Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : পুরোনো সেলাইয়ের বাক্সে লুকিয়ে ছিল এক নতুন জীবনের নকশা।

শিউলিপুর গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল ছোট্ট একটি বাড়ি। বাড়িটির দেওয়ালে সময়ের ছাপ, উঠোনে কয়েকটি তুলসীগাছ আর জানালার পাশে সারি দিয়ে রাখা পুরোনো টব। সেখানেই থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত ডাককর্মী অমলেশ চক্রবর্তী এবং তাঁর স্ত্রী সরলা দেবী।

তাঁদের একমাত্র মেয়ে তিতলি কলকাতায় একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করত। কয়েক বছর আগে বিয়ের পর সে অন্য শহরে চলে গিয়েছিল। বাবা-মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হতো, বছরে দু-একবার বাড়িতে আসত। কিন্তু দূরত্বের কারণে আগের মতো প্রতিদিনের ছোট ছোট কথা আর ভাগ করে নেওয়া হতো না।

অমলেশবাবু বাইরে থেকে কঠোর স্বভাবের মানুষ ছিলেন। জীবনের অধিকাংশ সময় নিয়ম মেনে কাজ করেছেন। নির্দিষ্ট সময়ে অফিস যাওয়া, হিসাব রাখা, প্রতিটি কাজের দায়িত্ব পালন করা—এসবই ছিল তাঁর অভ্যাস। কিন্তু অবসর নেওয়ার পর ধীরে ধীরে তাঁর দিনগুলো একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল। আগে যে মানুষটির হাতে সারাদিন কাজ থাকত, এখন তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়তেন।

সরলা দেবী মাঝেমধ্যে বলতেন, “তুমি যদি নিজের জন্য নতুন কিছু করতে, তাহলে সময়টাও ভালো কাটত।”

অমলেশবাবু হেসে উত্তর দিতেন, “এই বয়সে আবার নতুন কী করব? যা করার ছিল, সবই তো হয়ে গেছে।”

সরলা দেবী আর জোর করতেন না।

একদিন বর্ষার দুপুরে বাড়ির পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে তিতলির ছোটবেলার কিছু জিনিস বেরিয়ে এল। পুরোনো পাঠ্যবই, আঁকার খাতা, ভাঙা পুতুল আর একটি কাঠের সেলাইয়ের বাক্স। বাক্সটি ছিল সরলা দেবীর মায়ের। বহু বছর আগে তিনি নিজের হাতে কাপড় সেলাই করতেন। ছোটখাটো জামা মেরামত থেকে শুরু করে বালিশের ওয়াড় তৈরি—সবই করতেন সেই বাক্সের জিনিস দিয়ে।

বাক্সটির ঢাকনা খুলতেই সরলা দেবীর চোখে স্মৃতির ছায়া নেমে এল। ভিতরে ছিল নানা রঙের সুতো, কয়েকটি বোতাম, পুরোনো মাপফিতা, ছোট কাঁচি এবং একটি কাপড়ের থলিতে রাখা হাতে তৈরি নকশার টুকরো।

অমলেশবাবু পাশ থেকে বললেন, “এত পুরোনো জিনিস রেখে কী হবে? অনেক কিছুই তো আর ব্যবহার করা যাবে না।”

সরলা দেবী বাক্সটি বুকে টেনে নিয়ে বললেন, “সব পুরোনো জিনিসের মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায় না। কিছু জিনিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কোথা থেকে এসেছি।”

সেদিন সন্ধ্যায় বাক্সটি তিনি নিজের ঘরে রেখে দিলেন।

পরদিন পাশের বাড়ির দশ বছরের মেয়ে পিউ স্কুল থেকে ফিরে কাঁদতে কাঁদতে তাদের উঠোনে এল। তার স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য একটি বিশেষ পোশাক দরকার ছিল। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় নতুন পোশাক কেনা সম্ভব হচ্ছিল না। তার মা পুরোনো একটি জামা একটু বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ঠিকমতো পারছিলেন না।

পিউয়ের চোখের জল দেখে সরলা দেবী বললেন, “কাঁদছিস কেন? জামাটা নিয়ে আয় তো।”

পিউ অবাক হয়ে বলল, “আপনি পারবেন ঠাকুমা?”

সরলা দেবী মৃদু হেসে বললেন, “অনেক দিন সেলাই করিনি। হাতটা একটু কাঁপে বটে, কিন্তু চেষ্টা করতে দোষ কী?”

তিনি কাঠের বাক্সটি খুললেন। পুরোনো সুতো আর মাপফিতা বের করে জামাটি ভালো করে দেখলেন। তারপর ধীরে ধীরে সেলাই শুরু করলেন। কোথাও কাপড় ভাঁজ করলেন, কোথাও নতুন বোতাম লাগালেন, কোথাও রঙিন কাপড়ের ছোট টুকরো দিয়ে সাজিয়ে দিলেন।

দুই ঘণ্টা পরে জামাটি পিউয়ের হাতে তুলে দিলেন তিনি।

পিউ আনন্দে লাফিয়ে উঠল। “ঠাকুমা, এটা তো একেবারে নতুন জামার মতো!”

তার আনন্দ দেখে সরলা দেবীর মুখেও বহুদিন পরে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

ঘটনাটি সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু পরের কয়েক দিনে আরও দু-তিনজন প্রতিবেশী তাঁদের পুরোনো পোশাক নিয়ে সরলা দেবীর কাছে এলেন। কারও জামার বোতাম ছিঁড়েছে, কারও ওড়নার কিনারা খুলে গেছে, কারও আবার স্কুলের পোশাক একটু বড় করে দিতে হবে।

সরলা দেবী প্রথমে বিনা পয়সায় কাজগুলো করে দিচ্ছিলেন। কিন্তু একদিন অমলেশবাবু বললেন, “তুমি তো আবার নিয়মিত কাজ পেয়ে গেছ দেখছি!”

সরলা দেবী হেসে বললেন, “কাজ নয়, মানুষের উপকার করছি।”

অমলেশবাবু বললেন, “উপকার অবশ্যই ভালো। কিন্তু তোমার সময় আর পরিশ্রমেরও তো মূল্য আছে। সবাই যদি সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য কিছু দেয়, তাহলে তুমি নিজের প্রয়োজনের জিনিসও কিনতে পারবে।”

কথাটা সরলা দেবীর মনে ধরল।

পরের দিন থেকে তিনি ঠিক করলেন, খুব অসচ্ছল পরিবারের কাজ বিনা পয়সায় করবেন। অন্যদের কাছ থেকে শুধু সুতোর খরচ এবং সামান্য পারিশ্রমিক নেবেন। এতে তাঁর কাজের মূল্যও থাকবে, আবার কারও অসুবিধাও হবে না।

ধীরে ধীরে তাঁর কাছে কাজ আসতে শুরু করল। তবে সরলা দেবীর বয়স হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ বসে সেলাই করলে কোমরে ব্যথা হতো, চোখেও চাপ পড়ত। তিনি বুঝতে পারছিলেন, একা সব কাজ সামলানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

ঠিক সেই সময় পিউয়ের মা মাধবী দেবী একদিন তাঁর কাছে এলেন। মাধবী দেবী বাড়িতে থাকতেন এবং সংসারের কাজের ফাঁকে কিছু উপার্জন করার ইচ্ছা ছিল। তিনি বললেন, “দিদি, আপনি যদি আমাকে একটু সেলাই শেখাতেন, তাহলে আমিও কিছু কাজ করতে পারতাম।”

সরলা দেবী প্রথমে দ্বিধায় পড়লেন। অনেক বছর পর আবার কাউকে নিয়ম করে শেখানোর কথা ভাবছিলেন। তবু তিনি রাজি হলেন।

প্রতিদিন বিকেলে মাধবী দেবী আসতেন। প্রথমে সোজা সেলাই, তারপর বোতাম লাগানো, কাপড়ের কিনারা ভাঁজ করা এবং ছোটখাটো মেরামতের কাজ শিখতে লাগলেন। সরলা দেবী তাঁকে শুধু হাতের কাজ শেখাতেন না, কাপড় কাটার আগে মাপ নেওয়া, কাপড় নষ্ট না করা এবং কাজ শেষ হলে সেলাই পরীক্ষা করার গুরুত্বও বোঝাতেন।

একদিন মাধবী দেবী একটি জামার হাতা ভুল মাপে কেটে ফেললেন। তিনি ভীষণ হতাশ হয়ে বললেন, “আমার দ্বারা হবে না দিদি। এত সহজ কাজও ঠিক করতে পারলাম না।”

সরলা দেবী তাঁর হাত থেকে জামাটি নিয়ে বললেন, “ভুল হয়েছে মানেই তুমি অযোগ্য নও। ভুলটা কোথায় হয়েছে, সেটা বুঝতে পারলেই পরের বার ঠিক করতে পারবে। তবে মাপ নেওয়ার সময় তাড়াহুড়ো করবে না।”

তাঁরা দুজনে মিলে কাপড়ের অবশিষ্ট অংশ থেকে হাতাটি নতুন করে তৈরি করলেন। মাধবী দেবী সেদিন বাড়ি ফিরলেন অনেকটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে।

এরপর আরও একজন যোগ দিলেন—বিধবা রীনা পাল। তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব একাই সামলাতে হচ্ছিল। তিনি আগে কখনো সেলাইয়ের কাজ করেননি, কিন্তু শিখতে আগ্রহী ছিলেন। সরলা দেবী তাঁকেও ধীরে ধীরে শেখাতে শুরু করলেন।

অমলেশবাবু এবার আর শুধু বারান্দায় বসে থাকতেন না। তিনি নিজের পুরোনো অভ্যাস কাজে লাগিয়ে একটি হিসাবের খাতা তৈরি করলেন। কে কত কাজ করলেন, কত সুতো লাগল, কত টাকা এল, কত খরচ হলো—সব লিখে রাখতেন। কাজের অর্ডার অনুযায়ী পোশাকের নাম, মাপ এবং দেওয়ার তারিখও লিখে রাখতেন।

সরলা দেবী একদিন মজা করে বললেন, “তুমি তো দেখছি আমার ছোট্ট কাজটাকে পুরো অফিস বানিয়ে ফেলেছ!”

অমলেশবাবু হাসলেন। “অফিস না হোক, কাজেরও তো একটা নিয়ম থাকা দরকার। তুমিই তো আমাকে শিখিয়েছ, পুরোনো জিনিসেরও মূল্য আছে। আমার এত বছরের হিসাব রাখার অভ্যাসটাও তাহলে কাজে লাগুক।”

কয়েক মাসের মধ্যে তাঁদের ছোট্ট উদ্যোগের পরিচিতি বাড়তে লাগল। গ্রামের স্কুলের কয়েকজন অভিভাবক পোশাক মেরামতের কাজ দিতে শুরু করলেন। উৎসবের আগে পুরোনো শাড়ি থেকে বালিশের ওয়াড়, কাপড়ের ব্যাগ এবং ছোটদের পোশাক তৈরি করার কাজও এল।

তাঁরা একটি নিয়ম চালু করলেন—কাজের দাম আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হবে। কাপড়ের খরচ আলাদা, সেলাইয়ের পারিশ্রমিক আলাদা। কোনো কাজ সময়মতো শেষ করা সম্ভব না হলে আগেই জানানো হবে। এতে ক্রেতাদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি কমে গেল।

একদিন তিতলি ভিডিও কলে মায়ের ঘরে সাজানো কাপড়ের স্তূপ দেখে অবাক হয়ে গেল।

“মা, তোমরা এত কাজ করছ! আগে তো বলতেই না।”

সরলা দেবী হেসে বললেন, “আগে আমিও ভাবতাম, আমার সময় শেষ হয়ে গেছে। এখন বুঝছি, জীবনের এক অধ্যায় শেষ হলে আরেকটি অধ্যায় শুরু হতে পারে।”

তিতলি জানতে পারল, তার বাবা হিসাব রাখছেন, মা সেলাই শেখাচ্ছেন, আর মাধবী ও রীনা নিজেদের উপার্জন করছেন। সে আনন্দিত হয়ে বলল, “তোমরা চাইলে আমি কিছু ভালো মানের সেলাইয়ের উপকরণ পাঠিয়ে দিতে পারি।”

সরলা দেবী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “প্রয়োজন হলে বলব মা। তবে আমরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এগোতে চাই। শুরুতেই অনেক কিছু কেনার দরকার নেই।”

তিতলি মায়ের এই আত্মবিশ্বাস দেখে মুগ্ধ হলো।

এর কিছুদিন পর গ্রামের একটি স্কুলে অভিভাবক সমাবেশ ছিল। সেখানে কয়েকজন অভিভাবক প্রস্তাব দিলেন, পুরোনো কিন্তু ব্যবহারযোগ্য স্কুলের পোশাক সংগ্রহ করে প্রয়োজনমতো মেরামত করা যায় কি না। এতে দরিদ্র পরিবারের ছাত্রছাত্রীরা উপকৃত হবে।

সরলা দেবী উদ্যোগটির দায়িত্ব নিতে রাজি হলেন। তবে তিনি একটি শর্ত দিলেন—যে পোশাক ব্যবহার করা হবে, তা পরিষ্কার, অক্ষত এবং উপযুক্ত মাপের হতে হবে। কারও ব্যক্তিগত সম্মান যেন ক্ষুণ্ণ না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

কয়েকজন অভিভাবক পুরোনো পোশাক দিলেন। সেগুলোর অবস্থা পরীক্ষা করে প্রয়োজনমতো সেলাই করা হলো। যেসব পোশাক আর ব্যবহারযোগ্য ছিল না, সেগুলো অন্য কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা হলো। কাজটি করতে গিয়ে মাধবী ও রীনা আরও দক্ষ হয়ে উঠলেন।

একদিন পিউ স্কুল থেকে ফিরে সরলা দেবীকে বলল, “ঠাকুমা, বড় হয়ে আমিও তোমার মতো কাজ শিখব। নিজের হাতে কিছু তৈরি করতে পারলে কত ভালো লাগে!”

সরলা দেবী তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “অবশ্যই শিখবি। তবে মনে রাখিস, শুধু কাজ জানলেই হয় না। কাজের প্রতি যত্ন, সততা আর মানুষের প্রতি সম্মানও শিখতে হয়।”

সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে সরলা দেবী আবার সেই পুরোনো কাঠের বাক্সটি খুললেন। বাক্সের ভিতরে থাকা রঙিন বোতামগুলো এখনো আগের মতোই চকচক করছিল। কয়েকটি সুতো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, মাপফিতাটিও পুরোনো। তবু বাক্সটি তাঁর কাছে অমূল্য হয়ে উঠেছে।

অমলেশবাবু পাশে এসে দাঁড়ালেন।

“জানো সরলা, অবসর নেওয়ার পর আমি ভাবতাম, আমার জীবনে আর কোনো নতুন কাজ বাকি নেই। এখন বুঝি, কাজের ধরন বদলায়, কিন্তু মানুষের প্রয়োজন ফুরোয় না।”

সরলা দেবী মৃদু হেসে বললেন, “আর নতুন করে শুরু করার জন্য সব সময় নতুন জিনিস লাগে না। কখনো পুরোনো জিনিসের মধ্যেই নতুন পথ লুকিয়ে থাকে।”

জানালার বাইরে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল। ঘরের ভিতরে সেলাইয়ের বাক্সটি বন্ধ করে রাখা হলো। কিন্তু তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাগুলো আর বন্ধ রইল না।

সেই ছোট্ট বাক্স থেকেই জন্ম নিয়েছিল কয়েকজন মানুষের আত্মবিশ্বাস, নিজেদের উপার্জনের পথ এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি। সরলা দেবী বুঝেছিলেন, বয়স বাড়লে মানুষের মূল্য কমে যায় না। অভিজ্ঞতা, ধৈর্য আর শেখানোর ইচ্ছা থাকলে জীবনের যে কোনো পর্যায়েই নতুন কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব।

গল্পের শিক্ষা: জীবনে নতুনভাবে শুরু করার জন্য সব সময় বড় পুঁজি বা আধুনিক উপকরণের প্রয়োজন হয় না। নিজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সদিচ্ছাকে কাজে লাগিয়েও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা যায়। আর নিজের জ্ঞান অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিলে ব্যক্তিগত সাফল্য অনেক মানুষের জীবনে আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *