১. মাঠহীন শৈশব
পূর্ব মেদিনীপুরের ছোট্ট গ্রাম কুসুমপুর। একসময় এই গ্রামের বিকেলগুলো ছিল শিশুদের হাসি, দৌড়ঝাঁপ আর খেলাধুলায় ভরা। গ্রামের মাঝখানে ছিল একটি বড় খোলা মাঠ। সেখানে কেউ ফুটবল খেলত, কেউ দাঁড়িয়াবান্ধা, কেউ আবার কানামাছি কিংবা লুকোচুরি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের চেহারা বদলাতে শুরু করেছিল। মাঠের এক পাশে তৈরি হয়েছিল কয়েকটি দোকান, অন্য পাশে গড়ে উঠেছিল পাকা বাড়ি। বাকি জায়গাটুকুও ঝোপঝাড়ে ভরে গিয়েছিল। শিশুরা মাঠে খেলতে আসত না বললেই চলে।
বেশিরভাগ বিকেলে তারা বাড়ির মধ্যে বসে মোবাইল ফোনে গেম খেলত। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখত, কেউ আবার অনলাইনে বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত।
এই গ্রামেরই বারো বছরের ছেলে অয়ন। সে পড়াশোনায় মাঝারি, কিন্তু তার কৌতূহল ছিল প্রচুর। একদিন ঠাকুমার পুরোনো কাঠের বাক্স গোছাতে গিয়ে সে কয়েকটি অদ্ভুত জিনিস পেল—মাটির ছোট গুটি, কাপড়ের তৈরি বল, পুরোনো দড়ি আর কয়েকটি রঙিন কাঁচের গুলি।
অয়ন অবাক হয়ে ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করল,
—ঠাকুমা, এগুলো কী?
ঠাকুমা হাসলেন।
—এগুলো দিয়ে আমরা ছোটবেলায় খেলতাম। ওই গুলিগুলো দিয়ে গুলি খেলা, কাপড়ের বল দিয়ে কত রকম খেলা! আর এই দড়ি দিয়ে দল বেঁধে খেলতাম।
—তোমাদের কি তখন মোবাইল ছিল না?
ঠাকুমা হেসে উঠলেন।
—মোবাইল তো দূরের কথা, অনেক বাড়িতে ঠিকমতো বিদ্যুতের ব্যবস্থাও ছিল না। কিন্তু আমাদের বিকেলগুলো কখনও ফাঁকা থাকত না।
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার মনে হলো, তাদের আগের প্রজন্মের শৈশব যেন একেবারে অন্য রকম ছিল।
২. ঠাকুমার খেলার গল্প
পরের দিন স্কুল থেকে ফিরে অয়ন আবার ঠাকুমার কাছে গেল।
—ঠাকুমা, তুমি আমাকে সেই খেলাগুলো শেখাবে?
ঠাকুমা একটু অবাক হলেন।
—তুই খেলবি? তোর তো ওই ফোনটাই বেশি প্রিয়!
অয়ন লজ্জা পেয়ে বলল,
—আমি ফোনে গেম খেলি ঠিকই। কিন্তু তোমাদের খেলাগুলো কেমন ছিল, সেটা জানতে ইচ্ছে করছে।
ঠাকুমা তাকে উঠোনে নিয়ে গেলেন। প্রথমে শেখালেন গুটি দিয়ে খেলা। তারপর দেখালেন কীভাবে মাটিতে ঘর কেটে দাঁড়িয়াবান্ধার মতো খেলা খেলতে হয়। কাপড়ের বল দিয়ে শেখালেন সহজ একটি দলগত খেলা।
অয়ন আনন্দে মেতে উঠল। কিন্তু একা একা খেলে তার ভালো লাগছিল না।
সে তার বন্ধু রাহুল, মিতু, পিয়াল আর সায়নকে ডাকল।
—তোরা বিকেলে আমার বাড়িতে আসবি? নতুন একটা খেলা শেখাব।
রাহুল সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—মোবাইল গেমের নতুন কিছু নাকি?
—না, মাঠে খেলার খেলা।
রাহুল মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—মাঠে আবার কী খেলব? সেখানে তো ঠিকমতো জায়গাই নেই!
কথাটা শুনে অয়নের মন খারাপ হলো। তবু সে হাল ছাড়ল না।
৩. প্রথম দিনের ব্যর্থতা
শনিবার বিকেলে অয়ন বন্ধুদের নিয়ে গ্রামের পুরোনো মাঠে গেল। মাঠের অবস্থা সত্যিই খারাপ। কোথাও আগাছা, কোথাও ভাঙা ইট, কোথাও আবার আবর্জনা পড়ে আছে।
মিতু বলল,
—এখানে খেলতে গেলে তো পা কেটে যাবে!
পিয়াল বলল,
—চল, বাড়ি যাই। মোবাইলেই খেলা যাবে।
অয়ন তাদের থামিয়ে বলল,
—আজ খেলতে না পারি, কিন্তু মাঠটা পরিষ্কার করতে পারি না?
বন্ধুরা প্রথমে রাজি হলো না। কিন্তু অয়ন একা একা মাঠের এক কোণ থেকে প্লাস্টিকের বোতল আর কাগজ কুড়োতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর সায়ন এগিয়ে এল। তার পরে মিতু। শেষে রাহুলও হাত লাগাল।
তারা আবর্জনা এক জায়গায় জড়ো করে বড়দের সাহায্যে সঠিকভাবে সরানোর ব্যবস্থা করল। ভাঙা ইট ও ধারালো জিনিসগুলো আলাদা করে রাখল। মাঠের একটি ছোট অংশ পরিষ্কার করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।
খেলা আর হলো না। কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় অয়নের মনে আনন্দ ছিল।
সে বুঝল, শুধু অভিযোগ করলে কোনো কিছু বদলায় না। পরিবর্তনের জন্য প্রথম পদক্ষেপটা কাউকে না কাউকে নিতেই হয়।
৪. গ্রামের বড়দের সাহায্য
পরদিন অয়ন তার পরিকল্পনা নিয়ে অরুণাভ স্যারের কাছে গেল। স্যার মন দিয়ে সব শুনলেন।
—তুই কী করতে চাইছিস?
অয়ন বলল,
—স্যার, আমরা গ্রামের পুরোনো খেলাগুলো আবার শুরু করতে চাই। কিন্তু মাঠ পরিষ্কার করা, নিরাপদ জায়গা তৈরি করা—এসবের জন্য বড়দের সাহায্য দরকার।
স্যার বললেন,
—খুব ভালো উদ্যোগ। তবে মনে রাখবি, মাঠটা সবার। তাই একা সিদ্ধান্ত না নিয়ে গ্রামের মানুষকে সঙ্গে নিতে হবে।
অরুণাভ স্যার গ্রামের কয়েকজন অভিভাবক এবং পঞ্চায়েতের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বললেন। একদিন বিকেলে মাঠের পাশে একটি ছোট বৈঠক হলো।
কেউ বললেন, মাঠটি পরিষ্কার করা দরকার। কেউ বললেন, সেখানে খেলতে গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আছে। আবার কেউ প্রশ্ন তুললেন, আজকালকার ছেলেমেয়েরা কি সত্যিই এসব খেলায় আগ্রহী?
অয়ন উঠে দাঁড়াল। তার গলা প্রথমে কেঁপে উঠেছিল, কিন্তু সে সাহস করে বলল,
—আমরা শুধু খেলতে চাই না। আমরা চাই, ছোটরা যেন একসঙ্গে সময় কাটাতে পারে। মোবাইলে খেললেও অনেক কিছু শেখা যায়, কিন্তু মাঠে খেললে আমরা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে শিখি, নিয়ম মানতে শিখি, হেরে গিয়েও আবার চেষ্টা করতে শিখি।
বৈঠকে উপস্থিত একজন বৃদ্ধ বললেন,
—ছেলেটা ঠিকই বলেছে। আমরা ছোটবেলায় এই মাঠেই বড় হয়েছি। মাঠটা আবার বাচ্চাদের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
অবশেষে ঠিক হলো, মাঠের নিরাপদ অংশ পরিষ্কার করা হবে। স্থানীয় মানুষ শ্রম দিয়ে সাহায্য করবেন, আর শিশুদের খেলাধুলার সময় বড়রা নজর রাখবেন।
৫. ‘আমাদের খেলার বিকেল’
এক সপ্তাহের মধ্যে মাঠের একটি অংশ ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠল। আবর্জনা সরানো হলো, বিপজ্জনক জিনিস তুলে ফেলা হলো এবং মাটির অসমান জায়গাগুলো যতটা সম্ভব সমান করা হলো। খেলার সীমানা চিহ্নিত করতে চুন ব্যবহার করা হলো।
অয়ন ও তার বন্ধুরা একটি নাম ঠিক করল—‘আমাদের খেলার বিকেল’।
প্রতি শনিবার বিকেলে তারা একসঙ্গে খেলবে। প্রথম সপ্তাহে থাকবে কানামাছি, লুকোচুরি আর দাঁড়িয়াবান্ধা। পরের সপ্তাহে গুলি খেলা ও দড়ি টানাটানি। এরপর স্থানীয় খেলাধুলার সঙ্গে মানানসই আরও কিছু খেলা শেখানো হবে।
তারা একটি নিয়মও করল—কেউ কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করবে না, ছোটদের খেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে এবং হারলে কাউকে অপমান করা যাবে না।
প্রথম শনিবারে মাত্র সাতজন শিশু এল। তাদের মধ্যে দুজন কিছুক্ষণ পর চলে যেতে চাইল। কারণ তারা ভেবেছিল, পুরোনো খেলায় তেমন মজা নেই।
অয়ন বলল,
—একবার চেষ্টা করে দেখ। ভালো না লাগলে পরে অন্য কিছু খেলব।
প্রথমে তারা কানামাছি খেলল। চোখ বাঁধা অবস্থায় অন্যদের খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল। তারপর দাঁড়িয়াবান্ধা খেলতে গিয়ে রাহুল এমনভাবে দৌড়ল যে নিজেই নিজের পায়ে হোঁচট খেয়ে বসে পড়ল। সবাই তাকে তুলে দিল।
বিকেলের শেষে যারা প্রথমে চলে যেতে চেয়েছিল, তারাই বলল,
—আগামী শনিবারও খেলব!
অয়নের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
৬. নতুন বন্ধুত্ব
ধীরে ধীরে ‘আমাদের খেলার বিকেল’ জনপ্রিয় হয়ে উঠল। আগে যে শিশুরা একে অন্যের সঙ্গে খুব একটা কথা বলত না, তারাও এখন একসঙ্গে খেলতে শুরু করল।
গ্রামের মেয়ে মিতু ছিল খুব লাজুক। দল বেঁধে খেলতে সে প্রথমে সংকোচ বোধ করত। কিন্তু অয়ন তাকে বলল,
—এখানে সবাই খেলবে। কেউ খুব ভালো খেলতে পারে, কেউ একটু কম পারে। তাতে কিছু যায় আসে না।
মিতু ধীরে ধীরে সাহস পেল। একদিন কানামাছি খেলায় সে চোখ বাঁধা অবস্থায় তিনজনকে খুঁজে পেল। সবাই হাততালি দিল।
সায়ন আবার একটু রাগী স্বভাবের ছিল। হেরে গেলে সে খেলা ছেড়ে চলে যেত। একদিন দাঁড়িয়াবান্ধায় তার দল হেরে যাওয়ার পর সে রাগ করে বলল,
—আমি আর খেলব না। তোমরা ঠিকমতো খেলতে পারো না!
অয়ন শান্তভাবে বলল,
—আমরা সবাই যদি হারার পর চলে যাই, তাহলে খেলবে কে? আজ আমরা হারলাম, পরের বার আবার চেষ্টা করব।
কথাটা সায়নের মনে দাগ কাটল। সে ফিরে এসে দলের সঙ্গে বসে আলোচনা করল, কোথায় ভুল হয়েছে এবং কীভাবে পরের বার ভালো করা যায়।
অয়ন বুঝতে পারছিল, খেলাধুলা শুধু শরীরচর্চা নয়। এর মধ্যে বন্ধুত্ব, সহনশীলতা, সহযোগিতা এবং নিজের ভুল থেকে শেখার শিক্ষা রয়েছে।
৭. মোবাইলের সঙ্গে লড়াই নয়
কিছুদিন পর গ্রামের এক অভিভাবক অয়নের বাবাকে বললেন,
—আপনার ছেলে তো এখন মোবাইল ছেড়ে মাঠেই বেশি সময় কাটাচ্ছে। ভালোই হয়েছে!
কথাটা শুনে অয়নের বাবা হেসে বললেন,
—হ্যাঁ, তবে ওকে একটা কথা বলেছি। পড়াশোনা, বিশ্রাম আর পরিবারের জন্য সময় রেখেই খেলতে হবে।
অয়নও বুঝত, মোবাইল ফোন সব সময় খারাপ নয়। মোবাইলে পড়াশোনা করা যায়, নতুন খেলা শেখা যায়, দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে থাকা এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়া ঠিক নয়।
তাই তারা খেলার বিকেলে একটি নতুন নিয়ম চালু করল—খেলার সময় মোবাইল পাশে রাখা হবে না, জরুরি ফোন এলে অবশ্যই উত্তর দেওয়া যাবে। কেউ ছবি তুলতে চাইলে অন্যদের অনুমতি নিতে হবে।
একদিন রাহুল বলল,
—আগে ভাবতাম, মোবাইল গেম ছাড়া বিকেল কাটবে না। এখন দেখি, মাঠে খেলতে গেলে সময় কীভাবে কেটে যায় বোঝাই যায় না!
অয়ন হেসে বলল,
—কারণ এখানে শুধু স্ক্রিনের ছবি নয়, আমরা একে অন্যের মুখের হাসিও দেখতে পাই।
৮. গ্রামের খেলার উৎসব
তিন মাস পর অয়ন প্রস্তাব দিল, গ্রামের সব শিশুকে নিয়ে একটি ছোট খেলার উৎসব করা হোক। সেখানে শুধু প্রতিযোগিতা থাকবে না; পুরোনো খেলাগুলোর নিয়ম শেখানো হবে এবং বড়রা তাঁদের শৈশবের অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নেবেন।
অরুণাভ স্যার উদ্যোগটিকে সমর্থন করলেন। গ্রামের প্রবীণ মানুষদের নিয়ে একটি ছোট দল গঠন করা হলো। তাঁরা নিজেদের জানা খেলাগুলোর নিয়ম শিশুদের শেখাতে লাগলেন।
উৎসবের দিন মাঠে রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো হলো প্রবেশপথ। কেউ কানামাছি খেলল, কেউ গুটি খেলা দেখাল, কেউ দড়ি টানাটানিতে অংশ নিল। ছোটদের জন্য সহজ দৌড়ের খেলাও রাখা হয়েছিল।
সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি ঘটল বিকেলের দিকে।
গ্রামের এক বৃদ্ধা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বাড়ির বাইরে খুব কম বেরোতেন, নিজের নাতনির হাত ধরে মাঠে এলেন। তিনি শিশুদের দেখে বললেন,
—আমাদের সময়ে এই মাঠে কত আনন্দ হতো! এত দিন পরে আবার সেই দৃশ্য দেখছি।
তিনি নিজে দাঁড়িয়াবান্ধার কয়েকটি নিয়ম বুঝিয়ে দিলেন। শিশুরা মন দিয়ে শুনল। কেউ তাঁর কথা রেকর্ড করতে চাইল, তবে আগে অনুমতি নিল। বৃদ্ধা খুশি হয়ে বললেন,
—আমাদের গল্পগুলো তোমরা মনে রাখলে ভালো লাগবে।
সেদিন কোনো একজনকে শুধু বিজয়ী ঘোষণা করে উৎসব শেষ করা হয়নি। বরং সহযোগিতা, নিয়ম মেনে খেলা এবং নতুনদের সাহায্য করার জন্য আলাদা করে প্রশংসা করা হয়েছিল।
অয়ন দেখল, মাঠের চারদিকে কত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ হাততালি দিচ্ছেন, কেউ হাসছেন, কেউ আবার নিজেদের শৈশবের কথা মনে করে গল্প করছেন।
তার মনে হলো, সে শুধু খেলাগুলো ফিরিয়ে আনেনি; গ্রামের মানুষদের একসঙ্গে সময় কাটানোর একটি সুযোগও তৈরি করেছে।
৯. ছোট্ট উদ্যোগের বড় শিক্ষা
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কুসুমপুরের মাঠটি গ্রামের শিশুদের কাছে আবার প্রিয় হয়ে উঠল। প্রতিদিন সবাই আসত না, আর সব শিশুর পছন্দও এক ছিল না। কেউ ফুটবল ভালোবাসত, কেউ দৌড়তে, কেউ আবার পুরোনো দেশি খেলায় আনন্দ পেত।
তবু একটা পরিবর্তন স্পষ্ট ছিল। শিশুরা এখন জানত, আনন্দ পাওয়ার জন্য সব সময় দামি জিনিসের প্রয়োজন হয় না। কখনও সামান্য জায়গা, কয়েকজন বন্ধু আর নতুন কিছু শেখার আগ্রহই যথেষ্ট।
অয়নের ঠাকুমা একদিন তাকে বললেন,
—তুই আমাদের পুরোনো খেলাগুলো ফিরিয়ে এনেছিস, দাদুভাই। কিন্তু তার থেকেও বড় কাজ করেছিস।
অয়ন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
—কী কাজ, ঠাকুমা?
ঠাকুমা বললেন,
—তুই সবাইকে একসঙ্গে থাকতে শিখিয়েছিস। খেলার নিয়ম ভুলে গেলেও মানুষ আবার শিখতে পারে। কিন্তু একে অন্যের পাশে থাকার অভ্যাস হারিয়ে গেলে সেটা ফিরিয়ে আনা কঠিন।
অয়ন ঠাকুমার কথার গভীরতা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি, কিন্তু সে অনুভব করল, তার ছোট্ট উদ্যোগটি সত্যিই কিছু বদলেছে।
সন্ধ্যায় মাঠ থেকে ফেরার সময় সে একবার পিছন ফিরে তাকাল। কয়েকটি শিশু তখনও খেলার সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখছিল। রাহুল ছোটদের সাহায্য করছিল, মিতু নতুন একটি মেয়েকে খেলার নিয়ম বোঝাচ্ছিল, আর সায়ন পরের সপ্তাহের খেলার তালিকা লিখছিল।
অয়ন মনে মনে বলল, “এই মাঠ শুধু মাটির একটা টুকরো নয়। এখানে আমাদের বন্ধুত্ব আছে, হাসি আছে, শেখার সুযোগ আছে।”
সে জানত, সব শিশু একদিন একই খেলায় আনন্দ পাবে না। কেউ মোবাইল ব্যবহার করবে, কেউ ঘরে বসে বই পড়বে, কেউ সংগীত শিখবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রত্যেক শিশুর যেন নিরাপদে খেলাধুলা করার সুযোগ থাকে, বন্ধুত্ব গড়ার সুযোগ থাকে, নিজের পছন্দ খুঁজে নেওয়ার সুযোগ থাকে—এটাই ছিল তার স্বপ্ন।
আর সেই স্বপ্ন পূরণের শুরু হয়েছিল একটি পুরোনো বাক্সের কয়েকটি গুটি, একটি কাপড়ের বল এবং একটি প্রশ্ন থেকে।
কারণ, শৈশবকে সুন্দর করে তুলতে সব সময় বড় আয়োজনের দরকার হয় না। কখনও একজনের উদ্যোগই অনেকের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিতে পারে।