রাত তখন ২টা ১৭ মিনিট।
কলকাতা হাইকোর্টের পুরোনো নথিঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশকর্মীটি প্রথমে ভেবেছিল, ক্লান্তির কারণে সে ভুল দেখছে। টানা বারো ঘণ্টা ডিউটি করার পর চোখের সামনে অনেক সময় অদ্ভুত ছায়া ভেসে ওঠে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর যখন ছায়াটি নড়ে উঠল, তখন তার হাত থেকে টর্চ পড়ে গেল।
নথিঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন বৃদ্ধ।
পরনে সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর পাজামা। বাঁ হাতে একটি কালো ফাইল। মুখে অস্বাভাবিক শান্ত ভাব।
পুলিশকর্মীটি কাঁপা গলায় বলল, “কে আপনি? এখানে কীভাবে ঢুকলেন?”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু পকেট থেকে একটি পরিচয়পত্র বের করে পুলিশকর্মীর দিকে এগিয়ে দিলেন।
টর্চের আলোয় পরিচয়পত্রের ছবিটি স্পষ্ট হয়ে উঠতেই পুলিশকর্মীটি পিছিয়ে গেল।
ছবির মানুষটি তার পরিচিত। শুধু পরিচিত নয়—এই মানুষটির মৃত্যুর খবর সে নিজে সংবাদপত্রে পড়েছে।
তিন বছর আগে একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডে আদালতের রায় ঘোষণার আগের রাতে নিজের বাড়িতে খুন হয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অরুণাভ মজুমদার।
আর আজ সেই মৃত বিচারপতি দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে।
পুলিশকর্মীটি চিৎকার করতে গিয়েও পারল না। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন, “ভয় পেয়ো না। আমি তোমাকে কিছু করতে আসিনি।”
“কিন্তু… আপনি তো মারা গেছেন!”
বৃদ্ধের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
“সেটাই তো সবাই বিশ্বাস করে।”
তারপর তিনি কালো ফাইলটি দরজার সামনে রেখে বললেন, “সকালে এই ফাইলটা আইনজীবী অনিরুদ্ধ সেনের হাতে পৌঁছে দেবে। আর তাকে বলবে, মৃত মানুষের সাক্ষ্য দেওয়ার সময় হয়ে এসেছে।”
কথাটা শেষ হতেই করিডরের আলো নিভে গেল।
আলো ফিরে এলে সেখানে আর কেউ ছিল না।
শুধু মেঝেতে পড়ে ছিল কালো ফাইলটি।
আর তার প্রথম পাতায় লাল কালিতে লেখা—
মামলা নম্বর ৪৭/২০২৩।
অভিযুক্ত: অনিরুদ্ধ সেন।
অভিযোগ: এমন একজন মানুষকে খুন করা, যিনি কখনও মারা যাননি।
১. অচেনা খাম
সকাল আটটা বেজে দশ মিনিট।
দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়াহাটের কাছে নিজের ফ্ল্যাটে বসে কফি খাচ্ছিলেন আইনজীবী অনিরুদ্ধ সেন। বয়স ছত্রিশ। পেশায় ক্রিমিনাল লয়ার। গত দশ বছরে বহু জটিল মামলায় লড়েছেন, কয়েকজন কুখ্যাত অপরাধীর সাজাও নিশ্চিত করেছেন। তবু নিজের জীবনের একটি মামলার কথা তিনি কাউকে বলতে পারেন না।
তিন বছর আগে তাঁর বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ উঠেছিল।
অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অরুণাভ মজুমদার।
পুলিশের দাবি ছিল, বিচারপতির মৃত্যুর আগের রাতে অনিরুদ্ধ তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন। বাড়ির সিসিটিভিতে তাঁর গাড়ির উপস্থিতিও ধরা পড়েছিল। বিচারপতির ব্যক্তিগত ডায়েরিতে অনিরুদ্ধের নাম পাওয়া গিয়েছিল। এমনকি ঘটনার পর তাঁর আঙুলের ছাপও নাকি উদ্ধার হয়েছিল বাড়ির একটি কাচের গ্লাস থেকে।
কিন্তু আদালতে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে তিনি খালাস পেয়েছিলেন।
সেই মামলা তাঁর পেশাগত জীবনকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল। অনেক ক্লায়েন্ট সরে গিয়েছিলেন। সহকর্মীদের একাংশ তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। সংবাদমাধ্যম তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে ‘বিচারপতি হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্ত আইনজীবী’ বলে পরিচয় করিয়েছিল।
অনিরুদ্ধ নিজেকে নির্দোষ বলে জানতেন।
কিন্তু তিনি জানতেন না, সেদিন রাতে বিচারপতির বাড়িতে আসলে কী ঘটেছিল।
এই প্রশ্নের উত্তর তিনি তিন বছর ধরে খুঁজে চলেছেন।
ঠিক তখনই দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
দরজা খুলতেই দেখা গেল, একজন অচেনা কুরিয়ারকর্মী দাঁড়িয়ে আছে।
“অনিরুদ্ধ সেন?”
“হ্যাঁ।”
“আপনার নামে একটা পার্সেল।”
অনিরুদ্ধ সই করে পার্সেলটি নিলেন। বাদামি রঙের খাম। প্রেরকের নাম নেই। ভেতরে একটি ছোট মেমোরি কার্ড এবং হাতে লেখা একটি কাগজ।
কাগজে মাত্র দুটি বাক্য—
‘বিচারপতি অরুণাভ মজুমদার খুন হননি।
আপনি যদি সত্য জানতে চান, আজ রাত বারোটায় পুরোনো আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের পরিত্যক্ত প্রশাসনিক ভবনে আসুন।’
অনিরুদ্ধ প্রথমে ভেবেছিলেন, কেউ তাঁর সঙ্গে নিষ্ঠুর রসিকতা করছে।
কিন্তু খামের ভেতরের মেমোরি কার্ডটি কম্পিউটারে চালাতেই তাঁর সমস্ত ধারণা বদলে গেল।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটি অন্ধকার ঘর। ঘরের মাঝখানে একটি চেয়ার। চেয়ারে বসে আছেন একজন বৃদ্ধ।
মুখে দাড়ি বেড়েছে। চুল এলোমেলো। চোখের নীচে গভীর কালি। তবু মুখটি চিনতে ভুল হল না।
অরুণাভ মজুমদার।
বৃদ্ধ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন, “অনিরুদ্ধ, তুমি যদি এই ভিডিও দেখো, তার মানে আমি এখনও বেঁচে আছি। কিন্তু তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এত দিন আমাকে মৃত হয়ে থাকতে হয়েছে।”
অনিরুদ্ধের হাত থেকে কফির কাপটি টেবিলে পড়ে গেল।
ভিডিওতে বিচারপতি বলতে লাগলেন, “আমার মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তুমি নিশ্চয়ই অনেক প্রশ্ন করেছ। কিন্তু একটা প্রশ্নও করোনি—যে মৃতদেহটি উদ্ধার হয়েছিল, সেটি কার ছিল?”
অনিরুদ্ধ পর্দার কাছে এগিয়ে গেলেন।
বিচারপতি বললেন, “কারণ তোমাকে এমনভাবে প্রমাণ দেখানো হয়েছিল, যাতে এই প্রশ্ন তোমার মাথায় আসারই কথা নয়। আমার মৃত্যুর কাহিনি তৈরি করা হয়েছিল। আর সেই কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলে তুমি।”
ভিডিওটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
পর্দায় একটি নতুন বার্তা ফুটে উঠল—
ফাইলের বাকি অংশ দেখতে হলে মূল রেকর্ড উদ্ধার করুন।
অনিরুদ্ধ আবার ভিডিওটি চালানোর চেষ্টা করলেন। কোনও লাভ হল না।
সেদিনই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়ে গেল।
রাত বারোটায় তিনি পুরোনো জেলে যাবেন।
২. পরিত্যক্ত ভবনের ভিতরে
রাত এগারোটা পঞ্চান্ন।
আলিপুরের পুরোনো প্রশাসনিক ভবনটি বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত। চারদিকে উঁচু পাঁচিল, আগাছায় ঢাকা পথ, ভাঙা জানালা। শহরের নতুন বহুতলগুলির আলো দূরে ঝলমল করছে, অথচ এই ভবনের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় এখানে থমকে আছে।
অনিরুদ্ধ নিজের গাড়ি রাস্তার ধারে রেখে হেঁটে ভেতরে ঢুকলেন।
খামের সঙ্গে পাওয়া নির্দেশ অনুযায়ী উত্তর দিকের ভাঙা প্রবেশপথ দিয়ে তিনি ভবনে প্রবেশ করলেন। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে করিডর ধরে এগিয়ে গেলেন।
দেওয়ালে পুরোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তির ছেঁড়া কাগজ। মেঝেতে ধুলো, ভাঙা কাচ, শুকনো পাতার স্তূপ।
দ্বিতীয় ঘরের দরজায় একটি কাগজ সাঁটা ছিল।
লেখা—‘রেকর্ড বিভাগ’।
ঘরের ভিতরে ঢুকেই অনিরুদ্ধ দেখতে পেলেন, একটি টেবিলের ওপর ছোট টেপ রেকর্ডার রাখা। তার পাশে একটি খাম।
তিনি খাম খুললেন।
ভেতরে একটি পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং।
শিরোনাম—
‘বিচারপতি অরুণাভ মজুমদারের রহস্যমৃত্যু: বাড়ি থেকে উদ্ধার দেহ, তদন্তে নতুন মোড়।’
খবরটির তারিখ তিন বছর আগের। কিন্তু কাটিংয়ের পিছনে হাতে লেখা একটি মন্তব্য অনিরুদ্ধকে থমকে দিল।
‘দেহটির পরিচয় শনাক্ত করেছিলেন যে ব্যক্তি, তিনি পরে নিজের বক্তব্য বদলে ফেলেন।’
নিচে একটি নাম লেখা—
ডক্টর রণজিৎ পাল।
এই নাম অনিরুদ্ধের অপরিচিত নয়। বিচারপতির মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ডক্টর পালই ফরেনসিক বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তাঁকে অন্য জেলায় বদলি করা হয়েছিল।
কিন্তু তিনি নিজের বক্তব্য বদলে ফেলেছিলেন কেন?
অনিরুদ্ধ টেপ রেকর্ডারের বোতাম টিপলেন।
প্রথমে শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর একজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।
“আমি ডক্টর রণজিৎ পাল। এই রেকর্ডিং আমি করছি নিজের নিরাপত্তার জন্য। যদি কোনও দিন আমার কিছু হয়, তাহলে বুঝতে হবে, আমি যা জানি তা কাউকে জানাতে চেয়েছিলাম।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর কণ্ঠটি আবার শুরু হল।
“ময়নাতদন্তের সময় মৃতদেহের পরিচয় নিয়ে আমার সন্দেহ হয়েছিল। মুখমণ্ডল ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, কিন্তু দাঁতের গঠন এবং পুরোনো অস্ত্রোপচারের দাগের সঙ্গে বিচারপতি মজুমদারের চিকিৎসা-নথির মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। আমি লিখিতভাবে বিষয়টি উল্লেখ করেছিলাম।”
অনিরুদ্ধের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“কিন্তু পরদিন আমাকে জানানো হয়, পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য নতুন নথি এসেছে। সেই নথিতে স্বাক্ষর ছিল একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। আমাকে রিপোর্ট সংশোধন করতে বলা হয়। আমি আপত্তি করেছিলাম। তারপর আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে হুমকি দেওয়া হয়।”
রেকর্ডিংয়ে দীর্ঘ বিরতি।
“আমি ভয় পেয়েছিলাম। রিপোর্ট বদলে দিয়েছিলাম। আজও সেই অপরাধবোধ নিয়ে বেঁচে আছি।”
অনিরুদ্ধ টেবিলের কিনারা আঁকড়ে ধরলেন।
রেকর্ডিং শেষ হওয়ার আগে ডক্টর পালের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।
“তবে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় অন্য কিছু। মৃতদেহটি বিচারপতির ছিল না—এ কথা প্রমাণ করার জন্য শুধু পরিচয়ের অসংগতি যথেষ্ট নয়। কারণ যে নথির ভিত্তিতে বিচারপতিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, সেই নথিতে এমন একজন চিকিৎসকের স্বাক্ষর রয়েছে, যিনি ওই সময় শহরেই ছিলেন না।”
টেপ বন্ধ হয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
অনিরুদ্ধ টর্চ নিভিয়ে দিলেন।
দুজন মানুষের কথাবার্তা ভেসে এল।
“ও কি এসে গেছে?”
“হ্যাঁ। রেকর্ডিং চালিয়েছে।”
“তাহলে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোও।”
অনিরুদ্ধ দরজার পাশে সরে দাঁড়ালেন।
একজন লোক ঘরে ঢুকল। কালো পোশাক, মুখে মাস্ক। হাতে ছোট একটি যন্ত্র। সে টেবিলের ওপর থাকা টেপ রেকর্ডারটি তুলে নিয়ে বলল, “মূল প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।”
দ্বিতীয় লোকটি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।
“কিন্তু অনিরুদ্ধ সব জেনে গেছে।”
“সব নয়। ওর হাতে শুধু অর্ধেক সত্য আছে।”
প্রথম লোকটি টেবিলের নীচে হাত ঢুকিয়ে একটি ছোট যন্ত্র বের করল। তারপর দুজনেই বেরিয়ে গেল।
অনিরুদ্ধ কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে ঘর থেকে বেরোলেন। করিডরের শেষ প্রান্তে একটি দরজা আধখোলা। সেদিক থেকে আলো আসছে।
তিনি দরজার কাছে যেতেই একজন লোক পিছন থেকে তাঁর মুখ চেপে ধরল।
অনিরুদ্ধ ধস্তাধস্তি শুরু করলেন। লোকটি তাঁকে দেওয়ালে ঠেলে দিল। দুজনের লড়াইয়ে টর্চটি পড়ে ভেঙে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে অনিরুদ্ধ শুধু একটি বাক্য শুনতে পেলেন—
“তোমাকে আগেও সতর্ক করা হয়েছিল, সেন। মৃত মানুষের পেছনে ছুটলে শেষ পর্যন্ত নিজের মৃত্যুই খুঁজে পাবে।”
পরের মুহূর্তে তাঁর মাথায় ভারী কিছু আঘাত করল।
সব অন্ধকার।
৩. যে সাক্ষী নিজের নাম ভুলে গিয়েছিল
অনিরুদ্ধের জ্ঞান ফিরল একটি ছোট ঘরে।
জানালা নেই। দেওয়ালে সাদা রং। মাথার পিছনে তীব্র ব্যথা। তাঁর হাত-পা বাঁধা নয়, কিন্তু দরজাটি বাইরে থেকে বন্ধ।
টেবিলের ওপর জলভরা বোতল এবং একটি পরিষ্কার কাপড় রাখা।
তিনি উঠে বসতেই পাশের ঘর থেকে কাশির শব্দ এল।
“কে?” অনিরুদ্ধ ডাকলেন।
কোনও উত্তর নেই।
তিনি দরজায় ধাক্কা দিলেন। দরজা খুলল না।
কিছুক্ষণ পরে দেওয়ালের এক কোণে ছোট একটি স্পিকার থেকে কণ্ঠ ভেসে এল।
“আপনি নিরাপদে আছেন।”
“কোথায় আমি?”
“এখন সেটা জানা আপনার জন্য জরুরি নয়।”
“যে আমাকে এখানে এনেছে, তার সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
“আপনি ডক্টর পালের রেকর্ডিং শুনেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে নিশ্চয়ই বুঝেছেন, বিচারপতির মৃত্যুর ঘটনায় শুধু একটি মিথ্যা রিপোর্ট ছিল না। একটি সম্পূর্ণ পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল।”
অনিরুদ্ধ বললেন, “কার পরিচয়?”
“একজন এমন মানুষের, যাঁর অস্তিত্ব সরকারি নথিতে ছিল না।”
“এটা অসম্ভব।”
“আইনজীবী হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই জানেন, সরকারি নথিতে কোনও নাম না থাকলেই সেই মানুষটির অস্তিত্ব ছিল না—এ কথা বলা যায় না।”
অনিরুদ্ধ চুপ করে গেলেন।
স্পিকারের কণ্ঠ বলল, “আপনাকে একটি ছবি দেখানো হবে। মন দিয়ে দেখবেন।”
দেওয়ালের একটি অংশ সরে গিয়ে পর্দা বেরিয়ে এল।
ছবিতে একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ। সাধারণ চেহারা, পাতলা গোঁফ, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। পেছনে একটি হাসপাতালের দেওয়াল।
ছবির নিচে লেখা—
পরিচয় অজানা। সম্ভাব্য বয়স: ৪৫–৫০ বছর।
“এই মানুষটিকে আপনি চেনেন?” প্রশ্ন এল।
অনিরুদ্ধ ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কেন যেন মুখটি তাঁর পরিচিত মনে হচ্ছিল। কোথায় দেখেছেন মনে করতে পারছেন না।
“সম্ভবত দেখেছি,” তিনি বললেন।
“কোথায়?”
“মনে পড়ছে না।”
“ভালো করে ভাবুন।”
অনিরুদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন। মনে পড়ল, তিন বছর আগে বিচারপতির বাড়িতে যাওয়ার আগের দিন তিনি একটি হাসপাতালের করিডরে ছিলেন। সেখানে একজন মানুষ তাঁর কাছে এসে কিছু বলতে চেয়েছিলেন।
সেই মানুষটির চোখে ভয় ছিল।
লোকটি বলেছিল, “আপনি যদি অরুণাভ মজুমদারের সঙ্গে দেখা করেন, তাঁকে বলবেন—পুরোনো মামলাটা আবার খুলতে হবে।”
অনিরুদ্ধ তখন ব্যস্ত ছিলেন। লোকটিকে এড়িয়ে চলে গিয়েছিলেন।
এখন ছবির মানুষটির মুখের সঙ্গে সেই স্মৃতি মিলে যেতে শুরু করল।
“আমি ওকে দেখেছি,” অনিরুদ্ধ ফিসফিস করে বললেন।
“কোথায়?”
“হাসপাতালে। কিন্তু নাম জানি না।”
“তাহলে আপনার স্মৃতি এখনও সম্পূর্ণ মুছে যায়নি।”
“আপনারা কারা? আমাকে এখানে আটকে রেখেছেন কেন?”
স্পিকারের কণ্ঠ এবার একটু নরম হল।
“আমরা আপনাকে আটকাইনি। আপনাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে, যেখানে আপনি কিছুক্ষণ নিরাপদে থাকতে পারবেন।”
“যারা আমাকে আক্রমণ করল, তারাও কি আপনাদের লোক?”
“না।”
“তাহলে তাদের আটকাননি কেন?”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর উত্তর এল, “কারণ আমরা নিজেরাও জানি না, এই ঘটনায় কার ওপর ভরসা করা যায়।”
অনিরুদ্ধের মনে হল, তিনি আরও বড় কোনও জালে আটকে পড়েছেন।
পর্দায় এবার একটি নথি ভেসে উঠল। পুরোনো একটি ফৌজদারি মামলার কপি। মামলার বছর ২০০৯।
অভিযোগ ছিল, একটি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিচয় বদলে রোগীদের স্থানান্তর করা হয়েছে। কয়েকজন নিখোঁজ মানুষের সরকারি রেকর্ড পরে সংশোধন করা হয়েছিল। মামলাটি প্রমাণের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন পুলিশ সুপার দেবাশিস রায়।
আর মামলার বিচার করেছিলেন অরুণাভ মজুমদার।
অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন, বিচারপতির মৃত্যুর রহস্য হয়তো সেই পুরোনো মামলার সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু এখনও একটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
মৃতদেহটি কার ছিল?
আর যদি বিচারপতি বেঁচে থাকেন, তাহলে তিন বছর ধরে তিনি কোথায় ছিলেন?
স্পিকারের কণ্ঠ আবার শোনা গেল।
“আপনাকে এখন এখান থেকে বেরিয়ে যেতে দেওয়া হবে। তবে যাওয়ার আগে একটি কথা মনে রাখবেন—যে মানুষটিকে সবাই মৃত বলে জানে, তিনি শুধু নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য লুকিয়ে নেই। তিনি কাউকে রক্ষা করছেন।”
“কাকে?”
“সেই মানুষটিকে, যার পরিচয় আপনি ছবিতে দেখেছেন।”
অনিরুদ্ধ দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন।
“লোকটি কে?”
কিন্তু কোনও উত্তর এল না।
দরজার তালা খুলে গেল।
ঘরের বাইরে একটি ফাঁকা করিডর। করিডরের শেষে সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে নেমে তিনি দেখলেন, একটি ছোট গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
গাড়ির জানালা নামল।
ভেতরে বসে থাকা মহিলা বললেন, “উঠুন।”
অনিরুদ্ধ সতর্কভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কে?”
মহিলা বললেন, “আমার নাম মৈত্রী বসু। আমি তিন বছর আগে বিচারপতি মজুমদারের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলাম।”
অনিরুদ্ধের মনে পড়ল নামটি। বিচারপতির মৃত্যুর পরে মৈত্রী বসু হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমে তাঁর কোনও বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি।
“আপনি এত দিন কোথায় ছিলেন?”
মৈত্রী গাড়ির দরজা খুলে বললেন, “যেখানে থাকতে হলে নিজের নামটাও ভুলে যেতে হয়।”
অনিরুদ্ধ গাড়িতে উঠলেন।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
কয়েক মিনিট পরে মৈত্রী বললেন, “আপনি কি জানেন, বিচারপতি মজুমদার মারা যাওয়ার তিন দিন আগে নিজের উইল পরিবর্তন করেছিলেন?”
“না।”
“তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি একটি অচেনা ব্যক্তির নামে লিখে দিয়েছিলেন। সেই ব্যক্তির নাম সরকারি নথিতে নেই। কিন্তু উইলে তাঁর স্বাক্ষর, আঙুলের ছাপ এবং সাক্ষীদের বিবৃতি রয়েছে।”
“কে সেই ব্যক্তি?”
মৈত্রী তাঁর দিকে তাকালেন।
“আপনি যার ছবি দেখেছেন।”
অনিরুদ্ধের বুকের মধ্যে চাপা উত্তেজনা জমতে লাগল।
“তাহলে বিচারপতি তাঁকে রক্ষা করছেন কেন?”
মৈত্রী উত্তর দিলেন না।
কিছুক্ষণ পরে গাড়ি একটি নির্জন বাড়ির সামনে থামল।
বাড়িটি বাইরে থেকে সাধারণ। কোনও নামফলক নেই। জানালায় মোটা পর্দা। চারপাশে উঁচু পাঁচিল।
মৈত্রী বললেন, “আপনাকে একজনের সঙ্গে দেখা করাতে হবে।”
“কার সঙ্গে?”
“যিনি তিন বছর আগে বিচারপতির মৃত্যুর খবর নিজে হাতে সংবাদমাধ্যমকে দিয়েছিলেন।”
অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে তাকালেন।
“পুলিশ কমিশনার দেবাশিস রায়?”
মৈত্রী মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। কিন্তু আপনি যে দেবাশিস রায়কে চেনেন, তিনি নন।”
বাড়ির দরজা খুলে গেল।
ভেতরে প্রবেশ করতেই অনিরুদ্ধ দেখলেন, একটি টেবিলের সামনে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। তাঁর ডান হাতে পুরোনো পোড়া দাগ। মুখে ক্লান্তি, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
“অনিরুদ্ধ সেন,” তিনি বললেন, “অবশেষে তোমার সঙ্গে দেখা হল।”
অনিরুদ্ধ তাঁকে চিনতে পারলেন না।
বৃদ্ধ টেবিলের ওপর রাখা একটি ছবি তুলে তাঁর হাতে দিলেন।
ছবিতে তিনজন মানুষ। একজন তরুণ অনিরুদ্ধ। একজন অরুণাভ মজুমদার। আর তৃতীয়জন সেই অচেনা ব্যক্তি, যাঁর ছবি তিনি কিছুক্ষণ আগে দেখেছেন।
ছবির পিছনে তারিখ লেখা—২০০৯ সালের ১৭ নভেম্বর।
বৃদ্ধ বললেন, “তুমি যাকে আজ অচেনা বলছ, সে একসময় তোমার জীবন বাঁচিয়েছিল।”
অনিরুদ্ধের মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হল।
“কী বলছেন আপনি?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন—
“কারণ ওই মানুষটি তোমার জন্মদাতা বাবা।”
অনিরুদ্ধের হাত থেকে ছবিটি মেঝেতে পড়ে গেল।
তাঁর বাবা মারা গিয়েছিলেন, যখন তাঁর বয়স মাত্র সাত বছর। বাবার মৃত্যুর শংসাপত্র, হাসপাতালের নথি, শেষকৃত্যের ছবি—সবই তাঁর কাছে ছিল। জীবনের এতগুলো বছর তিনি কখনও বাবার মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ করেননি।
কিন্তু বৃদ্ধ এবার টেবিলের ড্রয়ার খুলে আরেকটি নথি বের করলেন।
সেখানে লেখা—
মৃত্যুর শংসাপত্র: প্রত্যাহৃত।
নিচে সরকারি সিল।
আর স্বাক্ষরের জায়গায় অরুণাভ মজুমদারের নাম।
বৃদ্ধ বললেন, “তোমার বাবা মারা যাননি, অনিরুদ্ধ। তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল।”
“কেন?”
“কারণ তিনি এমন একটি সত্য জানতেন, যার জন্য অনেক মানুষকে নিজেদের পরিচয় বদলাতে হয়েছিল।”
অনিরুদ্ধ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
বৃদ্ধ এবার জানালার দিকে তাকালেন।
“আর এখন সেই সত্য আবার প্রকাশ্যে আসতে চলেছে।”
“কী সত্য?”
বৃদ্ধ তাঁর দিকে ফিরে তাকালেন।
“তিন বছর আগে যে মৃতদেহটি বিচারপতি অরুণাভ মজুমদারের বলে শনাক্ত করা হয়েছিল, সেটি তোমার বাবার দেহ ছিল না।”
অনিরুদ্ধের গলা শুকিয়ে গেল।
“তাহলে সেটি কার দেহ?”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু টেবিলের ওপর রাখা ফোনটি অনিরুদ্ধের দিকে এগিয়ে দিলেন।
ফোনের পর্দায় একটি লাইভ ভিডিও চলছে।
একটি অন্ধকার ঘর। মেঝেতে চেয়ার। চেয়ারে বসে আছেন বিচারপতি অরুণাভ মজুমদার।
তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“অনিরুদ্ধ, তোমার হাতে সময় খুব কম। আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আমার নামে দ্বিতীয় একটি মৃত্যুসংবাদ প্রকাশিত হবে। আর সেই খবর প্রকাশিত হওয়ার আগেই তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে, প্রথমবার কে মারা গিয়েছিল।”
ভিডিও থেমে গেল।
তারপর পর্দায় একটি নতুন বার্তা ভেসে উঠল—
সাক্ষী নম্বর ১: জীবিত।
সাক্ষী নম্বর ২: নিখোঁজ।
সাক্ষী নম্বর ৩: অনিরুদ্ধ সেন।
অনিরুদ্ধ বুঝতে পারলেন, এই রহস্যের মধ্যে তিনি শুধু একজন আইনজীবী নন।
তিনি নিজেই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
আর হয়তো এমন একজন সাক্ষী, যার স্মৃতি থেকে বহু বছর আগেই সত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুছে দেওয়া হয়েছে।
চলবে…