পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট্ট রেলস্টেশন—সুবর্ণপুর। প্রতিদিন মাত্র কয়েকটি লোকাল ট্রেন সেখানে থামত। স্টেশনটি বড় ছিল না, কিন্তু তার এক কোণে রাখা একটি পুরোনো কাঠের বেঞ্চ যেন বহু বছরের ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছিল।
বেঞ্চটির রং উঠে গেছে, কাঠে ফাটল ধরেছে, তবু প্রতিদিন ভোরে একজন বৃদ্ধ এসে ঠিক সেই বেঞ্চেই বসতেন।
তাঁর নাম শিবনাথ রায়।
বয়স পঁচাত্তর।
সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাতে একটি কাপড়ের ব্যাগ।
স্টেশনের সবাই তাঁকে চিনত।
চায়ের দোকানদার জিজ্ঞেস করতেন,
— “দাদু, আজও অপেক্ষা?”
শিবনাথবাবু শুধু হেসে বলতেন,
— “হ্যাঁ, আজও।”
কিন্তু কার জন্য এই অপেক্ষা—তা কেউ জানত না।
একদিন কলেজপড়ুয়া এক তরুণী, ঈশিতা, প্রতিদিনের মতো ট্রেনে কলেজে যাচ্ছিল।
সে লক্ষ্য করল, বৃদ্ধ মানুষটি প্রতিদিন একই সময়ে এসে একই বেঞ্চে বসেন, আবার বিকেলে ফিরে যান।
কৌতূহল সামলাতে না পেরে একদিন সে এগিয়ে গিয়ে বলল,
— “দাদু, কাউকে খুঁজছেন?”
শিবনাথবাবু মৃদু হেসে বললেন,
— “হ্যাঁ, একজনকে।”
— “তিনি কি আসবেন?”
— “জানি না। তবু অপেক্ষা করছি।”
ঈশিতা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
পরের দিন সে বৃদ্ধের জন্য এক কাপ চা নিয়ে এল।
শিবনাথবাবু বললেন,
— “ধন্যবাদ মা।”
ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে গল্প জমে উঠল।
একদিন ঈশিতা জানতে পারল—
পঞ্চাশ বছর আগে শিবনাথবাবুর স্ত্রী মাধবী এই স্টেশন থেকেই কলকাতায় চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন।
যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন,
— “আমি ফিরে এসে এই বেঞ্চেই তোমার সঙ্গে বসব।”
কিন্তু ফেরার পথেই ট্রেন দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।
খবরটি অনেক পরে পৌঁছায়।
সেই দিন থেকে শিবনাথবাবু প্রায় প্রতিদিন এই বেঞ্চে এসে বসেন।
তিনি বলেন,
— “প্রতিশ্রুতিরও তো একটা ঠিকানা থাকে।”
ঈশিতার চোখ ভিজে উঠল।
কিছুদিন পরে প্রবল ঝড়ে স্টেশনের অনেক কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হলো।
রেল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল—
পুরোনো বেঞ্চটি সরিয়ে নতুন স্টিলের বেঞ্চ বসানো হবে।
খবরটি শুনে শিবনাথবাবু চুপ করে গেলেন।
ঈশিতা স্টেশনমাস্টারের কাছে গিয়ে বলল,
— “এই বেঞ্চটা শুধু কাঠ নয়। এটা একজন মানুষের স্মৃতি।”
স্টেশনমাস্টার বিষয়টি গুরুত্ব দিলেন।
তিনি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বললেন।
অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো—
বেঞ্চটি ফেলে দেওয়া হবে না।
মেরামত করে সংরক্ষণ করা হবে।
কয়েক সপ্তাহ পরে বেঞ্চটি নতুন করে রং করা হলো।
তার পাশে একটি ছোট্ট ফলক লাগানো হলো।
তাতে লেখা—
“এই বেঞ্চ শুধু অপেক্ষার নয়, ভালোবাসারও সাক্ষী।”
উদ্বোধনের দিন শিবনাথবাবুকে সেখানে বসানো হলো।
তিনি বেঞ্চটিতে হাত বুলিয়ে ধীরে বললেন,
— “মাধবী, দেখো… আমাদের জায়গাটা এখনও আছে।”
স্টেশনে উপস্থিত অনেকের চোখে জল এসে গেল।
এরপর ঈশিতা শহরে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষক হলো।
তবু মাসে একদিন সে সেই স্টেশনে আসত।
শিবনাথবাবুর সঙ্গে বসে গল্প করত।
একদিন এসে দেখল—
বেঞ্চে শুধু একটি সাদা ফুল রাখা।
স্টেশনমাস্টার এগিয়ে এসে বললেন,
— “আজ ভোরে শিবনাথবাবু চলে গেছেন।”
ঈশিতা কিছু বলতে পারল না।
সে নীরবে ফুলটি হাতে তুলে বেঞ্চের ওপর রেখে দিল।
আজও সুবর্ণপুর স্টেশনে সেই বেঞ্চটি আছে।
অনেক পথিক সেখানে বসে বিশ্রাম নেয়।
কেউ জানে না তার ইতিহাস।
আবার কেউ কেউ ফলকটি পড়ে কয়েক মুহূর্ত নীরবে বসে থাকে।
কারণ তারা বুঝতে পারে—
অপেক্ষা সবসময় কাউকে ফিরে পাওয়ার জন্য হয় না।
কখনও কখনও অপেক্ষা হয়—
ভালোবাসাকে জীবিত রাখার জন্য।
সন্ধ্যায় ট্রেন ছেড়ে গেলে প্ল্যাটফর্ম আবার নির্জন হয়ে যায়।
হালকা বাতাসে বেঞ্চের পাশে রাখা সাদা ফুলটি দুলতে থাকে।
মনে হয়—
কোথাও যেন এখনও দুটি মানুষ পাশাপাশি বসে আছেন।
একজনের চোখে অপেক্ষা,
আরেকজনের চোখে শান্তির হাসি।
সমাপ্ত। 🚉🤍🌸
Categories
রেলস্টেশনের বেঞ্চ।