শহরের বিজ্ঞান জাদুঘরের একটি বিশেষ ঘরে প্রতি রবিবার বসত ছোটদের বিজ্ঞানসভা। সেখানে কেউ রকেটের ছবি আঁকত, কেউ চুম্বক নিয়ে পরীক্ষা করত, আবার কেউ বানিয়ে আনত অদ্ভুত সব যন্ত্র। সভাটির দায়িত্বে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানশিক্ষক অমলেন্দু সেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শিশুরা ভুল উত্তর দিলে তাদের থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়; বরং এমন প্রশ্ন করা উচিত, যাতে তারা নিজেরাই উত্তর খুঁজে পায়।
সেই সভায় নিয়মিত আসত চৌদ্দ বছরের ঋদ্ধি। সে খুব মেধাবী ছিল, কিন্তু একটি সমস্যা ছিল—কোনও পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না পেলে সে আর দ্বিতীয়বার চেষ্টা করতে চাইত না। তার ধারণা, সত্যিকারের বুদ্ধিমান মানুষের প্রথম চেষ্টাতেই সফল হওয়া উচিত।
একদিন বিজ্ঞানসভায় অমলেন্দু স্যার একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতার ঘোষণা করলেন।
“তোমাদের এমন একটি যন্ত্র বানাতে হবে, যা একটি ছোট বলকে মেঝে থেকে তুলে নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে দেবে। তবে কোনও মোটর ব্যবহার করা যাবে না। তোমরা নিজেদের পছন্দমতো অন্য উপকরণ ব্যবহার করতে পারো।”
শিশুরা উত্তেজিত হয়ে উঠল। কেউ রাবারের ফিতা ব্যবহার করার কথা ভাবল, কেউ লিভার, কেউ আবার বাতাসের চাপ দিয়ে বল তোলার পরিকল্পনা করল।
ঋদ্ধি একটি জটিল যন্ত্রের নকশা তৈরি করল। তার যন্ত্রে ছিল কয়েকটি চাকা, স্প্রিং, সুতো এবং কাঠের বাহু। সে মনে মনে নিশ্চিত ছিল, অন্যদের তুলনায় তার নকশাই সবচেয়ে ভালো।
প্রথম দিনেই সে যন্ত্রটি তৈরি করে ফেলল। কিন্তু পরীক্ষা করার সময় বলটি ওপরে ওঠার বদলে পাশের দিকে ছিটকে পড়ল। ঋদ্ধি বিরক্ত হয়ে যন্ত্রটি বন্ধ করে দিল।
দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেও একই ফল হলো। তৃতীয়বার একটি কাঠের অংশ খুলে গেল।
রাগে সে বলল, “এটা অসম্ভব! নকশা তো ঠিকই ছিল।”
অমলেন্দু স্যার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার মতে, যন্ত্রটি কেন কাজ করছে না?”
ঋদ্ধি উত্তর দিল, “আমি জানি না। হয়তো উপকরণগুলো ভালো নয়।”
স্যার যন্ত্রটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা হতে পারে। কিন্তু আমরা পরীক্ষা না করে কীভাবে নিশ্চিত হব? বিজ্ঞান কি আমাদের অনুমানের ওপর সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়, নাকি প্রমাণ খুঁজতে শেখায়?”
ঋদ্ধি চুপ করে রইল।
স্যার তাকে একটি খাতা দিলেন। বললেন, “এবার যন্ত্রটি চালানোর আগে তোমার অনুমান লিখবে। তারপর কী ঘটল, সেটাও লিখবে। অনুমান ভুল হলে লজ্জা পাবে না। বরং দেখবে, ভুলটি তোমাকে নতুন কী তথ্য দিল।”
ঋদ্ধি অনিচ্ছা সত্ত্বেও খাতাটি খুলল।
প্রথম পরীক্ষায় সে লিখল—চাকার ঘর্ষণের কারণে বলটি যথেষ্ট শক্তি পাচ্ছে না।
পরীক্ষা করে দেখা গেল, ঘর্ষণ কিছুটা সমস্যা তৈরি করছে, কিন্তু সেটিই একমাত্র কারণ নয়। দ্বিতীয়বার সে লিখল—যন্ত্রের বাহু সঠিক কোণে কাজ করছে না। এবার কোণ বদলানো হলো। বল আগের চেয়ে উঁচুতে উঠল, কিন্তু নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছল না।
প্রতিটি পরীক্ষার ফল সে লিখে রাখল। কয়েক দিন পর তার খাতায় নানা রকম দাগ, হিসাব, আঁকিবুঁকি আর সংশোধনে ভরে গেল।
একদিন তার বন্ধু সায়ন বলল, “এতবার চেষ্টা করে কী লাভ? আমার তো ছোট যন্ত্রটা একবারেই কাজ করছে।”
ঋদ্ধির মন খারাপ হলো। সে আবার ভাবল, হয়তো এই প্রতিযোগিতা তার জন্য নয়।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে খাতাটি বন্ধ করে রাখল। পরের রবিবার বিজ্ঞানসভায় না যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিল।
কিন্তু রাতে খাতা খুলে নিজের পরীক্ষাগুলোর দিকে তাকাতেই সে একটি বিষয় লক্ষ করল। প্রতিবার বলটি যেখানে গিয়ে পড়েছে, তার দূরত্ব সে আলাদা করে লিখেছে। সেই হিসাবের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা ছিল। যন্ত্রের বাহুতে বল প্রয়োগের স্থান বদলালে বলের ওঠার উচ্চতাও বদলাচ্ছিল।
ঋদ্ধি নতুন নকশা আঁকল। এবার সে জটিল যন্ত্রের অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে একটি সহজ লিভার ব্যবস্থা তৈরি করল। পরদিন সে আবার বিজ্ঞানসভায় গেল।
নতুন যন্ত্রটি চালু করার আগে সে খাতায় লিখল—‘এই বিন্যাসে বলটি আগের চেয়ে বেশি উচ্চতায় উঠবে, কারণ প্রয়োগ করা বলের কার্যকর দূরত্ব বাড়ানো হয়েছে।’
পরীক্ষা শুরু হলো।
প্রথমবার বলটি কিছুটা উঁচুতে উঠল। দ্বিতীয়বার সে একটি সংযোগস্থল ঠিক করল। তৃতীয়বার বলটি নির্ধারিত উচ্চতায় পৌঁছে গেল।
ঋদ্ধি আনন্দে চিৎকার করে উঠল। তার বন্ধুরাও হাততালি দিল।
অমলেন্দু স্যার তাকে অভিনন্দন জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কোনটি?”
ঋদ্ধি একটু ভেবে বলল, “শেষবারের নকশা নয়, স্যার। আগের পরীক্ষাগুলো থেকে যা শিখেছি, সেটাই। আমি যদি প্রথম ব্যর্থতার পর থেমে যেতাম, তাহলে বুঝতেই পারতাম না সমস্যাটা কোথায়।”
স্যার হাসলেন। “ঠিক তাই। আর একটি কথা মনে রেখো—সফল হওয়া মানে সব সময় অন্যদের হারিয়ে দেওয়া নয়। কখনও কখনও নিজের পুরোনো ধারণাকে বদলাতে পারাটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য।”
প্রতিযোগিতার ফল প্রকাশের দিন ঋদ্ধি প্রথম পুরস্কার পেল না। তার বন্ধু সায়নের যন্ত্রটি কম সময়ে কাজ করেছিল বলে বিচারকেরা তাকে বিজয়ী ঘোষণা করলেন। প্রথম মুহূর্তে ঋদ্ধির একটু খারাপ লাগলেও সে সায়নকে অভিনন্দন জানাল।
তারপর সে নিজের খাতাটি অমলেন্দু স্যারের হাতে দিয়ে বলল, “স্যার, পরের বিজ্ঞানসভায় নতুন পরীক্ষা শুরু করব। এবার আরও ভালোভাবে ফল নথিভুক্ত করব।”
অমলেন্দু স্যার খাতাটি ফেরত দিয়ে বললেন, “এটা তোমার কাছেই থাক। কারণ এই খাতায় শুধু একটি যন্ত্রের নকশা নেই, আছে একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা বদলে যাওয়ার গল্প।”
বছর কয়েক পরে ঋদ্ধি যখন নিজেই ছোটদের বিজ্ঞান শেখাতে শুরু করল, তখন তার টেবিলের ওপর সেই পুরোনো খাতাটি রাখা থাকত। কোনও শিক্ষার্থী পরীক্ষা করে ব্যর্থ হলে সে কখনও বলত না, “তুমি পারবে না।”
সে শুধু জিজ্ঞাসা করত, “তোমার কী মনে হয়, এবার আমরা কী পরীক্ষা করে দেখতে পারি?”
আর সেই একটি প্রশ্ন থেকেই শুরু হতো নতুন আবিষ্কারের পথ।
শিক্ষা: ব্যর্থতা চেষ্টার শেষ নয়, শেখার একটি ধাপ। নিজের ভুল বিশ্লেষণ করে নতুনভাবে চেষ্টা করতে পারলে কঠিন সমস্যারও সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব।