Categories
গল্প বিবিধ

মৌমাছির ঘর।।।

বনপাহাড়ি গ্রামের চারপাশে ছিল শাল, পিয়াল আর মহুয়ার গাছ। বসন্ত এলেই চারদিক ফুলের গন্ধে ভরে উঠত। ভোরবেলায় গাছের ডালে ডালে পাখির ডাক আর ফুলের ওপর মৌমাছির গুঞ্জন মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করত।

সেই গ্রামের এক প্রান্তে থাকতেন বিমল।

বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। আগে তিনি দিনমজুরের কাজ করতেন। কখনও মাঠে, কখনও ইটভাটায়, কখনও দূরের শহরে নির্মাণের কাজে।

কাজ সবসময় পাওয়া যেত না।

এক বছর বর্ষার পর দীর্ঘদিন কাজ না থাকায় সংসারে অভাব দেখা দিল।

বিমলের স্ত্রী মালতী বলল,

—“এভাবে আর কতদিন চলবে?”

বিমল চুপ করে বসে রইলেন।

তাদের ছেলে নীল তখন ক্লাস এইটে পড়ে।

সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

—“বাবা, তুমি অন্য কোনও কাজ করতে পারো না?”

বিমল হেসে বললেন,

—“সব কাজ কি মানুষ নিজের ইচ্ছেমতো পায়?”

ঠিক সেই সময় গ্রামের স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক অনিরুদ্ধবাবু একদিন বিমলের বাড়িতে এলেন।

তিনি বললেন,

—“মৌমাছি পালন করবে?”

বিমল অবাক।

—“আমি?”

—“হ্যাঁ। তোমার বাড়ির পেছনে জায়গা আছে। ফুলের গাছও আছে।”

বিমল মাথা চুলকে বললেন,

—“মৌমাছি তো কামড়াবে!”

অনিরুদ্ধবাবু হেসে বললেন,

—“মৌমাছিকে ভয় করলে হবে না। তাকে বুঝতে হবে।”

কথাটা বিমলের ভালো লাগল।

কয়েকদিন পর তিনি প্রশিক্ষণ নিয়ে এলেন।

বাড়ির পেছনে কাঠের কয়েকটি বাক্স বসালেন।

প্রথম দিন গ্রামের সবাই দেখতে এল।

কেউ বলল,

—“বিমল পাগল হয়েছে।”

কেউ বলল,

—“মৌমাছি পুষে আবার সংসার চলে নাকি?”

বিমল কিছু বললেন না।

তিনি ধীরে ধীরে মৌমাছিদের পরিচর্যা করতে লাগলেন।

নীল প্রতিদিন বাবার সঙ্গে বাক্সের কাছে যেত।

সে খাতায় লিখে রাখত—

কতগুলো বাক্স।

কোন বাক্সে কতটা মধু।

কোন ফুলের সময় মৌমাছিরা বেশি সক্রিয়।

মালতীও বাড়ির পাশে সরষে, সূর্যমুখী, গাঁদা আর তুলসীর গাছ লাগাতে শুরু করল।

কয়েক মাস পর প্রথম মধু সংগ্রহের সময় এল।

বিমল সাবধানে চাক থেকে মধু সংগ্রহ করলেন।

সোনালি মধু বোতলে ভরা হল।

নীল বোতল হাতে নিয়ে বলল,

—“বাবা, এটা বিক্রি হবে?”

বিমল বললেন,

—“চেষ্টা করব।”

কিন্তু সমস্যা হল বাজারে।

দোকানদার বলল,

—“এটা আসল মধু কী করে বুঝব?”

বিমল বললেন,

—“আমাদের মৌমাছির চাক থেকে নিয়েছি।”

দোকানদার হেসে বলল,

—“সবাই তো সেটাই বলে।”

প্রথম কয়েকটি বোতল বিক্রি হল না।

বিমল হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

মালতী বলল,

—“হাল ছেড়ে দেবে?”

বিমল বললেন,

—“জানি না।”

নীল তখন বলল,

—“বাবা, আমরা নিজেরাই তো মানুষকে দেখাতে পারি মধু কীভাবে তৈরি হয়।”

বিমল তাকালেন।

—“কীভাবে?”

নীল স্কুলে একটি ছোট প্রদর্শনী করার কথা ভাবল।

অনিরুদ্ধবাবুর সাহায্যে স্কুলে ‘মৌমাছি ও কৃষি’ নিয়ে একটি অনুষ্ঠান হল।

বিমল নিজের মৌমাছির বাক্স নিয়ে গেলেন।

ছাত্রছাত্রীরা অবাক হয়ে দেখল।

অনিরুদ্ধবাবু বোঝালেন, মৌমাছি শুধু মধু দেয় না; ফুলের পরাগায়নের মাধ্যমে কৃষিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিমল বললেন,

—“মৌমাছিকে শুধু মধুর বাক্স হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ওরা প্রকৃতির কর্মী।”

অনুষ্ঠানের পর গ্রামের মানুষও বিষয়টা নতুনভাবে দেখতে শুরু করল।

একজন কৃষক এসে বলল,

—“বিমল, আমার সরষেখেতে যদি তোমার বাক্স রাখি?”

বিমল বললেন,

—“রাখতে পারো।”

আরেকজন বলল,

—“আমার লিচুবাগানেও রাখবে?”

ধীরে ধীরে বিমলের কাজ বাড়তে লাগল।

সে শুধু নিজের বাড়িতে নয়, অন্য কৃষকদের জমিতেও মৌমাছির বাক্স বসাতে শুরু করল।

কৃষকরাও উপকার পেলেন।

ফসলের পরাগায়ন ভালো হওয়ায় ফলন বাড়তে লাগল।

বিমলের মধুও বিক্রি হতে শুরু করল।

নীল বোতলের জন্য একটি নাম ঠিক করল—

“বনপাহাড়ির মধু”।

বোতলের গায়ে সে নিজেই লেবেল আঁকল।

একদিন শহর থেকে একজন ব্যবসায়ী গ্রামে এলেন।

তিনি বিমলের মধু দেখে বললেন,

—“মাসে কত বোতল দিতে পারবেন?”

বিমল বললেন,

—“যতটা মৌমাছির ক্ষতি না করে সংগ্রহ করা যায়, ততটাই।”

ব্যবসায়ী অবাক হয়ে বললেন,

—“আপনি বেশি উৎপাদন করতে চান না?”

বিমল মাথা নাড়লেন।

—“মৌমাছিকে কষ্ট দিয়ে বেশি মধু নিয়ে কী লাভ?”

ব্যবসায়ী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“আপনার মধু আমি নেব।”

সেদিন থেকে বিমলের জীবনে বদল এল।

কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হল গ্রামের মানুষের চিন্তায়।

আগে যেখানে সবাই ফুল গাছ কেটে ফেলত, সেখানে এখন মানুষ ফুলের গাছ লাগাতে শুরু করল।

স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বলল,

—“মৌমাছির জন্য ফুল লাগান।”

নীল একটি ছোট দল তৈরি করল।

নাম দিল—

“মৌবন্ধু”।

দলের সদস্যরা গ্রামের ফাঁকা জায়গায় ফুলের গাছ লাগাত।

বিমল তাদের শেখাতেন কীভাবে মৌমাছির বাক্সের কাছে যেতে হয়।

একদিন নীল বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

—“বাবা, তুমি আগে কী কাজ করতে?”

বিমল হেসে বললেন,

—“অনেক কাজ।”

—“আর এখন?”

—“এখন মৌমাছির সঙ্গে কাজ করি।”

নীল বলল,

—“তোমার সবচেয়ে ভালো লাগে কী?”

বিমল একটু ভেবে বললেন,

—“যখন দেখি একটা ছোট্ট মৌমাছি ফুল থেকে ফিরে এসে বাক্সে ঢুকছে।”

—“এতে এত আনন্দ?”

—“হ্যাঁ। কারণ তখন বুঝি, ও নিজের কাজটা করে ফিরেছে।”

একদিন গ্রামের এক কৃষক তাড়াহুড়ো করে এসে বিমলকে বলল,

—“আমার জমিতে অনেক মৌমাছি এসেছে। মেরে ফেলব?”

বিমল সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

—“না!”

তিনি সেখানে গিয়ে দেখলেন, গাছের ডালে বড় একটি মৌচাক তৈরি হয়েছে।

তিনি সাবধানে সেটিকে সরিয়ে একটি বাক্সে স্থানান্তর করলেন।

কৃষক অবাক হয়ে বলল,

—“তুমি না এলে আমি সব পুড়িয়ে দিতাম।”

বিমল বললেন,

—“যাকে না বুঝি, তাকে ধ্বংস করা খুব সহজ। বুঝতে শেখাটাই কঠিন।”

কয়েক বছর পর বনপাহাড়ি গ্রামের চেহারা বদলে গেল।

গ্রামের পথে নতুন নতুন ফুলের গাছ।

বাগানে মৌমাছির বাক্স।

কৃষকদের মধ্যে নতুন আয়।

আর স্কুলের শিশুরা প্রকৃতি নিয়ে অনেক বেশি সচেতন।

একদিন জেলা শহর থেকে একটি দল এল গ্রামের কাজ দেখতে।

তারা বিমলকে জিজ্ঞেস করল,

—“আপনি কীভাবে শুরু করেছিলেন?”

বিমল বললেন,

—“খুব ছোট করে।”

—“কী ছিল আপনার মূলধন?”

বিমল একটু হেসে বললেন,

—“একটা ধার করা বাক্স, কয়েকটা মৌমাছি আর চেষ্টা করার সাহস।”

নীল পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার হাতে তখন একটা নতুন খাতা।

সে বলল,

—“আর একটা জিনিস ছিল।”

সবাই তার দিকে তাকাল।

—“কী?”

নীল বলল,

—“বাবা হার মানেনি।”

বিমল ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

সন্ধ্যায় বাড়ির পেছনের বাগানে তখন অসংখ্য মৌমাছির গুঞ্জন।

ফুলের ওপর তারা ব্যস্ত।

কেউ মধু সংগ্রহ করছে।

কেউ পরাগ নিয়ে ফিরছে।

কেউ নতুন চাক তৈরি করছে।

বিমল দূর থেকে তাকিয়ে রইলেন।

একসময় যে মানুষ কাজ না পেয়ে চিন্তায় বসে থাকতেন, আজ তিনি অন্য মানুষকে কাজ শেখাচ্ছেন।

তিনি বুঝেছিলেন—

বড় পরিবর্তন সবসময় বড় জায়গা থেকে শুরু হয় না।

কখনও একটি ছোট কাঠের বাক্স থেকেও শুরু হতে পারে।

আর কখনও কখনও একটি ছোট মৌমাছির গুঞ্জনই একটি পুরো গ্রামের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *