Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

গ্রামীণ পর্যটনের সম্ভাবনা: বাংলার গ্রাম, লোকজীবন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।।

ভ্রমণ মানুষের জীবনে আনন্দ, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। অচেনা জায়গায় গিয়ে নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মধ্যে এক বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। সাধারণত পর্যটন বলতে আমরা পাহাড়, সমুদ্র, ঐতিহাসিক শহর কিংবা জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে যাওয়াকে বুঝি। কিন্তু আধুনিক পর্যটনের জগতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ক্রমশ পরিচিত হয়ে উঠছে—গ্রামীণ পর্যটন।

গ্রামীণ পর্যটন বলতে গ্রামের প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষিকাজ, লোকসংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার, হস্তশিল্প এবং স্থানীয় পরিবেশকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটনকে বোঝায়। এর মাধ্যমে শহরের মানুষ গ্রামের স্বাভাবিক জীবনকে কাছ থেকে দেখতে পারেন, আবার গ্রামের মানুষের জন্যও আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের মতো সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ রাজ্যে গ্রামীণ পর্যটনের সম্ভাবনা যথেষ্ট। নদী, পুকুর, সবুজ মাঠ, মাটির বাড়ি, লোকশিল্প, গ্রামীণ মেলা, কৃষিজীবন এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার—এসবকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে বাংলার বহু গ্রাম পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে।

গ্রামীণ পর্যটন কী

গ্রামীণ পর্যটন হলো এমন এক ধরনের ভ্রমণ, যেখানে পর্যটকের প্রধান আকর্ষণ থাকে গ্রামের পরিবেশ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা। এখানে শুধু দর্শনীয় স্থান দেখা নয়, বরং স্থানীয় মানুষের জীবনকে বোঝারও সুযোগ থাকে।

কোনো গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজ দেখা, পুকুরে মাছ চাষ সম্পর্কে জানা, স্থানীয় কারিগরের কাজ শেখা, লোকসংগীত শোনা, গ্রামের মেলা ঘুরে দেখা কিংবা ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নেওয়া—এসব গ্রামীণ পর্যটনের অংশ হতে পারে।

এই পর্যটনের বিশেষত্ব হলো, এখানে স্থানীয় মানুষ শুধু দর্শনীয় বিষয়ের অংশ নন; তাঁরা পর্যটন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

বাংলার গ্রামীণ জীবনের আকর্ষণ

বাংলার গ্রামের নিজস্ব সৌন্দর্য রয়েছে। সবুজ ধানখেত, মেঠোপথ, পুকুরপাড়, গাছপালায় ঘেরা বাড়ি, নদীর ঘাট এবং ঋতুভিত্তিক কৃষিকাজ গ্রামের পরিবেশকে স্বতন্ত্র করে তোলে।

শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে গ্রামের শান্ত পরিবেশ অনেক পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। ভোরের পাখির ডাক, মাঠে কৃষকের কাজ, বিকেলের আড্ডা এবং সন্ধ্যায় গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবন—এসব অভিজ্ঞতা শহরের মানুষের কাছে নতুন হতে পারে।

তবে গ্রামকে শুধু ছবির মতো সুন্দর একটি জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না। গ্রামের মানুষের পরিশ্রম, জীবিকা, সমস্যা এবং বাস্তব জীবনকেও সম্মানের সঙ্গে বুঝতে হবে।

কৃষিকে কেন্দ্র করে পর্যটন

বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। ধান, আলু, সবজি, ফুল, ফল এবং বিভিন্ন কৃষিজ পণ্যের উৎপাদনকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

পর্যটকেরা নির্দিষ্ট মৌসুমে কৃষিক্ষেত্র দেখতে পারেন, কৃষকের কাছ থেকে চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারেন এবং উপযুক্ত ব্যবস্থায় কৃষিকাজের কিছু অংশে অংশগ্রহণ করতে পারেন।

উদাহরণস্বরূপ, ফুলচাষের জন্য পরিচিত কোনো অঞ্চলে পর্যটকেরা ফুলের বাগান দেখতে পারেন। ফলচাষের এলাকায় ফল সংগ্রহের অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে এসব কার্যক্রম কৃষকের কাজের ক্ষতি না করে এবং তাঁর সম্মতি নিয়ে আয়োজন করা উচিত।

কৃষিভিত্তিক পর্যটন কৃষকের অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

নদী ও জলাশয়কে কেন্দ্র করে পর্যটন

বাংলার বহু গ্রামের জীবন নদী, খাল, বিল ও পুকুরের সঙ্গে যুক্ত। কোথাও নদীকে কেন্দ্র করে মাছ ধরা হয়, কোথাও নৌকায় যাতায়াত চলে, আবার কোথাও জলাশয়ের পাশে গড়ে উঠেছে স্থানীয় জনজীবন।

উপযুক্ত নিরাপত্তা ও পরিবেশগত নিয়ম মেনে নদীভিত্তিক ভ্রমণ, নৌকাভ্রমণ, পাখি পর্যবেক্ষণ কিংবা জলাশয়কেন্দ্রিক প্রকৃতিভ্রমণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তবে নদী ও জলাভূমির পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। পর্যটনের নামে প্লাস্টিক ফেলা, জল দূষণ কিংবা বন্যপ্রাণীদের বিরক্ত করা চলবে না। স্থানীয় পরিবেশ রক্ষা করেই পর্যটনের পরিকল্পনা করতে হবে।

লোকসংস্কৃতি ও গ্রামীণ পর্যটন

বাংলার লোকসংস্কৃতি গ্রামীণ পর্যটনের একটি বড় আকর্ষণ হতে পারে। বাউল গান, ভাটিয়ালি, কীর্তন, পালাগান, যাত্রা, লোকনৃত্য এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান গ্রামের নিজস্ব পরিচয় বহন করে।

পর্যটকদের জন্য স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে ছোট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। এতে পর্যটকেরা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হবেন, আর শিল্পীরাও তাঁদের শিল্প পরিবেশনের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ পাবেন।

তবে লোকসংস্কৃতিকে শুধু পর্যটকদের মনোরঞ্জনের উপকরণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস ও আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। তাই সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আয়োজনের ক্ষেত্রে শিল্পী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।

হস্তশিল্প ও গ্রামীণ শিল্পীদের সুযোগ

বাংলার বহু গ্রামে হস্তশিল্পের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। মাটির পাত্র, পটচিত্র, বেতের কাজ, বাঁশের সামগ্রী, তাঁতের কাপড়, কাঠের কাজ এবং বিভিন্ন ধরনের হাতে তৈরি পণ্য স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতার পরিচয় বহন করে।

গ্রামীণ পর্যটনের সঙ্গে হস্তশিল্পকে যুক্ত করা হলে পর্যটকেরা সরাসরি কারিগরের কাজ দেখতে পারেন এবং তাঁদের তৈরি সামগ্রী কিনতে পারেন।

এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কিছু ক্ষেত্রে কমানো সম্ভব হতে পারে। কারিগরও নিজের পণ্যের পরিচয় ও মূল্য সম্পর্কে পর্যটকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পান।

স্থানীয় হস্তশিল্পের বিক্রির ব্যবস্থা তৈরি হলে ঐতিহ্যবাহী শিল্প বাঁচিয়ে রাখার উৎসাহও বাড়তে পারে।

গ্রামীণ খাবারের আকর্ষণ

খাবার একটি অঞ্চলের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলার গ্রামীণ খাবারে স্থানীয় কৃষিপণ্য, মাছ, শাকসবজি, চাল, ডাল এবং ঋতুভিত্তিক উপাদানের ব্যবহার দেখা যায়।

গ্রামীণ পর্যটনের অংশ হিসেবে পর্যটকদের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশে স্থানীয় খাবারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বাড়িতে তৈরি পিঠে, পায়েস, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির পদ, মাছের রান্না কিংবা স্থানীয় বিশেষ খাবার পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।

এতে গ্রামের বাড়ির মানুষ, ক্ষুদ্র খাদ্যব্যবসায়ী এবং স্থানীয় উৎপাদকদের আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে খাবার তৈরির ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ পানীয় জল এবং খাদ্য সংরক্ষণের নিয়ম মেনে চলা জরুরি।

গ্রামীণ পর্যটন ও কর্মসংস্থান

গ্রামীণ পর্যটনের অন্যতম সম্ভাবনা হলো স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি করা। পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা, খাবার, পরিবহন, পথপ্রদর্শক পরিষেবা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, হস্তশিল্প বিক্রি এবং ভ্রমণ পরিকল্পনার মতো কাজে স্থানীয় মানুষ যুক্ত হতে পারেন।

গ্রামের তরুণ-তরুণীরা প্রশিক্ষণ নিয়ে পর্যটন পরিষেবা পরিচালনা করতে পারেন। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান পর্যটকদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।

তবে পর্যটন থেকে আয় তৈরি হওয়ার জন্য পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, পরিষেবার মান এবং পর্যটকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।

নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ

গ্রামীণ পর্যটনের বিকাশে নারীদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। স্থানীয় খাবার তৈরি, হস্তশিল্প, তাঁত, বাগান পরিচর্যা, অতিথি আপ্যায়ন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে নারীরা আয়ের সুযোগ পেতে পারেন।

স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা স্থানীয় সমবায়ের মাধ্যমে নারীরা নিজেদের পণ্য বাজারজাত করতে পারেন। পর্যটকদের কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রি করার সুযোগ তৈরি হলে তাঁদের আর্থিক স্বাধীনতা বাড়তে পারে।

তবে নারীদের অংশগ্রহণ যেন শুধু নামমাত্র না হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার। ব্যবসার সিদ্ধান্ত, আয় ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগ পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাঁদের সক্রিয় ভূমিকা থাকা উচিত।

গ্রামীণ পর্যটন ও তরুণ প্রজন্ম

অনেক গ্রামীণ তরুণ কাজের সন্ধানে শহরে চলে যেতে বাধ্য হন। তাঁদের জন্য স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

পরিকল্পিত গ্রামীণ পর্যটন কিছু তরুণকে নিজেদের এলাকায় উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগ দিতে পারে। তাঁরা অনলাইন প্রচার, ছবি তোলা, ভ্রমণ পরিকল্পনা, স্থানীয় গাইড পরিষেবা, হোমস্টে পরিচালনা কিংবা হস্তশিল্পের বিপণনের কাজ করতে পারেন।

তবে পর্যটনই সব গ্রামের জন্য একমাত্র সমাধান নয়। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্র শিল্প এবং অন্যান্য কর্মসংস্থানের সুযোগও সমানভাবে উন্নত করতে হবে।

পরিবেশবান্ধব পর্যটনের প্রয়োজন

গ্রামীণ পর্যটনের মূল আকর্ষণ অনেক সময় প্রকৃতি ও শান্ত পরিবেশ। কিন্তু পর্যটকের সংখ্যা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে সেই পরিবেশই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

প্লাস্টিকের বর্জ্য, অতিরিক্ত যানবাহন, শব্দদূষণ, জল অপচয় এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ গ্রামের পরিবেশকে নষ্ট করতে পারে।

তাই পর্যটনের পরিকল্পনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জল সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় পরিবেশের ধারণক্ষমতা বিবেচনা করে পর্যটকের সংখ্যা ও কার্যক্রম পরিচালনা করাও প্রয়োজন।

হোমস্টে ও স্থানীয় আতিথেয়তা

গ্রামীণ পর্যটনে হোমস্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হতে পারে। এর মাধ্যমে পর্যটকেরা স্থানীয় পরিবারের বাড়িতে বা তাঁদের পরিচালিত উপযুক্ত আবাসনে থেকে গ্রামের জীবন সম্পর্কে জানতে পারেন।

তবে হোমস্টে পরিচালনার জন্য পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ পানীয় জল, শৌচাগার, বিদ্যুৎ, জরুরি যোগাযোগ এবং অতিথিদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

পর্যটকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যেমন সম্মান করতে হবে, তেমনই স্থানীয় পরিবারের জীবনযাত্রার প্রতিও সম্মান দেখাতে হবে। অতিথি ও আয়োজক—উভয়ের জন্য স্পষ্ট নিয়ম থাকলে এই ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

গ্রামীণ পর্যটনের প্রচার

একটি সুন্দর গ্রাম থাকলেই পর্যটকেরা সেখানে পৌঁছে যাবেন, এমন নয়। সেই জায়গার পরিচয়, যাতায়াতের ব্যবস্থা, থাকার সুযোগ এবং কী কী দেখা যায়—এসব তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিও এবং স্থানীয় পর্যটন নির্দেশিকার মাধ্যমে গ্রামের পরিচিতি বাড়ানো যেতে পারে।

তবে প্রচারে অতিরঞ্জিত দাবি করা উচিত নয়। বাস্তবে যে পরিষেবা পাওয়া যাবে, সেই তথ্যই স্পষ্টভাবে তুলে ধরা দরকার। পর্যটকের অভিজ্ঞতা ভালো হলে মুখে মুখেও সেই জায়গার পরিচিতি বাড়তে পারে।

অবকাঠামোর উন্নয়ন

গ্রামীণ পর্যটন সফল করতে রাস্তা, গণপরিবহন, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, পানীয় জল, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থাকলেও যাতায়াত অত্যন্ত কঠিন হলে পর্যটকের সংখ্যা সীমিত থাকতে পারে।

তবে অবকাঠামো উন্নয়নের নামে নির্বিচারে নির্মাণ করা উচিত নয়। এমন উন্নয়ন প্রয়োজন, যা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াবে এবং পরিবেশের ক্ষতি কমাবে।

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের সম্ভাবনা

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামীণ পর্যটনের নানা সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও নদী ও কৃষিজীবন, কোথাও লোকশিল্প, কোথাও ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ স্থাপত্য, আবার কোথাও বনাঞ্চলের কাছাকাছি স্থানীয় জীবন পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে।

পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ এবং অন্যান্য জেলার বিভিন্ন গ্রামে স্থানীয় বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনের পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

প্রতিটি অঞ্চলের পরিচয় আলাদা। তাই সব জায়গায় একই ধরনের পর্যটন প্রকল্প চালু না করে স্থানীয় ইতিহাস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনা করা উচিত।

স্থানীয় মানুষের মতামতের গুরুত্ব

গ্রামীণ পর্যটন প্রকল্পের পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের মতামত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি। কারণ পর্যটনের প্রভাব সরাসরি তাঁদের জীবনযাত্রার ওপর পড়ে।

কোনো গ্রামে পর্যটন বাড়লে জমির ব্যবহার, জলের চাহিদা, যানবাহন, বর্জ্য এবং সামাজিক পরিবেশে পরিবর্তন আসতে পারে। তাই প্রকল্প শুরুর আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার।

পর্যটন থেকে যে আয় তৈরি হবে, তার ন্যায্য অংশ যেন স্থানীয় মানুষ পান, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। গ্রামের মানুষ যদি নিজেদের উদ্যোগের মালিকানা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার পান, তাহলে পর্যটন আরও গ্রহণযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

পর্যটনের চ্যালেঞ্জ

গ্রামীণ পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও কিছু সমস্যা রয়েছে। প্রশিক্ষণের অভাব, অর্থের সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত প্রচার না থাকা, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং পরিষেবার মান বজায় রাখার সমস্যা উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এ ছাড়া পর্যটকদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সংস্কৃতিকে অসম্মান করা, অনুমতি ছাড়া মানুষের ছবি তোলা, আবর্জনা ফেলা বা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে অনধিকার প্রবেশ করা অনুচিত।

পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ উভয়ের দায়িত্বশীল আচরণ থাকলে পর্যটনের পরিবেশ আরও সুন্দর হতে পারে।

উপসংহার

গ্রামীণ পর্যটন বাংলার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। এর মাধ্যমে গ্রামের প্রকৃতি, লোকসংস্কৃতি, কৃষিজীবন, হস্তশিল্প এবং ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরা যায়। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জন্য কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে গ্রামীণ পর্যটনের সাফল্য শুধু পর্যটকের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। স্থানীয় মানুষের আয়, তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতি, পরিবেশের সুরক্ষা এবং সংস্কৃতির মর্যাদা বজায় থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক সংগঠন, উদ্যোগপতি এবং গ্রামবাসীরা একসঙ্গে কাজ করলে গ্রামীণ পর্যটন আরও সুসংগঠিত হতে পারে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, উন্নত পরিষেবা, সঠিক প্রচার এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা এই উদ্যোগকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করবে।

গ্রামের সৌন্দর্যকে পণ্য হিসেবে বিক্রি না করে, গ্রামের মানুষ ও তাঁদের জীবনকে সম্মান করে পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে হবে। তাহলেই পর্যটক নতুন অভিজ্ঞতা পাবেন, স্থানীয় মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবেন এবং বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যও সংরক্ষিত থাকবে।

গ্রামীণ পর্যটনের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন গ্রামের প্রকৃতি বেঁচে থাকবে, সংস্কৃতি মর্যাদা পাবে এবং গ্রামের মানুষ নিজেদের মাটিতেই উন্নয়নের নতুন পথ খুঁজে পাবেন।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *