ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। নদীর জলের ওপর হালকা কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছিল। দূরে মাঝির নৌকার দাঁড় টানার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নদীর এপারে ছোট্ট গ্রাম শালুকডাঙা, আর ওপারে ছিল একটি ব্যস্ত শহর। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই নদী পার হয়ে কাজ, পড়াশোনা কিংবা চিকিৎসার জন্য শহরে যেত।
এই নদীর সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল কেয়ার জীবন।
কেয়ার বয়স বাইশ বছর। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর মা সরলাদেবী অনেক কষ্টে তাকে বড় করেছিলেন। সংসারে তেমন জমিজমা ছিল না। মা অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন। কেয়া পড়াশোনায় ভালো ছিল, কিন্তু কলেজে ওঠার পর সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধেও এসে পড়ে।
প্রতিদিন সকালে সে নদী পার হয়ে শহরের একটি ছোট অফিসে কাজ করতে যেত। অফিসের কাজ ছিল হিসাবের খাতা গুছিয়ে রাখা, নথিপত্র সাজানো এবং গ্রাহকদের তথ্য নথিভুক্ত করা। বেতন খুব বেশি ছিল না, তবে সেই টাকাতেই মা-মেয়ের সংসার চলত।
কেয়ার একটা স্বপ্ন ছিল। সে চাইত, গ্রামের মানুষকে সরকারি পরিষেবা, চাকরির আবেদন, পড়াশোনার সুযোগ এবং নানা প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কাজ বুঝতে সাহায্য করবে। সে দেখেছিল, সামান্য তথ্যের অভাবে কত মানুষ দিনের পর দিন দপ্তরে ঘুরছেন। কেউ আবেদন করতে জানেন না, কেউ ভুল ফর্ম জমা দেন, কেউ আবার দালালের কথায় টাকা হারান।
কিন্তু নিজের স্বপ্নের কথা সে কাউকে খুব একটা বলত না। গ্রামের অনেকে মনে করত, মেয়েদের বেশি দূর পড়াশোনা করে কী হবে? একটা ভালো বিয়ে হলেই তো জীবন গুছিয়ে যাবে।
কেয়ার মা অবশ্য মেয়ের ইচ্ছেকে সম্মান করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিস মা। মানুষের সাহায্য করার আগে নিজের জীবনটাকেও শক্ত করে গড়ে তুলতে হয়।”
কেয়া মায়ের কথা মনে রাখত।
একদিন সকালে নদীর ঘাটে এসে সে দেখল, নৌকা ছাড়তে দেরি হচ্ছে। মাঝি হরেন কাকু দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু যাত্রীরা অস্থির হয়ে পড়েছেন। একজন বৃদ্ধ কৃষক বারবার তাঁর কাপড়ের থলি খুলে কাগজপত্র দেখছেন। তাঁর মুখে উদ্বেগ।
কেয়া কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে কাকু? আপনি এত চিন্তা করছেন কেন?”
বৃদ্ধ বললেন, “শহরে একটা সরকারি দপ্তরে যেতে হবে মা। জমির কাগজ নিয়ে সমস্যা হয়েছে। আজই নাকি কিছু কাগজ জমা দিতে হবে। কোথায় যেতে হবে, কী করতে হবে, কিছুই বুঝতে পারছি না।”
কেয়া তাঁর কাগজগুলো দেখে বুঝল, তিনি একটি নির্দিষ্ট দপ্তরের ঠিকানা খুঁজছেন। নিজের ফোনে সরকারি দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য দেখে সে তাঁকে সঠিক ঠিকানা ও প্রয়োজনীয় কাগজের তালিকা বুঝিয়ে দিল। তারপর বলল, “আমি শহরে যাচ্ছি। আপনাকে দপ্তরটা চিনিয়ে দিতে পারব।”
বৃদ্ধের মুখে স্বস্তি ফিরে এল।
সেদিন অফিসে পৌঁছতে কেয়ার কিছুটা দেরি হয়েছিল। তবু সে মনে মনে খুশি ছিল। একজন অসহায় মানুষকে সঠিক পথে সাহায্য করতে পেরে তার মনে হলো, এই কাজই সে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে করতে চায়।
এরপর এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটতে লাগল। কেউ চাকরির আবেদন করতে চাইলে কেয়া তাকে সরকারি বিজ্ঞপ্তি পড়তে শেখাত। কোনো ছাত্র বৃত্তির আবেদন করতে চাইলে প্রয়োজনীয় তথ্য কোথায় পাওয়া যায়, তা বুঝিয়ে দিত। কেউ কোনো ফর্ম পূরণ করতে না পারলে সে সময় করে সাহায্য করত।
ধীরে ধীরে গ্রামের কয়েকজন তরুণ-তরুণী তার সঙ্গে যুক্ত হলো। তারা ঠিক করল, সপ্তাহে একদিন গ্রামের ক্লাবঘরে বসে বিনা পারিশ্রমিকে মানুষকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও আবেদনপত্রের কাজ বুঝিয়ে দেবে।
কিন্তু ভালো কাজ শুরু করা যত সহজ, তাকে টিকিয়ে রাখা তত সহজ নয়।
গ্রামের এক ব্যক্তি, নাম মহাদেব, এই উদ্যোগ পছন্দ করলেন না। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আবেদনপত্র পূরণ করে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিতেন। কেয়াদের উদ্যোগে তাঁর আয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি বিরক্ত হলেন।
একদিন বাজারে তিনি কয়েকজনকে বললেন, “ওরা কী জানে? আজকাল সবাই দুটো কথা শিখে নিজেকে বড় বিশেষজ্ঞ ভাবে। ভুল আবেদন করলে দায় নেবে কে?”
কথাটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। কিছু মানুষ সন্দেহ করতে শুরু করল। কেউ কেউ কেয়াকে সরাসরি প্রশ্ন করল, “তোমরা কি সব কাজ করে দিতে পারবে? কোনো ভুল হলে কী হবে?”
কেয়া রাগ করল না। সে বলল, “আমরা সব কাজ জানি না। যেটা জানি না, সেটা পরিষ্কার করে বলব। সরকারি নিয়ম যাচাই করে তবেই সাহায্য করব। যেখানে আইনজীবী বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দরকার, সেখানে তাঁদের কাছেই যেতে বলব।”
তার উত্তর শুনে অনেকে আশ্বস্ত হলেন। তবে সবাই নয়।
একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় কেয়া খবর পেল, তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সে তাড়াতাড়ি নদীর ঘাটে পৌঁছল। কিন্তু ঝোড়ো হাওয়ার কারণে নৌকা চলাচল বন্ধ ছিল। নদীর জল উত্তাল, আকাশে কালো মেঘ।
কেয়া ঘাটে দাঁড়িয়ে বারবার ওপারের দিকে তাকাচ্ছিল। ফোনে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, এই নদী যেন হঠাৎ তার আর মায়ের মাঝখানে অতিক্রম করা অসম্ভব এক দেয়াল তুলে দিয়েছে।
অনেকক্ষণ পর মাঝি হরেন কাকু এসে বললেন, “আজ আর নৌকা ছাড়বে না মা। বাতাস কমলে তবেই চলবে।”
কেয়া হতাশ হয়ে বসে পড়ল। এমন সময় তার এক সহকর্মী ফোন করল। সে জানাল, গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত একজন পরিচিত কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি কেয়ার বাড়ির কাছে থাকেন এবং সরলাদেবীর খোঁজ নিতে যাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ পর খবর এল, সরলাদেবীর শরীর খারাপ হলেও তিনি সচেতন আছেন। স্বাস্থ্যকর্মী তাঁকে দেখে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বলেছেন।
কেয়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। সে বুঝতে পারল, বিপদের সময় একা সবকিছু সামলানো যায় না। মানুষের পাশে মানুষের থাকা কতটা জরুরি, সেই দিন সে নতুন করে উপলব্ধি করল।
পরদিন আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে সে গ্রামে ফিরল। মাকে দেখে তার চোখ ভিজে উঠল। সরলাদেবী মেয়ের হাত ধরে বললেন, “কাল তোকে কাছে না পেয়ে ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিবেশীরা পাশে ছিল বলেই সাহস পেয়েছি।”
কেয়া মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি সব সময় তোমার পাশে থাকতে চাই মা। কিন্তু বুঝতে পারছি, আমাদের এমন একটা ব্যবস্থা দরকার, যাতে জরুরি সময়ে মানুষ একে অপরের সাহায্য পায়।”
এই ঘটনার পর কেয়া তার বন্ধুদের নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করল। তারা গ্রামের বিভিন্ন পরিবারের সম্মতিতে জরুরি যোগাযোগের একটি তালিকা তৈরি করল। সেখানে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নৌকার মাঝি, কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবার নম্বর রাখা হলো। ব্যক্তিগত তথ্য অযথা ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকেও তারা সতর্ক থাকল।
তারা আরও ঠিক করল, সপ্তাহে একদিনের বদলে মাসে একবার গ্রামের মানুষকে নিয়ে একটি আলোচনা সভা করবে। সেখানে সরকারি পরিষেবা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য, অনলাইন প্রতারণা থেকে সাবধান থাকার উপায়, জরুরি অবস্থায় কোথায় যোগাযোগ করতে হবে—এসব নিয়ে কথা হবে।
প্রথম সভায় মাত্র বারোজন মানুষ এসেছিলেন। দ্বিতীয় সভায় এলেন পঁচিশজন। তৃতীয় সভায় গ্রামের প্রবীণ কৃষক থেকে শুরু করে স্কুলের ছাত্রছাত্রী, দোকানদার—অনেকেই উপস্থিত হলেন।
একদিন সেই বৃদ্ধ কৃষকও সভায় এলেন, যাঁকে কেয়া প্রথমবার দপ্তরের ঠিকানা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিল। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি আগে ভাবতাম, শহরের অফিসে গেলে বড় বড় লোকের সাহায্য ছাড়া কাজ হয় না। এখন বুঝেছি, সঠিক তথ্য জানা থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান নিজেই করা যায়।”
তাঁর কথায় সবাই হাততালি দিল।
মহাদেবও একদিন দূর থেকে সভাটি দেখছিলেন। তাঁর মনে হলো, এই উদ্যোগকে বাধা দিয়ে নিজের লাভ ছাড়া আর কিছুই হবে না। কয়েক সপ্তাহ পর তিনি নিজেই কেয়ার কাছে এলেন।
“তোমাদের কাজ দেখে বুঝলাম, সবকিছু প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। আমারও কিছু অভিজ্ঞতা আছে। চাইলে আবেদনপত্রের সাধারণ ভুলগুলো নিয়ে একটা আলোচনা করতে পারি।”
কেয়া হাসিমুখে বলল, “অবশ্যই। আপনার অভিজ্ঞতা অনেকের কাজে লাগবে।”
মহাদেবের সেই সহযোগিতায় উদ্যোগটি আরও শক্তিশালী হলো। মানুষ বুঝতে পারল, সবার অভিজ্ঞতা একসঙ্গে কাজে লাগালে সমস্যার সমাধান সহজ হয়।
এদিকে কেয়ার নিজের জীবনেও পরিবর্তন আসছিল। সে কাজের পাশাপাশি একটি স্বীকৃত কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তি হলো। নিজের সঞ্চয়ের কিছু টাকা খরচ করে সে প্রশিক্ষণ নিল, বাকি খরচের জন্য উপযুক্ত বৃত্তির সুযোগ খুঁজল। কয়েক মাস পর সে আরও ভালো একটি চাকরির সুযোগ পেল।
চাকরির বেতন বাড়ল। মায়ের চিকিৎসা ও সংসারের খরচ সামলানো সহজ হলো। কিন্তু কেয়া গ্রামের কাজ ছেড়ে দিল না। বরং সে বন্ধুদের দায়িত্ব ভাগ করে দিল, যাতে উদ্যোগটি একজনের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।
একদিন সন্ধ্যায় সে নদীর ঘাটে বসেছিল। সূর্য ডুবে যাচ্ছে, জলের ওপর লালচে আলো পড়েছে। হরেন কাকু নৌকা বাঁধতে বাঁধতে বললেন, “কী ভাবছিস মা?”
কেয়া মৃদু হেসে বলল, “ভাবছি, এত দিন নদীটাকে শুধু বাধা মনে হতো। ওপারে যেতে হবে, তাই নদী পার হতে হবে। এখন মনে হয়, এই নদীর দুই পাড়ের মানুষকে আরও ভালোভাবে যুক্ত করাই আমার কাজ।”
হরেন কাকু বললেন, “নদী তো মানুষকে আলাদা করে, আবার নৌকাও তো মানুষকে মিলিয়ে দেয়। আসল কথা, কে কীভাবে তাকে ব্যবহার করছে।”
কেয়া নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, জীবনের প্রতিটি বাধাই হয়তো শত্রু নয়। কখনো কখনো বাধার কাছেই লুকিয়ে থাকে নতুন পথ খুঁজে নেওয়ার শিক্ষা।
কয়েক বছর পর শালুকডাঙায় একটি ছোট তথ্যসহায়তা কেন্দ্র গড়ে উঠল। সেখানে গ্রামের তরুণেরা পালা করে বসত। মানুষ সরকারি বিজ্ঞপ্তি পড়তে শিখত, প্রয়োজনীয় ফর্মের নির্দেশনা বুঝত, নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই করত। কোনো বিষয় তাঁদের জ্ঞানের বাইরে হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা যোগ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিত।
কেন্দ্রটির দেওয়ালে কেয়া একটি বাক্য লিখে রেখেছিল—
“সঠিক তথ্য মানুষের অধিকার, আর সেই তথ্যের পথ দেখানো এক ধরনের মানবিক দায়িত্ব।”
উদ্বোধনের দিন সরলাদেবী চুপচাপ মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেয়া ফিতে কাটার পর মায়ের দিকে তাকাল। মায়ের চোখে গর্বের জল।
সরলাদেবী বললেন, “তুই শুধু নিজের ঠিকানা খুঁজে পাসনি মা, অনেক মানুষের পথও একটু সহজ করে দিয়েছিস।”
কেয়া মায়ের হাত ধরল।
দূরে নদীর ওপর দিয়ে একটি নৌকা এগিয়ে যাচ্ছিল। তার দুই পাশে ছড়িয়ে পড়ছিল ছোট ছোট ঢেউ। কেয়া জানত, আগামী দিনেও সমস্যা আসবে, ভুল হবে, কখনো উদ্যোগ থমকে যাবে। কিন্তু এবার সে একা নয়। তার পাশে রয়েছে এমন কিছু মানুষ, যারা একে অপরকে সাহায্য করতে শিখেছে।
নদীর ওপারে নতুন ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে কেয়া শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করেছিল, মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান ঠিকানা কোনো শহর বা বাড়ির নাম নয়। সেই ঠিকানা হলো—যেখানে বিপদের সময় কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, আর যেখানে একজনের শেখা অন্য অনেকের পথ আলোকিত করে।
শিক্ষা: মানুষের পাশে দাঁড়াতে সব সমস্যার সমাধান জানা জরুরি নয়; প্রয়োজন সততা, সঠিক তথ্য যাচাই করার অভ্যাস এবং প্রয়োজনে যোগ্য ব্যক্তির সাহায্য নেওয়ার মানসিকতা। একা ভালো কাজ করার চেয়ে অনেককে সঙ্গে নিয়ে কাজ করলে তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়।