে তাকাল।
কিন্তু ঋতব্রত এবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসল।
কারণ সে বুঝে গেছে, কাচের শহরে শুধু মানুষকে দেখা হয় না।
মানুষ কী দেখছে, কী বিশ্বাস করছে, আর কী নিয়ে সন্দেহ করছে—সেটাও দেখা হয়।
আর এই খেলায় প্রথমবারের মতো সে নিজের স্মৃতিকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নিচ্ছে না।
সে নিজের সন্দেহকেও চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নিচ্ছে না।
সে শুধু প্রশ্ন করছে।
এবং হয়তো এই প্রশ্ন করাটাই তাদের সবচেয়ে বড় ভয়।
রাত গভীর হল।
শহরের সব কাচের দেওয়ালে আলো জ্বলতে লাগল। একের পর এক ঘরের ভেতর মানুষদের ছায়া দেখা গেল। কেউ ঘুমোচ্ছে, কেউ হাঁটছে, কেউ স্থির হয়ে বসে আছে।
কিন্তু একটি ঘর ছিল অন্ধকার।
দরজার ওপরে নম্বর লেখা—
০৭৪
ঘরটি তালাবদ্ধ নয়।
ভেতরে বিছানা আছে, টেবিল আছে, চেয়ার আছে।
শুধু কোনও মানুষ নেই।
ঋতব্রত যদি সেই ঘরে ঢুকতে পারত, তাহলে দেখত, টেবিলের নিচে ছোট্ট একটি যন্ত্র লুকিয়ে রাখা হয়েছে। যন্ত্রটির পর্দায় একটি চলমান মানচিত্র।
মানচিত্রে কাচের শহরের প্রতিটি ঘর চিহ্নিত।
তার মধ্যে ০৬৭ নম্বর ঘরটি জ্বলছে লাল আলোয়।
আর ০৭৪ নম্বর ঘরটি জ্বলছে সবুজ আলোয়।
তার নিচে একটি বার্তা—
“স্মৃতি পুনরুদ্ধার: ৩৮%।
পর্যবেক্ষণাধীন বিষয়ের আত্মনির্ভর সিদ্ধান্ত: প্রত্যাশার বাইরে।
পরবর্তী পদক্ষেপ: সাক্ষ্য নির্বাচন নয়, সাক্ষ্যদাতার পরিচয় যাচাই।”
তারপর পর্দায় নতুন একটি নাম ভেসে উঠল।
DR. ISHITA RAY — SUBJECT HISTORY SEALED
কয়েক সেকেন্ড পর সেই নামটিও অদৃশ্য হয়ে গেল।
কাচের শহর আবার নীরব হয়ে পড়ল।
কিন্তু নীরবতার নিচে, অদৃশ্য কোনও যন্ত্রের ভেতর, একটি নতুন পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।
এবার পরীক্ষার বিষয় শুধু ঋতব্রত নয়।
এবার প্রশ্ন উঠেছে—যে মানুষ অন্যদের স্মৃতি পরীক্ষা করে, তার নিজের স্মৃতি কতটা সত্য?
চলবে…