Categories
উপন্যাস

মৃত মানুষের সাক্ষ্য (দ্বিতীয় পর্ব: পরিচয়ের আড়ালে)।।

১. যে বাবাকে কখনও ভুলে যায়নি

অনিরুদ্ধ সেনের জীবনে সেদিন রাতের মতো অস্বাভাবিক রাত আর আসেনি।

একটি ঘরে বসে সে জানতে পেরেছে, তার মৃত বাবা হয়তো জীবিত। যে বিচারপতির হত্যাকাণ্ডে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, সেই বিচারপতিও নাকি বেঁচে আছেন। আর তিন বছর আগে যে মৃতদেহটিকে বিচারপতির বলে শনাক্ত করা হয়েছিল, সেটি অন্য কারও।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছিল একটি ছোট বাক্যে—‘তোমার বাবা মারা যাননি।’

অনিরুদ্ধের বাবা অমিতাভ সেন ছিলেন একটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক। অনিরুদ্ধের বয়স যখন সাত, তখন এক রাতে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছিল। পুলিশ জানিয়েছিল, গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি গাছে ধাক্কা মারে। গাড়ির সামনের অংশ সম্পূর্ণ দুমড়ে গিয়েছিল। চালকের আসনে বসা অমিতাভ সেনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছিল ঘটনাস্থল থেকে।

পরদিন তাঁর শেষকৃত্য হয়।

অনিরুদ্ধের মা বহু বছর সেই দুর্ঘটনার কথা বলতে চাইতেন না। বাবার ছবি ঘরে থাকলেও তাঁর মৃত্যুর দিনটি নিয়ে বাড়িতে কোনও আলোচনা হত না।

ছোটবেলায় অনিরুদ্ধ ভেবেছিল, শোক মানুষকে নীরব করে দেয়।

বড় হয়ে সে বুঝেছিল, নীরবতা কখনও কখনও শোকের চেয়েও গভীর কোনও কারণ লুকিয়ে রাখে।

কিন্তু তার বাবা যদি বেঁচে থাকেন, তাহলে এত বছর কোথায় ছিলেন তিনি? কেন ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি? আর কেন তাঁর মৃত্যুর শংসাপত্র প্রত্যাহার করার মতো নথি বিচারপতি অরুণাভ মজুমদারের কাছে ছিল?

অনিরুদ্ধ বৃদ্ধটির দিকে তাকাল।

“আপনার নাম এখনও বলেননি।”

বৃদ্ধ বললেন, “দেবাশিস রায়।”

“আপনি কি সেই পুলিশকর্তা, যিনি তিন বছর আগে বিচারপতির মৃত্যুর তদন্ত করেছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আপনি জানতেন যে বিচারপতি বেঁচে আছেন?”

দেবাশিস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমি জানতাম, তাঁর মৃত্যু নিয়ে যে সরকারি বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ সত্য নয়।”

“এটা তো একই কথা নয়।”

“ঠিক। তাই তোমাকে আজ সব বলতে পারছি না।”

অনিরুদ্ধ বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।

“আমাকে এত দিন অন্ধকারে রাখা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে খুনের মামলা হয়েছে। আমার পেশাগত জীবন ধ্বংস হয়েছে। এখন আবার বলা হচ্ছে, আমার বাবা জীবিত। আপনি যদি সত্যিই কিছু জানেন, তাহলে সব বলুন।”

দেবাশিস দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোমার বাবার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ২০০৯ সালে। তখন আমি একটি বিশেষ তদন্তের দায়িত্বে ছিলাম। সরকারি নথিতে পরিচয় পরিবর্তন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের অন্য নামে স্থানান্তর এবং হাসপাতালের রেকর্ডে অসংগতি—এই তিনটি বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছিল।”

“আমার বাবা কীভাবে এর সঙ্গে যুক্ত হলেন?”

“তিনি চিকিৎসক ছিলেন। তাঁর হাতে এমন কিছু নথি এসেছিল, যা প্রমাণ করত, কয়েকজন মৃত বলে ঘোষিত মানুষ আসলে অন্য পরিচয়ে বেঁচে ছিলেন। কিন্তু বিষয়টি শুধু নথি জালিয়াতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।”

“তাহলে?”

“কিছু মানুষকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার নামে তাদের পুরোনো পরিচয় মুছে ফেলা হয়েছিল। তাদের নতুন পরিচয় তৈরি করা হয়। কেউ কেউ স্বেচ্ছায় এই ব্যবস্থায় গিয়েছিলেন, কেউ গিয়েছিলেন বিপদের কারণে। কিন্তু একসময় এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে নিরপরাধ মানুষকেও নিখোঁজ করে দেওয়া হচ্ছিল।”

অনিরুদ্ধ চুপ করে শুনছিল।

দেবাশিস বললেন, “তোমার বাবা এই অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বিষয়টি আদালতে পেশ করতে। বিচারপতি অরুণাভ মজুমদারও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।”

“তাহলে বাবার দুর্ঘটনা?”

“আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না, সেটি দুর্ঘটনা ছিল কি না। তদন্তের নথিতে দুর্ঘটনা বলা হয়েছিল। কিন্তু কয়েকটি তথ্য পরে আর মেলেনি।”

“আপনি আমাকে আগে বলেননি কেন?”

দেবাশিসের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

“কারণ তখন তোমার বয়স কম ছিল। আর পরে তোমার মাকে একটি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল—এই ঘটনা নিয়ে কেউ কথা বললে তোমাদের দুজনের জীবন বিপন্ন হতে পারে।”

“তাহলে আমার মাকে সব জানতে দেওয়া হয়েছিল?”

“না। তিনিও সব জানতেন না।”

অনিরুদ্ধ চেয়ারে বসে পড়ল। মাথার মধ্যে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমে উঠছে।

“আমার বাবা কোথায়?”

দেবাশিস জানালার দিকে তাকালেন।

“এই মুহূর্তে আমি জানি না।”

“আপনি জানেন না, নাকি বলতে চাইছেন না?”

“আমি জানতাম, তিনি কোথাও নিরাপদে আছেন। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে তাঁর কোনও খবর পাইনি। বিচারপতির মৃত্যুর পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের শেষ সূত্রটিও হারিয়ে যায়।”

“তাহলে আপনি নিশ্চিত নন যে আমার বাবা জীবিত?”

দেবাশিস এবার সরাসরি তার দিকে তাকালেন।

“না। আমি নিশ্চিত নই। তবে তোমার হাতে যে নথিটি এসেছে, সেটি প্রমাণ করে যে তাঁর মৃত্যুর সরকারি নথি নিয়ে গুরুতর অসংগতি ছিল। সত্যিটা খুঁজে বের করতে হলে আমাদের অনুমানের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।”

অনিরুদ্ধ বুঝতে পারল, দেবাশিস যতটা জানেন, তার চেয়েও বেশি কিছু গোপন করছেন। কিন্তু তিনি যে প্রতিটি কথাই মিথ্যা বলছেন, তেমন প্রমাণও নেই।

ঠিক তখনই মৈত্রী বসু ঘরে ঢুকলেন।

তাঁর হাতে একটি ছোট ট্যাবলেট।

“একটা খবর এসেছে,” তিনি বললেন। “সকাল ছ’টার সময় শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে একজন অজ্ঞাতপরিচয় বৃদ্ধকে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর কাছে কোনও পরিচয়পত্র ছিল না। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি করার সময় তিনি নিজের নাম বলেছেন—অমিতাভ সেন।”

অনিরুদ্ধের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে জমে গেল।

“কোন হাসপাতাল?”

মৈত্রী হাসপাতালের নাম বললেন।

অনিরুদ্ধ আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না।

“আমাকে এখনই সেখানে যেতে হবে।”

দেবাশিস তার হাত ধরে থামালেন।

“একটু দাঁড়াও। হাসপাতালের খবর বাইরে চলে গেলে বিপদ হতে পারে।”

“আমার বাবা সেখানে আছেন কি না, সেটা জানার অধিকার আমার আছে।”

“অধিকার আছে। কিন্তু তোমাকে বুঝতে হবে, তুমি শুধু নিজের বাবাকে খুঁজছ না। এমন কিছু মানুষের খোঁজ করছ, যারা বহু বছর ধরে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছে। তোমার যাওয়ার খবর যদি তাদের কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে তারা ওই বৃদ্ধকে সরিয়ে দিতে পারে।”

অনিরুদ্ধ হাত ছাড়িয়ে নিল।

“তাহলে আমি একাই যাব।”

মৈত্রী বললেন, “আপনি একা যাবেন না। আমি আপনার সঙ্গে যাচ্ছি।”

দেবাশিস কিছুক্ষণ ভেবে সম্মতি দিলেন।

“ঠিক আছে। তবে হাসপাতালে ঢোকার আগে খবর নিয়ে নিও। কোনও অচেনা ব্যক্তিকে বিশ্বাস করবে না।”

অনিরুদ্ধ দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

দেবাশিস পিছন থেকে ডাকলেন, “অনিরুদ্ধ!”

সে ফিরে তাকাল।

“যদি সত্যিই তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হয়, তাহলে প্রথমেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করবে—২০০৯ সালের ১৭ নভেম্বর কী ঘটেছিল।”

অনিরুদ্ধ থমকে গেল।

“ওই তারিখের গুরুত্ব কী?”

দেবাশিস বললেন, “সেই দিনই প্রথমবার সরকারি নথিতে এমন একজন মানুষের মৃত্যুর খবর নথিভুক্ত হয়েছিল, যিনি পরে অন্য নামে জীবিত অবস্থায় সরকারি একটি দপ্তরে উপস্থিত হয়েছিলেন।”

“কে ছিলেন সেই মানুষ?”

দেবাশিস উত্তর দিলেন না।

“এই প্রশ্নের উত্তরই পুরো মামলাকে বদলে দিতে পারে,” তিনি শুধু বললেন।

২. হাসপাতালের শয্যায় অচেনা মানুষ

সকাল আটটা পঁয়ত্রিশ।

হাসপাতালের সামনে পৌঁছে অনিরুদ্ধ বুঝল, বিষয়টি সাধারণ নয়। প্রধান প্রবেশপথের পাশে দুটি সংবাদমাধ্যমের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন সাংবাদিক হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন।

মৈত্রী গাড়ি ঘুরিয়ে হাসপাতালের পিছনের প্রবেশপথে নিয়ে গেলেন।

“আপনি এখানে অপেক্ষা করুন,” তিনি বললেন। “আমি আগে ভেতরে গিয়ে খোঁজ নিই।”

অনিরুদ্ধ আপত্তি করতে যাচ্ছিল, কিন্তু মৈত্রী ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছেন।

প্রায় দশ মিনিট পরে তিনি ফিরে এলেন।

“বৃদ্ধটি তৃতীয় তলায়। তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের নথিতে নাম অমিতাভ সেন লেখা আছে, কিন্তু তাঁর কাছে কোনও পরিচয়পত্র নেই।”

“ডাক্তার কী বলেছেন?”

“এখনও কিছু বলেননি। তবে একজন নার্স জানিয়েছেন, জ্ঞান ফেরার পর বৃদ্ধ বারবার একটি নাম বলছেন।”

“কার নাম?”

মৈত্রী কিছুক্ষণ ইতস্তত করলেন।

“অনিরুদ্ধ।”

অনিরুদ্ধ আর কোনও কথা বলল না।

দুজনেই সিঁড়ি দিয়ে তৃতীয় তলায় উঠে গেল। করিডরের শেষ প্রান্তে একটি ছোট কক্ষ। দরজার বাইরে একজন নিরাপত্তারক্ষী দাঁড়িয়ে।

মৈত্রী হাসপাতালের পরিচিত এক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে প্রবেশের অনুমতি জোগাড় করলেন।

ঘরের মধ্যে ঢুকতেই অনিরুদ্ধের চোখ বিছানার দিকে চলে গেল।

একজন বৃদ্ধ শুয়ে আছেন। মুখ শুকনো, গালে গভীর ভাঁজ। চুল প্রায় সাদা। ডান হাতে স্যালাইনের নল। চোখ বন্ধ।

অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে বিছানার কাছে এগিয়ে গেল।

শৈশবের স্মৃতি সব সময় স্পষ্ট থাকে না। অনেক মুখ সময়ের সঙ্গে ঝাপসা হয়ে যায়। কিন্তু কিছু মুখের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গন্ধ, স্পর্শ, কণ্ঠস্বর—যা বহু বছর পরেও অদ্ভুতভাবে মনে থেকে যায়।

এই বৃদ্ধের মুখের সঙ্গে অনিরুদ্ধের শৈশবের ছবির মিল ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন এতটাই গভীর যে শুধু মুখ দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

সে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ডাকল, “বাবা?”

বৃদ্ধের চোখের পাতা কেঁপে উঠল।

তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুললেন তিনি।

কয়েক সেকেন্ড অনিরুদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন চিনতে চেষ্টা করছেন।

তারপর ঠোঁট নড়ল।

“তুই… এখানে কেন এসেছিস?”

অনিরুদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।

“তুমি কোথায় ছিলে এত দিন?”

বৃদ্ধ মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

“আমাকে খুঁজতে আসিসনি।”

“আমি তো জানতাম তুমি মারা গেছ!”

“তাহলে সেই বিশ্বাসটাই ধরে রাখ।”

অনিরুদ্ধ স্তব্ধ হয়ে গেল।

“কী বলছ তুমি? আমি তোমাকে এত বছর মৃত ভেবে বড় হয়েছি। তোমার জন্য মা একা সংসার সামলেছেন। তুমি কোথায় ছিলে, কেন যোগাযোগ করোনি—আমি কিছুই জানি না। আর আজ তোমাকে সামনে পেয়ে তুমি বলছ, আমি যেন ফিরে যাই?”

বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন।

“তোর মা কোথায়?”

“মা আর বেঁচে নেই।”

কথাটা শুনে বৃদ্ধের মুখের সমস্ত অভিব্যক্তি বদলে গেল।

তিনি উঠে বসার চেষ্টা করলেন। অনিরুদ্ধ তাড়াতাড়ি তাঁকে ধরে ফেলল।

“কবে?” বৃদ্ধের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

“দুই বছর আগে।”

“কী হয়েছিল?”

“হৃদ্‌রোগ। শেষ সময়ে তুমি কোথায় ছিলে, সেটা জানতে চেয়েছিলেন মা।”

বৃদ্ধ মুখে হাত চাপা দিলেন।

দীর্ঘক্ষণ কোনও কথা হল না।

তারপর তিনি ফিসফিস করে বললেন, “আমি জানতাম না।”

অনিরুদ্ধ বলল, “তুমি কোথায় ছিলে, বাবা?”

বৃদ্ধ চোখ মুছে বললেন, “আমি সব বলতে পারব না।”

“কেন?”

“কারণ তুই এখনও বিপদের মধ্যে আছিস।”

“তাহলে সত্যিটা বলো। বিচারপতি অরুণাভ মজুমদার কি বেঁচে আছেন?”

বৃদ্ধের চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

“তুই তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিস?”

“ভিডিওতে দেখেছি। আর দেবাশিস রায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে।”

বৃদ্ধের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“দেবাশিস তোকে সব বলেনি।”

“কী বলেনি?”

“তোর বাবার মৃত্যুর কাহিনি মিথ্যা হতে পারে। কিন্তু বিচারপতির মৃত্যুর ঘটনায় তোর নিজেরও একটা ভূমিকা আছে।”

অনিরুদ্ধ পিছিয়ে গেল।

“আমার ভূমিকা? আমি তো তখন মামলাটির সঙ্গে যুক্তই ছিলাম না!”

বৃদ্ধ বললেন, “তুই তখন ছোট ছিলি। কিন্তু ২০০৯ সালের ১৭ নভেম্বরের ঘটনাটা তোর মনে থাকার কথা।”

অনিরুদ্ধ মাথা নাড়ল।

“আমার কিছুই মনে নেই।”

“সেদিন তুই আমার সঙ্গে হাসপাতালে গিয়েছিলি। সেখানে একজন লোককে দেখেছিলি। সেই লোকটি পরে সরকারি নথিতে মৃত বলে চিহ্নিত হয়।”

“আমি তখন সাত বছরের শিশু!”

“আমি জানি। কিন্তু ওই লোকটির সঙ্গে তোর দেখা হওয়াটা কাকতালীয় ছিল না।”

অনিরুদ্ধ আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

“আমার জীবনের সবকিছু কি তাহলে সাজানো ছিল? আমার বাবার মৃত্যু, আমার শৈশবের স্মৃতি, বিচারপতির হত্যাকাণ্ড—সব?”

বৃদ্ধ বললেন, “না। কিন্তু কিছু মানুষ তোর মনে থাকা স্মৃতিগুলোর অর্থ বদলে দিতে চেয়েছিল।”

“কেন?”

বৃদ্ধ বিছানার পাশের টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করলেন।

সেখানে একটি ছোট বাদামি খাম রাখা ছিল।

“ওটা খুলে দেখ।”

অনিরুদ্ধ খামটি খুলল।

ভেতরে একটি পুরোনো হাসপাতালের পরিচয়পত্র, একটি সাদা-কালো ছবি এবং একটি ছোট কাগজ।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে আছেন অমিতাভ সেন। তাঁর পাশে একজন তরুণ। তরুণটির মুখে হালকা দাড়ি, চোখে চশমা।

অনিরুদ্ধ ছবিটি উল্টে দেখল।

পিছনে লেখা—

অরুণাভ মজুমদার। ১৭ নভেম্বর, ২০০৯।

অনিরুদ্ধ অবিশ্বাসের চোখে বাবার দিকে তাকাল।

“বিচারপতি তখন হাসপাতালে ছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু তিনি তো তখনও বিচারপতি হিসেবে কাজ করছিলেন!”

“সেই কারণেই ঘটনাটা গোপন রাখা হয়েছিল।”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন, “সেদিন বিচারপতি একটি গোপন সাক্ষ্যের ব্যবস্থা করতে এসেছিলেন। সেই সাক্ষী এমন কিছু জানতেন, যা আদালতের একটি পুরোনো রায়কে অবৈধ প্রমাণ করতে পারত।”

“সেই সাক্ষী কে ছিলেন?”

অমিতাভ সেন উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

তারপর দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।

একজন নার্স ভেতরে ঢুকে বললেন, “রোগীর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করতে হবে। ওঁকে বিশ্রাম নিতে হবে।”

অনিরুদ্ধ বিরক্ত হয়ে বলল, “আর পাঁচ মিনিট।”

নার্স মাথা নাড়লেন।

“দুঃখিত। আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, রোগীর কাছে আর কাউকে থাকতে দেওয়া যাবে না।”

“কার নির্দেশ?”

“হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।”

মৈত্রী দরজার কাছে গিয়ে বাইরে তাকালেন। করিডরের অন্য প্রান্তে দুজন অপরিচিত লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের একজন ফোনে কথা বলছে।

মৈত্রী দ্রুত ফিরে এলেন।

“অনিরুদ্ধ, আমাদের এখনই বেরোতে হবে।”

“কেন?”

“ওরা আপনার বাবার খোঁজে এসেছে।”

অমিতাভ সেন হঠাৎ অনিরুদ্ধের হাত শক্ত করে ধরলেন।

“শোন, তুই এখনই এখান থেকে চলে যা। ওই খামের মধ্যে যে পরিচয়পত্র আছে, সেটাকে নিরাপদে রাখিস। আর কারও হাতে দিবি না।”

“কিন্তু তোমাকে ছেড়ে যাব কী করে?”

“তুই থাকলে ওরা তোকে ব্যবহার করবে।”

“কিসের জন্য?”

বৃদ্ধের চোখে জল এসে গেল।

“আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য।”

অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

তার বাবা ফিসফিস করে বললেন, “এই মামলায় শুধু মৃত মানুষের পরিচয় বদলানো হয়নি। একজন জীবিত মানুষকে এমন অপরাধের সাক্ষী বানানো হয়েছিল, যা সে কখনও দেখেনি। আর সেই সাক্ষীর নাম—অমিতাভ সেন।”

৩. যে নথি কখনও তৈরি হয়নি

মৈত্রী অনিরুদ্ধকে নিয়ে হাসপাতালের পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নামলেন।

বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার আগে তিনি একবার পিছনে তাকালেন। তৃতীয় তলার জানালার পাশে একজন দাঁড়িয়ে আছে। দূরত্বের কারণে মুখ বোঝা যাচ্ছে না।

কিন্তু লোকটি তাঁদের দিকেই তাকিয়ে ছিল।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

অনিরুদ্ধ খামটি খুলে পরিচয়পত্রটি আবার দেখল। কার্ডটি পুরোনো হলেও তাতে হাসপাতালের সিল স্পষ্ট। নামের জায়গায় লেখা—ডক্টর অমিতাভ সেন। বিভাগ—ফরেনসিক মেডিসিন।

কিন্তু তার বাবা তো সাধারণ চিকিৎসক ছিলেন বলে সে জানত। পরিবারের পুরোনো কাগজপত্রে তাঁকে কখনও ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

সে মৈত্রীকে জিজ্ঞাসা করল, “আমার বাবার পরিচয়পত্রে এই বিভাগ লেখা কেন?”

মৈত্রী বললেন, “আপনার বাবার সম্পর্কে যা জানেন, তার অনেকটাই অসম্পূর্ণ।”

“আপনিও কি জানতেন?”

“আমি শুধু কিছু নথি দেখেছি। পুরো সত্য জানি না।”

“আপনি বিচারপতির ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। এত কিছু ঘটল, অথচ আপনি কিছুই জানেন না?”

মৈত্রী গাড়ির গতি কমালেন।

“জানা আর প্রমাণ করতে পারা এক নয়। বিচারপতির মৃত্যুর পর আমি এমন কিছু নথি দেখেছিলাম, যেগুলো পরের সপ্তাহে আর খুঁজে পাইনি। সরকারি সার্ভারে সেই ফাইলগুলোর কোনও রেকর্ড ছিল না। কিন্তু আমি জানতাম, সেগুলো ছিল।”

“কী ধরনের নথি?”

“একটি পুরোনো মামলার সাক্ষীদের তালিকা। সেখানে তিনজনের নাম ছিল। প্রথমজনের নামের পাশে লেখা ছিল—মৃত। দ্বিতীয়জনের পাশে—নিখোঁজ। আর তৃতীয়জনের নামের জায়গায় লেখা ছিল—পরিচয় অস্বীকৃত।”

“নামগুলো কী ছিল?”

“প্রথমজন অমিতাভ সেন।”

অনিরুদ্ধের বুকের মধ্যে ধাক্কা লাগল।

“আমার বাবা?”

“হ্যাঁ।”

“দ্বিতীয়জন?”

মৈত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“বিচারপতি অরুণাভ মজুমদার।”

অনিরুদ্ধ এবার আর কিছু বলতে পারল না।

“আর তৃতীয়জন?” সে কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞাসা করল।

মৈত্রী উত্তর দিলেন, “সেই নামটি কখনও নথিতে লেখা হয়নি।”

“এটা কীভাবে সম্ভব?”

“নথির একটি অংশে নামটি ছিল। কিন্তু যে কপিটি আমি দেখেছিলাম, সেটি হাতে লেখা ছিল। পরে যখন একই নথি কম্পিউটার থেকে বের করা হয়, নামের জায়গাটি ফাঁকা ছিল। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো মুদ্রণের ভুল। কিন্তু এরপর আরও কয়েকটি কাগজে একই ঘটনা ঘটতে থাকে।”

“অর্থাৎ কেউ ইচ্ছা করে নাম মুছে দিয়েছে।”

“সম্ভবত।”

অনিরুদ্ধ জানালার বাইরে তাকাল। শহর তখন সকালবেলার ব্যস্ততায় ভরে উঠেছে। মানুষ কাজে যাচ্ছে, দোকান খুলছে, বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। অথচ তার নিজের জীবনের ভিত যেন একের পর এক খুলে যাচ্ছে।

সে বলল, “আমাকে সেই পুরোনো মামলার নথি দেখতে হবে।”

মৈত্রী মাথা নাড়লেন।

“সেটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ। মূল নথি আদালতের রেকর্ডরুমে থাকার কথা। কিন্তু বিচারপতির মৃত্যুর পর সেই ফাইলটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।”

“তাহলে অন্য কপি?”

“একটি কপি থাকার কথা কলকাতার পুরোনো রেকর্ড সংরক্ষণাগারে।”

“সেখানে যেতে হবে।”

“আজই?”

“যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।”

মৈত্রী গাড়ি ঘুরিয়ে দিলেন।

“তাহলে আমাদের আগে একটি কাজ করতে হবে।”

“কী কাজ?”

“আপনার বাবার পরিচয়পত্রটি যাচাই করা।”

“কোথায়?”

“যে হাসপাতালে তিনি কাজ করতেন বলে নথিতে উল্লেখ আছে, সেখানে নয়। বরং যে দপ্তর তাঁর পরিচয়পত্র তৈরি করেছিল, সেখানে।”

“সেই দপ্তর কোথায়?”

মৈত্রী একটি নাম বললেন।

অনিরুদ্ধ নামটি শুনে চমকে উঠল।

সেটি ছিল একটি সরকারি ফরেনসিক গবেষণাগারের নাম—যেটি তিন বছর আগে বিচারপতি অরুণাভ মজুমদারের মৃত্যুর তদন্তে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছিল।

অর্থাৎ, তার বাবার পুরোনো পরিচয়পত্র এবং বিচারপতির মৃত্যুর তদন্ত—দুটিরই যোগসূত্র একই প্রতিষ্ঠানে।

৪. বন্ধ দরজার ওপারে

দুপুর বারোটা কুড়ি মিনিট।

গবেষণাগারটি শহরের প্রান্তে, একটি সরকারি হাসপাতাল চত্বরে অবস্থিত। প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তারক্ষী। দর্শনার্থীদের জন্য আলাদা রেজিস্টার। মৈত্রী নিজের পরিচয় দিয়ে ভিতরে ঢোকার অনুমতি চাইলেন।

কর্তব্যরত কর্মকর্তা তাঁদের একটি অপেক্ষাকক্ষে বসতে বললেন।

প্রায় পনেরো মিনিট পর একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি এলেন। পরিচয় দিলেন—ডক্টর সৌম্যদীপ বসু, প্রশাসনিক আধিকারিক।

তিনি অনিরুদ্ধের হাতে থাকা পরিচয়পত্রটি দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন।

“এটা আপনি কোথায় পেলেন?”

“আমার বাবার কাছে।”

“আপনার বাবার নাম কী?”

“ডক্টর অমিতাভ সেন।”

সৌম্যদীপ কিছুক্ষণ কার্ডটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“এই কার্ডের নকশা আমাদের পুরোনো ব্যবস্থার মতো। কিন্তু নম্বরটি অস্বাভাবিক।”

“কেন?”

“কারণ এই নম্বরটি একসময় অন্য একজন কর্মীর নামে বরাদ্দ ছিল।”

অনিরুদ্ধ সোজা হয়ে বসল।

“কার নামে?”

সৌম্যদীপ কম্পিউটারে কিছু খুঁজলেন। তারপর স্ক্রিনটি ঘুরিয়ে দিলেন।

সেখানে একজনের নাম দেখা গেল—

ডক্টর অনির্বাণ দত্ত।

অনিরুদ্ধ নামটি আগে কখনও শোনেনি।

“এই ব্যক্তি কে?”

“তিনি ২০০৯ সালে আমাদের গবেষণাগারে কর্মরত ছিলেন। ফরেনসিক পরিচয় শনাক্তকরণ বিভাগে কাজ করতেন। একদিন হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেন। পরে তাঁর সম্পর্কে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।”

“তিনি কি মারা গিয়েছিলেন?”

“না। অন্তত আমাদের রেকর্ডে তাঁর মৃত্যুর কোনও তথ্য নেই।”

“তাহলে আমার বাবার নামে তাঁর পরিচয়পত্র কীভাবে তৈরি হল?”

সৌম্যদীপ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে একটি বিষয় জানাতে পারি। ২০০৯ সালের শেষ দিকে আমাদের গবেষণাগারের কিছু কর্মীর পরিচয়পত্র বাতিল করা হয়েছিল। তার মধ্যে ডক্টর অনির্বাণ দত্তের কার্ডও ছিল।”

“কেন?”

“প্রশাসনিক কারণ দেখানো হয়েছিল।”

“কোন প্রশাসনিক কারণ?”

“সেটা পুরোনো ফাইলে থাকতে পারে।”

তিনি কম্পিউটারে আরেকটি অনুসন্ধান করলেন। কিছুক্ষণ পর একটি নথি খুলে গেল।

সেখানে লেখা ছিল—

‘কর্মী পরিচয় যাচাই সংক্রান্ত বিশেষ নির্দেশ। পূর্ববর্তী পরিচয় বাতিল করে নতুন পরিচয়পত্র ইস্যু করা হবে। পুরোনো নথি সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।’

নিচে অনুমোদনকারীর স্বাক্ষর।

অনিরুদ্ধ স্বাক্ষরটির দিকে তাকিয়ে রইল।

নামটি পড়তে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।

বিচারপতি অরুণাভ মজুমদার।

“একজন বিচারপতি কীভাবে একটি গবেষণাগারের কর্মীর পরিচয়পত্র বাতিল করার নির্দেশ দিতে পারেন?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞাসা করল।

সৌম্যদীপ বললেন, “এটি সাধারণ প্রশাসনিক নির্দেশ ছিল না। নথিতে বিশেষ আদালতের একটি আদেশের উল্লেখ রয়েছে।”

“কোন আদালত?”

“আদেশের কপি এখানে নেই।”

অনিরুদ্ধ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

“এই নথির একটি অনুলিপি চাই।”

সৌম্যদীপ মাথা নাড়লেন।

“দুঃখিত। অনুমতি ছাড়া এই নথি দেওয়া যাবে না।”

“তাহলে অনুমতির জন্য আবেদন করছি।”

“আপনাকে লিখিত আবেদন করতে হবে।”

অনিরুদ্ধ আবেদনপত্র চাইল। সৌম্যদীপ কাগজ এগিয়ে দিলেন।

অনিরুদ্ধ নাম ও ঠিকানা লিখতে শুরু করেছিল, এমন সময় আধিকারিকের ফোন বেজে উঠল।

তিনি ফোন ধরলেন।

“জি, স্যার।”

ওপাশের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল।

“কিন্তু স্যার, ওঁরা শুধু পুরোনো নথি সম্পর্কে জানতে চাইছেন… জি, বুঝেছি।”

ফোন রেখে তিনি অনিরুদ্ধের দিকে তাকালেন।

“দুঃখিত। আপনাদের এই মুহূর্তে চলে যেতে হবে।”

“কেন?”

“উপর থেকে নির্দেশ এসেছে।”

“কার নির্দেশ?”

সৌম্যদীপ উত্তর দিলেন না।

অনিরুদ্ধ বুঝতে পারল, তারা এখানে আসার খবর কারও কাছে পৌঁছে গেছে।

দুজনেই বাইরে বেরিয়ে এল।

প্রবেশদ্বারের কাছে এসে মৈত্রী থামলেন।

“একটা কথা লক্ষ করেছেন?”

“কী?”

“ওই আধিকারিক আমাদের নাম জিজ্ঞাসা করেননি। অথচ ফোনে তাঁকে আমাদের সম্পর্কে জানানো হয়েছে।”

অনিরুদ্ধ বলল, “তার মানে কেউ আমাদের অনুসরণ করছে।”

“শুধু অনুসরণ নয়। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে আগে থেকেই খবর পাচ্ছে।”

ঠিক তখনই অনিরুদ্ধের ফোনে একটি বার্তা এল।

অচেনা নম্বর।

বার্তায় লেখা—

আপনার বাবার পরিচয়পত্রটি নকল নয়। কিন্তু সেটি আপনার বাবারও নয়।

তার নিচে একটি ছবি।

ছবিতে একটি হাসপাতালের ঘর। বিছানায় শুয়ে আছেন অমিতাভ সেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে একজন চিকিৎসক। চিকিৎসকের মুখ অস্পষ্ট, কিন্তু তাঁর হাতে একটি নথি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

নথির শিরোনাম—

পরিচয় স্থানান্তর সংক্রান্ত সম্মতিপত্র।

অনিরুদ্ধ ছবিটি বড় করে দেখল।

নিচে স্বাক্ষরের জায়গায় দুটি নাম।

প্রথমটি—অমিতাভ সেন।

দ্বিতীয়টি—অনিরুদ্ধ সেন।

তারিখ—১৭ নভেম্বর, ২০০৯।

অনিরুদ্ধের বুকের মধ্যে কেমন একটা শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।

সেদিন তার বয়স ছিল সাত বছর।

সে কীভাবে কোনও সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে পারে?

আর যদি স্বাক্ষরটি তার না হয়, তাহলে কেউ তার নাম ব্যবহার করল কেন?

মৈত্রী ছবিটি দেখে ফিসফিস করে বললেন, “এটা অসম্ভব।”

অনিরুদ্ধ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর আরও একটি বার্তা এল।

আজ রাত দশটার মধ্যে পুরোনো রেকর্ডরুমে পৌঁছান। নইলে আপনার বাবার দ্বিতীয় মৃত্যু সংবাদ প্রকাশিত হবে।

অনিরুদ্ধ ফোনটি শক্ত করে ধরল।

এবার বিষয়টি শুধু অতীতের রহস্য নয়। কেউ তার বাবাকে আবার মৃত ঘোষণা করার হুমকি দিচ্ছে।

আর সেই ঘোষণার আগে তাদের হাতে সময় মাত্র কয়েক ঘণ্টা।

৫. মৃতের নামে শেষ স্বাক্ষর

সন্ধ্যা সাতটা।

অনিরুদ্ধ ও মৈত্রী একটি ছোট ক্যাফেতে বসে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

অনিরুদ্ধ বলল, “আমাদের প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে, হাসপাতালের বৃদ্ধ সত্যিই আমার বাবা কি না।”

মৈত্রী বললেন, “আপনি তো তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন।”

“হ্যাঁ। কিন্তু আমি তাঁর মুখ দেখে চিনেছি বলেই সব প্রমাণিত হয় না। আমাদের ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে।”

“সেটা করা যেতে পারে। তবে ফল পেতে সময় লাগবে।”

“আমাদের হাতে সময় নেই।”

মৈত্রী ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো নোটবুক বের করলেন।

“বিচারপতির ব্যক্তিগত নোটবুকের একটি কপি আমার কাছে আছে। আমি এত দিন কাউকে দেখাইনি।”

অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে তাকাল।

“আপনার কাছে ছিল?”

“এটা বিচারপতির মৃত্যুর কয়েক দিন আগে আমাকে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজন না হলে যেন না খুলি।”

মৈত্রী নোটবুকের মাঝের পাতা খুললেন।

একটি পাতায় তিনটি নাম লেখা—

অমিতাভ সেন।

অনির্বাণ দত্ত।

অনিরুদ্ধ সেন।

প্রতিটি নামের পাশে একটি করে তারিখ।

অমিতাভ সেন—১৭ নভেম্বর, ২০০৯।

অনির্বাণ দত্ত—১৮ নভেম্বর, ২০০৯।

অনিরুদ্ধ সেন—১৯ নভেম্বর, ২০০৯।

নিচে একটি বাক্য—

‘পরিচয় বদলানো যায়। কিন্তু পরিচয়ের সাক্ষীকে বদলানো যায় না।’

অনিরুদ্ধ বলল, “এই তিনটি তারিখের মধ্যে কী সম্পর্ক?”

মৈত্রী উত্তর দিলেন, “সম্ভবত তিন দিন ধরে তিনটি পৃথক ঘটনা ঘটেছিল। প্রথম দিন আপনার বাবার পরিচয় বদলানো হয়েছিল। দ্বিতীয় দিন ডক্টর অনির্বাণ দত্ত নিখোঁজ হন। তৃতীয় দিন আপনার নামে একটি নথি তৈরি করা হয়।”

“কিন্তু আমি তখন শিশু ছিলাম। আমার নামে কী নথি তৈরি হতে পারে?”

“সেটাই আমাদের জানতে হবে।”

অনিরুদ্ধ নোটবুকের পরের পাতা উল্টে দিল।

সেখানে একটি আদালতের সিলের ছাপ। নীচে মামলা নম্বর—৪৭/২০০৯।

এই নম্বরটি দেখে অনিরুদ্ধের মনে পড়ল, বিচারপতির হত্যাকাণ্ডের মামলার নম্বর ছিল ৪৭/২০২৩।

একই সংখ্যা।

সে নিজের অজান্তেই বলল, “এটা কি কাকতালীয়?”

মৈত্রী মাথা নাড়লেন।

“আমি কাকতালীয় বলে বিশ্বাস করি না।”

নোটবুকের শেষ পাতায় একটি ঠিকানা লেখা ছিল। কলকাতার পুরোনো আদালতপাড়ার একটি রেকর্ড সংরক্ষণাগার।

তার পাশে লেখা—

মূল নথি—সাক্ষী তালিকা।
ফাইল ৪৭/২০০৯।
রাত দশটার আগে উদ্ধার করতে হবে।

অনিরুদ্ধ ঘড়ির দিকে তাকাল।

সাড়ে সাতটা।

তাদের হাতে আড়াই ঘণ্টা।

সে উঠে দাঁড়াল।

“চলুন।”

মৈত্রী নোটবুকটি ব্যাগে রেখে বললেন, “একটা কথা। সেখানে পৌঁছে যদি দেখি ফাইলটি নেই?”

অনিরুদ্ধ দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল, “তাহলে বুঝব, কেউ আমাদের আগেই সত্যিটা মুছে ফেলতে শুরু করেছে।”

ক্যাফে থেকে বেরিয়ে তারা গাড়িতে উঠল।

শহরের সন্ধ্যার যানজট ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠছে। রাস্তার আলো জ্বলেছে। মানুষের ভিড়ে কলকাতা তার প্রতিদিনের ছন্দে চলেছে।

কিন্তু অনিরুদ্ধ জানত, তার নিজের জীবন আর আগের মতো থাকবে না।

কারণ সে এখন এমন একটি মামলার পেছনে ছুটছে, যেখানে মৃত মানুষ জীবিত হতে পারে, জীবিত মানুষ সরকারি নথিতে মৃত হয়ে যেতে পারে, আর একটি শিশুর নাম ব্যবহার করে তৈরি হতে পারে এমন এক পরিচয়, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে সেই শিশুটিও কিছু জানে না।

রাত নটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিটে তারা রেকর্ড সংরক্ষণাগারের সামনে পৌঁছল।

পুরোনো ভবনটির গেটে তালা ঝুলছে।

কিন্তু ভেতরের একটি জানালায় আলো জ্বলছে।

অনিরুদ্ধ গেটের কাছে গিয়ে দেখল, তালার পাশে একটি ছোট কাগজ আটকে আছে।

তাতে লেখা—

মামলা ৪৭/২০০৯-এর মূল ফাইলটি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।

নিচে একটি স্বাক্ষর।

অনিরুদ্ধ সেই স্বাক্ষর চিনতে পারল।

এটি তার নিজের স্বাক্ষর।

কিন্তু সে এই কাগজে কখনও সই করেনি।

আর কাগজের নিচে লেখা তারিখটি আরও ভয়ংকর—

১৯ নভেম্বর, ২০০৯।

সেদিনই তার নামে তৈরি হয়েছিল সেই অজানা নথি।

অনিরুদ্ধ দরজার দিকে তাকাল।

ভেতর থেকে কেউ যেন খুব ধীরে তালা খুলছে।

দরজাটি সামান্য ফাঁক হতেই অন্ধকারের মধ্যে একটি কণ্ঠ শোনা গেল—

“এত দেরি করলে কেন, অনিরুদ্ধ? তোমার বাবাকে তো তুমি ইতিমধ্যেই একবার মেরে ফেলেছ।”

অনিরুদ্ধ জমে গেল।

দরজার ওপারে কে দাঁড়িয়ে আছে, তা সে দেখতে পেল না।

কিন্তু কণ্ঠটি তার অচেনা নয়।

এটি সেই মানুষটির কণ্ঠ, যাঁকে সে তিন বছর আগে নিজের চোখে মৃত অবস্থায় দেখেছিল বলে বিশ্বাস করত।

বিচারপতি অরুণাভ মজুমদার।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *