শহর থেকে অনেক দূরে, নদী আর সবুজ মাঠে ঘেরা একটি ছোট্ট গ্রাম—বকুলতলা। গ্রামটির মাঝখানে প্রায় একশো বছরের পুরোনো একটি পাঠাগার। একসময় এটি ছিল গ্রামের গর্ব, কিন্তু এখন ধুলো জমা তাক, ছেঁড়া বই আর ভাঙা জানালার কারণে খুব কম মানুষই সেখানে যেত।
ইতিহাসের ছাত্র ঋত্বিক গবেষণার কাজে গ্রামে এসেছিল। তার কাজ ছিল পুরোনো গ্রন্থাগারগুলোর ইতিহাস সংগ্রহ করা। গ্রামের মানুষ তাকে বলল,
— “বকুলতলা পাঠাগারে গেলে সাবধানে যেও। ওখানে নাকি একটা নীল ডায়েরি আছে। যে পড়তে শুরু করে, সে শেষ না করে উঠতে পারে না।”
ঋত্বিক এসব কথা শুনে হেসে ফেলল। সে মনে মনে ভাবল, “প্রতিটি গ্রামেরই একটা না একটা রহস্যময় গল্প থাকে।”
পরদিন সকালে সে পাঠাগারে গেল। বৃদ্ধ গ্রন্থাগারিক অজিতবাবু তাকে স্বাগত জানালেন। গল্প করতে করতে তিনি বললেন,
— “যদি কোনো পুরোনো বই নাও, পড়ে আবার জায়গামতো রেখে দিও।”
ঋত্বিক বই খুঁজতে খুঁজতে এক কোণে কাঠের একটি আলমারি দেখতে পেল। আলমারির দরজা খুলতেই ধুলোর ঝড় উঠল। সেখানে রাখা ছিল চামড়ার মলাটে বাঁধানো একটি নীল রঙের ডায়েরি।
প্রথম পাতায় লেখা—
“যে সত্য জানার সাহস রাখে, শুধু সেই এই ডায়েরি খুলবে।”
কৌতূহল সামলাতে না পেরে ঋত্বিক পড়া শুরু করল।
ডায়েরিটি লিখেছিলেন অমিয় ভট্টাচার্য, যিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এই পাঠাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক ছিলেন।
ডায়েরিতে লেখা ছিল—
“এই পাঠাগারের ভেতরে এমন একটি ঘর আছে, যেখানে গ্রামের ইতিহাস লুকিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু লোভী মানুষের হাত থেকে বাঁচাতে সেই ঘরের পথ গোপন করে দেওয়া হয়েছে।”
ঋত্বিকের চোখে উত্তেজনা জ্বলে উঠল।
পরদিন সে অজিতবাবুকে বিষয়টি জানাল। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— “আমি জানতাম, একদিন না একদিন কেউ এই ডায়েরি খুঁজে পাবে।”
দুজন মিলে পাঠাগারের প্রতিটি দেওয়াল পরীক্ষা করতে লাগলেন।
হঠাৎ ঋত্বিক লক্ষ্য করল, একটি বইয়ের তাক অন্যগুলোর তুলনায় একটু আলাদা।
সে তাকটি সরাতেই ভেতরে একটি সরু দরজা দেখা দিল।
দরজাটি খুলতেই তারা নেমে গেল ভূগর্ভস্থ একটি ছোট ঘরে।
ঘরটি বই, দলিল, মানচিত্র আর হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিতে ভরা।
একটি কাঠের বাক্সে ছিল গ্রামের দুইশো বছরের ইতিহাস।
সেখানে জমিদারদের দলিল যেমন ছিল, তেমনি ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গোপন চিঠি, দুর্ভিক্ষের বিবরণ, গ্রাম গড়ে ওঠার কাহিনি এবং বহু মানুষের জীবনসংগ্রামের নথি।
অজিতবাবুর চোখ ভিজে উঠল।
তিনি বললেন,
— “এগুলো যদি হারিয়ে যেত, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনও নিজেদের অতীতকে চিনতে পারত না।”
ঋত্বিক সব নথি সংরক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করল। কয়েক মাসের মধ্যে পাঠাগারটি সংস্কার করা হলো। পুরোনো দলিল ডিজিটাল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হলো।
উদ্বোধনের দিন গ্রামের স্কুলের ছেলেমেয়েরা নতুন পাঠাগারে বই পড়তে এল।
অজিতবাবু নীল ডায়েরিটি ঋত্বিকের হাতে তুলে দিয়ে বললেন,
— “এটা এখন তোমার কাছে থাকুক।”
ঋত্বিক মাথা নেড়ে বলল,
— “না কাকু। এটা কোনো একজন মানুষের নয়। এটা এই পাঠাগারের আত্মা। এখানেই থাকুক, যাতে ভবিষ্যতে আরেকজন কৌতূহলী মানুষ এটাকে খুঁজে পায়।”
অজিতবাবু মৃদু হেসে ডায়েরিটি আবার কাচের বাক্সে রেখে দিলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় ঋত্বিক শেষবারের মতো পাঠাগারের দিকে তাকাল।
জানালার ফাঁক দিয়ে নীল ডায়েরির মলাটে সূর্যের শেষ আলো পড়ছিল।
মনে হচ্ছিল, ইতিহাস যেন নিঃশব্দে বলছে—
“যে জাতি তার অতীতকে যত্ন করে, তার ভবিষ্যৎ কখনও অন্ধকার হয় না।”
সমাপ্ত। 📖💙
Categories
নীল ডায়েরির রহস্য।