শীতের ভোর। উত্তরবঙ্গের ছোট্ট পাহাড়ঘেরা গ্রাম ধবলডাঙা। বছরের অন্য সময় গ্রামটি প্রাণচঞ্চল থাকলেও শীত পড়লেই চারদিক ঢেকে যেত ঘন কুয়াশায়। গ্রামের মানুষ বলত, “এই কুয়াশার আড়ালে শুধু পথ নয়, লুকিয়ে আছে বহু বছরের ইতিহাস।”
কলকাতার তরুণ শিক্ষক অর্ণব নতুন চাকরি নিয়ে ধবলডাঙা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগ দিতে আসে। গ্রামের এক প্রান্তে একটি পুরোনো বাড়িতে তার থাকার ব্যবস্থা হয়। বাড়িটির মালিক বৃদ্ধ নৃপেনবাবু বিদায় নেওয়ার আগে শুধু একটি কথাই বললেন,
— “রাত বারোটার পর বাড়ির পেছনের বাঁশবাগানে যাবেন না।”
অর্ণব হেসে বলল, “আপনারা এখনও এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন?”
বৃদ্ধ শান্ত গলায় উত্তর দিলেন,
— “সব গল্পই কুসংস্কার নয় বাবা। কিছু গল্পের পেছনে সত্যি লুকিয়ে থাকে।”
প্রথম কয়েকদিন সবকিছু স্বাভাবিকই চলছিল। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা অর্ণবকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিল। কিন্তু এক রাতে আচমকা তার ঘুম ভেঙে গেল।
জানলার বাইরে যেন কারও মৃদু কণ্ঠ ভেসে আসছে।
“ফিরে এসো…”
অর্ণব উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ঘন কুয়াশার মধ্যে দূরে একটি লণ্ঠনের আলো দেখা যাচ্ছে। সেই আলো ধীরে ধীরে বাঁশবাগানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
পরদিন সকালে সে বিষয়টি গ্রামের চায়ের দোকানে বলতেই সবাই চুপ করে গেল। অনেকক্ষণ পরে দোকানদার বলল,
— “ওই আলো কেউ অনুসরণ করে না।”
— “কেন?”
— “কারণ যারা গিয়েছে, তারা আর আগের মতো ফিরে আসেনি।”
অর্ণব যুক্তিবাদী মানুষ। সে এসব মানল না।
সেই রাতেই লণ্ঠনের আলো আবার দেখা দিল।
এবার সে টর্চ হাতে আলোটিকে অনুসরণ করল।
কুয়াশার মধ্যে পথ যেন শেষই হচ্ছে না। কিছুদূর এগিয়ে সে দেখতে পেল একটি ভাঙাচোরা মন্দির। মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধা।
বৃদ্ধা বললেন,
— “তুমি এসেছ?”
অর্ণব অবাক।
— “আপনি আমাকে চেনেন?”
বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।
— “না। কিন্তু তোমার মতো কাউকেই আমি বহু বছর ধরে অপেক্ষা করছি।”
অর্ণব কিছু বুঝতে পারল না।
বৃদ্ধা মন্দিরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা একটি লোহার বাক্স দেখালেন।
— “এটা গ্রামের ইতিহাস। কেউ যেন হারিয়ে যেতে না দেয়।”
বাক্স খুলতেই অর্ণব বিস্মিত হয়ে গেল।
ভেতরে পুরোনো দলিল, ডায়েরি, কয়েকটি সাদা-কালো ছবি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কার কিছু গোপন নথি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
“এই গ্রামের মানুষ স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তাদের নাম ইতিহাসে লেখা হয়নি। যে এই ডায়েরি খুঁজে পাবে, সে যেন সত্যিটা সবাইকে জানায়।”
অর্ণব সারারাত ডায়েরি পড়ল।
সে জানতে পারল, ১৯৪৩ সালে গ্রামের কয়েকজন তরুণ স্বাধীনতা সংগ্রামী ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি বাঁচাতে এই মন্দিরে লুকিয়ে রেখেছিলেন। পরে এক বিশ্বাসঘাতকের কারণে সবাই ধরা পড়েন। কিন্তু নথিগুলো আর কেউ খুঁজে পায়নি।
পরদিন অর্ণব সমস্ত নথি নিয়ে জেলার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করল। ইতিহাসবিদরা এসে পরীক্ষা করে নিশ্চিত করলেন যে নথিগুলো অত্যন্ত মূল্যবান।
কয়েক মাস পরে ধবলডাঙা গ্রামে একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি হলো। সেখানে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম খোদাই করা হলো। বহু বছরের অবিচার অবশেষে দূর হলো।
উদ্বোধনের দিন অর্ণবের মনে পড়ল সেই বৃদ্ধার কথা।
সে আবার রাতের বেলা মন্দিরে গেল।
কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
শুধু ভাঙা সিঁড়ির ওপর একটি পুরোনো লণ্ঠন পড়ে আছে।
বৃদ্ধ নৃপেনবাবুকে ঘটনাটি বলতেই তিনি গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
— “যে বৃদ্ধার কথা বলছ, তিনি ছিলেন কমলাদেবী। তিনি ছিলেন সেই সংগ্রামীদের একজনের মেয়ে। প্রায় বিশ বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।”
অর্ণব স্তব্ধ হয়ে গেল।
তাহলে যাঁর সঙ্গে সে কথা বলেছিল…
নৃপেনবাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “হয়তো কিছু আত্মা মুক্তি পায় না, যতক্ষণ না তাদের অসমাপ্ত কাজ শেষ হয়।”
সেই বছরের শীত শেষে ধবলডাঙার কুয়াশা যেন আগের চেয়ে অনেক হালকা লাগছিল।
গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত, বহু বছরের অপেক্ষার অবসান হয়েছে।
অর্ণব যখনই ভোরের কুয়াশার দিকে তাকাত, তার মনে হতো—কুয়াশা কখনও কখনও পথ আড়াল করে, কিন্তু সত্যকে নয়।
বরং সত্যের কাছে পৌঁছাতে হলে অনেক সময় সেই কুয়াশার ভেতর দিয়েই হাঁটতে হয়।
সমাপ্ত।
Categories
কুয়াশার আড়ালে।