Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে মেয়েটি প্রতি বছর নিজের শ্রাদ্ধে আসে (ষষ্ঠ পর্ব: মৃত বোনের মুখে জন্মের সত্য)।

লোহার দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।

কোনও মানুষের হাত ছিল না দরজায়। কোনও বাতাসও বইছিল না। তবু বহু বছরের মরচে ধরা দরজাটি এমনভাবে খুলে গেল, যেন ওপার থেকে কেউ দীর্ঘ বারো বছর ধরে অপেক্ষা করছিল—কখন তিয়াসা এসে দাঁড়াবে, কখন তার সামনে শেষ সত্যটি প্রকাশ পাবে।

দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটির মুখ দেখে তিয়াসার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

মুখটি তার মায়ের মতো।

আবার তার নিজের মতোও।

মহিলার কপালের বাঁদিকে ছোট্ট একটা কালো তিল। তিয়াসারও ঠিক সেই জায়গায় একই রকম একটি তিল রয়েছে। মহিলার ডান হাতের কবজিতে সরু পোড়া দাগ। তিয়াসার ছোটবেলার ছবিতেও সেই দাগ দেখা যায়—যদিও তার মা সবসময় বলতেন, ছোটবেলায় প্রদীপের আগুনে হাত পুড়ে গিয়েছিল।

তিয়াসা কাঁপা গলায় বলল, “আপনি কে?”

মহিলাটি একটু হাসল।

“এই প্রশ্নটাই তো তোর এত বছর আগে করা উচিত ছিল, তিয়াসা।”

“আপনি বললেন, আপনি আমার মৃত বোন! কিন্তু আমার তো কোনও বোন ছিল না!”

“ছিল না? নাকি তোকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে তোর কোনও বোন নেই?”

মহিলার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না তিয়াসা।

ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা অমিতাভ সেন হঠাৎ দু’হাতে কান চেপে ধরলেন।

“চুপ করো! আর একটা কথাও বলবে না!”

মহিলাটি তাঁর দিকে তাকাল।

“কেন, অমিতাভ? আবার ভয় পাচ্ছ? বারো বছর আগে যে ভয় তোমাকে একটা মানুষের জীবন কেড়ে নিতে বাধ্য করেছিল, সেই ভয় আজও তোমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে?”

অমিতাভের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“তুমি মরেছ! নিজের চোখে তোমাকে মরতে দেখেছি আমি!”

“তুমি কাকে মরতে দেখেছিলে, সেটা কি একবারও ভেবেছ?”

মহিলার গলা এবার কঠিন হয়ে উঠল।

“তুমি একটা দেহ দেখেছিলে। কিন্তু সেই দেহটা কার ছিল, তা জানার চেষ্টা করোনি। কারণ তুমি সত্যিটা জানতে চাইলে তোমার নিজের অপরাধও প্রকাশ হয়ে যেত।”

তিয়াসা ধীরে ধীরে মহিলার দিকে এগিয়ে গেল।

“আপনি কি আমার মায়ের যমজ বোন?”

মহিলাটি মাথা নাড়ল।

“না।”

“তাহলে?”

“আমি তোর জন্মের আগেই মৃত বলে ঘোষিত হয়েছিলাম। কিন্তু আমার মৃত্যুটা ছিল কাগজে-কলমে। আর তোর জন্মের রাতেই আমার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়েছিল।”

তিয়াসার মাথার ভেতর যেন অসংখ্য প্রশ্ন একসঙ্গে ঘুরতে লাগল।

“আপনার নাম কী?”

মহিলাটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমার নাম মেঘদূতি।”

নামটি শুনেই পিছন থেকে চমকে উঠল শশাঙ্ক রায়।

“অসম্ভব! মেঘদূতি তো জন্মের পরেই মারা গিয়েছিল!”

মহিলাটি তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনিও তো বারো বছর আগে মারা গিয়েছিলেন বলে সবাই জানত, শশাঙ্কবাবু। তা হলে আপনি আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কীভাবে?”

শশাঙ্কের মুখ থেকে কোনও শব্দ বেরোল না।

ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল।

দেবব্রত রায় জানলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই। তিয়াসা, বাক্সের ভেতরে যে কাগজগুলো আছে, সেগুলো ভালো করে দেখো। বিশেষ করে শেষ পাতাটা।”

তিয়াসা কাঁপা হাতে ধাতব বাক্সটি খুলল।

ভেতরে পুরোনো দলিল, হাসপাতালের একটি বিবর্ণ ছবি এবং অমিতাভ সেনের স্বীকারোক্তিপত্র ছিল। কাগজগুলোর নীচে ভাঁজ করা একটি ছোট্ট খাম। খামের ওপরে লেখা—

‘তিয়াসার আঠারো বছর পূর্ণ হলে খুলতে হবে।’

তিয়াসার জন্মদিন তো অনেক আগেই পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু খামের তারিখ দেখে তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

খামটি লেখা হয়েছিল আঠারো বছর আগে।

অর্থাৎ তার জন্মেরও আগে!

“এটা কে লিখেছে?” তিয়াসা জিজ্ঞাসা করল।

মেঘদূতি বলল, “তোর জন্মদাত্রী মা।”

“কিন্তু আমার মা তো—”

“যাঁকে তুই মা বলে চিনিস, তিনি তোকে বড় করেছেন। কিন্তু জন্ম দিয়েছিলেন অন্য একজন।”

“তাহলে আমার জন্মদাত্রী মা কোথায়?”

মেঘদূতি চোখ বন্ধ করল।

“এই বাড়িতেই।”

ঘরের মধ্যে উপস্থিত প্রত্যেকের মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

তিয়াসা একবার বন্দি ঘরটির দিকে, আর একবার নিজের বাবার দিকে তাকাল।

“বাবা, তুমি কি জানো আমার আসল মা কে?”

অমিতাভ উত্তর দিলেন না।

তিয়াসা এবার তাঁর জামার হাতা ধরে ঝাঁকিয়ে উঠল।

“আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি! আমার মা কে?”

অমিতাভের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“আমি জানি না।”

“মিথ্যে!”

“আমি সত্যিই জানি না, তিয়াসা! আমি শুধু জানতাম, যে মহিলাকে আমি বিয়ে করেছিলাম, তিনি আমার সন্তানের জন্মের পর বদলে গিয়েছিলেন। তাঁর আচরণ, তাঁর কণ্ঠস্বর, এমনকী তাঁর হাতের লেখাও বদলে গিয়েছিল। কিন্তু আমি কাউকে কিছু বলতে পারিনি।”

মেঘদূতি ঠান্ডা গলায় বলল, “কারণ তুমি নিজেই জানতেই না, তোমার স্ত্রীকে আসলে কে সরিয়ে দিয়েছিল।”

তিয়াসা খামটি খুলল।

ভেতরে একটি মাত্র চিঠি।

কালি অনেকটাই মুছে গিয়েছে। তবু প্রথম কয়েকটি লাইন স্পষ্ট পড়া যাচ্ছিল।

‘আমার সন্তান,

তুই যখন এই চিঠি পড়বি, তখন হয়তো আমি আর বেঁচে থাকব না। তোর জন্মের রাতে তিনটি শিশু জন্মেছিল। তাদের মধ্যে একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়, একজনকে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়, আর তৃতীয়জনকে এমন একটি পরিচয় দেওয়া হয়, যা তার নিজের ছিল না।

তুই যাকে নিজের জীবন বলে জানিস, সেই জীবন আসলে অন্য একটি মেয়ের কাছ থেকে ধার করা।

কিন্তু মনে রাখিস, তিয়াসা—সবচেয়ে বড় মিথ্যেটা তোর জন্ম নিয়ে নয়।

সবচেয়ে বড় মিথ্যেটা হল, তোকে বিশ্বাস করানো হয়েছে যে তোর মা মারা গিয়েছেন।’

চিঠির শেষ লাইনটি পড়ে তিয়াসার হাত থেকে কাগজটি পড়ে গেল।

“মা মারা যাননি?”

কেউ উত্তর দিল না।

সে আবার চিঠিটি তুলে নিল। নীচে একটি নাম লেখা ছিল।

‘মধুমিতা সেন।’

তিয়াসা নামটি দেখেই অমিতাভের দিকে তাকাল।

“তুমি তো বলেছিলে, তুমি নিজের হাতে মধুমিতাকে হত্যা করেছ!”

অমিতাভ মাথা নীচু করে বললেন, “হ্যাঁ।”

“তাহলে এই চিঠি কীভাবে লেখা হল?”

“আমি জানি না!”

মেঘদূতি এবার ধীরে ধীরে তিয়াসার কাছে এল।

“কারণ এই চিঠি তোর মায়ের মৃত্যুর আগে লেখা হয়নি।”

“তার মানে?”

“এই চিঠি লেখা হয়েছিল গত বছর।”

তিয়াসার মনে হল, মাটিটা যেন তার পায়ের নীচ থেকে সরে যাচ্ছে।

গত বছর!

অর্থাৎ যে মানুষটিকে বারো বছর আগে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, তিনি গত বছরও বেঁচে ছিলেন!

ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে কোথাও একটা শিশুর কান্না শোনা গেল।

একবার।

দু’বার।

তারপর খুব কাছে থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল—

“দিদি, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?”

তিয়াসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

কণ্ঠস্বরটি তার অচেনা নয়।

এ কণ্ঠস্বর সে বহুবার শুনেছে।

প্রতি বছর দুর্গাপুজোর পর যে রাতে সে নিজের মৃত বোনের শ্রাদ্ধ করত, সেই রাতে জানলার বাইরে থেকে এই কণ্ঠস্বরই তাকে ডাকত।

“দিদি, আমার জন্য একটু জল দেবে?”

তিয়াসার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“মেঘলা?”

অন্ধকারের মধ্যে একটা ছোট্ট হাত এসে তার হাত ধরল।

“হ্যাঁ, দিদি। আমি মেঘলা।”

“কিন্তু তুমি তো এই ঘরেই ছিলে!”

“আমি কখনও এই ঘরে ছিলাম না।”

তিয়াসা কাঁপতে কাঁপতে বলল, “তাহলে এতক্ষণ যে মেয়েটিকে দেখলাম, সে কে?”

কোনও উত্তর এল না।

হঠাৎ জরুরি আলোর ক্ষীণ লাল আভা জ্বলে উঠল।

তিয়াসা দেখল, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বারো বছরের একটি মেয়ে। পরনে সাদা ফ্রক, ভেজা চুল কাঁধের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে, আর ডান হাতের কবজিতে সেই একই পোড়া দাগ।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হল, মেয়েটির মুখ হুবহু তিয়াসার মতো।

মেয়েটি তিয়াসার হাত ছেড়ে অমিতাভের দিকে তাকাল।

“বাবা, তুমি আমাকে পুকুরে ফেলে দিয়েছিলে কেন?”

অমিতাভ পিছিয়ে যেতে লাগলেন।

“না! না! তুমি মেঘলা নও!”

মেয়েটি হাসল।

“তাহলে তুমি আমাকে কী নামে ডাকতে?”

অমিতাভের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।

“মৃণালিনী…”

নামটি শুনে ঘরের মধ্যে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।

দেবব্রত রায় হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, “অসম্ভব! মৃণালিনী তো মধুমিতার প্রথম সন্তান ছিল!”

মেঘদূতি চোখ তুলে তিয়াসার দিকে তাকাল।

“এবার বুঝতে পারছিস, তোর জন্মের রাতে ঠিক কতগুলো শিশু জন্মেছিল?”

তিয়াসা অস্ফুট স্বরে বলল, “তিনটি…”

“না,” মেঘদূতি বলল। “তিনটি নয়।”

তারপর সে অন্ধকার সিঁড়ির দিকে আঙুল তুলল।

“এই বাড়িতে চারটি শিশু জন্মেছিল। আর তাদের মধ্যে একজনকে আজও কেউ খুঁজে পায়নি।”

ঠিক তখনই ওপরতলার বন্ধ ঘর থেকে তিনবার দরজায় আঘাতের শব্দ হল।

ঠক!

ঠক!

ঠক!

তারপর ভেতর থেকে এক বৃদ্ধার কণ্ঠ শোনা গেল—

“মধুমিতা, দরজাটা খোল। তোর মেয়েরা সবাই ফিরে এসেছে।”

তিয়াসা চমকে উঠে দেবব্রতকে দেখল।

দেবব্রত কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “এই কণ্ঠস্বর… এ তো আমার মায়ের!”

শশাঙ্ক রায় চিৎকার করে উঠলেন, “কিন্তু মা তো পঁচিশ বছর আগে মারা গিয়েছেন!”

দরজার ওপার থেকে বৃদ্ধার উত্তর এল—

“আমি মারা যাইনি, শশাঙ্ক। তোমরা সবাই মিলে আমাকে মেরে ফেলেছিলে। আজ আমি আমার চারটি নাতনিকে নিয়ে যাব।”

তারপর দরজার নীচের ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে গড়িয়ে এল একটি পুরোনো ছবি।

ছবিতে চারটি নবজাতক পাশাপাশি শুয়ে আছে।

আর তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটির মুখ দেখে তিয়াসার বুকের রক্ত যেন জমে গেল।

কারণ মহিলাটি দেখতে অবিকল তার নিজের মতো।

শুধু তাঁর চোখ দুটো ছিল সম্পূর্ণ কালো।

আর ছবির নীচে লাল কালিতে লেখা—

‘চার বোনের মধ্যে যে বেঁচে থাকবে, সে-ই নিজের শ্রাদ্ধ করবে।’

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *