Categories
উপন্যাস বিবিধ

বৃষ্টিভেজা প্ল্যাটফর্মের মেয়েটি (প্রথম পর্ব: শেষ ট্রেনের অপেক্ষা)।

রাত তখন দশটা বেজে সাতচল্লিশ মিনিট।

শিয়ালদহ স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা শেষ লোকাল ট্রেনটির জানালায় বৃষ্টির জল জমে ছিল। দূরে ঘোষণার মাইকে ভেসে আসছিল অস্পষ্ট শব্দ। ক্লান্ত যাত্রীরা কেউ বেঞ্চে বসে, কেউ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে, কেউ আবার বাড়ি ফেরার তাড়ায় প্ল্যাটফর্মের এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছিল।

কিন্তু এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও একটি মেয়েকে আলাদা করে চোখে পড়ছিল।

মেয়েটির পরনে ছিল নীল সালোয়ার-কামিজ। কাঁধে ছোট একটি ব্যাগ। চুল ভিজে কপালের পাশে লেগে আছে। ডান হাতে শক্ত করে ধরা একটা পুরোনো বাদামি খাম। তার চোখ বারবার স্টেশনের বড় ঘড়িটার দিকে চলে যাচ্ছিল।

মনে হচ্ছিল, সে কারও জন্য অপেক্ষা করছে।

কিন্তু যার জন্য অপেক্ষা, সে কি সত্যিই আসবে?

প্ল্যাটফর্মের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা চব্বিশ বছরের যুবকটি মেয়েটিকে প্রথম দেখেছিল প্রায় কুড়ি মিনিট আগে। তার নাম ঋদ্ধি সেন। পেশায় সাংবাদিক। একটি ছোট সংবাদপত্রে কাজ করে। সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে বৃষ্টিতে আটকে পড়েছিল সে।

প্রথমে মেয়েটিকে দেখে বিশেষ কিছু মনে হয়নি। শহরের স্টেশনে কত মানুষই তো অপেক্ষা করে! কেউ বাড়ি ফেরার জন্য, কেউ প্রিয়জনের জন্য, কেউ আবার এমন কোনও খবরের আশায়, যা হয়তো তার পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।

কিন্তু মেয়েটির চোখে এমন একটা অস্থিরতা ছিল, যা ঋদ্ধিকে বারবার তার দিকে তাকাতে বাধ্য করছিল।

হঠাৎ একটি বৃদ্ধ লোক মেয়েটির কাছে এসে দাঁড়ালেন।

“তুমি কি নন্দিতা?”

মেয়েটি চমকে উঠল।

“আপনি কে?”

বৃদ্ধ লোকটি চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, “তোমার মা আমাকে পাঠিয়েছেন।”

মেয়েটির হাত থেকে খামটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

“আমার মা? কিন্তু মা তো—”

বৃদ্ধ তাকে থামিয়ে দিলেন।

“এখানে এসব কথা বলা যাবে না। ট্রেন আসার আগে তোমাকে একটা কথা জানতে হবে।”

“কী কথা?”

বৃদ্ধ লোকটি তার পকেট থেকে একটি ছোট্ট চাবি বের করলেন।

“তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগে যে ঘরটা বন্ধ করে রেখেছিলেন, সেই ঘরের চাবি এটা।”

নন্দিতার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তার বাবা মারা গেছেন আট বছর আগে। ছোটবেলা থেকে সে জানত, তার বাবা একজন সাধারণ স্কুলশিক্ষক ছিলেন। মৃত্যুর আগে দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। তাঁদের বাড়ির দোতলায় একটি ঘর ছিল, যেটি তিনি কাউকে খুলতে দিতেন না। বাবা মারা যাওয়ার পরও ঘরটি বন্ধই ছিল।

মা বলতেন, ঘরের ভিতরে বাবার পুরোনো কাগজপত্র রয়েছে। একদিন সব গুছিয়ে নেওয়া হবে।

কিন্তু সেই দিন আর আসেনি।

আর আজ, এত বছর পরে, একজন অচেনা বৃদ্ধ সেই ঘরের চাবি নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে।

“আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?” নন্দিতা ফিসফিস করে প্রশ্ন করল।

“চিনতাম।”

“তাহলে এত দিন কোথায় ছিলেন?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। শুধু খামটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই চিঠিটা তুমি বাড়ি গিয়ে পড়বে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—আজ রাত বারোটার আগে যদি তুমি সেই ঘর না খোলো, তাহলে তোমার বাবার মৃত্যুর আসল কারণ আর কোনও দিন জানতে পারবে না।”

কথাটা বলেই তিনি ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন।

নন্দিতা কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎ বৃদ্ধের পিছনে ছুটতে গেল।

কিন্তু লোকটিকে আর কোথাও দেখা গেল না।

সেই সময় প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকল।

হুইসেলের তীক্ষ্ণ শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। যাত্রীরা তাড়াহুড়ো করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। নন্দিতা নড়ল না। তার চোখ তখনও ভিড়ের মধ্যে বৃদ্ধকে খুঁজছিল।

“আপনি কি ঠিক আছেন?”

পাশ থেকে প্রশ্নটা শুনে সে ঘুরে তাকাল।

ঋদ্ধি তার সামনে দাঁড়িয়ে।

“আপনি এতক্ষণ ধরে ওই লোকটাকে খুঁজছেন। কোনও সমস্যা হয়েছে?”

নন্দিতা প্রথমে উত্তর দিতে চাইল না। অচেনা কাউকে নিজের জীবনের কথা বলার অভ্যাস তার ছিল না। কিন্তু লোকটির কথাগুলো তার মাথায় এমনভাবে ঘুরছিল যে, নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে উঠছিল।

“একজন লোক এসেছিলেন,” সে বলল। “বললেন, আমার মায়ের পাঠানো মানুষ। তারপর একটা চাবি দিয়ে চলে গেলেন।”

ঋদ্ধি অবাক হল।

“আপনার মা কোথায়?”

“বাড়িতে।”

“তাহলে উনি নিজে আসেননি কেন?”

নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“কারণ আমার মা গত তিন বছর ধরে নিখোঁজ।”

ঋদ্ধি আর কোনও প্রশ্ন করল না।

দূরে ট্রেনের দরজা বন্ধ হওয়ার ঘণ্টা বাজছিল। নন্দিতা হঠাৎ ট্রেনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই ট্রেনটাই আমার বাড়ির দিকে যায়। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, বাড়ি ফিরে আমি এমন কিছু দেখতে পাব, যার জন্য এত দিন প্রস্তুত ছিলাম না।”

ঋদ্ধি বলল, “আপনি চাইলে আমি আপনার সঙ্গে যেতে পারি।”

নন্দিতা সন্দেহের চোখে তাকাল।

“কেন যাবেন?”

“আমি সাংবাদিক। অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে কৌতূহল আমার পেশারই অংশ। তবে আপনি না চাইলে যাব না।”

নন্দিতা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটির চোখে কৌতূহল ছিল, কিন্তু সেই কৌতূহলের সঙ্গে কোনও অস্বস্তিকর আগ্রাসন ছিল না।

শেষ পর্যন্ত সে বলল, “ঠিক আছে। তবে একটা শর্ত আছে।”

“কী?”

“আমি যা দেখাব, তা নিয়ে কোনও খবর করবেন না। অন্তত আমার অনুমতি ছাড়া নয়।”

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

“কথা দিলাম।”

দুজনেই ট্রেনে উঠল।


রাত এগারোটা কুড়ি।

ট্রেন থেকে নেমে নন্দিতা ও ঋদ্ধি একটি সরু রাস্তা ধরে হাঁটছিল। শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে এলেই এই পাড়াটা অন্য রকম হয়ে যায়। পুরোনো বাড়ি, সরু গলি, রাস্তার ধারে বন্ধ দোকান, আর মাঝে মাঝে দূরের কোনও বাড়ি থেকে ভেসে আসা টেলিভিশনের শব্দ।

নন্দিতাদের বাড়িটা ছিল গলির একেবারে শেষ প্রান্তে।

দোতলা পুরোনো বাড়ি। দেয়ালের রং উঠে গেছে। বারান্দার রেলিংয়ে মরচে। সদর দরজার পাশে একটি নামফলক—‘অধ্যাপক অমিয়কুমার দত্ত’।

ঋদ্ধি নামটা পড়ে বলল, “আপনার বাবা শিক্ষক ছিলেন?”

“হ্যাঁ। স্থানীয় স্কুলে ইতিহাস পড়াতেন। খুব সাধারণ মানুষ ছিলেন।”

“তাহলে ঘরটা বন্ধ করে রাখতেন কেন?”

নন্দিতা উত্তর দিল না।

দরজা খুলে সে ভিতরে ঢুকল। বাড়ির ভিতরটা অন্ধকার। সে আলো জ্বালতেই পুরোনো আসবাবপত্র, দেওয়ালে টাঙানো ছবি আর ধুলোমাখা বইয়ের তাক চোখে পড়ল।

বসার ঘরের দেওয়ালে তার বাবার ছবি। সাদা পাঞ্জাবি, মোটা ফ্রেমের চশমা, শান্ত মুখ।

নন্দিতা ছবিটার দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াল।

“বাবা, তুমি কী লুকিয়ে রেখেছিলে?”

ঋদ্ধি কিছু বলল না।

নন্দিতা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে লাগল। ঋদ্ধি পিছনে পিছনে গেল। দোতলার করিডরের শেষ ঘরটির সামনে এসে সে থামল।

দরজায় বড় তালা ঝুলছে।

নন্দিতা ব্যাগ থেকে বৃদ্ধের দেওয়া চাবিটা বের করল।

চাবি ঢোকানোর আগে তার হাত কেঁপে উঠল।

“আপনি চাইলে নিচে অপেক্ষা করতে পারেন,” সে বলল।

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

“আপনি একা থাকতে না চাইলে আমি এখানেই আছি।”

নন্দিতা ধীরে ধীরে চাবি ঘোরাল।

খট করে শব্দ হল।

তালাটা খুলে গেল।

দরজা ঠেলতেই একটা ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে গন্ধ বাইরে বেরিয়ে এল। ঘরটা বহু বছর ধরে বন্ধ। জানালার পর্দা নামানো। একপাশে কাঠের আলমারি, মাঝখানে একটি টেবিল, আর দেওয়ালজুড়ে বই।

কিন্তু ঘরে ঢুকেই নন্দিতার চোখ আটকে গেল টেবিলের ওপর রাখা একটি জিনিসে।

একটি পুরোনো লাল রঙের ডায়েরি।

ডায়েরির ওপর সাদা কাগজে লেখা—

“নন্দিতার আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার দিন খোলা হবে।”

নন্দিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

তার আঠারো বছর পূর্ণ হয়েছে বহু আগেই। বাবার মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ষোলো। সেই হিসেবে ডায়েরিটা অন্তত আট বছর ধরে এখানে পড়ে আছে।

কিন্তু বাবা যদি তাকে আঠারো বছর বয়সে ডায়েরিটা পড়তে বলতেন, তাহলে তিনি নিজে কেন তা তাকে দেননি?

ঋদ্ধি টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “খুলবেন?”

নন্দিতা ডায়েরিটা হাতে নিল।

প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখা—

“নন্দিতা,

তুই যখন এই ডায়েরি পড়বি, তখন হয়তো আমি আর থাকব না। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, তোকে সত্যিটা সময়মতো না বলা। আমি ভেবেছিলাম, তোকে রক্ষা করছি। কিন্তু মানুষ যখন সত্যি লুকিয়ে রাখে, তখন সে অজান্তেই নিজের প্রিয়জনের জীবনকে মিথ্যার ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়।

তোর জন্মের দিন আমি শুধু একটি সন্তানকে বাড়ি নিয়ে আসিনি। আমি একটি অপরাধের সাক্ষী হয়েছিলাম।”

নন্দিতার হাত থেকে ডায়েরিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

ঋদ্ধি তাড়াতাড়ি ধরে ফেলল।

“কী হয়েছে?”

নন্দিতা কোনও উত্তর দিল না। সে পরের পাতাটা খুলল।

“তোর জন্মের দিন হাসপাতালের করিডরে আমি একটি শিশুর কান্না শুনেছিলাম। নার্স বলেছিল, শিশুটি মৃত। কিন্তু আমি নিজের চোখে তাকে নড়তে দেখেছিলাম। সেই শিশুটিকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কেউ জানত না। আমি প্রশ্ন করেছিলাম। আমাকে চুপ থাকতে বলা হয়েছিল।

কয়েক দিন পর আমি জানতে পারি, ওই হাসপাতাল থেকে একাধিক নবজাতক নিখোঁজ হয়েছে। কাগজে তাদের মৃত্যু লেখা হয়েছে, কিন্তু তাদের দেহ কখনও পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি।

আমি তদন্ত শুরু করেছিলাম। আর সেই তদন্ত করতে গিয়েই বুঝতে পারি, এই অপরাধের সঙ্গে এমন কিছু মানুষ জড়িত, যাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও নেই।”

নন্দিতা ডায়েরি বন্ধ করে ফেলল।

“না… এটা হতে পারে না।”

ঋদ্ধি শান্ত গলায় বলল, “আপনার বাবার কথা শুনে মনে হচ্ছে, তিনি কোনও বড় অপরাধের প্রমাণ পেয়েছিলেন।”

“কিন্তু আমার বাবা তো একজন স্কুলশিক্ষক ছিলেন! তিনি এসবের মধ্যে জড়ালেন কীভাবে?”

ঋদ্ধি ডায়েরিটা আবার খুলল।

শেষ পাতায় একটা ঠিকানা লেখা ছিল। তার নিচে একটি নাম—

ডা. সুশান্ত রায়।

আর তার পাশে লাল কালিতে লেখা—

“এই মানুষটিই জানে, নন্দিতার জন্মের রাতে দ্বিতীয় শিশুটিকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”

ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির নিচে সদর দরজায় জোরে ধাক্কা পড়ল।

ধাম! ধাম! ধাম!

নন্দিতা চমকে উঠল।

ঋদ্ধি দ্রুত দরজার কাছে গিয়ে করিডরের জানালা দিয়ে নিচে তাকাল। গলির অন্ধকারে কালো রঙের একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়ির ভিতরে কেউ বসে আছে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না।

আবার দরজায় ধাক্কা।

“নন্দিতা দত্ত! দরজা খুলুন!”

বাইরে থেকে একজন পুরুষের গলা ভেসে এল।

“আমরা জানি, আপনি ঘরটা খুলেছেন। আপনার বাবার ডায়েরি আমাদের হাতে তুলে দিন। তাহলে আপনার কোনও ক্ষতি হবে না।”

নন্দিতার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

“ওরা আমার নাম জানে কীভাবে?”

ঋদ্ধি নিচু গলায় বলল, “আপনার বাবার ডায়েরিতে এমন কিছু আছে, যা ওরা পেতে চায়।”

বাইরে থেকে আবার গলা এল।

“আমরা শেষবারের মতো বলছি। ডায়েরিটা দিয়ে দিন।”

নন্দিতা ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।

“এটা আমি কাউকে দেব না।”

ঋদ্ধি জানালার দিকে তাকিয়ে দ্রুত ঘরের আলো নিভিয়ে দিল।

“আমাদের পিছনের সিঁড়ি দিয়ে বেরোতে হবে।”

“কিন্তু ডায়েরি?”

“ডায়েরিটা সঙ্গে নিন।”

দুজনেই ঘরের পিছনের দরজা খুলে সরু সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। সেই সিঁড়ি বাড়ির পুরোনো রান্নাঘরের পাশে গিয়ে শেষ হয়েছে। সেখান থেকে একটি ছোট দরজা দিয়ে পিছনের গলিতে বেরোনো যায়।

দরজা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে লাগল।

তারা দ্রুত গলি ধরে এগিয়ে গেল।

কিন্তু মোড়ের কাছে পৌঁছতেই নন্দিতা থেমে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে সেই বৃদ্ধ লোকটি।

স্টেশনের সেই অচেনা মানুষ।

তাঁর হাতে একটি ছোট টর্চ। চোখে অদ্ভুত এক ক্লান্তি।

“আপনারা পালাচ্ছেন কেন?” তিনি বললেন।

ঋদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে নন্দিতার সামনে দাঁড়াল।

“আপনি কে? আপনি ওকে চাবি দিয়েছেন কেন? আর বাইরে যারা এসেছে, তারা কারা?”

বৃদ্ধ লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর নন্দিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি তোমার বাবার বন্ধু ছিলাম। তোমার জন্মের সময় যা ঘটেছিল, তার কিছুটা আমি জানি। কিন্তু তোমাকে একটা কথা আগে জানতে হবে।”

“কী কথা?”

বৃদ্ধ পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।

ছবিতে হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে তিনজন মানুষ। একজন নন্দিতার বাবা অমিয়কুমার। একজন তরুণ চিকিৎসক। আর তৃতীয়জন—একজন মহিলা, যার মুখ নন্দিতার মায়ের সঙ্গে অবিকল মিলে যায়।

নন্দিতা ছবিটা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।

“এটা আমার মা! কিন্তু ছবিটা কবে তোলা?”

বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “তোমার জন্মের তিন বছর পরে।”

নন্দিতার চোখে জল এসে গেল।

“কিন্তু মা তো বলতেন, তিনি আমাকে জন্ম দেওয়ার সময় মারা গিয়েছিলেন!”

বৃদ্ধ এবার এমন একটা কথা বললেন, যা শুনে ঋদ্ধিও নির্বাক হয়ে গেল।

“তোমার মা মারা যাননি, নন্দিতা। তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। আর সেই রাতেই তোমার বাবার বাড়ি থেকে একটি শিশু নিখোঁজ হয়েছিল।”

“কোন শিশু?”

বৃদ্ধ ছবিটার পিছনটা ঘুরিয়ে ধরলেন।

সেখানে কাঁপা হাতে লেখা—

“নন্দিতা, তুমি যাকে এত দিন নিজের অতীত ভেবেছ, সে তোমার জীবনের অর্ধেক মাত্র। তোমার আরেকটি পরিচয় এখনও অন্ধকারে অপেক্ষা করছে।”

নন্দিতা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।

তার মনে হল, এত দিন ধরে সে যে জীবনকে সত্যি বলে জেনে এসেছে, তার প্রতিটি দেওয়ালের পিছনে অন্য একটি গল্প লুকিয়ে রয়েছে।

আর সেই গল্পের দরজা মাত্র খুলতে শুরু করেছে।

ঠিক তখনই দূরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

বৃদ্ধ দ্রুত ছবিটা নন্দিতার হাতে দিয়ে বললেন, “এখন তোমাকে এখান থেকে যেতে হবে। কাল সকাল দশটায় পুরোনো মেডিক্যাল কলেজের পিছনের গেটে এসো। একা আসবে না। এই ছেলেটিকে সঙ্গে আনতে পারো। কিন্তু কাউকে আর বিশ্বাস করবে না।”

“আপনি কোথায় যাবেন?” নন্দিতা প্রশ্ন করল।

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

তিনি অন্ধকার গলির ভিতরে চলে গেলেন।

নন্দিতা আর ঋদ্ধি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ঋদ্ধি বলল, “আমাদের কাল সকালেই ওখানে যেতে হবে।”

নন্দিতা ছবিটা শক্ত করে ধরে মাথা নাড়ল।

তার চোখে তখন আর শুধু ভয় ছিল না।

ছিল উত্তর খুঁজে পাওয়ার জেদ।

কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, তার বাবার বন্ধ ঘরটি কেবল পুরোনো কাগজপত্রের ঘর ছিল না।

ওই ঘরের ভিতরে বন্দি ছিল একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া পরিচয়, একটি মায়ের অজানা জীবন এবং এমন এক অপরাধের ইতিহাস, যা বহু বছর ধরে শহরের বুকের মধ্যে নিঃশব্দে বেঁচে ছিল।

আর সেই ইতিহাসের প্রথম সাক্ষী—তার নিজের বাবা।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *