Categories
উপন্যাস বিবিধ

নীল খামের শেষ চিঠি (তৃতীয় পর্ব: যে জানালায় ভোরের আলো ফিরল)।

রাত তখন প্রায় আড়াইটে।

উত্তর কলকাতার পুরোনো বাড়িটার দোতলার ঘরে তিনজন মানুষ বসে ছিল। বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালার কাঠের পাল্লায় টুপটাপ শব্দ পড়ছে। ঘরের মাঝখানে রাখা মায়ের পুরোনো ছবিটা দেখে অনির্বাণের মনে হচ্ছিল, ছবির মানুষটি যেন এই মুহূর্তেও তাকে কিছু বলতে চাইছেন।

একদিকে বাবা অরুণাভ মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে সৌম্য, সেই অচেনা মানুষ, যাঁর সঙ্গে তার মায়ের অতীত জড়িয়ে রয়েছে। আর মাঝখানে অনির্বাণ—নিজের জন্মের সত্যিটুকু জানার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ, যে এত দিন নিজের পরিচয়কে কখনও প্রশ্ন করেনি।

কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার জীবনের সমস্ত পরিচিত শব্দের অর্থ বদলে গিয়েছে।

বাবা বলেছিলেন, তার জন্মের সময় আরেকটি শিশুও পৃথিবীতে এসেছিল। সেই শিশুটি কোথায় হারিয়ে গেল, কেন হারিয়ে গেল, আর এত বছর ধরে কেন কেউ তাকে খুঁজল না—এই প্রশ্নগুলো অনির্বাণের মাথার মধ্যে হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল।

তার ওপর মায়ের কণ্ঠস্বর।

“অনু? আমি তোর মা।”

এটা কি সত্যিই মায়ের কণ্ঠ ছিল? নাকি কেউ তার স্মৃতি, আবেগ আর দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে কোনও অজানা পথে ঠেলে দিচ্ছে?

অনির্বাণ বাবার দিকে তাকাল।

“তুমি বলেছিলে, মা মারা গিয়েছিল। তাহলে তাঁর গলা আমি শুনলাম কী করে?”

অরুণাভ চোখ নামিয়ে নিলেন।

“আমি জানি না।”

“তুমি কিছুই জানো না? আমার জন্মের সময় দুটো বাচ্চা হয়েছিল, একটা হারিয়ে গেল, মা মারা গেলেন, আর তুমি এত বছর আমাকে কিছুই বললে না! এবার অন্তত সত্যিটা বলো।”

অরুণাভ ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “সত্যিটা আমি যতটা জানি, ততটাই বলব। কিন্তু একটা কথা আগে বুঝে নে—সব সত্যি জানার পর হয়তো তুই আমাকে আর আগের মতো দেখতে পারবি না।”

“আমি তো এখনই তোমাকে আগের মতো দেখতে পারছি না, বাবা।”

কথাটা বলেই অনির্বাণ মুখ ফিরিয়ে নিল। তার নিজের কণ্ঠস্বরও যেন তার কাছে অপরিচিত লাগছিল।

সৌম্য এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এবার তিনি বললেন, “অরুণাভবাবু, এত বছর ধরে যে কথাগুলো লুকিয়ে রেখেছেন, সেগুলো বলার সময় এসে গিয়েছে। ছেলেটার আর কিছু হারানোর বাকি নেই।”

অরুণাভ হঠাৎ তাঁর দিকে তাকালেন।

“আপনি আমাকে বিচার করবেন না, সৌম্যবাবু। আপনি জানেন না, সেই রাতে কী ঘটেছিল।”

“তাহলে বলুন।”

বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়ে গেল।

অরুণাভ উঠে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করলেন। তারপর ফিরে এসে আলমারির পাশে রাখা একটা পুরোনো চেয়ারে বসলেন।

“আঠারো ফেব্রুয়ারি, উনিশশো ছিয়ানব্বই। সেদিন রাতটা আমি কোনও দিন ভুলতে পারিনি। মধুমিতাকে নিয়ে আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দিয়েছিল। অনেকক্ষণ পর ডাক্তার এসে বললেন, দুটো ছেলে হয়েছে। দুটোই বেঁচে আছে। কিন্তু ছোট ছেলেটার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল।”

অনির্বাণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

“আমাকে একবার দুটো বাচ্চাকে দেখানো হয়েছিল। একজনের গলায় নীল সুতো, অন্যজনের গলায় লাল। আমি ভেবেছিলাম, দুজনকেই বাড়ি নিয়ে যাব। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের লোকেরা জানাল, একটা শিশুকে অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। তারা বলেছিল, চিকিৎসার জন্যই এই ব্যবস্থা।”

“কোন হাসপাতালে?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল।

অরুণাভ মাথা নাড়লেন।

“সেটাই তো জানতাম না। কাগজে একটা নাম লেখা হয়েছিল, কিন্তু পরে জানতে পারি, সেই হাসপাতালের ঠিকানাই ভুল। আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ আমাকে বলেছিল, শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, সব কাগজ পরে দেওয়া হবে।”

“তারপর?”

“তারপর আর কোনও কাগজ আসেনি। শিশুটির কোনও খোঁজও পাইনি।”

অনির্বাণের চোখে অবিশ্বাস।

“তুমি পুলিশে খবর দাওনি?”

“দিয়েছিলাম। কিন্তু হাসপাতালের রেজিস্টারে কোনও দ্বিতীয় শিশুর নাম ছিল না। যে চিকিৎসক ওই রাতে দায়িত্বে ছিলেন, তিনি কয়েক দিনের মধ্যে চাকরি ছেড়ে চলে যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছিল, আমার স্ত্রী নাকি একটি সন্তানই জন্ম দিয়েছেন। তাদের কাছে অন্য কোনও শিশুর নথি ছিল না।”

“আর তুমি সেটা মেনে নিলে?”

“না!” অরুণাভের গলা কেঁপে উঠল। “আমি মেনে নিইনি। বহু মাস খুঁজেছিলাম। কিন্তু তোর মা তখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তার ওপর একদিন মধুমিতা জানতে পারে, দ্বিতীয় শিশুটির কথা আমি অনেক দিন ধরে লুকিয়ে রেখেছি। সে আমাকে প্রশ্ন করেছিল। আমি উত্তর দিতে পারিনি।”

অনির্বাণ এবার সৌম্যর দিকে তাকাল।

“আপনি এসব জানতেন?”

সৌম্য মাথা নাড়লেন।

“না। আমি শুধু জানতাম, মধুমিতা আমার কাছে একটা চিঠি পাঠিয়েছিল। সেখানে সে লিখেছিল, তোমার জন্মের সঙ্গে একটা বড় বিপদ জড়িয়ে আছে। আমাকে যেন তোমার জীবনে না আসতে বলে। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো সে নিজের সংসার বাঁচাতে চাইছে। পরে বুঝলাম, সে কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল।”

“কাকে?”

সৌম্য অনির্বাণের চোখের দিকে তাকালেন।

“তোমাদের দুজনকেই।”

ঘরের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।

অনির্বাণ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“আমি ছাদে যাচ্ছি। মা যে লাল বাক্সের কথা বলেছে, সেটা খুঁজে বের করব।”

অরুণাভও উঠে দাঁড়ালেন।

“আমি তোর সঙ্গে যাব।”

“না। আমি একাই যাব।”

“অনু—”

“এত দিন তোমরা সবাই আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছ। এবার অন্তত নিজের জন্মের সত্যিটা আমি নিজে খুঁজে বের করতে চাই।”

অরুণাভ আর বাধা দিলেন না।

সৌম্য শুধু বললেন, “সাবধানে যেয়ো। পুরোনো বাড়ির ছাদে অনেক জিনিস নষ্ট হয়ে আছে।”

অনির্বাণ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।


পুরোনো বাড়ির ছাদে উঠলেই একটা অদ্ভুত গন্ধ পাওয়া যেত। শ্যাওলা, ভেজা ইট, পুরোনো কাঠ আর বহুদিন না খোলা ঘরের গন্ধ।

ছাদের এক কোণে ভাঙা চৌকি। অন্য কোণে কয়েকটা মরচে ধরা টিনের বাক্স। মাঝখানে একটা পরিত্যক্ত তুলসীমঞ্চ। ছোটবেলায় মা তাকে এখানে নিয়ে আসতেন। বর্ষার পরে জমে থাকা জল দেখিয়ে বলতেন, “অনু, পৃথিবীর সব জমে থাকা জল একদিন না একদিন শুকিয়ে যায়। শুধু মনের ভিতরে জমে থাকা কষ্টটা শুকোতে সময় লাগে।”

সেই স্মৃতিটুকু মনে পড়তেই তার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল।

ছাদের উত্তর দিকে একটা ছোট ঘর ছিল। বহু বছর ধরে সেখানে পুরোনো আসবাবপত্র রাখা হত। ঘরটার দরজা বাইরে থেকে আটকে ছিল। অনির্বাণ মরচে ধরা শিকল সরিয়ে দরজাটা ঠেলতেই ধুলোর গন্ধে নাক-মুখ ভরে গেল।

ঘরের ভিতরে ঢুকে সে মোবাইলের আলো জ্বালল।

দেয়ালের পাশে একটা কাঠের আলমারি। তার নিচে ভাঙা ট্রাঙ্ক। ছাদের একটা কোণে পুরোনো খবরের কাগজের স্তূপ। আর সবশেষে, একটা কালো কাপড়ে মোড়া ছোট লাল বাক্স।

বাক্সটা হাতে তুলতেই অনির্বাণের মনে হল, তার ভিতরে কাগজের চেয়েও ভারী কিছু রয়েছে—বিশ বছর ধরে জমে থাকা অজস্র প্রশ্ন।

ঢাকনায় ছোট্ট একটা তালা। কিন্তু তালাটা বন্ধ ছিল না। শুধু একটা লাল সুতো দিয়ে বাক্সটা বাঁধা।

অনির্বাণ সুতো খুলে ঢাকনা তুলল।

ভিতরে কয়েকটি কাগজ, হাসপাতালের সিল মারা একটি নথি, দুটি জন্ম-পরিচয়ের কার্ড, একটি ছোট্ট শিশুর লাল উলের টুপি এবং একটা সাদা খাম।

খামের ওপর মায়ের হাতের লেখা—

“অনুর জন্য। যখন সে জানতে চাইবে, তার আরেকটি অর্ধেক কোথায়।”

অনির্বাণের আঙুল কাঁপছিল।

সে প্রথমে হাসপাতালের নথিটা খুলল।

সেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল—১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, একই মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া দুই পুত্রসন্তান। প্রথম শিশুর পরিচয়: অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়। দ্বিতীয় শিশুর অস্থায়ী পরিচয়: অয়ন মুখোপাধ্যায়।

তারপর একটি অদ্ভুত মন্তব্য—

“দ্বিতীয় শিশুকে বিশেষ পর্যবেক্ষণের জন্য স্থানান্তর করা হয়েছে। অভিভাবকের সম্মতি নথিভুক্ত নয়।”

নিচে চিকিৎসকের স্বাক্ষর।

ডা. রণজিৎ সেন।

অনির্বাণ নামটা মনে মনে কয়েকবার পড়ল।

এরপর সে সাদা খামটি খুলল।

ভিতরে চার পাতার একটি চিঠি।

“অনু,

যদি তুই এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব, তোর জীবনের দরজাটা অবশেষে খুলেছে। আমি চাইনি, তোর ছোটবেলায় এই সত্যিটা তোর সামনে আসুক। কারণ তখন তুই কিছু বুঝতে পারতিস না। আর যখন বুঝতে শিখলি, তখন এমন কিছু মানুষের নজর থেকে তোকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছিল, যারা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে যে কোনও কিছু করতে পারত।

তোর জন্মের রাতে শুধু একটি শিশুকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়নি। তাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে দরিদ্র পরিবারের অসহায় শিশুদের পরিচয় বদলে দেওয়া হত। কিছু শিশুকে দত্তক দেওয়ার নামে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হত, কিছু শিশুর অস্তিত্বই কাগজ থেকে মুছে ফেলা হত।

তোর ভাই অয়নের শ্বাসকষ্ট ছিল সামান্য। কিন্তু হাসপাতালের লোকেরা সেই অসুস্থতার কথা বাড়িয়ে বলে আমাদের থেকে তাকে আলাদা করে। তোর বাবা প্রতিবাদ করেছিল। আমিও করেছিলাম। কিন্তু আমাদের হাতে কোনও প্রমাণ ছিল না।

কয়েক মাস পরে আমি জানতে পারি, ওই হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন মানুষ বেআইনিভাবে নবজাতক শিশুদের অন্যত্র পাঠাত। তাদের মধ্যে একজন ছিল ডা. রণজিৎ সেন। সে আমাদের ভয় দেখিয়েছিল। বলেছিল, আমরা যদি বেশি খোঁজাখুঁজি করি, তাহলে তোরও ক্ষতি হতে পারে।

তোর বাবা পুলিশে গিয়েছিল। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তদন্ত এগোয়নি। আমি বুঝতে পারছিলাম, তোর ভাইকে খুঁজে পেতে হলে আমাদের শুধু তার নাম জানলেই হবে না, জানতে হবে তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং কারা তার পরিচয় বদলেছে।

সেই সময় আমার জীবনে আরও একটা ভুল হয়েছিল। আমি সৌম্যকে আবার খুঁজে পেয়েছিলাম। তাকে সাহায্য করতে বলেছিলাম। কিন্তু আমাদের পুরোনো সম্পর্ককে কেন্দ্র করে অনেকেই সন্দেহ করেছিল, সে হয়তো নিজের স্বার্থে আমাদের পরিবারের মধ্যে ঢুকতে চাইছে। আমি চাইনি, তোর জীবনে আরও জটিলতা তৈরি হোক। তাই তাকে দূরে থাকতে বলেছিলাম।

কিন্তু তোর বাবা কখনও তোর শত্রু ছিল না। সে নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়ে তোকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। তার ভুল ছিল—সে ভেবেছিল, সত্যি লুকিয়ে রাখলে বিপদও একদিন হারিয়ে যাবে।

আমার ভুল ছিল, আমি ভেবেছিলাম, একদিন সব ঠিক করে তোকে সব বলব। সেই একদিন আর আসেনি।

অনু, আমি যদি তোর পাশে না থাকি, তবুও তুই একা নস। তোর ভাই কোথাও আছে। তার হয়তো অন্য নাম, অন্য পরিবার, অন্য জীবন। কিন্তু তার জন্মের সত্যিটা বদলায়নি।

তাকে খুঁজে পাস। তবে তাকে খুঁজে পেয়ে তার জীবনটাকে নিজের প্রশ্নের ভারে ভেঙে দিস না।

আর একটা কথা—মানুষের জন্মের সত্যি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার থেকেও বড় হল, সে কাদের ভালোবাসায় মানুষ হয়েছে।

তোর মা, মধুমিতা।”

চিঠিটা শেষ হতে না হতেই অনির্বাণের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

মা সত্যিই সব জানতেন। অন্তত অনেক কিছু জানতেন।

কিন্তু তিনি কোথায়?

চিঠির সঙ্গে আরও একটি কাগজ ছিল। পুরোনো একটি ঠিকানা—“মাতৃসেবা সদন, সংলগ্ন পুরোনো রেকর্ড ভবন, শ্যামবাজার।” আর তার পাশে পেন্সিলে লেখা একটা ফোন নম্বর।

অনির্বাণ দ্রুত ফোন নম্বরটা মোবাইলে তুলল।

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।

অজানা নম্বর।

সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরল।

“হ্যালো?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনও শব্দ নেই।

তারপর সেই কণ্ঠস্বর।

“অনু?”

অনির্বাণের বুকের ভিতর যেন সব শব্দ থেমে গেল।

“মা?”

“হ্যাঁ, বাবা।”

তার গলা কেঁপে উঠল।

“তুমি কোথায়? তুমি কি বেঁচে আছ?”

ওপাশে দীর্ঘশ্বাস।

“আমি বেঁচে আছি। কিন্তু এত বছর ধরে যে জীবন কাটিয়েছি, তাকে বেঁচে থাকা বলা যায় কি না জানি না।”

“তাহলে সবাইকে বললে তুমি মারা গিয়েছ কেন?”

“আমি নিজে তোমাকে ছেড়ে যেতে চাইনি, অনু। কিন্তু সেই সময় তোমার ভাইয়ের খোঁজ করতে গিয়ে এমন কিছু তথ্য আমার হাতে এসেছিল, যার জন্য তোমার জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়ে। তোমার বাবা আমাকে সাহায্য করেছিল। আমরা দুজনেই ভেবেছিলাম, কিছুদিনের জন্য আড়ালে থাকলে তোমাকে বাঁচানো যাবে।”

“কিছুদিন? কুড়ি বছর?”

“সময়টা যে এত দীর্ঘ হয়ে যাবে, আমি বুঝিনি।”

“তুমি একবারও আমার কাছে আসোনি?”

ওপাশে কান্নার শব্দ শোনা গেল।

“অনেকবার এসেছি, বাবা। দূর থেকে তোকে স্কুলে যেতে দেখেছি। তোর জন্মদিনে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছি। তুই যখন প্রথম চাকরি পেলি, তখনও এসেছিলাম। কিন্তু সামনে আসার সাহস হয়নি। আমি জানতাম, আমার ফিরে আসা মানে পুরোনো বিপদগুলোকে আবার জাগিয়ে তোলা।”

অনির্বাণ কেঁদে ফেলল।

“তাহলে নীল খামটা পাঠালে কেন?”

“কারণ আমি আর অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। এত বছর ধরে তোর ভাইয়ের খোঁজ করেছি। কিছু সূত্র পেয়েছি। কিন্তু এখন আমার শরীর ভালো নেই। আমি চাই, সত্যিটা তুই জানিস। তোর বাবা জানে না, আমি কতটা কাছে পৌঁছে গিয়েছি।”

“তুমি কোথায় আছ?”

“এই মুহূর্তে সেটা বলব না। আগে তুই একটা কাজ কর। বাক্সের ভিতরে যে ছোট্ট টুপিটা পেয়েছিস, সেটার ভিতরে দেখ।”

অনির্বাণ দ্রুত লাল উলের টুপিটা হাতে নিল। ভিতরের সেলাইয়ের কাছে একটা ছোট কাগজ গুঁজে রাখা ছিল।

সে কাগজটা বের করল।

তাতে লেখা—“অয়ন সেনগুপ্ত। দত্তক গ্রহণের নথি: ১৯৯৭। নিবন্ধন নম্বর ৪৭/বি।”

অনির্বাণ স্তব্ধ হয়ে গেল।

“অয়ন সেনগুপ্ত? তাহলে ওর নাম বদলে দেওয়া হয়েছিল?”

“হ্যাঁ। কিন্তু শুধু নাম নয়। তার জন্মের নথিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছিল। আমি যতটুকু জেনেছি, তাকে কলকাতার বাইরে এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে পাঠানো হয়েছিল। তারা হয়তো কিছুই জানতেন না। তাঁরা ভেবেছিলেন, শিশুটিকে আইন মেনেই দত্তক নিচ্ছেন।”

“তাহলে আমি ওকে খুঁজে পাব কীভাবে?”

“এই নিবন্ধন নম্বরটাই তোর প্রথম সূত্র। কাল সকালে তুই পুরোনো রেকর্ড ভবনে যাবি। সেখানে একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মী আছেন—নির্মলবাবু। আমি তাঁকে খবর দিয়েছি। তিনি তোর জন্য কিছু নথি রেখে দিয়েছেন।”

“তুমি আমার সঙ্গে দেখা করবে না?”

ওপাশে নীরবতা।

তারপর মা বললেন, “করব। কিন্তু তার আগে তোর বাবার সঙ্গে কথা বল। ওকে ক্ষমা করতে পারবি কি না, সেটা তোর সিদ্ধান্ত। তবে ওর সমস্ত ভুলের পিছনে যে শুধু স্বার্থ ছিল, তা নয়।”

“মা, আমি তোমাকে দেখতে চাই।”

“আমিও তোকে দেখতে চাই, অনু।”

কথাটা এত সাধারণ, অথচ এত বছর ধরে না শোনা—অনির্বাণের মনে হল, তার বুকের ভিতরে জমে থাকা সমস্ত অভিমান এক মুহূর্তে কান্না হয়ে বেরিয়ে আসছে।

“আমি অপেক্ষা করব,” সে বলল।

ফোন কেটে গেল।

অনির্বাণ অনেকক্ষণ ফোনটা কানে ধরে বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

দিগন্তে তখনও ভোরের আলো ফোটেনি।


পরদিন সকাল আটটা।

অনির্বাণ, অরুণাভ এবং সৌম্য—তিনজন একসঙ্গে শ্যামবাজারের পুরোনো রেকর্ড ভবনে পৌঁছল।

বাড়িটা বাইরে থেকে প্রায় পরিত্যক্ত। দেয়ালে শ্যাওলা, জানালায় মরচে, সামনের সাইনবোর্ডের অর্ধেক অক্ষর উঠে গিয়েছে। ভিতরে ঢুকতেই এক বৃদ্ধ তাঁদের পথ দেখিয়ে একটা ছোট ঘরে নিয়ে গেলেন।

“আপনারাই কি মধুমিতা দেবীর পরিবারের লোক?” বৃদ্ধ প্রশ্ন করলেন।

“হ্যাঁ,” অনির্বাণ বলল।

বৃদ্ধ নিজের পরিচয় দিলেন—নির্মল চক্রবর্তী। বহু বছর আগে তিনি মাতৃসেবা সদনের প্রশাসনিক বিভাগে কাজ করতেন। অবসরের আগে তিনি কিছু পুরোনো নথির অনুলিপি তৈরি করেছিলেন, কারণ ওই হাসপাতালের শিশু স্থানান্তরের রেকর্ডে অসংখ্য অসংগতি ছিল।

“আপনার মা আমাকে অনেকবার খুঁজেছেন,” নির্মলবাবু বললেন। “শেষবার এসেছিলেন প্রায় ছয় মাস আগে। তখন তাঁর শরীর খুব খারাপ ছিল। তিনি জানতেন, হয়তো বেশি সময় পাবেন না।”

“আপনি জানেন, আমার ভাই কোথায়?” অনির্বাণের গলায় উৎকণ্ঠা।

নির্মলবাবু একটা ফাইল খুললেন।

“এই নথিতে বলা আছে, অয়নকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল এক দম্পতির কাছে। স্বামীর নাম ছিল অমিতাভ সেনগুপ্ত, স্ত্রীর নাম কেয়া সেনগুপ্ত। তাঁরা থাকতেন হাওড়ার শিবপুরে। কিন্তু কয়েক বছর পরে তাঁরা শহর ছেড়ে চলে যান।”

“এখন কোথায় থাকেন?”

“অমিতাভবাবু অনেক বছর আগে মারা গিয়েছেন। কেয়াদেবী এখনও বেঁচে আছেন বলে আমার জানা। আর তাঁদের ছেলে—যাকে তাঁরা অয়ন নামে বড় করেছিলেন—সে এখন চিকিৎসক।”

অনির্বাণের বুকের মধ্যে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল।

“চিকিৎসক?”

“হ্যাঁ। নাম অয়ন সেনগুপ্ত। এখন একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করেন। আমি তাঁর ঠিকানা জোগাড় করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আপনার মা চেয়েছিলেন, আগে আপনি সব সত্যি জানুন। তিনি ভয় পেতেন, হঠাৎ গিয়ে নিজের পরিচয় দিলে ছেলেটা মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে।”

সৌম্য ধীরে বললেন, “এত বছর ধরে যে মানুষটাকে আমরা খুঁজছিলাম, সে হয়তো আমাদের কাছেই ছিল।”

নির্মলবাবু আরও একটি কাগজ বের করলেন।

“আরেকটা তথ্য আছে। অয়নের দত্তক নেওয়ার নথিতে যে চিকিৎসকের স্বাক্ষর রয়েছে, সেই ডা. রণজিৎ সেন পরবর্তী সময়ে শিশু পাচারের একটি মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। মামলাটি শেষ পর্যন্ত প্রমাণের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বহু বছর আগেই মারা গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত কাগজপত্রের কিছু অংশ সম্প্রতি উদ্ধার হয়েছে। আপনার মা সেই কাগজের একটি অনুলিপি পেয়েছিলেন।”

“সেখানে কী আছে?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল।

নির্মলবাবু একটা কাগজ তাঁর হাতে দিলেন।

এটি ছিল একটি চিঠির অনুলিপি। লেখা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে।

“অয়নকে নতুন পরিচয়ে দেওয়া হয়েছে। শিশুটির জৈবিক পরিবারের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখা যাবে না। পুরোনো নথি পরিবর্তনের ব্যবস্থা সম্পন্ন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন শেষ।”

নিচে কয়েকজনের নাম। তাদের মধ্যে হাসপাতালের এক প্রশাসনিক কর্মী, একজন দালাল এবং ডা. রণজিৎ সেন।

অরুণাভ কাগজটা হাতে নিয়ে কাঁপতে লাগলেন।

“আমি যদি তখন এই কাগজটা পেতাম…”

“তাহলে হয়তো গল্পটা অন্য রকম হত,” নির্মলবাবু বললেন। “কিন্তু অতীত বদলানো যায় না। এখন অন্তত সত্যিটা সামনে এসেছে।”

অনির্বাণ কাগজগুলো যত্ন করে ব্যাগে রাখল।

“অয়ন সেনগুপ্তের ঠিকানাটা দিতে পারবেন?”

নির্মলবাবু একটি কাগজে ঠিকানা লিখে দিলেন।

“তবে একটা অনুরোধ করব। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে নিজের পরিচয় ধীরে ধীরে দেবেন। তাঁর কাছে এই কুড়ি-তিরিশ বছরের জীবনটাই সত্যি। সেই সত্যিটাকে অস্বীকার করবেন না।”

অনির্বাণ মাথা নাড়ল।

“আমি শুধু জানতে চাই, আমার ভাই কেমন আছে।”


হাওড়ার শিবপুর।

সেদিন বিকেলে অনির্বাণ একাই অয়ন সেনগুপ্তের বাড়ির সামনে দাঁড়াল। পুরোনো পাড়ার মধ্যে দুইতলা বাড়ি। বারান্দায় গাছের টব। দরজার পাশে ছোট ফলকে লেখা—“ডা. অয়ন সেনগুপ্ত, এম.ডি.”

দরজার ঘণ্টা বাজাতেই এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। বয়স প্রায় সত্তর। চোখে চশমা, মুখে ক্লান্তির ছাপ।

“কাকে চাই?”

অনির্বাণ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

তারপর বলল, “আমি কি কেয়াদেবীর সঙ্গে কথা বলতে পারি?”

“আমি কেয়া। আপনি কে?”

অনির্বাণ নিজের পরিচয় দিল। তারপর ব্যাগ থেকে নথির অনুলিপি বের করে তাঁর হাতে দিল।

কেয়াদেবী কাগজটা দেখেই দরজার হাতল শক্ত করে ধরলেন।

“আপনি… আপনি কোথা থেকে এগুলো পেলেন?”

“আমি অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়। আমার জন্মের সময় আমার একটি যমজ ভাই হারিয়ে গিয়েছিল। নথিতে তার নাম ছিল অয়ন।”

কেয়াদেবীর চোখে জল এসে গেল।

“তাহলে এত বছর পরে…”

তিনি বাক্য শেষ করতে পারলেন না।

“আপনি কি জানতেন?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল।

কেয়াদেবী ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“আমরা যখন অয়নকে বাড়িতে নিয়ে আসি, তখন বলা হয়েছিল, তার জন্মদাতা বাবা-মা আর বেঁচে নেই। সমস্ত কাগজপত্র আইন মেনেই হয়েছে বলে আমাদের জানানো হয়েছিল। আমরা তাকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছি। কখনও ভাবিনি, তার জন্মের পিছনে এমন একটা ঘটনা লুকিয়ে আছে।”

“অয়ন কি জানে?”

“ও জানে, আমরা তাকে দত্তক নিয়েছিলাম। কিন্তু নিজের জন্মপরিচয়ের কথা এত বিস্তারিত জানে না। আমরা ওকে কখনও মিথ্যে বলতে চাইনি। আবার এমন কোনও সত্যিও দিতে চাইনি, যার জন্য ওর জীবন ভেঙে যায়।”

ঠিক তখনই বাড়ির ভিতর থেকে একজন পুরুষের গলা শোনা গেল।

“মা, দরজায় কে এসেছে?”

সাদা পাঞ্জাবি পরা একজন মানুষ বাইরে এলেন। বয়স প্রায় তিরিশ। চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, মুখে ক্লান্ত অথচ শান্ত ভাব। তাঁর হাতে হাসপাতালের কিছু কাগজ।

অয়ন সেনগুপ্ত।

অনির্বাণ প্রথমবার নিজের মুখের মতো আরেকটি মুখ দেখল।

চোখের গঠন, ভ্রুর বাঁক, নাকের সামান্য তির্যকতা—সব যেন একই ছাঁচে তৈরি। পার্থক্য শুধু অয়নের গালের পাশে ছোট একটা কাটা দাগ।

দুজনেই একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইল।

কেউ কোনও কথা বলল না।

শেষ পর্যন্ত অয়নই নীরবতা ভাঙল।

“মা, কী হয়েছে?”

কেয়াদেবী কাঁপা গলায় বললেন, “অয়ন, তোমার সঙ্গে একজনের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে।”

অনির্বাণ এগিয়ে এল।

“আমার নাম অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়। আমার জন্মের সময় আমার একটা যমজ ভাই ছিল। আমি এত দিন জানতাম না, সে কে।”

অয়ন কাগজগুলো হাতে নিল। একের পর এক পড়তে লাগল। তার মুখের রং বদলে গেল।

“এগুলো… এগুলো কি সত্যি?”

“আমি জানি না, তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে কি না,” অনির্বাণ বলল। “আমি তোমার জীবন বদলাতে আসিনি। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, তুমি বেঁচে আছ কি না।”

অয়ন দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর প্রশ্ন করল, “আমার জন্মদাতা মা কি বেঁচে আছেন?”

অনির্বাণের গলা আটকে গেল।

“হ্যাঁ। অন্তত আমি গতকাল তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি।”

অয়নের চোখ বড় হয়ে গেল।

“তাহলে তিনি এত দিন কোথায় ছিলেন?”

“সেটা আমি এখনও পুরোপুরি জানি না। কিন্তু আমি তাঁকে খুঁজে বের করব। আর তুমি চাইলে… তুমিও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারো।”

অয়ন চেয়ারে বসে পড়ল।

“আমার বাবা-মা আমাকে বড় করেছেন। তাঁরা আমাকে কখনও কম ভালোবাসেননি। আমি তাঁদের বাবা-মা বলেই জানি। এখন যদি জানতে পারি, আমার জন্মের সময় এত কিছু ঘটেছিল, তাহলে তাঁদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বদলে যাবে কি?”

অনির্বাণ ধীরে মাথা নাড়ল।

“না। তোমার জীবনের সত্যি বদলাবে না। তাঁরা তোমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, সেটা কোনও নথি মুছে দিতে পারে না। আমার বাবাও আমাকে বড় করেছেন। তিনি আমার জন্মদাতা কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যি হল, তিনিই আমাকে মানুষ করেছেন।”

অয়ন চোখ মুছল।

“তাহলে আমরা দুজনেই এক অদ্ভুত গল্পের অংশ।”

অনির্বাণের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল।

“হয়তো। কিন্তু গল্পের শেষটা এখনও লেখা হয়নি।”

অয়ন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল।

অনির্বাণ সেই হাত ধরল।

দুজনের হাতের স্পর্শে যেন কুড়ি বছরের অন্ধকারে প্রথম আলো জ্বলে উঠল।


তিন দিন পর।

কলকাতার এক শান্ত পাড়ার ছোট্ট বাড়ি। সামনের বাগানে শিউলি গাছ। ভোরের বাতাসে ফুলের গন্ধ। জানালার পাশে একটি চেয়ারে বসে ছিলেন মধুমিতা।

চুলে পাক ধরেছে। মুখে বয়সের রেখা। শরীর দুর্বল। কিন্তু চোখ দুটো এখনও সেই একই—যে চোখে একদিন অনির্বাণ পৃথিবীর প্রথম আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল।

দরজার বাইরে গাড়ি থামল।

অনির্বাণ প্রথমে নামল। তার পাশে অয়ন। পিছনে অরুণাভ আর সৌম্য।

অনির্বাণের মনে হচ্ছিল, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে আবার দশ বছরের ছোট ছেলে হয়ে গিয়েছে। যার মা একদিন তার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতেন। যার বিশ্বাস ছিল, মা পৃথিবীর সব প্রশ্নের উত্তর জানেন।

কিন্তু আজ সে জানে, মায়েরও ভুল ছিল। মায়েরও ভয় ছিল। আর সেই ভয় থেকে জন্ম নিয়েছিল দীর্ঘ বিচ্ছেদ।

দরজা খুলে গেল।

মধুমিতা দাঁড়িয়ে ছিলেন।

কয়েক সেকেন্ড কেউ নড়ল না।

তারপর তিনি ফিসফিস করে বললেন, “অনু…”

অনির্বাণ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।

সে ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।

“তুমি এত দিন কোথায় ছিলে, মা?”

মধুমিতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

“ক্ষমা করে দিস, বাবা।”

“আমি তোমাকে ক্ষমা করব কি না জানি না। কিন্তু তোমাকে আর হারাতে চাই না।”

মধুমিতা কেঁদে ফেললেন।

“আমি আর কোথাও যাব না, অনু। যত দিন বাঁচি, তোদের পাশে থাকতে চাই।”

অয়ন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে দ্বিধা, অস্বস্তি, আকুলতা—সব একসঙ্গে।

মধুমিতা তাকে দেখলেন।

“অয়ন…”

অয়নের ঠোঁট কেঁপে উঠল।

“আপনি… আমার মা?”

মধুমিতা মাথা নাড়লেন। তারপর হাত বাড়িয়ে দিলেন।

“তুই যদি আমাকে মা বলে ডাকতে না পারিস, তাতেও আমার কোনও অভিযোগ থাকবে না। আমি তোকে জন্ম দিয়েছিলাম, কিন্তু তোকে মানুষ করেছে অন্য একটি পরিবার। তাদের ভালোবাসার ওপর আমার কোনও অধিকার নেই। আমি শুধু তোকে একবার দেখতে চেয়েছিলাম।”

অয়ন এগিয়ে এসে তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।

“আমি আপনাকে কী বলে ডাকব, সেটা বুঝতে আমার একটু সময় লাগবে। কিন্তু একটা কথা বলতে পারি—আমি আপনাকে দোষ দিতে চাই না।”

মধুমিতা তার মুখ ছুঁয়ে দিলেন।

“তোর গালটা এখনও ছোটবেলার মতোই।”

অয়ন হেসে ফেলল। সেই হাসির মধ্যে জল মিশে ছিল।

অরুণাভ এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মধুমিতা এবার তাঁর দিকে তাকালেন।

দুজনের চোখাচোখি হল।

কুড়ি বছরের অভিমান, রাগ, অনুশোচনা আর অগণিত না-বলা কথার ভার নিয়ে তারা দাঁড়িয়ে রইলেন।

শেষ পর্যন্ত অরুণাভ বললেন, “আমি তোমাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই চেষ্টায় তোমাকে হারিয়েছি।”

মধুমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আমিও তোমাকে সবটা বিশ্বাস করতে পারিনি। আমরা দুজনেই ভয় পেয়েছিলাম। আর সেই ভয়ের মূল্য দিয়েছে আমাদের সন্তানরা।”

অরুণাভের চোখে জল।

“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?”

মধুমিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“ক্ষমা কোনও এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত নয়, অরুণাভ। এত বছরের ক্ষত একদিনে সেরে যাবে না। কিন্তু আমরা যদি সত্যি কথা বলতে শিখি, তাহলে হয়তো আবার কথা বলা শুরু করতে পারব।”

অরুণাভ মাথা নত করলেন।

সৌম্য পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি ধীরে বললেন, “মধুমিতা, আমি তোমাকে অনেক বছর ধরে ভুল বুঝেছি। ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে তোমার জীবন থেকে মুছে দিয়েছ। আজ বুঝতে পারছি, তুমি শুধু নিজের অতীত নয়, ভবিষ্যৎকেও বাঁচানোর চেষ্টা করছিলে।”

মধুমিতা তাঁর দিকে তাকালেন।

“সৌম্য, আমাদের অতীত ছিল। কিন্তু আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ তাদের নিজেদের। এখন আর পুরোনো সম্পর্কের হিসাব মেলানোর সময় নয়। এখন দরকার, ওরা যেন নতুন করে বাঁচতে পারে।”

সৌম্য মাথা নাড়লেন।

“তুমি ঠিক বলেছ।”

সেদিন দুপুরে সবাই একসঙ্গে খেতে বসল।

টেবিলে খুব সাধারণ খাবার—ভাত, ডাল, আলুভাজা, মাছের ঝোল। অথচ অনির্বাণের মনে হচ্ছিল, বহু বছর পর সে সত্যিকারের কোনও পারিবারিক টেবিলে বসেছে। এখানে প্রত্যেকের জীবনে আলাদা সত্যি আছে, আলাদা ক্ষত আছে, কিন্তু আর কেউ কিছু লুকিয়ে রাখছে না।

খাওয়ার মাঝখানে অয়ন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “মা, আমাদের জন্মের সময় কি সত্যিই নীল আর লাল সুতো বাঁধা ছিল?”

মধুমিতা হেসে উঠলেন। সেই হাসি শুনে অনির্বাণের মনে পড়ল, ছোটবেলায় মায়ের হাসি শুনলে বাড়ির সমস্ত ঘর যেন আলোয় ভরে যেত।

“হ্যাঁ। অনুর গলায় ছিল নীল সুতো, আর তোর গলায় লাল। আমি ভেবেছিলাম, দুটো রং আমাদের দুটো ছেলেকে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করবে। কিন্তু কে জানত, একদিন সেই রং দুটোই তোদের আলাদা করে দেবে!”

অয়ন নিজের কবজির দিকে তাকাল।

“লাল সুতোটা কি এখনও কোথাও আছে?”

অনির্বাণ ব্যাগ থেকে সেই ছোট্ট উলের টুপিটা বের করল।

“আছে। আর নীল সুতোর কথা লেখা আছে মায়ের পুরোনো নথিতে।”

মধুমিতা টুপিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন, “আমি তোদের দুজনের জন্যই ছোট ছোট দুটো জামা সেলাই করেছিলাম। একটা নীল বোতাম লাগানো, অন্যটা লাল। ভেবেছিলাম, তোরা বড় হলে সেই জামার ছবি দেখাব। কিন্তু জীবন অন্য পথে চলে গেল।”

“তুমি কি জামা দুটো রেখেছ?” অনির্বাণ প্রশ্ন করল।

মধুমিতা মাথা নাড়লেন।

“একটা আছে। অন্যটা হারিয়ে গেছে। হয়তো কোনও দিন খুঁজে পাব।”

অয়ন মৃদু হেসে বলল, “এবার আমরা দুজনে মিলে খুঁজব।”


সন্ধ্যায় অনির্বাণ মায়ের ঘরে গেল।

ঘরটি ছোট। জানালার পাশে একটি কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর ওষুধের শিশি, কয়েকটি বই এবং একটি পুরোনো ডায়েরি।

অনির্বাণ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল।

“মা, তুমি কি জানালাটা সব সময় খোলা রাখতে?”

মধুমিতা বললেন, “হ্যাঁ।”

“কেন?”

“কারণ আমি জানতাম, একদিন তুই ফিরে আসবি। হয়তো দরজা দিয়ে নয়, হয়তো কোনও চিঠির সূত্র ধরে। কিন্তু তুই আসবি।”

“নীল খামটা কি তুমি পাঠিয়েছিলে?”

“হ্যাঁ। খামটা আমি ২০০৬ সালে লিখেছিলাম। তোর জন্মের দশ বছর পূর্ণ হওয়ার সময়। তখন ভেবেছিলাম, হয়তো একদিন তোর হাতে পৌঁছবে। কিন্তু সেটা পাঠানোর সাহস পাইনি। পরে সব কাগজ গুছিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। গত কয়েক মাসে যখন বুঝলাম, আমার শরীর আর আগের মতো নেই, তখন পুরোনো ডাকঘরের এক কর্মীর সাহায্যে খামটা পাঠানোর ব্যবস্থা করি।”

“তাহলে খামের তারিখটা?”

“সেটা ইচ্ছে করেই রেখেছিলাম। যাতে তুই বুঝতে পারিস, এই গল্পটা আজকের নয়। বিশ বছর ধরে এর ভিতরে অনেক কথা জমে আছে।”

অনির্বাণ মায়ের পাশে বসল।

“তুমি যে ফোন করেছিলে, সেটা কীভাবে সম্ভব হল? আমি তো ভেবেছিলাম, তুমি মারা গিয়েছ।”

মধুমিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তোর বাবা জানত, আমি বেঁচে আছি। তবে সে জানত না, আমি ঠিক কোথায় থাকি। ফোন করার জন্য আমি নির্মলবাবুর সাহায্য নিয়েছিলাম। তোর পুরোনো বাড়ির ছাদের বাক্সে নম্বরটা লেখা ছিল। আমি চাইছিলাম, তুই নিজে সত্যিটা খুঁজে বের করিস। তোর সামনে সব কথা একসঙ্গে বলে দিলে হয়তো তুই কাউকেই বিশ্বাস করতে পারতিস না।”

“কিন্তু তুমি কি সত্যিই কখনও বাড়ি ফিরে আসতে পারতে না?”

মধুমিতা চোখ বন্ধ করলেন।

“পারতাম হয়তো। কিন্তু যখন তুই ছোট ছিলি, তখন ভয় পেয়েছি। পরে যখন তুই বড় হলি, তখন লজ্জা পেয়েছি। তারপর সময় এতটাই পেরিয়ে গেল যে, ফিরে আসার সাহসটাই হারিয়ে ফেললাম।”

অনির্বাণ মায়ের হাত ধরল।

“তুমি আমাকে একটা সুযোগ দিতে পারতে, মা।”

“জানি।”

“আমি তোমার ওপর রাগ করেছি। এখনও রাগ আছে। কিন্তু আমি চাই, তুমি আমার জীবনের বাকি সময়টুকুতে থাকো।”

মধুমিতা তার হাত শক্ত করে ধরলেন।

“আমি থাকব, অনু। এবার আর কোনও জানালা বন্ধ করব না।”


পরবর্তী কয়েক মাসে অনেক কিছু বদলে গেল।

অনির্বাণ অয়নের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে শুরু করল। প্রথম দিকে তাদের মধ্যে অস্বস্তি ছিল। একই রক্তের সম্পর্কের কথা জানা আর সত্যিকারের ভাই হয়ে ওঠা এক জিনিস নয়। তাদের শৈশব আলাদা, অভ্যাস আলাদা, স্মৃতি আলাদা। একজন উত্তর কলকাতার পুরোনো বাড়িতে বড় হয়েছে, অন্যজন শিবপুরের এক শান্ত পরিবারে।

তবু ধীরে ধীরে তারা একে অন্যকে জানতে শিখল।

অয়ন জানল, অনির্বাণ ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে বইমেলায় যেত। অনির্বাণ জানল, অয়ন ছোট থেকে চিকিৎসক হতে চেয়েছিল, কারণ তার দত্তক বাবা একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে একজন চিকিৎসক তাঁকে সুস্থ করে তুলেছিলেন।

অনির্বাণ বলেছিল, “তুই তো মানুষের জীবন বাঁচাস।”

অয়ন উত্তর দিয়েছিল, “হয়তো নিজের জীবনের প্রথম গল্পটা জানতাম না বলেই অন্য মানুষের গল্প শুনতে শিখেছি।”

অরুণাভও অয়নের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেষ্টা করলেন। প্রথম কয়েকবার অয়ন তাঁকে ‘অরুণাভবাবু’ বলে ডাকত। অরুণাভ কখনও তাকে জোর করেননি। তিনি জানতেন, কোনও সম্পর্ক দাবি করে পাওয়া যায় না।

একদিন অয়ন নিজেই বলল, “আপনি যদি আপত্তি না করেন, আমি আপনাকে বাবার মতোই সম্মান করতে চাই। আমার জন্মদাতা কে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি জানি না। কিন্তু আমার জীবনের সত্যিটা আমি অস্বীকার করব না।”

অরুণাভের চোখ ভিজে উঠেছিল।

“তুই আমাকে যে সম্মান দিচ্ছিস, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। তোকে কোনও নাম বা সম্পর্কের মধ্যে আটকে রাখতে চাই না।”

সৌম্যও অনির্বাণের জীবনে রয়ে গেলেন। তিনি কখনও নিজের জায়গা দাবি করেননি। বরং পুরোনো ছবির গল্প, মধুমিতার কলেজজীবনের স্মৃতি আর বহু বছর আগের কলকাতার কথা বলে অনির্বাণকে তার মায়ের আরেকটি রূপ চিনতে সাহায্য করতেন।

অনির্বাণ বুঝতে শিখল, একজন মানুষের জীবনে একাধিক মানুষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন। ভালোবাসার জায়গা সব সময় একটিই হয় না।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটল মধুমিতার জীবনে।

তিনি আর একা থাকতেন না। অনির্বাণ প্রতিদিন তাঁর কাছে যেত। অয়ন সপ্তাহে অন্তত দুদিন আসত। অরুণাভ মাঝে মাঝে ওষুধের তালিকা নিয়ে বসতেন। সৌম্য পুরোনো বই নিয়ে আসতেন।

মধুমিতা কখনও কখনও জানালার পাশে বসে চারজনকে একসঙ্গে দেখতেন। তাঁর চোখে জল এসে যেত।

“এত বছর পরও তোমরা সবাই একসঙ্গে বসতে পারছ,” তিনি বলতেন। “এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।”

তবু গল্পের সমস্ত অন্ধকার একদিনে মুছে যায়নি।

ডা. রণজিৎ সেনের বিরুদ্ধে পুরোনো নথি নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছিল। বহু নথি হারিয়ে গিয়েছিল, কিছু সাক্ষী আর বেঁচে ছিলেন না। তবু অনির্বাণ ও অয়ন তাঁদের জন্মের নথি সংশোধনের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেয়। তাঁরা জানতেন, হয়তো সব অপরাধের বিচার আর সম্ভব হবে না। কিন্তু সত্যিটা সরকারি নথিতে ফিরিয়ে আনা জরুরি।

মধুমিতা তাঁদের বলেছিলেন, “তোরা শুধু নিজেদের জন্য লড়ছিস না। যেসব শিশু নিজেদের পরিচয় না জেনেই বড় হয়েছে, তাদের জন্যও লড়ছিস।”

অনির্বাণ সেই কথাটা মনে রেখেছিল।


এক বছর পর।

আবার ফেব্রুয়ারি মাস।

আঠারো তারিখের সকাল।

পুরোনো উত্তর কলকাতার বাড়িটিতে ছোট্ট একটি অনুষ্ঠান হচ্ছে। কোনও বড় আয়োজন নেই। বাড়ির ছাদ পরিষ্কার করা হয়েছে। তুলসীমঞ্চের পাশে দুটো ছোট গাছ লাগানো হয়েছে—একটি শিউলি, অন্যটি জুঁই।

অনির্বাণ ও অয়ন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

অরুণাভ, সৌম্য আর মধুমিতা তাঁদের সামনে বসে আছেন।

মধুমিতার শরীর এখনও দুর্বল, কিন্তু মুখে আজ অন্য রকম শান্তি। তিনি দুটো ছোট খাম বের করলেন। একটি নীল, অন্যটি লাল।

নীল খামটা অনির্বাণের হাতে দিলেন। লাল খামটা অয়নের হাতে।

“এগুলো কী?” অয়ন জিজ্ঞেস করল।

“তোদের জন্য আমার শেষ দুটো চিঠি,” মধুমিতা বললেন।

অনির্বাণ চমকে উঠল।

“শেষ চিঠি মানে?”

মধুমিতা হেসে বললেন, “ভয় পাস না। আমি এখনও বেঁচে আছি। আর অনেক দিন বাঁচতে চাই। কিন্তু কিছু কথা আছে, যেগুলো মুখে বললে হয়তো তোরা ভুলে যাবি। তাই লিখে রেখেছি।”

দুজনেই খাম খুলল।

অনির্বাণের চিঠিতে লেখা—

“অনু,

একদিন তুই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলি, আমি কেন জানালাটা খোলা রাখতাম। উত্তরটা আজও একই—আমি চাইতাম, তোর জীবনে ফেরার পথটা কখনও পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যাক।

আমি জানি, আমার অনুপস্থিতির জন্য তোর মনে অনেক ক্ষত তৈরি হয়েছে। আমি চাই না, তুই সেই ক্ষতকে ভুলে যা। কারণ ভুলে গেলে হয়তো তুই বুঝতেই পারবি না, সত্যি লুকিয়ে রাখার মূল্য কত বড়।

তবে তুই যেন সারাজীবন শুধু অতীতের কাছে উত্তর খুঁজে না বেড়াস। কখনও কখনও সামনে তাকানোও জরুরি।

তোর জন্মের গল্পে অনেক ভুল ছিল। কিন্তু তোর জীবনের ভবিষ্যৎ যেন সেই ভুলগুলো লিখে না দেয়।

তুই ভালো থাকিস। ভালোবাসিস। আর যাদের ভালোবাসিস, তাদের কাছে সত্যিটা বলিস।

তোর মা।”

অয়নের চিঠিতে লেখা—

“অয়ন,

তোর জন্মের পর আমি তোকে কোলে নিয়ে খুব অল্প সময় কাটাতে পেরেছিলাম। সেই সময়টা কতটা ছোট ছিল, তা হয়তো তুই কোনও দিন বুঝবি না। কিন্তু মা হওয়ার অনুভূতিটা আমার কাছে কখনও ছোট হয়ে যায়নি।

আমি জানি, তোর আরেকটি পরিবার আছে। তারা তোকে বড় করেছে, তোর অসুখে রাত জেগেছে, তোর সাফল্যে আনন্দ পেয়েছে। তাদের ভালোবাসার সঙ্গে আমার ভালোবাসার কোনও প্রতিযোগিতা নেই।

তুই তাদের ভালোবাসিস। আমাকে চিনতে চাইলে চিনিস। না চাইলে সময় নিস।

রক্তের সম্পর্ক মানুষকে একসঙ্গে জন্ম দিতে পারে, কিন্তু সম্পর্ককে সত্যি করে তোলে যত্ন, সম্মান আর সময়।

তুই আমার ছেলে—এই সত্যিটা আমি কোনও দিন অস্বীকার করব না। কিন্তু তুই কাদের নিজের মানুষ বলবি, সেই সিদ্ধান্ত শুধু তোর।

তোর মা।”

অয়ন চিঠিটা ভাঁজ করে মায়ের পাশে এসে বসল।

“আমি আপনাকে মা বলব,” সে বলল। “আজই, এখনই। তবে কেয়ামাকেও মা বলব। কারণ তিনি আমাকে মানুষ করেছেন।”

মধুমিতার চোখে জল এসে গেল।

“আমি তো সেটাই চাই, বাবা।”

অনির্বাণও মায়ের হাত ধরল।

“আমার একটা প্রশ্ন এখনও আছে, মা।”

“কী প্রশ্ন?”

“আমাদের গল্পের নাম যদি দিতে হয়, তুমি কী নাম দেবে?”

মধুমিতা জানালার দিকে তাকালেন।

বাইরে সকালের আলো পড়েছে। জানালার পাল্লা খোলা। হাওয়ায় শিউলি গাছের ডাল দুলছে।

তিনি মৃদু হেসে বললেন, “নীল খামের শেষ চিঠি।”

অনির্বাণ মাথা নাড়ল।

“না, মা। নীল খামের শেষ চিঠি নয়। কারণ এই গল্পের শেষে তো আমরা একে অন্যকে ফিরে পেয়েছি। আমার মনে হয়, এর নাম হওয়া উচিত—‘যে জানালায় ভোরের আলো ফিরল।’”

মধুমিতা কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন, “তাহলে এই নামই থাক।”

ছাদের ওপরে তখন রোদ উঠেছে।

কুড়ি বছর ধরে যে বাড়ির একটি জানালা খোলা ছিল, সেই জানালা দিয়ে আজ সত্যিই ভোরের আলো ঢুকছিল।

অতীতের সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। সব অপরাধের বিচারও হয়নি। কিছু ক্ষত হয়তো কোনও দিন পুরোপুরি শুকোবে না। কিন্তু অনির্বাণ বুঝেছিল, সত্যি জানার অর্থ সব সময় সুখী সমাপ্তি নয়—কখনও কখনও সত্যি জানার অর্থ নতুন করে বাঁচার সাহস খুঁজে পাওয়া।

সে অয়নের দিকে তাকাল।

“চল, ভাই। আজ থেকে আমাদের গল্পটা নতুন করে শুরু হোক।”

অয়ন হাসল।

“চল।”

দুজন পাশাপাশি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। পিছনে রইল পুরোনো ছাদ, লাল বাক্স, নীল খাম আর বহু বছরের অন্ধকার।

সামনে অপেক্ষা করছিল নতুন দিন।

আর জানালাটা?

সেটা খোলা রইল।

যেন কেউ ফিরে আসতে চাইলে আর কখনও পথ ভুলে না যায়।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *