Categories
অনুগল্প

ঘাটের শেষ নৌকা।

সন্ধ্যা নামলেই নদীর ঘাটটা ফাঁকা হয়ে যেত।

শুধু একটি নৌকা তখনও বাঁধা থাকত।

নৌকার মালিক ছিলেন বৃদ্ধ মাঝি কাশীনাথ।

বয়স সত্তরের কাছাকাছি।

তবু প্রতিদিন সূর্য ডোবার পরও তিনি ঘাটে বসে থাকতেন।

একদিন গ্রামের নতুন স্কুলশিক্ষক অর্ক তাঁকে জিজ্ঞেস করল,

—“কাকু, এত রাতে এখানে বসে থাকেন কেন?”

কাশীনাথ নদীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“একজনকে অপেক্ষা করছি।”

—“কে?”

—“আমার মেয়ে।”

অর্ক অবাক হল।

—“আপনার মেয়ে কোথায়?”

কাশীনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“শহরে থাকে। অনেক বছর আগে রাগ করে চলে গিয়েছিল।”

অর্ক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

পরদিনও কাশীনাথ ঘাটে বসে রইলেন।

তারপরের দিনও।

এক রাতে প্রবল ঝড় উঠল।

সবাই ঘরে ঢুকে পড়লেও কাশীনাথ নৌকার দড়ি খুলতে ব্যস্ত।

অর্ক ছুটে এসে বলল,

—“কোথায় যাচ্ছেন?”

—“ওপারে।”

—“এই ঝড়ে?”

কাশীনাথ বললেন,

—“আজ খবর পেয়েছি, আমার মেয়ে এসেছে।”

অর্ক অবাক।

—“কোথায়?”

—“ওপারের বাসস্ট্যান্ডে।”

অর্ক বলল,

—“আমি আপনার সঙ্গে যাব।”

দু’জনে নৌকায় উঠল।

নদী তখন উত্তাল।

ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকা বারবার দুলছে।

কাশীনাথ দাঁড় বেয়ে চলেছেন।

অর্ক বলল,

—“আপনি এত বছর অপেক্ষা করলেন কেন?”

কাশীনাথ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“কারণ বাবা-মা কখনও দরজা বন্ধ করে রাখে না।”

অবশেষে তারা ওপারে পৌঁছল।

বাসস্ট্যান্ডে সত্যিই একজন মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন।

চুলে পাক ধরেছে।

হাতে একটি ব্যাগ।

কাশীনাথ তাঁকে দেখেই থেমে গেলেন।

মহিলাও স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

—“বাবা…”

কাশীনাথ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না।

মেয়ের সামনে গিয়ে শুধু বললেন,

—“এতদিন লাগল?”

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

—“আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে আর ক্ষমা করবে না।”

কাশীনাথ মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“তুই ভুল করেছিলি। কিন্তু তুই তো আমার মেয়ে।”

ফিরে আসার সময় মেয়েটি বাবার পাশে নৌকায় বসেছিল।

নদী তখন শান্ত।

অর্ক নৌকার পেছনে বসে ছিল।

হঠাৎ মেয়েটি বাবাকে বলল,

—“বাবা, তুমি এখনও এই নৌকাটা চালাও?”

কাশীনাথ হেসে বললেন,

—“তোর জন্যই তো রেখে দিয়েছিলাম।”

—“আমার জন্য?”

—“হ্যাঁ। ভাবতাম, যেদিন ফিরবি, সেদিন তোকে নিয়ে শেষবার নদী পার হব।”

মেয়ের চোখে জল এসে গেল।

—“তারপর?”

কাশীনাথ নদীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তারপর নৌকাটা তোকে দিয়ে দেব।”

মেয়ে অবাক।

—“আমি নৌকা চালাতে পারি না।”

কাশীনাথ হেসে বললেন,

—“শিখে নেবি।”

কয়েক মাস পর গ্রামের মানুষ এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল।

ঘাটে কাশীনাথ আর তাঁর মেয়ে পাশাপাশি দাঁড় বেয়ে নৌকা চালাচ্ছেন।

বৃদ্ধ মাঝি ধীরে ধীরে কাজ কমিয়ে দিলেন।

কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি ঘাটে এসে বসতেন।

এবার আর অপেক্ষা করার জন্য নয়।

মেয়েটি ওপার থেকে ফিরে আসার সময় বাবার জন্য চা নিয়ে আসত।

একদিন অর্ক জিজ্ঞেস করল,

—“কাকু, এখন আর কারও জন্য অপেক্ষা করেন?”

কাশীনাথ হেসে বললেন,

—“না।”

—“কেন?”

—“যার জন্য অপেক্ষা করতাম, সে তো ফিরে এসেছে।”

নদীর ওপরে তখন শেষ বিকেলের আলো।

ঘাটের পাশে নৌকাটা দুলছিল।

আর কাশীনাথের মুখে এমন এক শান্তি ছিল, যা বহু বছরের অপেক্ষার পরেই আসে।

কখনও কখনও মানুষকে ফিরে পেতে বড় কোনও অলৌকিক ঘটনা লাগে না। শুধু দরজাটা খোলা রাখতে হয়—যাতে সে ফিরে আসার পথটা খুঁজে পায়।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *