Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : শেষ ট্রেনের যাত্রী।

 

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। ছোট্ট স্টেশনটির নাম শিমুলতলা। দিনের বেলায় স্টেশনটিতে বেশ ভিড় থাকে, কিন্তু রাত বাড়তেই চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। প্ল্যাটফর্মের দু’টি হলুদ আলো মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিল। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর তার সঙ্গে মিশে ছিল হালকা বৃষ্টির শব্দ।

স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে একা বসে ছিলেন অরুণবাবু।

বয়স প্রায় ষাট। হাতে পুরনো একটি চামড়ার ব্যাগ। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি।

শেষ ট্রেনটি আসার কথা রাত এগারোটায়।

অরুণবাবু জানতেন, এই ট্রেনটিই তাঁকে সেই গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে তিনি প্রায় চল্লিশ বছর আগে চলে এসেছিলেন।

কেন ফিরছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেও ঠিক জানতেন না।

চল্লিশ বছর আগে এই স্টেশনেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়েছিল।

তখন তিনি তরুণ। সদ্য কলেজ পাশ করেছেন। চাকরির জন্য শহরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁর জীবনে এসেছিল মেঘলা।

মেঘলা ছিল পাশের গ্রামের মেয়ে। খুব সাধারণ, শান্ত স্বভাবের। অরুণের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল গ্রামের লাইব্রেরিতে।

দু’জনের মধ্যে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, তারপর ভালোবাসা।

কিন্তু অরুণের বাবা এই সম্পর্ক মেনে নেননি।

তিনি চেয়েছিলেন অরুণ শহরে গিয়ে ভালো চাকরি করুক, বড়লোক পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করুক।

একদিন অরুণকে শহরে যাওয়ার জন্য জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সেদিন স্টেশনে মেঘলা এসেছিল।

অরুণের ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে মেঘলা বলেছিল,

“তুমি যদি আজ চলে যাও, আমি অপেক্ষা করব।”

অরুণ কিছু বলতে পারেননি।

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল।

আর তারপর?

জীবন তাঁকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল।

চাকরি, বিয়ে, সংসার, সন্তান—সবই হয়েছিল।

কিন্তু মেঘলার কথা কখনও পুরোপুরি ভুলতে পারেননি তিনি।

বছর দশেক আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একদিন পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে অরুণ একটি চিঠি পেয়েছিলেন।

মেঘলার লেখা।

চিঠিটি তিনি কখনও পাননি।

চিঠিতে মাত্র কয়েকটি কথা ছিল—

“অরুণ, তুমি যদি ফিরে আসো, আমি এখনও অপেক্ষা করব। তবে তোমার জন্য নয়, তোমার সঙ্গে একবার কথা বলার জন্য।”

চিঠির তারিখ ছিল আজ থেকে তিরিশ বছর আগের।

চিঠিটি পড়ার পর অরুণ বহুবার মেঘলাকে খুঁজেছিলেন।

কিন্তু পারেননি।

কেউ বলেছিল, মেঘলা বিয়ে করে অন্য শহরে চলে গেছে।

কেউ বলেছিল, সে নাকি বিয়েই করেনি।

কেউ আবার বলেছিল, মেঘলা বহু বছর আগে মারা গেছে।

কোনটা সত্যি, অরুণ জানতেন না।

আজ হঠাৎ কেন যেন তাঁর মনে হল—একবার সেই গ্রামে ফিরে যাওয়া দরকার।

হয়তো মেঘলা নেই।

হয়তো সবকিছু বদলে গেছে।

তবুও যেতে হবে।

ঠিক তখনই স্টেশনের অন্ধকার দিক থেকে একটি ছোট্ট ছেলে এসে তাঁর সামনে দাঁড়াল।

ছেলেটির বয়স দশ-এগারোর বেশি নয়।

পরনে ভেজা জামা।

সে অরুণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি কি অরুণকাকু?”

অরুণ চমকে উঠলেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি আমাকে চেনো?”

ছেলেটি মৃদু হেসে বলল,

“চিনি না। তবে আপনাকে চিনতে বলেছে।”

“কে?”

ছেলেটি পকেট থেকে একটি ছোট্ট খাম বের করল।

“এটা আপনাকে দিতে বলেছে।”

অরুণ কাঁপা হাতে খামটি নিলেন।

খামের ওপর লেখা—

অরুণের জন্য।

হাতের লেখাটা তিনি সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেললেন।

মেঘলা।

চোখ ঝাপসা হয়ে এল তাঁর।

“মেঘলা কোথায়?”

ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আমার ঠাকুমা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।”

অরুণের বুকের ভেতরটা যেন থমকে গেল।

“তোমার ঠাকুমার নাম কী?”

ছেলেটি বলল,

“মেঘলা।”

কথাটা শুনে অরুণ যেন পাথর হয়ে গেলেন।

এত বছর পরও?

মেঘলা বেঁচে আছে?

ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

ছেলেটি বলল,

“চলুন। ঠাকুমা বলেছে, শেষ ট্রেনটা যেন আপনি মিস না করেন।”

অরুণ ব্যাগটা তুলে দাঁড়ালেন।

চল্লিশ বছর আগে যে ট্রেনে তিনি মেঘলাকে পিছনে ফেলে চলে গিয়েছিলেন, আজ সেই একই রকম একটি শেষ ট্রেন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ট্রেন ছাড়ল।

জানালার পাশে বসে অরুণ খামটি খুললেন।

ভেতরে একটি ছোট্ট কাগজ।

মাত্র এক লাইন লেখা—

“এবার আর তোমাকে যেতে দেব না—তবে এবার তোমাকে আমার কাছে থাকতে হবে না, শুধু একবার সত্যিটা শুনে যেও।”

অরুণের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

বাইরে অন্ধকার ছুটে চলছিল।

আর তাঁর মনে হচ্ছিল, জীবনে কিছু ট্রেন দেরিতে এলেও, তাদের গন্তব্য কখনও হারিয়ে যায় না।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *