Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে মানুষটি কাগজের নৌকা বানাতেন।।

শহরের পুরোনো আদালতপাড়ায় একটি ছোট্ট ফটোকপির দোকান ছিল। দোকানটির মালিক ছিলেন প্রবীর ঘোষ। সারাদিন তিনি মানুষের কাগজপত্রের প্রতিলিপি করতেন—জমির দলিল, চাকরির আবেদন, পরীক্ষার প্রবেশপত্র, ব্যবসার হিসাব, কত কী! কাগজের স্তূপের মাঝেই কেটে যেত তাঁর দিন।

কিন্তু দোকানের একটি অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। প্রতিদিন কাজ শেষ হলে ফেলে দেওয়ার মতো কাগজের টুকরোগুলো তিনি আলাদা করে রাখতেন। সেগুলো দিয়ে বানাতেন ছোট ছোট কাগজের নৌকা।

কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, “কাগজেরও দ্বিতীয় জীবন থাকতে পারে।”

পাড়ার শিশুরা তাঁর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নৌকা বানানো দেখত। কেউ কেউ বাড়ি যাওয়ার সময় একটি করে নৌকা নিয়ে যেত। প্রবীর তাদের শেখাতেন কীভাবে কাগজ ভাঁজ করলে নৌকাটি জলে ভাসবে, আর কীভাবে সামান্য ভুলে সেটি ডুবে যাবে।

এক বর্ষার সকালে দোকানে এল কলেজপড়ুয়া অনিরুদ্ধ। তার হাতে একটি মোটা ফাইল। সে জমির কাগজের প্রতিলিপি করাতে এসেছিল। কাজ শেষ হওয়ার পর প্রবীর লক্ষ করলেন, ছেলেটি দোকানের কোণে রাখা কাগজের নৌকাগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।

প্রবীর জিজ্ঞাসা করলেন, “নৌকা ভালো লাগে?”

অনিরুদ্ধ একটু হেসে বলল, “ছোটবেলায় খুব বানাতাম। এখন আর সময় হয় না।”

“সময় হয় না, নাকি সময় বের করা হয় না?”

প্রশ্নটা শুনে অনিরুদ্ধ চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পরে সে জানাল, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাওয়ার জন্য সে মরিয়া। বাড়িতে আর্থিক সমস্যা। বাবা অসুস্থ, মা সেলাই করে সংসার চালান। পরীক্ষায় ভালো ফল করেও কয়েকটি চাকরির সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। এখন সে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকে।

প্রবীর মন দিয়ে শুনলেন। তারপর একটি কাগজের নৌকা এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এটা নিয়ে যাও। তবে একটা কথা মনে রেখো—নৌকা বানালেই নদী শান্ত থাকবে, এমন নয়। কিন্তু নৌকা বানানো শিখলে ঢেউয়ের মধ্যে চলার একটা উপায় তৈরি হয়।”

অনিরুদ্ধ নৌকাটি নিয়ে বাড়ি ফিরল। কথাটির অর্থ সে পুরোপুরি বুঝতে পারেনি, তবু নৌকাটি নিজের পড়ার টেবিলে রেখে দিল।

পরের কয়েক সপ্তাহে সে নিজের পড়াশোনার পদ্ধতি বদলাল। আগে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই খুলে বসে থাকত, কিন্তু দুশ্চিন্তায় মনোযোগ দিতে পারত না। এবার সে প্রতিদিনের পড়াকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করল। প্রতিদিন কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর লেখা, পুরোনো প্রশ্নপত্র সমাধান করা এবং ভুলগুলো আলাদা খাতায় লিখে রাখা—এই নিয়ম তৈরি করল।

কোনও দিন পরিকল্পনা অনুযায়ী পড়া শেষ হত না। কোনও পরীক্ষায় আবারও প্রত্যাশামতো নম্বর পেত না। তবু সে পুরো দিনের ব্যর্থতা ভেবে নিজেকে দোষারোপ না করে পরদিনের কাজ শুরু করত।

একদিন অনিরুদ্ধ একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হল। চাকরি পেতে আরও কিছু সময় লাগল, কিন্তু সে আর আগের মতো ভেঙে পড়ল না। অবশেষে একটি সরকারি দপ্তরে কাজ পেল।

চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর সে প্রবীরের দোকানে ফিরে এল। সঙ্গে ছিল মিষ্টির বাক্স। দোকানদারকে প্রণাম করে বলল, “আপনার দেওয়া নৌকাটা এখনও আমার কাছে আছে।”

প্রবীর হেসে বললেন, “তাহলে তো নৌকাটা ডোবেনি!”

অনিরুদ্ধ উত্তর দিল, “নৌকাটা কাগজের ছিল, কিন্তু আপনার কথাটা আমার খুব কাজে লেগেছে। আমি বুঝেছি, সব সমস্যা একদিনে সমাধান করা যায় না। তবে প্রতিদিনের ছোট কাজগুলো ঠিকভাবে করলে পথ তৈরি হয়।”

তারপর অনিরুদ্ধ দোকানের কোণে রাখা নৌকাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কি জানেন, আপনার এই নৌকাগুলো শুধু শিশুদের খেলনা নয়? এগুলো মানুষকে নতুন করে শুরু করার কথা মনে করিয়ে দেয়।”

প্রবীর কিছু বললেন না। তিনি আরেকটি কাগজ তুলে নিলেন। সাবধানে চারটি কোণ ভাঁজ করলেন, মাঝখানে চাপ দিলেন, তারপর দুহাতে নৌকাটিকে আকার দিলেন।

বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছিল। নর্দমার জলে একটি ছোট কাগজের নৌকা ভেসে যাচ্ছিল। কোথায় যাবে, কত দূর যাবে, কেউ জানত না। তবু সে এগিয়ে চলেছিল।

প্রবীর তাকিয়ে বললেন, “জীবনও অনেকটা এমন। সব সময় গন্তব্য জানা থাকে না। কিন্তু যতক্ষণ এগিয়ে যাওয়ার শক্তি আছে, ততক্ষণ পথ শেষ হয়ে যায় না।”

শিক্ষা: জীবনের বড় সমস্যাগুলো সব সময় একবারে সমাধান করা সম্ভব নয়। ছোট ছোট বাস্তব পদক্ষেপ, নিয়মিত চেষ্টা এবং ব্যর্থতার পর আবার শুরু করার মানসিকতাই ধীরে ধীরে মানুষকে লক্ষ্যের কাছে পৌঁছে দেয়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *