অন্ধকারের মধ্যে নিজের মতো দেখতে একজন মানুষকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে ঠিক কী অনুভূতি হয়, তা অনিরুদ্ধ কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
কিন্তু সেই রাতে, শালবনের পুরোনো বাড়ির মাটির নিচে তৈরি গোপন ঘরে দাঁড়িয়ে, সে বুঝতে পারল—পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য কোনো রক্তাক্ত মৃতদেহ নয়, কোনো অশরীরী ছায়াও নয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য হলো নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা অন্য একজন মানুষ।
“তুমি কে?”
অনিরুদ্ধের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি উত্তর দিল না। ঘরের বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ পর জরুরি বাতিটা আবার জ্বলে উঠতেই দুজনের মুখ স্পষ্ট হলো।
লোকটির বয়স অনিরুদ্ধের কাছাকাছি। পরনে কালো শার্ট, ভেজা চুল কপালের ওপর নেমে এসেছে। বাঁ ভ্রুর ওপর সেই একই কাটা দাগ। এমনকি অনিরুদ্ধের মতো কথা বলার সময় তার ডান গালেও সামান্য টোল পড়ছে।
লোকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
“আমার নাম অয়ন।”
“অয়ন?”
“হ্যাঁ। আর তুমি অনিরুদ্ধ। আমাদের দুজনের জন্ম একই দিনে, একই হাসপাতালে।”
অনিরুদ্ধ মাথা নাড়ল।
“অসম্ভব! আমার কোনো ভাই নেই।”
অয়ন মৃদু হাসল।
“এই কথাটাই তোমাকে সারা জীবন বিশ্বাস করানো হয়েছে।”
“তোমার কাছে কী প্রমাণ আছে?”
অয়ন পকেট থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করল। ছবিতে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রয়েছেন মাধবী সেন। তাঁর দুপাশে দুটি শিশু। একটির হাতে লাল সুতো, অন্যটির হাতে নীল সুতো বাঁধা।
ছবির পেছনে লেখা—‘আমার দুই সন্তান। ঈশ্বর যেন ওদের একে অপরের কাছ থেকে কখনও দূরে না রাখেন।’
নিচে মায়ের স্বাক্ষর।
অনিরুদ্ধ ছবিটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।
“এটা তুমি কোথায় পেলে?”
“আমার কাছে ছবিটা ছিল না। কয়েক মাস আগে একটা অচেনা খাম পেয়েছিলাম। তার মধ্যে এই ছবি, একটা হাসপাতালের নথি আর একটা ঠিকানা ছিল।”
“কে পাঠিয়েছিল?”
“জানি না। কিন্তু ঠিকানাটা আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছে।”
অনিরুদ্ধ এবার অয়নের চোখের দিকে তাকাল।
“তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?”
অয়ন উত্তর দেওয়ার আগে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“একটা অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছি। আমার পালক বাবা-মা আমাকে ছোটবেলায় দত্তক নিয়েছিলেন। তাঁরা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার জন্মের ব্যাপারে কোনো তথ্য তাঁদের কাছে ছিল না। আমার দত্তক নেওয়ার কাগজপত্রে মায়ের নামের জায়গায় লেখা ছিল ‘অজ্ঞাতপরিচয় মহিলা’।”
“তুমি কি কখনও নিজের আসল পরিবারকে খুঁজেছ?”
“খুঁজেছি। কিন্তু বারবার বাধা পেয়েছি। যেখানেই গেছি, কেউ না কেউ আমার আগেই সেখানে পৌঁছে গেছে। হাসপাতালের রেকর্ড উধাও, পুরোনো কর্মীরা নিখোঁজ, সাক্ষীরা মুখ খুলতে রাজি নয়।”
“তাহলে এতদিন পর আমার কাছে এলে কেন?”
অয়ন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কারণ গত সপ্তাহে আমি একটা চিঠি পেয়েছি।”
“নীল খাম?”
“হ্যাঁ।”
অয়ন পকেট থেকে ভাঁজ করা একটি কাগজ বের করল।
চিঠিতে লেখা—
‘তোমার যমজ ভাইকে খুঁজে বের করো। তার কাছে এমন একটি জিনিস আছে, যা তোমার জন্মের সত্য প্রমাণ করতে পারে। কিন্তু সাবধান, তোমাদের মধ্যে একজনকে ছোটবেলা থেকেই মিথ্যে পরিচয়ে বড় করা হয়েছে।’
অনিরুদ্ধ চুপ করে রইল।
যমজ ভাই!
এতদিন সে ভেবেছিল, তার জীবনের গল্প খুব সাধারণ। ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে, বাবার কাছে বড় হয়েছে, তারপর পড়াশোনা শেষ করে সাংবাদিক হয়েছে।
কিন্তু আজ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার পরিচিত পৃথিবীটা ভেঙে পড়েছে।
তার মা হয়তো মারা যাননি। তার বাবা হয়তো তার প্রকৃত বাবা নন। আর তার এমন একজন ভাই রয়েছে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে সে কিছুই জানত না।
“অয়ন, একটা কথা বলো। আমাদের মধ্যে কে আসল অনিরুদ্ধ?”
অয়ন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “সেটাই তো সবচেয়ে বড় রহস্য।”
“তুমি কী বলতে চাইছ?”
“আমার কাছে হাসপাতালের যে নথি এসেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, প্রথম শিশুটির নাম লেখা হয়েছিল অনিরুদ্ধ। দ্বিতীয় শিশুটির নাম লেখা হয়েছিল অয়ন। কিন্তু নথির ওপর পরে অন্য কালিতে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে।”
“কে পরিবর্তন করেছে?”
“সেই নামটাই খুঁজছি।”
অয়ন একটি কাগজ এগিয়ে দিল। তাতে হাসপাতালের পুরোনো রেজিস্টারের ছবি ছিল। প্রথম নামের পাশে কালো কালি দিয়ে লেখা ‘অনিরুদ্ধ সেন’। দ্বিতীয় নামের জায়গায় লেখা ‘অয়ন’। কিন্তু রেজিস্টারের নিচে থাকা স্বাক্ষরটি দেখে অনিরুদ্ধের বুক কেঁপে উঠল।
স্বাক্ষরটি তার বাবার।
দেবব্রত সেন।
“বাবা কেন হাসপাতালের নথিতে স্বাক্ষর করবেন?”
অয়ন বলল, “হয়তো তিনি শুধু একজন অভিভাবক হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন। আবার হয়তো এই নথি বদলে দেওয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল।”
“তুমি কি আমার বাবাকে দোষী ভাবছ?”
“আমি কাউকে দোষী ভাবছি না। আমি শুধু সত্যিটা জানতে চাই।”
অয়ন কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল, “আর সেই সত্য জানার জন্য আমাদের মায়ের শেষ রাতের ঘটনাটা জানতে হবে।”
অনিরুদ্ধের মনে পড়ল মায়ের রেকর্ডিংয়ের কথা।
‘যেদিন তোমাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেদিন আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, একদিন তোমাকে ফিরিয়ে আনব।’
কথাগুলো তার মাথার মধ্যে ঘুরছিল।
“আমাদের মা কোথায়?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করল।
অয়নের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
“আমার মনে হয়, তিনি বেঁচে আছেন।”
“তুমি কীভাবে জানো?”
অয়ন পকেট থেকে আরেকটি ছবি বের করল।
ছবিটা সাম্প্রতিক। একজন বয়স্ক মহিলা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে গভীর বলিরেখা, চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু চোখ দুটো স্পষ্টতই পরিচিত।
মাধবী সেন!
ছবির পেছনে একটি তারিখ লেখা ছিল—মাত্র তিন মাস আগের।
অনিরুদ্ধ ছবিটা বুকে চেপে ধরল।
“এটা কোথায় তুলেছ?”
“আমি তুলিনি। ছবিটা আমাকে পাঠানো হয়েছিল। সঙ্গে একটা ঠিকানা ছিল—শালবনের পুরোনো ডাকবাংলো।”
অনিরুদ্ধ হঠাৎ মাথা তুলল।
“সেই ডাকবাংলোতেই তো আমাকে যেতে বলা হয়েছে!”
অয়ন মাথা নাড়ল।
“আমাকেও।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর অয়ন বলল, “আমাদের আজ রাতেই সেখানে যেতে হবে।”
“কিন্তু বাইরে যারা রয়েছে?”
অয়নের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।
“ওরা আমাদের এখানে আটকে রাখতে চায়। আর যদি আমরা সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি, তাহলে হয়তো এই বাড়ির সঙ্গে সঙ্গে সব প্রমাণও উধাও হয়ে যাবে।”
ঠিক তখনই ঘরের দরজার ওপাশ থেকে একটা ভারী শব্দ হলো।
ধাম!
দুজনেই চমকে উঠল।
তারপর বৃদ্ধের কণ্ঠ শোনা গেল।
“অনিরুদ্ধ! অয়ন! তোমরা যদি ভেতরে থাকো, তাহলে মন দিয়ে শোনো। আমার হাতে বেশি সময় নেই।”
অনিরুদ্ধ দরজার কাছে এগিয়ে গেল।
“আপনি কে? আগে নিজের পরিচয় দিন!”
বৃদ্ধের কণ্ঠে এবার তাড়াহুড়ো।
“আমার নাম শশাঙ্ক রায়। তোমাদের জন্মের সময় আমি ওই হাসপাতালের প্রশাসনিক আধিকারিক ছিলাম। তোমাদের মায়ের সঙ্গে যা হয়েছিল, তার অনেক কিছুই আমি জানি। কিন্তু আমি সবটা জানি না।”
“আপনি আমাদের মাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন?”
“আমি তাঁকে কোথাও নিয়ে যাইনি। বরং তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম।”
অয়ন অনিরুদ্ধের দিকে তাকাল।
বৃদ্ধ আবার বললেন, “তোমাদের দুজনের জন্মের পর হাসপাতালের রেকর্ডে পরিবর্তন করা হয়েছিল। সেই কাজের সঙ্গে একজন চিকিৎসক, একজন পুলিশ আধিকারিক এবং তোমাদের পরিবারের একজন সদস্য জড়িত ছিলেন।”
“পরিবারের সদস্য বলতে কে?” অনিরুদ্ধ প্রশ্ন করল।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর বৃদ্ধ বললেন, “দেবব্রত সেন।”
অনিরুদ্ধের বুকের মধ্যে যেন কেউ পাথর ছুড়ে মারল।
“না! আপনি মিথ্যে বলছেন!”
“আমি চাইতাম কথাটা মিথ্যে হোক। কিন্তু আমার কাছে প্রমাণ আছে।”
“কী প্রমাণ?”
“তোমাদের মায়ের লেখা একটা চিঠি। সেখানে তিনি নিজের হাতে সবকিছু লিখে গিয়েছিলেন। চিঠিটা আমার কাছে আছে। কিন্তু সেটা তোমাদের হাতে দেওয়ার আগে একটা কথা জানা দরকার।”
“কী কথা?”
বৃদ্ধের কণ্ঠ নিচু হয়ে এল।
“তোমাদের মধ্যে একজনের জন্মের সময় গুরুতর শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, শিশুটিকে বাঁচানো কঠিন হতে পারে। সেই রাতেই হাসপাতালের বিদ্যুৎ চলে যায়। জরুরি বিভাগের কর্মীরা কয়েক মিনিটের জন্য অন্ধকারে কাজ করতে বাধ্য হন।”
“তারপর?”
“বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর দেখা যায়, শিশু দুটির পরিচয়-কার্ড বদলে গেছে। নার্সরা ভুল বুঝতে পেরেছিলেন কি না, কেউ বলতে পারেনি। কিন্তু পরের দিন থেকে হাসপাতালের সমস্ত নথিতে দুই শিশুর পরিচয় আলাদা করে লেখা হয়।”
অয়ন জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আমাদের মধ্যে কে অসুস্থ ছিল?”
বৃদ্ধ বললেন, “সেটাই কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেনি। কারণ চিকিৎসকের মূল রিপোর্টটাও হারিয়ে গিয়েছিল।”
“আপনি কি সেই রিপোর্ট দেখেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“তাতে কী লেখা ছিল?”
বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে আবার প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল।
দরজার কাঠ ফেটে যাওয়ার শব্দ হলো।
বৃদ্ধ দ্রুত বললেন, “আমি তোমাদের সাহায্য করতে চাই। কিন্তু তোমরা যদি সত্যিই জানতে চাও, তাহলে ডাকবাংলোয় যাও। সেখানে এমন একজন আছেন, যিনি তোমাদের জন্মের রাতের প্রত্যক্ষদর্শী।”
“কে?”
“ডাক্তার নীলাদ্রি মুখোপাধ্যায়।”
অয়ন নামটা শুনে চমকে উঠল।
“কিন্তু তিনি তো বিশ বছর আগে মারা গেছেন!”
বৃদ্ধ বললেন, “সরকারি নথিতে তাই লেখা আছে।”
এই কথাটুকু বলেই তিনি চুপ করে গেলেন।
তারপর দরজার ওপাশ থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। কেউ একজন দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে।
বৃদ্ধ আর কোনো কথা বললেন না।
অনিরুদ্ধ দরজায় ধাক্কা দিল।
“শশাঙ্কবাবু! আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
কোনো উত্তর এল না।
দুজনেই বুঝতে পারল, বৃদ্ধ চলে গেছেন।
অয়ন ঘরের চারদিকে তাকিয়ে বলল, “এখান থেকে বেরোনোর অন্য কোনো পথ আছে?”
অনিরুদ্ধ মনে করার চেষ্টা করল, সে যখন প্রথমবার ঘরটিতে ঢুকেছিল, তখন কোন দিক দিয়ে এসেছিল। ঘরের একপাশে একটি সরু করিডর ছিল, যা অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে।
দুজন সেই করিডর ধরে এগিয়ে গেল।
কিছু দূর যাওয়ার পর একটা লোহার সিঁড়ি দেখা গেল। সিঁড়িটা ওপরের দিকে উঠে গেছে। ওপরে একটি ছোট্ট দরজা।
দরজা খুলতেই তারা বাড়ির পেছনের বাগানে বেরিয়ে এল।
বৃষ্টি তখন কিছুটা কমেছে।
দূরে রাস্তার পাশে একটি কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির হেডলাইট বন্ধ, কিন্তু ভেতরে কেউ বসে আছে বলে মনে হলো।
অয়ন অনিরুদ্ধের হাত ধরে বলল, “ওদিকে তাকিও না। আমাদের এখনই বেরোতে হবে।”
দুজন দ্রুত গাছের আড়াল ধরে এগিয়ে গেল।
বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে এসে অনিরুদ্ধ থামল।
“আমাদের গাড়ি কোথায়?”
“গাড়ি আনিনি। হাঁটতে হবে।”
“শালবনের ডাকবাংলো এখান থেকে কত দূরে?”
“প্রায় তিন কিলোমিটার।”
“এই বৃষ্টিতে?”
অয়ন মৃদু হাসল।
“সত্যি খুঁজতে বেরোলে আবহাওয়ার অনুমতি নিতে হয় না।”
দুজন হাঁটতে শুরু করল।
রাস্তাটা নির্জন। দুপাশে ঘন শালগাছ, মাঝে মাঝে ঝোপের মধ্যে থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। রাস্তার ওপর জমে থাকা জল এড়িয়ে তারা এগিয়ে চলল।
কিছুক্ষণ পর অনিরুদ্ধ বলল, “অয়ন, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“করো।”
“তুমি কি কখনও মনে করো, তোমার জীবনটা অন্য কারও হওয়ার কথা ছিল?”
অয়ন থেমে গেল।
“প্রায় প্রতিদিন।”
“কেন?”
“কারণ ছোটবেলা থেকেই আমার মনে হতো, আমার চারপাশের মানুষগুলো আমাকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু আমার সম্পর্কে এমন কিছু জানে, যা তারা আমাকে বলতে চায় না। আমার জন্মদিনে সবাই আনন্দ করত। অথচ আমি যখন নিজের জন্মের কথা জিজ্ঞেস করতাম, তখন সবাই চুপ করে যেত।”
সে একটু থেমে বলল, “তুমি জানো, আমার পালক মা মারা যাওয়ার আগে আমাকে কী বলেছিলেন?”
“কী?”
“তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি যেখান থেকেই এসো, তুমি আমাদের সন্তান।’ তারপর আমার হাতে একটা চাবি দিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি কখনও নিজের পরিচয় খুঁজতে যাও, তাহলে মনে রেখো, সত্য জানার অধিকার তোমার আছে। কিন্তু সত্য জানলেই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।’”
অয়ন পকেট থেকে একটা ছোট্ট পিতলের চাবি বের করল।
“এই চাবিটা আমার কাছে বারো বছর ধরে আছে। আজও জানি না, এটা কোন তালার।”
অনিরুদ্ধ চাবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
চাবির মাথায় খোদাই করা রয়েছে একটি চিহ্ন।
একটি বৃত্তের মধ্যে তিনটি ছোট বিন্দু।
অনিরুদ্ধের হঠাৎ মায়ের ঘরের দেওয়ালে দেখা একটি ছবির কথা মনে পড়ল। ছবির নিচে একই চিহ্ন আঁকা ছিল।
“অয়ন, এই চিহ্নটা আমি আগে দেখেছি।”
“কোথায়?”
“আমাদের বাড়িতে। মায়ের ঘরে।”
অয়ন চাবিটা শক্ত করে ধরল।
“তাহলে হয়তো আমরা সঠিক পথেই এগোচ্ছি।”
প্রায় চল্লিশ মিনিট হাঁটার পর তারা ডাকবাংলোর সামনে পৌঁছল।
পুরোনো দোতলা বাড়ি। দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। জানলার কাচ ভাঙা। সামনের গেটের ওপর মরচে ধরা অক্ষরে লেখা—‘শালবন ডাকবাংলো’।
বাড়ির চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা।
অনিরুদ্ধ গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
“এখানে কেউ থাকে বলে মনে হচ্ছে না।”
অয়ন বলল, “চিঠিতে ঠিক এই জায়গার কথাই লেখা ছিল।”
তারা বারান্দায় উঠে দরজায় ধাক্কা দিল।
কেউ উত্তর দিল না।
অয়ন পিতলের চাবিটা বের করে দরজার পাশে থাকা একটি ছোট্ট তালায় লাগাল। আশ্চর্যজনকভাবে চাবিটা তালার মধ্যে ঢুকে গেল। ঘোরাতেই দরজাটা খুলে গেল।
ভেতরে ঘন অন্ধকার।
অনিরুদ্ধ মোবাইলের আলো জ্বালল।
দেওয়ালে পুরোনো ছবির সারি। একটি ভাঙা টেবিল। কোণে ধুলো জমা চেয়ার। কিন্তু ঘরের মাঝখানে রাখা টেবিলের ওপর তাজা ফুলের তোড়া।
যেন কেউ কিছুক্ষণ আগেই সেখানে এসে ফুল রেখে গেছে।
ফুলের পাশে একটি সাদা খাম।
অনিরুদ্ধ খামটা তুলে নিল।
তার ওপর লেখা—
‘অনিরুদ্ধ ও অয়নের জন্য।’
ভেতরে একটি চিঠি এবং একটি ছোট্ট মেমোরি কার্ড।
চিঠিতে লেখা—
“তোমরা যদি এখানে পৌঁছে থাকো, তবে বুঝব, শশাঙ্ক এখনও বেঁচে আছে এবং তোমাদের সাহায্য করছে।
আমার নাম ডা. নীলাদ্রি মুখোপাধ্যায়।
সরকারি নথিতে আমাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু আমি মারা যাইনি। আমি বেঁচে আছি, কারণ তোমাদের জন্মের রাতে যা দেখেছিলাম, তা ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা আমার ছিল না।
আমি তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখার অপেক্ষায় ছিলাম।
এই মেমোরি কার্ডে তোমাদের জন্মের রাতের একটি ভিডিও রয়েছে। ভিডিওটি দেখার পর তোমরা বুঝতে পারবে, তোমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যেটা কোথা থেকে শুরু হয়েছিল।
কিন্তু সাবধান।
ভিডিওর শেষ অংশ দেখার আগে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিও।
কারণ তোমরা একা নও।”
অনিরুদ্ধ চিঠিটা নামিয়ে রাখল।
“এখানে কম্পিউটার কোথায়?”
অয়ন ঘরের অন্য পাশের আলমারি খুলল। ভেতরে একটি পুরোনো ল্যাপটপ রাখা। আশ্চর্যজনকভাবে তার চার্জারও রয়েছে।
ল্যাপটপ চালু হতে কিছুটা সময় লাগল।
তারপর অয়ন মেমোরি কার্ডটি লাগাল।
একটি মাত্র ভিডিও ফাইল দেখা গেল।
ফাইলের নাম—‘১২-০৭-১৯৯৯_রাত_০২-১৭’।
ভিডিও চালু হলো।
প্রথমে হাসপাতালের একটি করিডর দেখা গেল। ক্যামেরার অবস্থান থেকে বোঝা যায়, ভিডিওটি কোনো নিরাপত্তা ক্যামেরায় তোলা।
ঘড়িতে রাত দুটো বেজে বারো মিনিট।
একজন নার্স দ্রুত করিডর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তাঁর হাতে দুটি শিশুর ফাইল।
তারপর দেখা গেল, একজন চিকিৎসক একটি ঘরে ঢুকছেন।
কয়েক মিনিট পর হাসপাতালের আলো নিভে গেল।
স্ক্রিন কালো।
তারপর আলো ফিরে এল।
একজন পুরুষকে দেখা গেল, তিনি নার্সের সঙ্গে কথা বলছেন। মুখটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু তাঁর হাতে একটি নীল খাম।
লোকটি খামটা নার্সের হাতে দিয়ে বললেন, “যা বলা হয়েছে, ঠিক তাই করবেন। দুটি শিশুর পরিচয় বদলাতে হবে।”
অনিরুদ্ধের বুক ধক করে উঠল।
অয়ন স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
নার্স মাথা নাড়লেন।
“কিন্তু স্যার, এটা বেআইনি। আর যদি কেউ জানতে পারে—”
লোকটি তাঁর কথা থামিয়ে দিলেন।
“কেউ জানবে না। কাগজপত্র আমি সামলে নেব। আপনি শুধু আপনার কাজ করুন।”
তারপর লোকটি ক্যামেরার দিকে ঘুরলেন।
এক মুহূর্তের জন্য তাঁর মুখ স্পষ্ট দেখা গেল।
অনিরুদ্ধের হাত অবশ হয়ে গেল।
লোকটি তার বাবা দেবব্রত সেন।
অয়ন ফিসফিস করে বলল, “তাহলে সত্যিই উনি—”
অনিরুদ্ধ কোনো কথা বলতে পারল না।
ভিডিও চলতে থাকল।
নার্স দুটি শিশুর কাছে গেলেন। প্রথম শিশুটির হাত থেকে লাল সুতো খুলে দ্বিতীয় শিশুটির হাতে বাঁধলেন। তারপর নীল সুতো দুটির অবস্থান বদলে দিলেন।
পরিচয় বদলে দেওয়া হলো।
কিন্তু ভিডিওর শেষ অংশে আরও ভয়ংকর কিছু ঘটল।
দেবব্রত সেন ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর নার্সকে বাইরে পাঠিয়ে একা দুটি শিশুর সামনে দাঁড়ালেন।
তিনি প্রথম শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ফিসফিস করে বললেন—
“ক্ষমা করো, বাবা। তোমাকে বাঁচানোর জন্যই আমাকে অন্যটাকে হারাতে হবে।”
অনিরুদ্ধের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
দেবব্রত দ্বিতীয় শিশুটিকে তুলে নিলেন। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর শিশুটিকে একটি ছোট্ট বাক্সের মতো দেখতে বিশেষ পরিবহনের পাত্রে রাখা হলো।
ভিডিওতে দেখা গেল, একজন অচেনা মহিলা ঘরে ঢুকলেন। তাঁর মুখ স্কার্ফে ঢাকা।
দেবব্রত শিশুটিকে তাঁর হাতে তুলে দিলেন।
মহিলা শিশুটিকে নিয়ে চলে গেলেন।
কিন্তু যাওয়ার আগে তিনি ক্যামেরার দিকে তাকালেন।
এক মুহূর্তের জন্য তাঁর চোখ দেখা গেল।
সেই চোখ অনিরুদ্ধের খুব পরিচিত।
মায়ের চোখ।
অনিরুদ্ধ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
“না! এটা হতে পারে না!”
ভিডিও শেষ হয়ে গেল।
ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
অয়ন ল্যাপটপ বন্ধ করে অনিরুদ্ধের দিকে তাকাল।
“তাহলে আমাদের মা-ই একজন শিশুকে নিয়ে গিয়েছিলেন?”
অনিরুদ্ধ মাথা নাড়ল।
“আমি বুঝতে পারছি না। বাবা কেন পরিচয় বদলালেন? মা কেন একটি শিশুকে নিয়ে চলে গেলেন? আর অন্য শিশুটিকে কার কাছে রেখে গেলেন?”
অয়ন বলল, “হয়তো আমাদের মধ্যে একজনকে বাঁচানোর জন্য তাঁরা এমনটা করেছিলেন।”
“কিন্তু কাকে বাঁচানোর জন্য?”
প্রশ্নটা ঘরের মধ্যে ঝুলে রইল।
ঠিক তখনই ডাকবাংলোর ওপরের তলা থেকে পায়ের শব্দ ভেসে এল।
দুজনেই মাথা তুলল।
ধীর পায়ে কেউ সিঁড়ি দিয়ে নামছে।
এক ধাপ।
দুই ধাপ।
তিন ধাপ।
অয়ন ল্যাপটপের আলো নিভিয়ে দিল।
অন্ধকারে তারা দরজার পাশে সরে দাঁড়াল।
সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে একজন বৃদ্ধ থামলেন।
তারপর সুইচ টিপতেই ঘরের আলো জ্বলে উঠল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সাদা চুলের এক বৃদ্ধ। পরনে ধূসর পাঞ্জাবি, চোখে মোটা চশমা। হাতে একটি কালো ব্যাগ।
তিনি দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমরা অবশেষে এসেছ।”
অনিরুদ্ধ এগিয়ে গেল।
“আপনি কি ডা. নীলাদ্রি মুখোপাধ্যায়?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ।”
“আপনি আমাদের জন্মের রাতের ঘটনা জানেন?”
“শুধু জানি না, আমি সেই রাতের একজন সাক্ষী।”
“তাহলে বলুন, আমাদের মধ্যে কে আসল অনিরুদ্ধ?”
ডাক্তার কিছুক্ষণ দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর টেবিলের ওপর ব্যাগটা রাখলেন।
“তোমাদের দুজনেরই নাম অনিরুদ্ধ রাখা হয়েছিল।”
অনিরুদ্ধ ও অয়ন একসঙ্গে বলে উঠল, “কী?”
ডাক্তার ধীরে ধীরে বললেন, “তোমাদের জন্মের আগে তোমাদের মা ঠিক করেছিলেন, দুটি ছেলের নামই হবে অনিরুদ্ধ। তাঁর বিশ্বাস ছিল, নামের মধ্যে এমন একটা শক্তি থাকে, যা মানুষকে নিজের ভাগ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়।”
“তাহলে অয়ন নামটা এল কোথা থেকে?”
“সেটা তোমাদের বাবার দেওয়া নাম।”
ডাক্তার ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ফাইল বের করলেন।
“দেবব্রত সেন একজন শিশুকে নিজের সন্তান হিসেবে বড় করতে চেয়েছিলেন। অন্য শিশুটিকে তিনি এমন একজনের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন, যে তাকে এই পরিবারের অতীত থেকে দূরে রাখতে পারবে।”
“কিন্তু কেন?” অয়ন জিজ্ঞেস করল।
ডাক্তার চোখ নামিয়ে বললেন, “কারণ তোমাদের জন্মের সঙ্গে একটি অপরাধ জড়িয়ে ছিল।”
অনিরুদ্ধের গলা শুকিয়ে গেল।
“কী অপরাধ?”
ডাক্তার বললেন, “তোমাদের জন্মের কয়েক ঘণ্টা আগে হাসপাতালের পাশের একটি বাড়িতে একজন মহিলা খুন হন। তাঁর নাম ছিল কেয়া মুখোপাধ্যায়।”
“আপনার আত্মীয়?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“আমার স্ত্রী।”
কথাটা শুনে অনিরুদ্ধ থমকে গেল।
ডাক্তার আবার বললেন, “কেয়া সেই রাতে তোমাদের মাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি জানতেন, মাধবী বিপদে আছেন। তিনি আরও জানতেন, তোমাদের বাবা একটি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত। সেই কেলেঙ্কারির প্রমাণ মাধবীর কাছে ছিল।”
“তাহলে আমার মা কি বাবাকে ব্ল্যাকমেল করছিলেন?”
“না। তিনি প্রমাণগুলো পুলিশের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন।”
“কীসের প্রমাণ?”
ডাক্তার ফাইলের একটি পৃষ্ঠা সামনে রাখলেন। সেখানে কয়েকটি হাসপাতালের নাম, কিছু আর্থিক লেনদেনের হিসাব এবং কয়েকটি শিশুর পরিচয় লেখা ছিল।
“একটি বেআইনি শিশু পাচার চক্র বহু বছর ধরে নবজাতকদের পরিচয় বদলে বিভিন্ন পরিবারের হাতে তুলে দিচ্ছিল। কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের দত্তক নেওয়ার আড়ালে অর্থের লেনদেন হতো। কিছু ক্ষেত্রে পরিচয় বদলে সম্পত্তির উত্তরাধিকারও পাল্টে দেওয়া হতো।”
অয়ন স্তব্ধ হয়ে গেল।
“আপনি বলতে চাইছেন, আমাদের জন্মের সময়ও এমন কিছু ঘটেছিল?”
“হ্যাঁ। কিন্তু তোমাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও জটিল। কারণ তোমাদের মা এই চক্রের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।”
অনিরুদ্ধ টেবিলের ওপর হাত রেখে বলল, “তাহলে মা কি এই চক্রের হাত থেকে আমাদের বাঁচাতে চেয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“আর বাবা?”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“দেবব্রত সেন সেই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, তার প্রমাণ আমার কাছে নেই। কিন্তু তিনি জানতেন, ওই রাতে কী ঘটেছিল। আর তোমাদের পরিচয় বদলানোর সিদ্ধান্তও তাঁর সামনে নেওয়া হয়েছিল।”
“তাহলে তিনি অপরাধী?”
“আমি বিচারক নই। আমি শুধু সত্যিটা জানি।”
ডাক্তার ব্যাগ থেকে আরেকটি খাম বের করলেন।
খামটা অন্যগুলোর মতো নীল নয়। সম্পূর্ণ সাদা।
“এটা মাধবী আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তাঁর দুই ছেলে যখন একসঙ্গে আমার সামনে দাঁড়াবে, তখনই যেন খামটা খুলি।”
অনিরুদ্ধ কাঁপা হাতে খামটা নিল।
ভেতরে একটি চিঠি এবং একটি ছোট্ট চাবি।
চিঠিতে লেখা—
“নীলাদ্রি,
যদি আমার দুই ছেলে কখনও একসঙ্গে তোমার কাছে আসে, তবে বুঝবে, সময় এসে গেছে। ওদের এমন একটি জায়গায় নিয়ে যেয়ো, যেখানে সত্য লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
কলকাতার পুরোনো বাড়ি নয়, শালবনের ডাকবাংলোও নয়।
ওদের নিয়ে যেয়ো নদীর ধারের সেই বাড়িতে, যেখানে কেয়া শেষবার আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
সেখানেই রয়েছে আসল নথি।
আর নীলাদ্রি, যদি তুমি এখনও মনে করো যে দেবব্রত শুধু একজন অপরাধী, তবে এই চিঠির শেষ লাইনটা পড়ো।
তিনি যা করেছেন, তার সবটাই অপরাধ ছিল না।
কিছু সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন এমন একটি শিশুকে বাঁচানোর জন্য, যাকে বাঁচিয়ে রাখার কথা কেউ ভাবেনি।
— মাধবী”
অনিরুদ্ধ চিঠিটা নামিয়ে রাখল।
“কোন শিশুকে বাঁচানোর কথা বলছেন মা?”
ডাক্তার উত্তর দিলেন না।
বরং জানলার দিকে এগিয়ে গিয়ে পর্দা সরালেন।
বাইরে রাস্তার ওপর একটি গাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে।
গাড়িটা ধীরে ধীরে ডাকবাংলোর সামনে এসে থামল।
ডাক্তার মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “আমাদের বেরোতে হবে। তারা আমাদের খুঁজে পেয়েছে।”
অয়ন জিজ্ঞেস করল, “কারা?”
ডাক্তার বললেন, “যারা এই নথিগুলো এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছে।”
ঠিক তখনই দরজায় তিনবার ধাক্কা পড়ল।
টক।
টক।
টক।
তারপর বাইরে থেকে একজন মহিলার কণ্ঠ শোনা গেল।
“ডাক্তারবাবু, দরজা খুলুন। আমি মাধবী।”
অনিরুদ্ধের শরীরের প্রতিটি স্নায়ু যেন এক মুহূর্তে জমে গেল।
অয়ন ডাক্তারের দিকে তাকাল।
ডাক্তারের মুখ ফ্যাকাশে।
তিনি ফিসফিস করে বললেন, “অসম্ভব। মাধবী যদি সত্যিই বাইরে থাকে, তাহলে এত বছর ধরে আমরা কাকে খুঁজছিলাম?”
দরজার ওপাশ থেকে আবার সেই কণ্ঠ ভেসে এল।
“অনি, অয়ন, দরজা খোলো। তোমাদের মা এসেছেন।”
অনিরুদ্ধ আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
ডাক্তার তার হাত চেপে ধরলেন।
“দাঁড়াও! দরজা খুলবে না!”
“কেন? উনি আমার মা!”
“কারণ তোমাদের মা দরজার ওপাশে থাকলে তিনি কখনও তোমাদের নাম ধরে ডাকতেন না।”
অনিরুদ্ধ থমকে গেল।
“কেন?”
ডাক্তার কাঁপা গলায় বললেন, “কারণ তিনি জানেন, তোমাদের দুজনের মধ্যে একজনের নাম এখনও অনিরুদ্ধ নয়।”
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার নিচ দিয়ে একটি নীল খাম ভেতরে ঢুকে এল।
খামের ওপর লেখা—
“ডা. নীলাদ্রি মুখোপাধ্যায়ের জন্য—আপনার স্ত্রী কেয়ার শেষ চিঠি।”
ডাক্তার খামটা দেখেই পিছিয়ে গেলেন।
তারপর নিজের অজান্তেই বলে উঠলেন—
“কেয়া তো মারা যাওয়ার আগে সব চিঠি পুড়িয়ে দিয়েছিল!”
দরজার ওপাশ থেকে মহিলার কণ্ঠ এবার বদলে গেল।
“সব চিঠি নয়, নীলাদ্রি। একটি চিঠি আমি তোমার জন্য রেখে গিয়েছিলাম।”
ঘরের আলো নিভে গেল।
আর অন্ধকারের মধ্যে শোনা গেল একটি বাক্য—
“তোমাদের দুজনের মধ্যে একজন আমার ছেলে নয়।”
চলবে…