শহরের পুরনো বাজারে একটি অদ্ভুত দোকান ছিল। দোকানটির নাম ‘সময়ের ঘর’। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, সেখানে হয়তো পুরনো বই কিংবা নানা রকম উপহারসামগ্রী বিক্রি হয়। কিন্তু দোকানের কাচের দরজায় লেখা ছিল একটি আশ্চর্য বাক্য—
“এখানে সময় ভাড়া পাওয়া যায়। টাকা নয়, দাম দিতে হয় নিজের অভ্যাস দিয়ে।”
দোকানটির মালিক ছিলেন এক বৃদ্ধ, নাম শশাঙ্কবাবু। তাঁর বয়স কত, কেউ জানত না। বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ীরাও তাঁকে ছোটবেলা থেকে একই রকম দেখতে পেয়েছেন বলে দাবি করতেন।
একদিন কলেজপড়ুয়া অদিতি দোকানটির সামনে এসে দাঁড়াল। পরীক্ষার আর মাত্র পনেরো দিন বাকি। অথচ তার পড়া শেষ হয়নি। মোবাইল ফোনে ভিডিও দেখতে দেখতে, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে, কখন যে দিনের বেশির ভাগ সময় চলে যায়, সে বুঝতেই পারে না।
অদিতি দোকানের লেখাটি পড়ে হেসে ফেলল। তারপর দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে বলল, “কাকু, সত্যিই কি সময় ভাড়া দেন?”
শশাঙ্কবাবু চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, “কত ঘণ্টা লাগবে?”
“প্রতিদিন অন্তত তিন ঘণ্টা বেশি সময় পেলে ভালো হতো।”
বৃদ্ধ একটি মোটা খাতা খুললেন। সেখানে অসংখ্য মানুষের নামের পাশে বিভিন্ন হিসাব লেখা। কারও পাশে লেখা ‘প্রতিদিন কুড়ি মিনিট’, কারও পাশে ‘এক ঘণ্টা’, আবার কারও পাশে ‘নিজের জন্য আধ ঘণ্টা’।
অদিতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এত মানুষ আপনার কাছ থেকে সময় নিয়েছেন?”
“নিয়েছেন তো বটেই। কিন্তু সবাই সময়ের দাম দিতে পারেননি।”
“দাম কত?”
শশাঙ্কবাবু বললেন, “তোমাকে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা দেব। তার বদলে তোমাকে তিনটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, পড়ার সময় মোবাইল ফোন অন্য ঘরে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, দিনের শুরুতেই কাজের তালিকা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, রাতে ঘুমানোর আগে দেখতে হবে, সময়টা কোথায় খরচ করলে।”
অদিতি হেসে বলল, “এ তো সময় ভাড়া নয়, নিয়ম মানা!”
বৃদ্ধ শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “সময় তো তোমার কাছেই আছে। আমি শুধু তোমাকে তার দরজা দেখাচ্ছি।”
অদিতি চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করল।
প্রথম দিনই তার অসুবিধা হলো। মোবাইল ফোন অন্য ঘরে রেখে পড়তে বসে বারবার মনে হচ্ছিল, কেউ হয়তো বার্তা পাঠিয়েছে। কয়েকবার উঠে ফোন আনতে গিয়েও সে নিজেকে সামলাল। কাজের তালিকা তৈরি করেছিল ঠিকই, কিন্তু সব কাজ শেষ করতে পারেনি।
রাতে দোকানে ফিরে সে বলল, “আজ আপনার নিয়ম মেনেও তিন ঘণ্টা বেশি সময় পেলাম না!”
শশাঙ্কবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি পড়ার মাঝে বারবার জানালার বাইরে তাকিয়েছ? অপ্রয়োজনীয় কাজ করেছ? একই বিষয় বারবার পড়েছ, কারণ মনোযোগ ছিল না?”
অদিতি একটু ভেবে মাথা নাড়ল।
“তাহলে সময় কোথায় হারিয়েছে, তা খুঁজে বের করো। সময়ের হিসাব রাখা মানে শুধু ঘড়ির দিকে তাকানো নয়, নিজের অভ্যাসকে চিনতে শেখা।”
পরদিন থেকে অদিতি পড়ার সময়কে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করল। নির্দিষ্ট সময় পড়ল, মাঝখানে বিরতি নিল, তারপর আগের পড়া নিজেকে প্রশ্ন করে যাচাই করল। সব কাজ এক দিনে শেষ করার চেষ্টা না করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে করল।
এক সপ্তাহ পরে তার পড়ার গতি বেড়ে গেল। শুধু তাই নয়, সে প্রতিদিন কিছুটা সময় গান শোনার এবং মায়ের সঙ্গে গল্প করার জন্যও রাখতে পারল।
পরীক্ষার আগের দিন অদিতি আবার ‘সময়ের ঘর’-এ এল। বলল, “কাকু, এখন আর আমার তিন ঘণ্টা বাড়তি সময় দরকার হয় না। যে সময়টুকু আছে, সেটাই ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি।”
শশাঙ্কবাবু মৃদু হাসলেন। “তাহলে তোমার ভাড়া শেষ।”
অদিতি কৌতূহল নিয়ে খাতার দিকে তাকাল। “এবার কি অন্য কাউকে সময় দেবেন?”
বৃদ্ধ বললেন, “দেব। তবে মনে রেখো, কেউ কারও জন্য সময় তৈরি করে দিতে পারে না। শুধু সময় নষ্ট হওয়ার পথগুলো বন্ধ করতে সাহায্য করতে পারে।”
অদিতি দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পিছন ফিরে দেখল। বৃদ্ধ খাতার পাতায় নতুন একটি নাম লিখছেন। নামের পাশে লিখলেন—‘নিজের সময় খুঁজে পেতে চায়’।
বাড়ি ফেরার পথে অদিতি বুঝল, সময়ের অভাব অনেক সময় ঘড়ির কাঁটায় থাকে না; থাকে আমাদের ছড়িয়ে থাকা মনোযোগে, অগোছালো অভ্যাসে এবং কোন কাজটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে না পারার মধ্যে।
পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন অদিতি খুব ভালো নম্বর পেল। কিন্তু তার কাছে সাফল্য শুধু নম্বর ছিল না। সে শিখেছিল, নিজের সময়কে সম্মান করা মানে নিজের জীবনকেও সম্মান করা।
অনেক দিন পরে সে আবার বাজারে গেল। কিন্তু ‘সময়ের ঘর’ নামে কোনও দোকান খুঁজে পেল না। সেখানে তখন একটি ছোট্ট সাধারণ বইয়ের দোকান।
দোকানের মালিক জানালেন, শশাঙ্কবাবু বহু বছর আগেই মারা গিয়েছেন। তবে তাঁর একটি খাতা দোকানের পুরনো আলমারিতে রাখা আছে।
অদিতি খাতাটি খুলে শেষ পাতায় একটি বাক্য দেখতে পেল—
“সময় কারও সম্পত্তি নয়। কিন্তু সময়কে কীভাবে ব্যবহার করবে, সেই সিদ্ধান্ত তোমার।”
অদিতি বাক্যটি নিজের ডায়েরিতে লিখে নিল। তার মনে হলো, শশাঙ্কবাবুর দোকান হয়তো সত্যিই জাদুর ছিল না, কিন্তু সেখানে পাওয়া শিক্ষা তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে।
শিক্ষা: সময় বাড়ানো সম্ভব নয়, কিন্তু সময়ের সঠিক ব্যবহার শেখা সম্ভব। মনোযোগ, পরিকল্পনা, নিয়মিত বিরতি এবং অপ্রয়োজনীয় অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অল্প সময়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা যায়।