Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে আদালতে হাসির বিচার হতো।।

শহরের এক প্রান্তে ছিল ছোট্ট একটি পুতুলনাট্যের দল। তাদের মঞ্চ ছিল কাঠের তৈরি, পর্দা ছিল পুরোনো কাপড়ের, আর আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা ছিল সামান্য। তবু প্রতি মাসে তারা এমন একটি নাটক মঞ্চস্থ করত, যা দেখে দর্শকেরা হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরতেন।

দলের পরিচালক ছিলেন মৃণালবাবু। তিনি বিশ্বাস করতেন, হাসি মানুষের মন হালকা করে, কিন্তু কাউকে ছোট করে হাসানো কখনও প্রকৃত আনন্দের উৎস হতে পারে না।

দলে নতুন যোগ দিয়েছিল কুড়ি বছরের অর্ক। তার কণ্ঠস্বর ভালো, অভিনয়ের ক্ষমতাও অসাধারণ। সে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। কিন্তু তার একটি অভ্যাস ছিল—নাটকে হাসি বাড়ানোর জন্য সে অন্যদের ভুল, উচ্চারণ কিংবা চেহারা নিয়ে ঠাট্টা করত।

দর্শকেরা অনেক সময় হেসে উঠতেন। অর্ক ভাবত, সে নিশ্চয়ই খুব ভালো অভিনয় করছে।

একদিন দলের জন্য নতুন নাটক লেখা হলো—‘হাসির আদালত’। গল্পে এক অদ্ভুত বিচারক বসতেন, যিনি শহরের মানুষের হাসির কারণ বিচার করতেন। কেউ অন্যকে আনন্দ দিতে গিয়ে হাসালে সে প্রশংসা পেত, আর কাউকে অপমান করে হাসালে তাকে নিজের কাজের ফল বুঝতে হতো।

নাটকের প্রধান চরিত্র পেল অর্ক। সে খুব খুশি হলো। কিন্তু মহড়ার সময় সে সহ-অভিনেতা বিপ্লবের তোতলামি নিয়ে একটি নতুন সংলাপ যোগ করল। দৃশ্যটি দেখে কয়েকজন হেসে ফেলল।

বিপ্লবও হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু তার মুখের অস্বস্তি অর্কের চোখে পড়ল না।

মৃণালবাবু মহড়া থামিয়ে দিলেন।

“এই সংলাপটি কেন যোগ করলে?” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

অর্ক বলল, “দর্শক হাসবে বলে। নাটকটা তো হাসির।”

“দর্শক হাসলেই কি সব সংলাপ ঠিক হয়ে যায়?”

অর্ক উত্তর দিল, “হাসানোই তো আমাদের কাজ।”

মৃণালবাবু শান্ত গলায় বললেন, “মানুষকে হাসানো আর কাউকে হাসির পাত্র বানানো এক কথা নয়।”

অর্ক কথাটি গুরুত্ব দিল না। তার মনে হলো, পরিচালক হয়তো নাটকটিকে অতিরিক্ত গম্ভীর করে তুলছেন।

পরের দিন দলের একটি অনুষ্ঠান ছিল শহরের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের কেন্দ্রে। শিশুরা পুতুলনাট্য দেখতে খুব ভালোবাসত। অনুষ্ঠান শুরুর আগে অর্ক মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে বিপ্লবকে বলল, “আজ কিন্তু আমার নতুন সংলাপটা বলব। দেখিস, সবাই হেসে গড়িয়ে পড়বে।”

বিপ্লব মৃদু স্বরে বলল, “আমাকে নিয়ে হলে না বললেই ভালো হয়।”

অর্ক অবাক হয়ে তাকাল। “আরে, মজা করছি! এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে?”

বিপ্লব আর কিছু বলল না।

নাটক শুরু হলো। প্রথম কয়েকটি দৃশ্যে শিশুরা আনন্দে হাততালি দিল। কিন্তু অর্ক যখন বিপ্লবের কথা বলার ধরন নকল করে সংলাপটি বলল, তখন সামনের সারির একটি ছেলে হাসল না। সে নিজের পাশে বসা বন্ধুটিকে জিজ্ঞাসা করল, “ওঁর কথা বলতে অসুবিধা হয় বলে কি সবাই তাঁকে নিয়ে হাসবে?”

প্রশ্নটি খুব জোরে বলা হয়নি। তবু অর্ক শুনতে পেল।

তার সংলাপ মুখে আটকে গেল।

মঞ্চে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল। বিপ্লব নিজের চরিত্রে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু তার চোখ নিচু হয়ে গিয়েছিল।

অর্ক প্রথমবার বুঝতে পারল, দর্শকের হাসি সব সময় আনন্দের প্রমাণ নয়। কখনও মানুষ পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে হাসে, কখনও অস্বস্তি ঢাকতে হাসে, আবার কখনও অন্যের কষ্টকে গুরুত্ব না দিয়েও হাসে।

সে সংলাপটি বাদ দিয়ে নাটকের পরের অংশে চলে গেল। অনুষ্ঠান শেষ হলে সে বিপ্লবের কাছে গিয়ে বলল, “আমি ভেবেছিলাম, সবাই হাসবে বলে ব্যাপারটা ঠিক আছে। কিন্তু তোমার কেমন লাগছে, সেটা একবারও ভাবিনি। আমাকে ক্ষমা করো।”

বিপ্লব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তুমি যদি সত্যিই বুঝে থাকো, তাহলে পরের বার শুধু আমার কাছে নয়, মঞ্চেও সেটা প্রমাণ কোরো।”

সেদিন রাতে অর্ক বাড়ি ফিরে নাটকের পাণ্ডুলিপি খুলল। সে অপমানজনক সংলাপগুলো কেটে দিল। বদলে এমন দৃশ্য লিখল, যেখানে বিচারক এক ধনী ব্যবসায়ীর অহংকার, এক ক্ষমতাবান কর্মকর্তার অযৌক্তিক দাবি এবং নিজের ভুল স্বীকার করতে না চাওয়া মানুষের আচরণ নিয়ে রসিকতা করেন।

নতুন সংস্করণে হাসি কমল না, বরং আরও প্রাণবন্ত হলো। কারণ এবার হাসির লক্ষ্য ছিল মানুষের দুর্বলতা নিয়ে নিষ্ঠুর ঠাট্টা নয়, বরং অন্যায়, ভণ্ডামি ও অহংকার।

পরের অনুষ্ঠানে অর্ক মঞ্চে উঠে দর্শকদের বলল, “আগের প্রদর্শনীতে আমার একটি সংলাপ একজন সহকর্মীকে কষ্ট দিয়েছিল। সেটি আমার ভুল ছিল। আজকের নাটকে আমরা চেষ্টা করেছি, কাউকে অপমান না করেও কীভাবে হাসি তৈরি করা যায়।”

তারপর পর্দা উঠল।

শেষ দৃশ্যে বিচারক ঘোষণা করলেন, “এই আদালতে হাসির বিচার হয় না শুধু। বিচার হয়, সেই হাসির আড়ালে কারও চোখে জল জমেছে কি না।”

দর্শকেরা হেসে উঠলেন, তারপর হাততালি দিলেন।

মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে বিপ্লব অর্কের দিকে তাকিয়ে হাসল। এবার সেই হাসিতে কোনও অস্বস্তি ছিল না।

সেদিন অর্ক পুরস্কার জেতেনি, সংবাদপত্রেও তার নাম বেরোয়নি। তবু বাড়ি ফেরার পথে তার মনে হলো, সে অভিনয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠটি শিখেছে।

শিক্ষা: কাউকে অপমান করে হাসি অর্জন করা সহজ, কিন্তু সকলের মর্যাদা বজায় রেখে আনন্দ তৈরি করাই প্রকৃত প্রতিভা। কথা বলার আগে ভাবা উচিত, আমাদের আনন্দ অন্য কারও কষ্টের কারণ হচ্ছে কি না।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *