Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে বাড়িতে কেউ নিজের নাম বলতে পারে না ((প্রথম পর্ব: মধ্যরাতের চিঠি))।

রাত তখন ১১টা ৪০ মিনিট। কলকাতার আকাশে সারাদিনের বৃষ্টির পরও মেঘ জমে আছে। রাস্তার বাতিগুলো কুয়াশার মতো ভেজা বাতাসে ঝাপসা হয়ে উঠেছে। উত্তর কলকাতার একটি পুরোনো বাড়ির দোতলার ঘরে বসে সাংবাদিক ঈশান সেন কম্পিউটারে খবর লিখছিল।

হঠাৎ দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।

টক।

টক।

টক।

ঈশান বিরক্ত হয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। এত রাতে কে এল?

দরজা খুলতেই সে দেখল, বাইরে কেউ নেই। শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি বাদামি খাম। খামের ওপর কালো কালিতে লেখা—

‘ঈশান সেনের জন্য। আজ রাতেই খুলবেন।’

খামের নিচে প্রেরকের নাম নেই। ডাকটিকিট নেই। এমনকি খামটি দরজার নিচ দিয়ে ঢোকানো হয়েছে, নাকি কেউ রেখে গেছে, তারও কোনও চিহ্ন নেই।

ঈশান খামটি তুলে ঘরে ফিরল।

ভেতরে ছিল একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি এবং হাতে লেখা একটি চিঠি।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটি বিশাল জমিদারবাড়ি। বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাতজন মানুষ। ছবির পেছনে লেখা—‘রায়বাড়ি, শালবন, ১৯৮৭।’

চিঠিতে লেখা—

‘ঈশান,

তুমি হয়তো আমাকে চেনো না। কিন্তু তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের উত্তর আমার কাছে রয়েছে।

আগামীকাল রাত বারোটার আগে শালবনের রায়বাড়িতে পৌঁছোবে। বাড়ির উত্তর দিকের দরজাটি খোলা পাবে। ভেতরে ঢোকার পর কেউ তোমার নাম জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দেবে না।

বিশেষ করে, বাড়ির যে মেয়েটি তোমাকে তোমার মায়ের নামে ডাকবে, তাকে বিশ্বাস করবে না।

আর একটি কথা—বাড়িতে আটজন মানুষ থাকবে। কিন্তু ছবিতে মাত্র সাতজন।

অষ্টম মানুষটি কে, সেটা জানার চেষ্টা কোরো না।

যদি নিজের অতীত জানতে চাও, তবে এসো।

—যে তোমার জন্মের সত্যিটা জানে।’

চিঠিটি পড়ে ঈশানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি তৈরি হলো।

তার মা মারা গিয়েছিলেন যখন সে মাত্র দশ বছরের। বাবার কাছ থেকে সে জেনেছিল, জন্মের সময় তার মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং কয়েক বছর পরেই মারা যান। বাবা কোনও দিন মায়ের অতীত নিয়ে কথা বলতে চাইতেন না। ঈশান বহুবার জানতে চেয়েও কোনও উত্তর পায়নি।

কিন্তু এই চিঠি তার জন্মের সত্যি জানে কীভাবে?

আর ছবির বাড়িটি?

ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার মুখটি দেখে ঈশানের হাত কেঁপে উঠল।

মহিলাটির মুখ তার মায়ের ছবির সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।

কিন্তু ছবিটি তোলা হয়েছে ১৯৮৭ সালে। ঈশানের জন্ম তারও কয়েক বছর পরে।

মা তাহলে সেই বাড়িতে কী করছিলেন?


পরদিন সন্ধ্যায় ঈশান তার বন্ধু অনির্বাণকে ফোন করল। অনির্বাণ পেশায় ফটোগ্রাফার এবং পুরোনো বাড়ি ও পরিত্যক্ত স্থাপত্য নিয়ে কাজ করে।

ছবিটি দেখে অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“এই বাড়িটা আমি কোথাও দেখেছি,” সে বলল।

“কোথায়?”

“পুরোনো একটা সংবাদপত্রের আর্কাইভে। শালবনের রায়বাড়ি নিয়ে একটা খবর ছিল। ১৯৮৭ সালে বাড়ির আটজন বাসিন্দা এক রাতের মধ্যে নিখোঁজ হয়ে যান। আশ্চর্যের বিষয়, বাড়ির দরজা-জানালা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। কোনও ভাঙচুরের চিহ্ন ছিল না। শুধু বসার ঘরের দেয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা ছিল—‘আমাদের মধ্যে একজন মানুষ নয়।’”

ঈশান চুপ করে গেল।

“তারপর কী হয়েছিল?”

“পুলিশ তদন্ত করেছিল। কিন্তু কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস পর বাড়িটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। গ্রামের লোকজন বলে, রাত বারোটার পর বাড়ির ভেতর থেকে মানুষের কথাবার্তা শোনা যায়। কেউ কেউ জানালায় আটজনের ছায়াও দেখেছে।”

“তুমি কি আমার সঙ্গে যাবে?”

অনির্বাণ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।

“যাব। তবে একটা কথা বলি—তুমি যদি সত্যিই যাও, সবকিছু রেকর্ড করবে। ছবি, শব্দ, দরজা, জানালা—সব। কোনও রহস্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা ভুলে যেয়ো না।”

ঈশান রাজি হলো।

রাত সাড়ে দশটায় তারা শালবনের উদ্দেশে রওনা দিল।


শালবন পৌঁছোতে রাত প্রায় ১১টা ৪৫ মিনিট।

গাড়ির হেডলাইটে দেখা গেল সরু রাস্তার দু’পাশে ঘন গাছপালা। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। গ্রামের বাড়িগুলোর অধিকাংশে আলো নিভে গেছে।

রায়বাড়ির সামনে পৌঁছে দু’জনই গাড়ি থামাল।

বিশাল লোহার ফটকটি অর্ধেক খোলা। তার গায়ে মরচে, চারপাশে বুনো লতা। বাড়ির দেয়ালে ফাটল ধরেছে। ছাদের কার্নিশ থেকে ঝুলছে শুকনো গাছের শিকড়। অথচ দোতলার একটি জানালায় মৃদু হলুদ আলো জ্বলছে।

অনির্বাণ ক্যামেরা বের করল।

“অদ্ভুত ব্যাপার,” সে বলল। “বাড়িতে কেউ থাকে না বলে শুনেছিলাম। তাহলে আলো জ্বলছে কীভাবে?”

ঈশান উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই ফটকের ভেতর থেকে একটি বৃদ্ধ কণ্ঠ শোনা গেল।

“এত দেরি করলে কেন, বাবু?”

দু’জন চমকে উঠল।

ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধ। পরনে সাদা ধুতি, গায়ে কালো চাদর। মুখে গভীর বলিরেখা। চোখ দুটি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।

ঈশান জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কে?”

বৃদ্ধ বললেন, “আমি এই বাড়ির দেখাশোনা করি। তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”

“আমার নাম আপনি জানলেন কীভাবে?”

বৃদ্ধের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।

“এই বাড়িতে কারও নাম জানতে হয় না। বাড়ি নিজেই সবাইকে চিনে নেয়।”

কথাটি বলে তিনি উত্তর দিকের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

ঈশান চিঠির নির্দেশ মনে করে অনির্বাণের দিকে তাকাল। দু’জনেই কোনও কথা না বলে বৃদ্ধের পিছু নিল।

দরজাটি সত্যিই খোলা ছিল।

ভেতরে ঢুকতেই ঈশান অনুভব করল, বাড়ির ভেতরের বাতাস বাইরের তুলনায় অনেক ঠান্ডা। দেয়ালে পুরোনো তৈলচিত্র, কাঠের মেঝে, ধুলো জমা আসবাব। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কোথাও মাকড়সার জাল নেই। টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানিতে তাজা ফুল। আর একটি কোণে রাখা গ্রামোফোন থেকে খুব আস্তে পুরোনো গান বাজছে।

বৃদ্ধ বললেন, “বসার ঘরে যাও। সবাই অপেক্ষা করছে।”

“কারা সবাই?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

তিনি সিঁড়ির দিকে চলে গেলেন।

ঈশান ও অনির্বাণ বসার ঘরে প্রবেশ করল।

ঘরের মাঝখানে একটি লম্বা টেবিল। টেবিলের চারপাশে বসে আছে সাতজন মানুষ—চারজন পুরুষ, তিনজন মহিলা। সবার পোশাক পুরোনো দিনের। তাদের মুখে অদ্ভুত স্থিরতা। কেউ কথা বলছে না।

ঈশান ঘরে ঢুকতেই সাত জোড়া চোখ একসঙ্গে তার দিকে ঘুরে গেল।

টেবিলের মাথায় বসা এক বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালেন।

“এসেছিস অবশেষে!”

ঈশান অবাক হয়ে বলল, “আপনি আমাকে চেনেন?”

বৃদ্ধা এগিয়ে এসে তার মুখ স্পর্শ করতে গেলেন।

“তোকে চিনব না? তুই তো আমার—”

হঠাৎ তিনি থেমে গেলেন।

তার চোখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

“না! না, এ কথা বলা যাবে না!”

তিনি দ্রুত নিজের মুখ দু’হাতে ঢেকে চেয়ারে বসে পড়লেন।

অনির্বাণ ঈশানের কানে ফিসফিস করে বলল, “এখানে কিছু একটা ভীষণ ভুল হচ্ছে। চল, বেরিয়ে যাই।”

কিন্তু তারা দরজার দিকে ঘুরতেই দেখল, দরজাটি বন্ধ।

ঈশান হাতল টানল। দরজা নড়ল না।

টেবিলের মাথায় বসা আরেকজন পুরুষ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

“এখন আর যাওয়া যাবে না। রাত বারোটা বাজতে চলেছে।”

দেয়ালের ঘড়িতে তখন ১১টা ৫৯ মিনিট।

এক মিনিট পর ঘড়ির ঘণ্টা বাজল।

ঢং।

ঢং।

ঢং।

প্রতিটি ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে ঘরের আলো একটু একটু করে নিভে যেতে লাগল।

শেষ ঘণ্টাটি বাজতেই পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে গেল।

অনির্বাণ চিৎকার করে উঠল, “ঈশান!”

ঈশান হাত বাড়িয়ে বন্ধুর হাত খুঁজল। কিন্তু তার আঙুলে স্পর্শ লাগল ঠান্ডা, ভেজা কিছু একটা।

সে ভাবল, অনির্বাণের হাত।

কিন্তু সেই হাতের আঙুল ছিল অস্বাভাবিক লম্বা। বরফের মতো ঠান্ডা। আর হাতের তালুর মাঝখানে যেন একটি ছোট্ট চোখ।

ঈশান হাত সরিয়ে নিতে গিয়ে হোঁচট খেল।

ঠিক তখনই অন্ধকারের মধ্যে একজন মহিলা তার কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন—

“ঈশান, তুই আমাকে চিনতে পারছিস না?”

কণ্ঠটি শুনে তার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল।

এই কণ্ঠ সে কোনও দিন ভুলতে পারে না।

এটি তার মায়ের কণ্ঠ।

“মা?” ঈশানের মুখ থেকে শব্দটি বেরিয়ে এল।

সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের সমস্ত মানুষ একযোগে চিৎকার করে উঠল—

“নাম বলিস না!”

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

দেয়ালের ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করেছে। টেবিলের ওপর রাখা ছবিগুলো একে একে মেঝেতে পড়ে ভেঙে যাচ্ছে। ঘরের সাতজন মানুষ নিজেদের মুখ আঁচড়াতে শুরু করেছে।

অন্ধকারের মধ্যে মায়ের কণ্ঠ আবার শোনা গেল।

“তুই আমার ছেলে নোস, ঈশান।”

ঈশান জমে গেল।

“কী বলছ, মা?”

“তোর জন্মের রাতে যে শিশুটিকে আমি কোলে নিয়েছিলাম, সে তুই ছিলি না।”

ঠিক সেই মুহূর্তে অনির্বাণের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল।

এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর আলোকিত হয়ে গেল।

ঈশান দেখল, টেবিলের চারপাশে সাতজন নয়, আটজন বসে আছে।

অষ্টম মানুষটি তার নিজের মুখ নিয়ে তার ঠিক বিপরীতে বসে আছে।

একই চোখ, একই নাক, একই চেহারা।

শুধু তার গলায় গভীর একটি ক্ষত।

সেই মানুষটি ঈশানের দিকে তাকিয়ে হাসল।

“অবশেষে দেখা হলো, ভাই।”

তারপর আলো নিভে গেল।

আর অন্ধকারের মধ্যে ঈশান অনুভব করল, কেউ তার কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলছে—

“এবার বল, আমাদের মধ্যে আসল ঈশান কে?”

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *