ঘড়ির কাঁটা যখন রাত বারোটার ঘর ছুঁল, তখন জমিদারবাড়ির প্রতিটি জানালা একসঙ্গে কেঁপে উঠল।
বাইরে ঝড় উঠেছে। বাঁশবাগানের মাথায় মাথায় হাওয়া আছড়ে পড়ছে। পুরোনো বাড়ির ছাদ থেকে খসে পড়ছে চুনসুরকি। অথচ ঘরের ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কারও চোখ সেদিকে নেই।
তাদের সমস্ত মনোযোগ সেই বারো বছরের মেয়েটির দিকে।
মেয়েটি তিয়াসার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে অদ্ভুত এক শান্ত হাসি। যেন এই বাড়িতে যা ঘটছে, তার সবটাই সে আগে থেকে জানত।
তিয়াসা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?”
মেয়েটি বলল, “আমার নাম ছিল মেঘলা।”
“ছিল মানে?”
“কারণ, এই বাড়িতে আমার নাম কেউ উচ্চারণ করে না। মা আমাকে মেঘলা বলে ডাকতেন। কিন্তু বারো বছর আগে আমার নাম মুছে দেওয়া হয়েছিল।”
তিয়াসা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“তুমি কি সত্যিই আমাদের বোন?”
মেঘলা মাথা নাড়ল।
“আমি তোমাদের বোন। কিন্তু আমাদের জন্মের গল্পটা তোমরা যা জানো, তার চেয়ে অনেক আলাদা।”
তৃষা এগিয়ে এসে বলল, “তাহলে এত বছর কোথায় ছিলে?”
মেঘলা তার দিকে তাকাল।
“যেখানে তোমরা কেউ আমাকে খুঁজতে যাওনি।”
“আমরা তো জানতামই না তুমি বেঁচে আছ!”
“তুমি জানতে না। কিন্তু বাবা জানতেন।”
সবাই অমিতাভের দিকে তাকাল।
তিনি তখনও মেঝেতে বসে আছেন। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছেন। তাঁর কাঁধ কাঁপছে।
মেঘলা ধীরে ধীরে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“বাবা, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?”
অমিতাভ মুখ তুললেন।
তাঁর চোখে জল।
“মেঘলা…”
মেয়েটি মৃদু হাসল।
“বারো বছর পর আমার নামটা মনে পড়ল?”
অমিতাভ কিছু বলতে পারলেন না।
মেঘলা এবার কঠিন গলায় বলল, “তুমি আমাকে পুকুরে ফেলে দিয়েছিলে কেন?”
ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
তিয়াসা বিশ্বাস করতে পারছিল না, তার বাবা এমন কিছু করতে পারেন।
অমিতাভ কাঁপা গলায় বললেন, “আমি তোকে মারতে চাইনি।”
“তাহলে আমাকে ফেলে দিয়েছিলে কেন?”
“আমি ভেবেছিলাম…”
“কী ভেবেছিলে?”
অমিতাভ চোখ বন্ধ করলেন।
“আমি ভেবেছিলাম, তুই আর বেঁচে নেই।”
মেঘলার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“কিন্তু আমি বেঁচে ছিলাম, বাবা। আমি পুকুরের জলে ডুবে যাচ্ছিলাম। কেউ আমাকে তুলে আনেনি। আমি নিজেই পাড়ে উঠেছিলাম। তারপর এই বাড়ির পিছনের জঙ্গলে তিন দিন লুকিয়ে ছিলাম।”
তিয়াসার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“তুমি তিন দিন একা ছিলে?”
মেঘলা মাথা নাড়ল।
“তখন আমার বয়স ছিল বারো। আমি জানতাম না কোথায় যাব। বাড়িতে ফিরতে ভয় করছিল। কারণ, যে বাবা আমাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন, সেই বাবাই আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন।”
অমিতাভ হঠাৎ বলে উঠলেন, “আমি তোকে মারতে চাইনি, মেঘলা! আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম!”
মেঘলা তীব্র দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাল।
“কার থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলে?”
অমিতাভ উত্তর দিলেন না।
মেঘলা এবার দেবব্রত রায়ের দিকে ঘুরল।
“আপনি বলুন। আপনি তো সব জানেন।”
দেবব্রত লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর মুখে কোনও বিস্ময় নেই।
“আমি যা জানি, সব বললে এই পরিবারের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।”
মেঘলা বলল, “এই পরিবারে আর কী অবশিষ্ট আছে? মিথ্যে ছাড়া?”
দেবব্রত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তাহলে শোনো।”
বারো বছর আগে রায়বাড়িতে একটি ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছিল।
সেই সময় শশাঙ্ক রায়ের সম্পত্তি নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ চলছিল। তাঁর কোনও পুত্রসন্তান ছিল না। তাঁর দুই ভাইয়ের মধ্যে দেবব্রত ছিলেন ছোট। পরিবারের পুরোনো দলিল অনুযায়ী, শশাঙ্কের মৃত্যুর পর সম্পত্তির একটি বড় অংশ পাওয়ার কথা ছিল তাঁর কন্যার।
কিন্তু শশাঙ্কের কন্যা নন্দিতা তখন নিখোঁজ।
পরিবারের লোকেরা ধরে নিয়েছিল, সে মারা গেছে।
ঠিক সেই সময় মাধুরী রায়ের বোন মধুমিতা সেনের সঙ্গে অমিতাভের সংসারে জন্ম হয়েছিল তিনটি শিশু— তিয়াসা, তৃষা এবং মেঘলা।
তিনটি শিশুর জন্মের খবর পরিবারের বাইরে ছড়িয়ে পড়লে অনেক প্রশ্ন উঠত। কারণ, সেই সময় পরিবারের সম্পত্তি, উত্তরাধিকার এবং একটি পুরোনো আইনি চুক্তি নিয়ে গোপন বিরোধ চলছিল।
দেবব্রত বললেন, “তিনটি শিশুর মধ্যে একজনকে রায়বাড়ির উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আর বাকি দুজনকে অন্য পরিচয়ে বড় করার সিদ্ধান্ত হয়।”
তিয়াসা অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু শিশুদের পরিচয় বদলে দিয়ে সম্পত্তি পাওয়ার কী সম্পর্ক?”
দেবব্রত উত্তর দিলেন, “সম্পর্ক ছিল। কারণ, রায়বাড়ির পুরোনো দলিলে একটি শর্ত ছিল। শশাঙ্কের কন্যার বংশধর ছাড়া অন্য কেউ ওই সম্পত্তির মূল অংশের দাবি করতে পারত না। নন্দিতা নিখোঁজ হওয়ার পর সেই শর্ত পূরণ করার জন্য একটি নতুন গল্প তৈরি করা হয়েছিল।”
“কী গল্প?”
“বলা হয়েছিল, নন্দিতা একটি কন্যাসন্তান রেখে মারা গেছে। সেই শিশুকে সামনে রেখে সম্পত্তির দাবি বজায় রাখা হবে।”
তিয়াসা ধীরে ধীরে বলল, “তাহলে মেঘলাকে নন্দিতার সন্তান বলে দেখানোর পরিকল্পনা ছিল?”
দেবব্রত মাথা নাড়লেন।
“ঠিক তাই।”
মেঘলা ঠান্ডা গলায় বলল, “কিন্তু আমি তো নন্দিতার সন্তান নই।”
“না। তুই মধুমিতা আর অমিতাভের মেয়ে।”
“তাহলে আমাকে কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল?”
দেবব্রত উত্তর দিলেন, “কারণ, তোর মুখের গড়ন নন্দিতার ছোটবেলার ছবির সঙ্গে অনেকটা মিল ছিল। আর তোর জন্মের নথি গোপন রাখা সহজ ছিল।”
তৃষা চিৎকার করে উঠল, “এটা সম্পত্তির জন্য করা হয়েছিল?”
দেবব্রত বললেন, “শুধু সম্পত্তির জন্য নয়। এই বাড়ির আরেকটি গোপন সত্য ছিল। যে সত্য প্রকাশ পেলে সম্পত্তি তো দূরের কথা, পুরো পরিবারকেই অপরাধের মুখোমুখি হতে হত।”
তিয়াসা জিজ্ঞেস করল, “সেই সত্যটা কী?”
দেবব্রত উত্তর দেওয়ার আগেই মধুমিতা দরজার ওপাশ থেকে বলে উঠলেন, “ওকে থামাও! ও আবার মিথ্যে বলবে!”
দেবব্রত দরজার দিকে তাকালেন।
“মধুমিতা, তুমি কি এখনও সেই রাতটার কথা মনে করতে পারো?”
“সব মনে আছে।”
“তাহলে বলো, নন্দিতা কীভাবে নিখোঁজ হয়েছিল?”
মধুমিতা চুপ করে গেলেন।
দেবব্রত ধীরে ধীরে বললেন, “কারণ, নন্দিতা নিজের চোখে এমন একটা ঘটনা দেখে ফেলেছিল, যা তার দেখা উচিত ছিল না। সে জানতে পেরেছিল, শশাঙ্ক রায়ের মৃত্যুর পর সম্পত্তি দখল করার জন্য পরিবারের একজন সদস্য নথিপত্র জাল করেছে। আর সেই জালিয়াতি ঢাকতে গিয়ে একজন নিরপরাধ মানুষকে খুন করা হয়েছিল।”
তিয়াসা শিউরে উঠল।
“খুন?”
দেবব্রত মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। নন্দিতা সেই খুনের সাক্ষী ছিল। তাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্যই তার মৃত্যু হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়।”
“কিন্তু নন্দিতা তো…”
তিয়াসা কথাটা শেষ করতে পারল না।
কারণ, এতক্ষণ যে মেয়েটিকে নন্দিতা বলে চিনেছিল, সে এবার ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল।
তার মুখে অদ্ভুত ক্লান্তি।
“আমি সেই খুন দেখেছিলাম,” সে বলল। “কিন্তু আমাকে কেউ হত্যা করেনি। আমাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।”
দেবব্রত তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকালেন।
“তুই এখনও বেঁচে আছিস, নন্দিতা। তবু এত বছর ধরে মৃত মানুষের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন?”
নন্দিতা উত্তর দিল, “কারণ, আমার মুখ দেখলে মানুষ ভয় পায়। আর আমি নিজেই জানি না, আমি আসলে কে।”
মেঘলা তার দিকে এগিয়ে গেল।
“তুমি জানো, তুমি কে। কিন্তু তুমি আমাদের বলছ না।”
নন্দিতা মাথা নিচু করল।
“আমি জানি না, তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে কি না।”
তিয়াসা তার হাত ধরল।
“আমরা আর মিথ্যে শুনতে চাই না। তুমি যা জানো, সব বলো।”
নন্দিতা গভীর শ্বাস নিল।
তারপর বলল, “বারো বছর আগে এই বাড়িতে শুধু একটি খুন হয়নি। সেই রাতে একজন মানুষকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, একজনকে বন্দি করা হয়েছিল, আর একজনকে নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল।”
“কে বন্দি হয়েছিল?” তিয়াসা জিজ্ঞেস করল।
নন্দিতা লোহার দরজার দিকে তাকাল।
“মধুমিতা।”
মধুমিতা রায়বাড়ির গোপন ঘরে বন্দি হয়েছিলেন বারো বছর আগে।
কিন্তু কেন?
নন্দিতা জানাল, সেই রাতে মধুমিতা নিজের চোখে দেখেছিলেন, দেবব্রত রায় একটি পুরোনো দলিল পুড়িয়ে ফেলছেন। সেই দলিলে এমন তথ্য ছিল, যা প্রমাণ করতে পারত যে রায়বাড়ির সম্পত্তির একটি বড় অংশ অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে।
মধুমিতা প্রতিবাদ করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, সবকিছু পুলিশের হাতে তুলে দেবেন।
তারপরই তাঁকে ঘরে আটকে রাখা হয়।
অমিতাভকে বাধ্য করা হয়েছিল শিশুদের পরিচয় বদলাতে। মেঘলাকে রায়বাড়ির উত্তরাধিকারী হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তিয়াসা ও তৃষাকে আলাদা পরিচয়ে বড় করার ব্যবস্থা হয়েছিল।
কিন্তু পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়নি।
কারণ, নন্দিতা পালিয়ে গিয়েছিল।
আর মেঘলাও পুকুরে পড়ে বেঁচে গিয়েছিল।
দেবব্রত এতক্ষণ নীরবে সব শুনছিলেন।
এবার তিনি বললেন, “নন্দিতা, তুই একটা কথা ভুলে যাচ্ছিস।”
“কী কথা?”
“যে দলিলের কথা বলছিস, সেটা আমি পুড়িয়ে ফেলিনি।”
নন্দিতা চমকে উঠল।
দেবব্রত নিজের কোটের ভিতর হাত ঢুকিয়ে একটি ছোট্ট ধাতব বাক্স বের করলেন।
“এই বাক্সে সেই দলিলের আসল কপি আছে।”
তিয়াসা বাক্সটির দিকে তাকাল।
“তাহলে এত বছর ধরে আপনি এটা লুকিয়ে রেখেছিলেন কেন?”
দেবব্রত বললেন, “কারণ, দলিলটা প্রকাশ করলে শুধু আমার ভাইয়ের অপরাধ প্রকাশ পেত না। আরও একজনের নাম সামনে আসত।”
“কার নাম?”
দেবব্রত ধীরে ধীরে তিয়াসার দিকে তাকালেন।
“তোর মায়ের।”
তিয়াসা হতবাক হয়ে গেল।
“মধুমিতা?”
“না। যে মহিলাকে তুই এত বছর ধরে মা বলে চিনে এসেছিস, সেই মধুমিতা সেন।”
তিয়াসার মনে হল, কেউ তার বুকের ভিতর থেকে হৃদয়টা ছিঁড়ে নিয়েছে।
“কিন্তু আপনি তো বললেন, তিনি বন্দি ছিলেন!”
দেবব্রত মাথা নাড়লেন।
“একজন মধুমিতা বন্দি ছিলেন। আরেকজন মধুমিতা বাইরে ছিলেন।”
তৃষা চিৎকার করে উঠল, “দুজন মধুমিতা?”
দেবব্রত শান্ত গলায় বললেন, “মধুমিতা আর মাধুরী যমজ বোন ছিলেন। তাঁদের মুখ এক ছিল। বারো বছর আগে সেই মিলকেই ব্যবহার করে একজনের পরিচয়ে অন্যজনকে চালানো হয়েছিল।”
তিয়াসা দেওয়ালের দিকে হাত বাড়িয়ে নিজেকে সামলাল।
“তাহলে আমার মা কে?”
দেবব্রত উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু ধাতব বাক্সটি খুললেন।
ভিতরে একটি পুরোনো দলিল, একটি হাসপাতালের ছবি এবং একটি ছোট্ট কাগজ।
কাগজে লেখা ছিল—
‘যে মেয়েটি নিজের শ্রাদ্ধে আসে, সে মৃত নয়। সে ফিরে আসে সেই মানুষটির মুখোশ খুলতে, যে তার জীবন কেড়ে নিয়েছিল।’
তিয়াসা কাগজটা হাতে নিয়ে বলল, “এই কথার অর্থ কী?”
নন্দিতা তার দিকে তাকাল।
“এর অর্থ, প্রতি বছর যে রাতে আমার শ্রাদ্ধ হয়, সেই রাতেই আসল অপরাধী ফিরে আসে।”
“কে সেই অপরাধী?”
নন্দিতা উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির প্রধান দরজায় প্রচণ্ড শব্দ হল।
তারপর বাইরে থেকে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল।
দেবব্রত এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
অমিতাভ ফিসফিস করে বললেন, “না… পুলিশ এখানে কীভাবে এল?”
তিয়াসার ফোনে একটি বার্তা এল।
প্রেরক— মা।
বার্তায় লেখা—
‘তিয়াসা, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা। দেবব্রতকে বিশ্বাস করিস না। সে তোদের সবাইকে মেরে ফেলবে।’
তিয়াসা বার্তাটি দেখিয়ে দেবব্রতকে বলল, “আপনি কি সত্যিই আমাদের ক্ষতি করতে চান?”
দেবব্রত কোনও উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে একজন পুলিশ অফিসারের গলা শোনা গেল।
“দেবব্রত রায়! আমরা জানি আপনি ভিতরে আছেন। দরজা খুলুন!”
দেবব্রত মৃদু হাসলেন।
“অবশেষে তারা এসে গেছে।”
“তারা কারা?” তিয়াসা জিজ্ঞেস করল।
দেবব্রত ধীরে ধীরে বললেন, “যারা বারো বছর ধরে আমার মৃত্যুর তদন্ত করছে।”
বাইরে আবার ধাক্কা পড়ল।
“দরজা খুলুন! না হলে দরজা ভেঙে ঢুকব!”
দেবব্রত তিয়াসার হাতে ধাতব বাক্সটি তুলে দিলেন।
“এটা নিয়ে পালাও।”
“কেন?”
“কারণ, আজ রাত শেষ হওয়ার আগে তুই বুঝতে পারবি, এই বাড়িতে আসলে কে মৃত আর কে জীবিত।”
তিয়াসা বাক্সটি শক্ত করে ধরল।
ঠিক তখনই পিছন থেকে মেঘলার কণ্ঠ ভেসে এল।
“দিদি, বাক্সটা খুলে দেখো।”
তিয়াসা বাক্সের ভিতরের দলিলটি তুলে নিল।
শেষ পাতায় একটি স্বাক্ষর।
অমিতাভ সেন।
আর তার নীচে একটি স্বীকারোক্তি—
‘আমি নিজের হাতে মধুমিতা সেনকে হত্যা করেছি।’
তিয়াসা স্তব্ধ হয়ে গেল।
সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা অমিতাভ ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।
তাঁর চোখে এবার আর কোনও ভয় নেই।
শুধু এক অদ্ভুত শূন্যতা।
তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তিয়াসা। আমি তোমার মাকে হত্যা করেছিলাম।”
ঠিক সেই মুহূর্তে লোহার দরজার ওপাশ থেকে মধুমিতার হাসি ভেসে এল।
একটি দীর্ঘ, শীতল হাসি।
তারপর তিনি বললেন—
“অমিতাভ, তুমি কি এখনও মনে করো, যাকে তুমি হত্যা করেছিলে, সে-ই তোমার স্ত্রী ছিল?”
তিয়াসা ধীরে ধীরে দরজার দিকে তাকাল।
দরজার নীচের ফাঁক দিয়ে একটি হাত বেরিয়ে এল।
হাতে সেই একই রুপোর আংটি, যা তিয়াসা ছোটবেলায় নিজের মায়ের হাতে দেখেছিল।
কিন্তু আংটিটি তো এখন কলকাতায় থাকা তার মায়ের হাতেই থাকার কথা!
দরজার ওপাশ থেকে মধুমিতা ফিসফিস করে বললেন—
“তিয়াসা, আমি তোমার জন্মদাত্রী মা নই।”
এক মুহূর্ত থেমে তিনি বললেন—
“আমি তোমার মৃত বোন।”
আর ঠিক তখনই লোহার দরজাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।
চলবে…