Categories
বিবিধ

যে মেয়েটি নীরবতার ছবি আঁকত।

শহরের এক প্রান্তে ছিল একটি বিশেষ বিদ্যালয়। সেখানে এমন সব শিশু পড়তে আসত, যাদের শেখার ধরন ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। কেউ কথা বলতে অসুবিধা অনুভব করত, কেউ শব্দের চেয়ে ছবি সহজে বুঝতে পারত, আবার কেউ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য সময় নিত একটু বেশি।

সেই বিদ্যালয়ের পাশের বাড়িতে থাকত পনেরো বছরের মেয়ে মেঘলা। ছবি আঁকতে সে খুব ভালোবাসত। তার খাতায় ফুটে উঠত নদী, পাহাড়, মানুষের মুখ, ভিড়ের রাস্তা কিংবা একাকী দাঁড়িয়ে থাকা গাছ। কিন্তু মেঘলার ছবির একটি বিশেষত্ব ছিল—সে ছবিতে মানুষের মুখের অভিব্যক্তি আঁকতে ভালোবাসত।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় সে দেখল, বিদ্যালয়ের বারান্দায় একটি ছেলে বসে আছে। তার নাম অর্ণব। ছেলেটি নতুন ভর্তি হয়েছে। অন্য শিশুরা মাঠে খেললেও সে চুপচাপ নিজের হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে বসেছিল।

মেঘলা দূর থেকে তাকে লক্ষ করল। পরদিনও একই দৃশ্য। তৃতীয় দিনেও তাই।

একদিন সে সাহস করে অর্ণবের পাশে বসে খাতা খুলল। তারপর একটি কাগজে হাসিমুখ আঁকল, তার পাশে আঁকল দুঃখী মুখ, আর শেষে আঁকল একটি ছোট্ট বিড়াল।

অর্ণব ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে সে বিড়ালটির ছবিতে আঙুল রাখল। তারপর নিজের ব্যাগ থেকে একটি পেন্সিল বের করে কাগজের অন্য পাশে একটি বাড়ি আঁকল।

মেঘলা অবাক হয়ে দেখল, অর্ণবের আঁকার হাত অসাধারণ। কয়েকটি রেখার মধ্যেই সে বাড়ির জানালা, উঠোনে রাখা ফুলের টব আর দরজার সামনে বসে থাকা একটি বিড়াল এঁকে ফেলেছে।

সেদিন তাদের খুব বেশি কথা হয়নি। তবু একটি নতুন বন্ধুত্বের শুরু হলো।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ মেঘলা নিয়মিত অর্ণবের সঙ্গে ছবি আঁকতে লাগল। কখনও তারা রং মেলাত, কখনও অসম্পূর্ণ ছবিতে নতুন কিছু যোগ করত। অর্ণব কথা বলতে স্বচ্ছন্দ ছিল না, কিন্তু ছবির মাধ্যমে সে নিজের পছন্দ, অপছন্দ আর অনুভূতি বোঝাতে পারত।

মেঘলা বুঝতে শিখল, কারও কথা কম বলার অর্থ এই নয় যে তার মনে বলার মতো কিছু নেই।

একদিন বিদ্যালয়ে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল। শিক্ষকরা ঠিক করলেন, বিদ্যালয়ের করিডরে শিশুদের আঁকা ছবি দিয়ে একটি প্রদর্শনী করা হবে। মেঘলা প্রস্তাব দিল, অর্ণবের ছবিগুলিও সেখানে রাখা হোক।

একজন শিক্ষক বললেন, “ও কি নিজের ছবিগুলো অন্যদের দেখাতে চাইবে?”

মেঘলা বলল, “ওকে জিজ্ঞেস করলেই তো জানা যাবে।”

সে অর্ণবের সামনে কয়েকটি ছবি রাখল এবং প্রদর্শনীর একটি ছোট্ট পোস্টার দেখাল। অর্ণব প্রথমে দ্বিধা করল। তারপর নিজের আঁকা বাড়িটির ছবিটি বেছে নিয়ে পোস্টারের পাশে রাখল।

অনুষ্ঠানের দিন করিডরে অনেক মানুষ এলেন। কেউ রঙের ব্যবহার দেখে প্রশংসা করলেন, কেউ ছবির গল্প জানতে চাইলেন। অর্ণব প্রথমে একটু অস্বস্তি বোধ করলেও শিক্ষক তার পাশে দাঁড়ালেন। মেঘলা ছবির পাশে একটি ছোট্ট লেখা লাগিয়ে দিল—‘একটি বাড়ি, যেখানে কেউ একা নয়।’

একজন দর্শক ছবিটি দেখে বললেন, “এত সুন্দর ছবি! ছেলেটি কী বলতে চেয়েছে?”

মেঘলা উত্তর দিল, “ছবিটি ওর নিজের। ওর কাছ থেকেই জানতে হবে। আমরা শুধু অনুমান করতে পারি।”

তারপর সে অর্ণবকে ছবিটির দিকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করল, সে কি ছবির গল্প বোঝাতে চায়। অর্ণব ধীরে ধীরে ছবির বাড়ি, ফুলের টব এবং বিড়ালটির দিকে আঙুল দেখাল। শিক্ষক তার ইশারা ও পরিচিত যোগাযোগপদ্ধতির সাহায্যে কথাগুলোর অর্থ বুঝতে সাহায্য করলেন।

অর্ণব বোঝাতে চেয়েছিল, তার বাড়িতে একটি বিড়াল আছে। স্কুলে যখন তার মন খারাপ হয়, তখন সে সেই বিড়ালটির কথা ভাবে। বিড়ালটি তার কাছে নিরাপত্তা আর ভালোবাসার প্রতীক।

সেদিন ছবিটি প্রদর্শনীর বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠল। কিন্তু মেঘলার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল অন্য কিছু। অনুষ্ঠান শেষে অর্ণব নিজে থেকে তার খাতা খুলে নতুন একটি ছবি আঁকতে শুরু করেছিল। ছবিতে ছিল দুটি শিশু, পাশাপাশি বসে আছে। একজনের হাতে রংতুলি, অন্যজনের হাতে পেন্সিল।

ছবিটি শেষ করে অর্ণব মেঘলার দিকে তাকিয়ে হাসল।

মেঘলা বুঝল, বন্ধুত্বের জন্য সব সময় একই ভাষায় কথা বলতে হয় না। কখনও মনোযোগ দিয়ে দেখা, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা এবং অন্যের প্রকাশের ধরনকে সম্মান করাই যথেষ্ট।

এরপর বিদ্যালয়ে একটি ছোট্ট শিল্পকর্মের দল তৈরি হলো। সেখানে প্রত্যেক শিশুকে নিজের মতো করে ছবি আঁকা, রং করা কিংবা অন্য কোনও সৃজনশীল কাজ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো। কেউ মুখে গল্প বলল, কেউ ছবি আঁকল, কেউ আবার পরিচিত ইশারা ব্যবহার করে নিজের ভাবনা প্রকাশ করল।

মেঘলা প্রায়ই সেই দলের কাছে যেত। সে কাউকে শেখাতে যাওয়ার আগে জানতে চাইত, সে কী করতে চায়।

বছর কয়েক পরে মেঘলা শিল্পকলার পড়াশোনা শুরু করল। তার স্বপ্ন ছিল এমন একটি জায়গা তৈরি করা, যেখানে মানুষ নিজের অনুভূতি প্রকাশের জন্য নিরাপদ পরিবেশ পাবে—কথায়, ছবিতে কিংবা নিজের পছন্দের অন্য কোনও মাধ্যমে।

তার খাতার প্রথম পাতায় সে লিখেছিল—

‘সবাই একইভাবে কথা বলে না, কিন্তু প্রত্যেকের অনুভূতি শোনার মতো মূল্যবান।’

শিক্ষা: মানুষের সঙ্গে সত্যিকারের যোগাযোগ গড়ে তুলতে শুধু কথা বললেই হয় না; মনোযোগ দিয়ে বুঝতেও হয়। প্রত্যেকের প্রকাশের ধরনকে সম্মান করা এবং নিজের ধারণা চাপিয়ে না দেওয়াই সহমর্মিতার প্রকৃত পরিচয়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *