Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ ট্রেনের যাত্রী ((তৃতীয় পর্ব: যে যাত্রী কখনও মারা যায়নি))।

শেষ পর্ব

রাত ১২টা ১২ মিনিট।

স্মৃতিপুরের আকাশে কোনও চাঁদ নেই। কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে রাস্তা, বাড়িঘর, গাছপালা—এমনকি দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অভিশপ্ত নীলচে-কালো ট্রেনটিও। শুধু তার জানালাগুলোয় জ্বলছে অসংখ্য হলুদ আলো। প্রতিটি আলো যেন কোনও এক মৃত মানুষের শেষ স্মৃতি।

অয়ন বসু দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো বসু বাড়ির সদর দরজায়। তার হাতে মোবাইল ফোন। পর্দায় এখনও জ্বলজ্বল করছে সেই বার্তা—

‘দাদা, আমি এখনও বেঁচে আছি। কিন্তু ট্রেনটা আমাকে খুঁজছে। আমাকে বাঁচাতে হলে, আগামী রাত ১২টা ১৩ মিনিটের আগে তোমাকে নিজের মৃত্যুর সত্যিটা জানতে হবে।’

অয়নের মাথায় অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরছে।

মেঘলা যদি বেঁচে থাকে, তাহলে সাত বছর আগে কাকে মৃত বলে শনাক্ত করা হয়েছিল? আর সে নিজে যদি বেঁচে থাকে, তাহলে আয়নার ওপারে দাঁড়ানো সেই রক্তাক্ত মানুষটি কে?

ঠিক তখনই পিছন থেকে ধূসর কোট পরা বৃদ্ধের কণ্ঠ শোনা গেল।

“সময় শেষ হয়ে আসছে, অয়নবাবু।”

অয়ন ঘুরে দাঁড়াল।

“আমি আর কোনও ধাঁধা শুনতে চাই না। আপনি সব জানেন। সত্যিটা বলুন।”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “সত্যিটা আমি বলতে পারি না। কারণ এই ট্রেন কাউকে সত্যি উপহার দেয় না। সে শুধু মানুষকে তার নিজের স্মৃতির সামনে দাঁড় করায়। স্মৃতি যদি মিথ্যে হয়, সত্যিটা আপনাকেই খুঁজে নিতে হবে।”

“তাহলে আমি কোথায় যাব?”

বৃদ্ধ হাত তুলে ট্রেনটির দিকে দেখালেন।

“শেষ কামরায়। সেখানে এমন একজন অপেক্ষা করছে, যার সঙ্গে আপনার দেখা হওয়ার কথা ছিল সাত বছর আগেই।”


অয়ন ট্রেনে উঠতেই দরজাটি নিজে থেকে বন্ধ হয়ে গেল।

কামরার মধ্যে এবার আর কোনও অচেনা যাত্রী নেই। সারি সারি আসন খালি পড়ে আছে। জানালার বাইরে ছুটে চলেছে অন্ধকার। দেয়ালের ঘড়িতে সময় ১২টা ১৩ মিনিট।

অয়ন শেষ কামরার দিকে এগিয়ে গেল।

প্রতিটি দরজার ওপরে একটি করে নাম লেখা। কোথাও ‘অপেক্ষা’, কোথাও ‘অনুশোচনা’, কোথাও ‘অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি’। শেষ দরজাটির ওপরে লেখা—

‘যে সত্যি থেকে পালিয়েছিল।’

দরজাটি খুলতেই অয়ন নিজেকে দেখতে পেল একটি হাসপাতালের ঘরে।

সাদা বিছানা। পাশে চিকিৎসার সরঞ্জাম। জানালার বাইরে বৃষ্টি। বিছানায় শুয়ে আছে এক যুবক, যার মুখ অয়নের মতোই। তার মাথায় ব্যান্ডেজ, শরীরের একাধিক জায়গায় আঘাতের চিহ্ন।

বিছানার পাশে বসে কাঁদছে মেঘলা।

“দাদা, চোখ খোল। প্লিজ, চোখ খোল!”

অয়ন দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এটি কোনও কল্পনা নয়। তার ভেতরে বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা স্মৃতির একটি অংশ।

দৃশ্যের মধ্যে একজন চিকিৎসক এগিয়ে এসে বললেন, “রোগীর অবস্থা এখনও সংকটজনক। মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। জ্ঞান ফিরলেও দুর্ঘটনার আগের স্মৃতি ফিরে পেতে সময় লাগতে পারে।”

মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ডাক্তারবাবু, আমার দাদার কিছু হবে না তো?”

চিকিৎসক কোনও উত্তর দিলেন না।

দৃশ্যটি কেঁপে উঠল। হাসপাতালের আলো নিভে গেল। আবার আলো জ্বলতেই অয়ন দেখল, মেঘলা বিছানার পাশে একা বসে আছে। তার হাতে একটি কাগজ।

সে কাগজে লিখছে—

‘দাদা, তুই যদি কোনও দিন সব ভুলে যাস, তবুও মনে রাখিস, আমি তোকে দোষ দিইনি।’

অয়নের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“আমি হাসপাতালে ছিলাম?” সে বিড়বিড় করে বলল। “তাহলে আমি কীভাবে দুর্ঘটনার পরের সাত বছর কাটালাম?”

পেছন থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠ এল।

“কারণ আপনি দুর্ঘটনার পর বেঁচে গিয়েছিলেন, অয়নবাবু। কিন্তু আপনার স্মৃতির একটা অংশ আর কখনও ফিরে আসেনি।”

অয়ন ঘুরে দেখল বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন।

“আর মেঘলা?”

বৃদ্ধের চোখ নেমে গেল।

“সেই রাতের পর মেঘলা নিখোঁজ হয়েছিল। তার মৃত্যুর কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছিল না। কিন্তু সবাই ধরে নিয়েছিল, সে দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আপনার পরিবার, পুলিশ, সংবাদমাধ্যম—সবাই সেই ধারণাকেই সত্যি বলে মেনে নিয়েছিল।”

অয়নের বুক কেঁপে উঠল।

“কিন্তু আমি তো নিজেই তার মৃত্যুর খবর লিখেছিলাম!”

“আপনি হাসপাতাল থেকে ফিরে সেই খবর লিখেছিলেন। তখন আপনার স্মৃতি অসম্পূর্ণ ছিল। অন্যদের বলা কথাকেই আপনি নিজের স্মৃতি বলে বিশ্বাস করেছিলেন।”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“না… আমি তো সাংবাদিক। আমি প্রমাণ ছাড়া কোনও খবর প্রকাশ করি না।”

বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন, “মানুষ যখন নিজের জীবনের সত্যিটাই ভুলে যায়, তখন অন্যের দেওয়া প্রমাণকে বিশ্বাস করা ছাড়া তার আর কী উপায় থাকে?”


হঠাৎ ট্রেনের জানালায় একটি মুখ ভেসে উঠল।

মেঘলা।

কিন্তু এবার তার মুখে কোনও রক্ত নেই। পরনে সাদা পোশাক, চোখে সেই ছোটবেলার পরিচিত মায়া।

সে জানালার ওপার থেকে হাত রাখল কাচে।

“দাদা!”

অয়ন ছুটে গেল।

“মেঘলা! তুই কোথায়? তুই কি সত্যিই বেঁচে আছিস?”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“আমি বেঁচে আছি। কিন্তু তোকে খুঁজে পাওয়ার জন্য আমাকে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।”

“তাহলে এতদিন কোথায় ছিলি?”

“সেই রাতের দুর্ঘটনার পর আমি কিছুদিন হাসপাতালে ছিলাম। তারপর আমাকে অন্য শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমার স্মৃতিও পুরোপুরি ঠিক ছিল না। আমি শুধু জানতাম, আমার দাদা বেঁচে আছে। কিন্তু তার কাছে পৌঁছনোর কোনও পথ ছিল না।”

অয়ন কাচের ওপর হাত রাখল।

“আমি তোকে খুঁজিনি কেন?”

মেঘলার চোখে জল জমল।

“কারণ তুই নিজের স্মৃতির কাছে বন্দি ছিলি। তুই বারবার সেই রাতের স্বপ্ন দেখতিস, কিন্তু প্রতিবার ঘুম ভাঙার পর সব ভুলে যেতিস। তোর অবচেতন মন তোকে সেই দুর্ঘটনার কাছে ফিরিয়ে আনতে চাইত। আর তুই ভয়ে পালিয়ে যেতিস।”

“কিন্তু এই ট্রেন? এই স্মৃতিপুর? এগুলো কী?”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “এই ট্রেন বাস্তব আর স্মৃতির মাঝখানের এক অদ্ভুত পথ। এখানে মৃতদের স্মৃতি আছে, জীবিতদের অপরাধবোধ আছে, আর আছে এমন কিছু মানুষ, যারা নিজেদের অতীতকে শেষবারের মতো বুঝতে চায়। তুই এখানে এসেছিস নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে।”

“তাহলে স্টেশনে যে দু’জন তোকে দেখেছিলাম?”

“একজন ছিল আমার স্মৃতি, আর অন্যজন ছিল তোর অপরাধবোধের তৈরি প্রতিচ্ছবি। তুই নিজেই বুঝতে পারছিলি না, কোন স্মৃতিটাকে বিশ্বাস করবি। তাই তোর মনে দুটো মেঘলা তৈরি হয়েছিল।”

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

সাত বছর ধরে সে ভেবেছিল, বোনের মৃত্যুর জন্য সে দায়ী। সেই অপরাধবোধ তাকে নিজের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে রেখেছিল।

কিন্তু সত্যিটা এখনও অসম্পূর্ণ।

“সেই রাতে আসলে কী হয়েছিল, মেঘলা? গাড়িতে তৃতীয় মানুষটি কে ছিল?”

মেঘলার মুখ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল।

“তুই কি সত্যিই জানতে চাস?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে শেষ দরজাটা খুলে দে। সেখানে তোর সবচেয়ে ভয়ংকর স্মৃতি অপেক্ষা করছে।”


ট্রেনের শেষ প্রান্তে একটি কালো দরজা দেখা গেল।

অয়ন কাছে যেতেই দরজায় লাল অক্ষরে ফুটে উঠল—

‘প্রবেশ করলে আর মিথ্যে মনে করা যাবে না।’

অয়ন দরজা খুলল।

পরমুহূর্তে সে ফিরে গেল সাত বছর আগের সেই বর্ষার রাতে।

কলকাতার বাইরে একটি নির্জন রাস্তা। প্রবল বৃষ্টি। রাস্তার ওপর জল জমে আছে। গাড়ির ভেতরে অয়ন স্টিয়ারিং ধরে বসে। পাশের আসনে মেঘলা। পেছনের আসনে একজন পুরুষ।

সেই পুরুষের মুখ দেখতে পেয়ে অয়ন স্তব্ধ হয়ে গেল।

তার বাবা।

অয়ন কাঁপতে কাঁপতে বলল, “বাবা?”

দৃশ্যের মধ্যে বাবা চিৎকার করে বলছেন, “অয়ন, গাড়ি থামা! এভাবে গাড়ি চালাস না!”

মেঘলা কাঁদছে।

“দাদা, তুই শান্ত হ! আমরা বাড়ি ফিরে যাব। আমি কোথাও যাচ্ছি না।”

কিন্তু তরুণ অয়ন রাগে অন্ধ। সে বলছে, “সবাই আমার কাছ থেকে চলে যেতে চায়! তুইও চলে যাবি, তাই না?”

মেঘলা মাথা নাড়ছে।

“আমি তোকে ছেড়ে যাচ্ছি না, দাদা। আমি শুধু নিজের জীবনটা নিজের মতো করে শুরু করতে চাই।”

“তাহলে আগে আমাকে বলতে পারতিস!”

“আমি বলতেই তো চেয়েছিলাম!”

গাড়ির ভেতরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর পেছনের আসন থেকে বাবা বললেন, “অয়ন, রাগের মাথায় কিছু করিস না। তোর বোনের কথা শোন।”

অয়ন স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দ্রুত গাড়ি চালাতে শুরু করল। বৃষ্টিতে রাস্তা দেখা যাচ্ছে না।

একটি বাঁক।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের আলো।

মেঘলার চিৎকার—

“দাদা, সাবধান!”

তারপর প্রচণ্ড ধাক্কা।

কাচ ভাঙার শব্দ।

লোহার সঙ্গে লোহার সংঘর্ষ।

আর অন্ধকার।

অয়ন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

“আমি… আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম…”

বৃদ্ধের কণ্ঠ ভেসে এল, “হ্যাঁ। কিন্তু আপনি একা দায়ী ছিলেন না। দুর্ঘটনায় আপনার বাবা ঘটনাস্থলেই মারা যান। আপনি এবং মেঘলা গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার হন। পরে হাসপাতালে আপনার জ্ঞান ফিরলেও স্মৃতির অনেকটা অংশ হারিয়ে যায়। মেঘলাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।”

অয়ন কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে আমি এতদিন বাবাকেও ভুলে গিয়েছিলাম?”

“আপনি ঘটনাটির কিছু অংশ মনে রেখেছিলেন। কিন্তু নিজের অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে আপনার মন সেই স্মৃতিগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে রেখেছিল। আপনি ভাবতেন, মেঘলার মৃত্যু হয়েছে আপনার জন্য। সেই বিশ্বাসই আপনাকে নিজের জীবন থেকে পালাতে বাধ্য করেছে।”

অয়ন মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল।

“আমি বাবাকে মেরেছি… আমি আমার বোনকে হারিয়েছি…”

মেঘলা তার পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসল।

“না, দাদা। তুই ইচ্ছে করে কাউকে মারিসনি। তুই রাগ করেছিলি, ভুল করেছিলি, বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালিয়েছিলি। সেই ভুলের ভয়ংকর পরিণতি হয়েছিল। কিন্তু ভুলের জন্য অনুশোচনা করা আর সারাজীবন নিজেকে শাস্তি দেওয়া এক কথা নয়।”

অয়ন তার দিকে তাকাল।

“তুই আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছিস?”

মেঘলা মৃদু হাসল।

“আমি তোকে কোনও দিন ঘৃণা করিনি। কিন্তু তোকে একটা কথা বলার ছিল। তুই যদি নিজেকে ক্ষমা করতে না পারিস, তাহলে আমার কাছে ফিরে আসার সাহসও পাবি না।”

ঠিক তখনই ট্রেনের সমস্ত আলো একসঙ্গে নিভে গেল।

বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন, “দ্রুত! সময় শেষ হয়ে আসছে!”

অন্ধকারের মধ্যে একটি বিশাল দরজা খুলে গেল। দরজার ওপারে দেখা গেল সেই প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রথমবার অয়ন ট্রেনে উঠেছিল।

কিন্তু এবার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত যাত্রী অয়নের দিকে তাকিয়ে আছে।

তাদের চোখে একই প্রশ্ন—

‘তুমি কি ফিরতে চাও?’


অয়ন মেঘলার হাত ধরল।

“চল, আমরা একসঙ্গে ফিরব।”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“আমি ফিরব, দাদা। কিন্তু তোর ফেরার পথ আলাদা।”

“কেন?”

“কারণ তুই এখনও জীবিত। এই ট্রেন মৃতদের স্মৃতি আর জীবিতদের অনুশোচনার মধ্যে চলাচল করে। তুই এখানে নিজের অতীতের মুখোমুখি হতে এসেছিলি। এখন তোর সামনে দুটো পথ। এক, তুই এখানেই থেকে যাবি, সেই রাতের স্মৃতিকে বারবার বাঁচতে বাঁচতে। দুই, তুই সত্যিটা মেনে নিয়ে নিজের জীবনে ফিরে যাবি।”

অয়ন জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে ভোরের প্রথম আলো ফুটছে। ট্রেনের ঘড়িতে সময় বদলেছে।

১২টা ১৪।

১২টা ১৫।

১২টা ১৬।

সাত বছর পর সময় আর থেমে নেই।

“তুই কি আমার সঙ্গে ফিরতে পারবি না?”

মেঘলা তার হাত শক্ত করে ধরল।

“আমি ফিরব। কিন্তু তুই আগে ফিরবি। তোর জীবনে এখনও অনেক কাজ বাকি। বাবার স্মৃতিকে সম্মান করতে হবে, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, আর সত্যিটা লিখতে হবে—যাতে আর কোনও পরিবার অসম্পূর্ণ খবরের আড়ালে হারিয়ে না যায়।”

অয়নের চোখে জল।

“তুই আমাকে আবার ছেড়ে চলে যাবি?”

মেঘলা তার কপালে হাত রাখল।

“কেউ কাউকে সত্যি ভালোবাসলে, সে সব সময় পাশে না থাকলেও তার ভালোবাসা হারিয়ে যায় না।”

ট্রেনের দরজা খুলে গেল।

বৃদ্ধ এগিয়ে এসে অয়নের হাতে একটি নতুন টিকিট দিলেন।

এবার টিকিটে লেখা—

‘যাত্রী: অয়ন বসু। গন্তব্য: বর্তমান। প্রস্থান: ১৭ নভেম্বর ২০১৯, রাত ১২টা ১৩ মিনিট। ফেরার টিকিট: আছে।’

অয়ন অবাক হয়ে বৃদ্ধের দিকে তাকাল।

“আপনি কে? কেন আমাকে সাহায্য করলেন?”

বৃদ্ধের মুখে এক শান্ত হাসি ফুটল।

“আমি শুধু পথ দেখাই। মানুষকে তার নিজের সত্যির কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার কাজ।”

“আপনিও কি কোনও দিন এই ট্রেনে উঠেছিলেন?”

বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকালেন।

“অনেক বছর আগে। আমিও এক অসমাপ্ত প্রশ্ন নিয়ে এসেছিলাম। তারপর বুঝেছিলাম, সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। কিন্তু যে প্রশ্নের উত্তর জানা সম্ভব, তার থেকে পালিয়ে থাকা উচিত নয়।”

অয়ন কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বৃদ্ধ ধীরে ধীরে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।

শুধু তাঁর লণ্ঠনটি পড়ে রইল প্ল্যাটফর্মে।


অয়ন চোখ খুলল হাসপাতালের বিছানায়।

জানালা দিয়ে সকালের আলো এসে পড়েছে। পাশে একজন নার্স দাঁড়িয়ে। দূরে চিকিৎসক কথা বলছেন।

“অয়নবাবু, শুনতে পাচ্ছেন? আপনি জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন!”

অয়ন কথা বলতে চাইল, কিন্তু গলা শুকিয়ে গেছে। সে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, “আমার বোন… মেঘলা কোথায়?”

চিকিৎসক অবাক হয়ে তাকালেন।

“আপনার বোন? আমরা তো জানতাম, দুর্ঘটনায় আপনার পরিবারের অন্য সদস্য মারা গিয়েছিলেন। আপনি অনেক দিন ধরে অচেতন ছিলেন। আপনার বোনের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনও নতুন খবর নেই।”

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

সে কি স্বপ্ন দেখেছিল? সেই ট্রেন, স্মৃতিপুর, বৃদ্ধ, দুই মেঘলা—সবই কি তার আহত মনের তৈরি কল্পনা?

ঠিক তখনই নার্স বললেন, “আপনার জন্য একজন দেখা করতে এসেছেন।”

দরজা খুলে একজন তরুণী ভেতরে এল।

পরনে হালকা নীল পোশাক। চোখে জল। হাতে একটি পুরোনো ছাতা।

অয়ন তাকিয়ে রইল।

“মেঘলা?”

তরুণী ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার হাত ধরল।

“দাদা।”

অয়নের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তুই বেঁচে আছিস!”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। আমি বেঁচে আছি।”

“তুই কোথায় ছিলি এতদিন?”

“অন্য শহরে চিকিৎসা চলছিল। পরে নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে অনেক সময় লেগেছে। তোর খবর পেয়েছিলাম, কিন্তু তোর জ্ঞান ফিরবে কি না জানতাম না। অবশেষে হাসপাতাল থেকে খবর পেলাম।”

অয়ন তার হাত শক্ত করে ধরল।

“আমি তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমি বাবার মৃত্যুর জন্য, দুর্ঘটনার জন্য…”

মেঘলা তাকে থামিয়ে দিল।

“আমরা পরে সব কথা বলব। এখন তুই সুস্থ হয়ে ওঠ। তারপর একসঙ্গে বাবার স্মৃতির সামনে দাঁড়াব।”

অয়ন মাথা নাড়ল।

হাসপাতালের জানালা দিয়ে তখন রোদ এসে পড়েছে। বহু বছরের অন্ধকারের পর তার মনে হলো, পৃথিবীটা আবার নতুন করে শুরু হতে পারে।


কয়েক মাস পর।

অয়ন আবার সাংবাদিকতার কাজে ফিরেছে। কিন্তু এবার তার লেখার ধরন বদলে গেছে। সে শুধু ঘটনার বিবরণ লেখে না, ঘটনার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কথাও খোঁজে। কোনও খবর প্রকাশ করার আগে সে প্রতিটি তথ্য যাচাই করে। কারণ সে জানে, অসম্পূর্ণ সত্য কখনও কখনও একটি পরিবারের জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দিতে পারে।

মেঘলা এখন তার কাছেই থাকে। দু’জনে মিলে বাবার পুরোনো ছবিগুলো সাজিয়েছে। বসু বাড়ির একটি ঘর নতুন করে তৈরি করেছে। সেখানে রাখা হয়েছে বাবার ছবি, মায়ের ছবি, আর ছোটবেলার অয়ন-মেঘলার একটি পারিবারিক ছবি।

একদিন রাতে অয়ন তার ডায়েরি খুলে লিখতে বসেছিল।

শিরোনাম লিখল—

‘শেষ ট্রেনের যাত্রী: একটি অসমাপ্ত রাতের সত্যি।’

লিখতে লিখতে তার চোখ পড়ল টেবিলের কোণে রাখা পুরোনো কালো টিকিটটির দিকে।

সেটি সে হাসপাতাল থেকে ফিরে নিজের জামার পকেটে পেয়েছিল।

এতদিন টিকিটটি ফাঁকা ছিল।

কিন্তু সেদিন হঠাৎ তার গায়ে কয়েকটি অক্ষর ফুটে উঠল—

‘যাত্রী: অয়ন বসু। গন্তব্য: বাড়ি। যাত্রা: সম্পূর্ণ।’

অয়ন বিস্ময়ে টিকিটটি হাতে তুলে নিল।

তারপর জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে কোথাও যেন ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

একবার।

তারপর আরেকবার।

অয়ন জানালা খুলে বাইরে তাকাল। রাস্তা ফাঁকা। আকাশে পূর্ণিমার আলো। কোনও ট্রেন নেই, কোনও স্টেশন নেই।

শুধু দূরের অন্ধকারে একটি ক্ষীণ হলুদ আলো জ্বলল, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

অয়ন মৃদু হাসল।

সে বুঝতে পারল, কিছু স্মৃতি কখনও পুরোপুরি মুছে যায় না। কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষকে সারাজীবন খুঁজতে হয়। আর কিছু যাত্রা শেষ হয় তখনই, যখন মানুষ নিজের অতীতকে অস্বীকার না করে তাকে মেনে নিতে শেখে।

সে ডায়েরির শেষ পাতায় লিখল—

“মৃত্যু সব সময় জীবনের শেষ নয়। কখনও কখনও অপরাধবোধও মানুষকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করে রাখে। আর মুক্তি আসে তখনই, যখন মানুষ সত্যিকে গ্রহণ করে, নিজের ভুলের দায় স্বীকার করে এবং নতুন করে বাঁচার সাহস খুঁজে পায়।”

ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে মেঘলার কণ্ঠ এল।

“দাদা, ঘুমাবি না?”

অয়ন টিকিটটি ডায়েরির মধ্যে রেখে দিল।

“আসছি।”

সে আলো নিভিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

টেবিলের ওপর খোলা ডায়েরির শেষ পাতায় তখন আরেকটি বাক্য ফুটে উঠল—

‘শেষ ট্রেনটি আবার আসবে। তবে এবার তার যাত্রী জানে, কোন পথে তাকে ফিরতে হবে।’

বাইরে রাত গভীর হলো। শহর ঘুমিয়ে পড়ল। দূরে রেললাইনের ওপর দিয়ে একটি সাধারণ ট্রেন ছুটে গেল, তার জানালায় মানুষের মুখ, জীবনের ব্যস্ততা, আগামী দিনের আশা।

আর অন্ধকারের অনেক দূরে, এমন এক পথে যার অস্তিত্ব কোনও মানচিত্রে নেই, নীলচে-কালো ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করল।

তার শেষ কামরায় ধূসর কোট পরা বৃদ্ধ বসে আছেন। তাঁর সামনে রাখা খাতায় তিনি একটি নাম কেটে দিলেন—

‘অয়ন বসু — যাত্রা সম্পূর্ণ।’

তারপর নতুন একটি নাম লিখলেন।

ট্রেনের ঘড়িতে তখন রাত ১২টা ১৩ মিনিট।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *