১. ঠাকুমার বাক্স
পূর্ব মেদিনীপুরের ছোট্ট গ্রাম শিউলিপুরে থাকত চৌদ্দ বছরের মেয়ে মেঘলা। শীতকাল তার খুব প্রিয় ছিল। ভোরের কুয়াশা, খেজুরের রসের গন্ধ, উঠোনে রোদ পোহানো আর সন্ধ্যায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে গল্প—সব মিলিয়ে শীতের দিনগুলো তার কাছে ছিল আনন্দের।
কিন্তু এবারের শীতটা যেন অন্য রকম।
আগে পৌষ মাস এলেই তাদের বাড়িতে শুরু হতো পিঠে তৈরির উৎসব। ঠাকুমা সরস্বতী দেবী চালের গুঁড়ো, নারকেল, খেজুরের গুড় আর দুধ দিয়ে কত রকমের পিঠে বানাতেন! পাটিসাপটা, দুধপুলি, সেদ্ধ পিঠে, গোকুল পিঠে—একেকটির স্বাদ একেক রকম।
এখন ঠাকুমার বয়স হয়েছে। আগের মতো দীর্ঘ সময় রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কাজ করতে পারেন না। মেঘলার মা চাকরি ও সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকেন। ফলে বাড়িতে পিঠে তৈরি হয় খুব কম।
একদিন পুরোনো জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে মেঘলা ঠাকুমার কাঠের আলমারির নিচে একটি ছোট টিনের বাক্স পেল। বাক্সের মধ্যে কয়েকটি হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ, পুরোনো ছবি আর একটি ছোট খাতা ছিল।
খাতাটি খুলতেই সে দেখল, পাতায় পাতায় লেখা নানা পিঠের নাম, উপকরণের পরিমাণ এবং রান্নার পদ্ধতি।
একটি পাতায় লেখা ছিল—‘মকরসংক্রান্তির দুধপুলি—ঠাকুমার বিশেষ পদ্ধতি’।
মেঘলা অবাক হয়ে ঠাকুমার কাছে ছুটে গেল।
—ঠাকুমা, তুমি এত রকম পিঠে বানাতে জানতে?
সরস্বতী দেবী মৃদু হেসে বললেন, —জানতাম তো! তোমার ঠাকুরদা বাজার থেকে খেজুরের গুড় নিয়ে এলে আমাদের বাড়িতে পিঠে তৈরির ধুম পড়ে যেত। পাড়ার লোকজনও আসতেন। কারও হাতে নারকেল কোরানো, কেউ চালের গুঁড়ো মাখছেন, কেউ আবার উনুনে দুধ জ্বাল দিচ্ছেন।
মেঘলা খাতার পাতায় হাত বুলিয়ে বলল, —এগুলো তো হারিয়ে যেতে বসেছে, ঠাকুমা!
ঠাকুমা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—সবাই এখন ব্যস্ত। পুরোনো দিনের মতো সময় কোথায়?
মেঘলা মনে মনে ঠিক করল, এবারের শীতে সে ঠাকুমার কাছ থেকে সব পিঠে বানানো শিখবে।
২. প্রথম পাটিসাপটা
পরদিন সকালেই মেঘলা রান্নাঘরে হাজির।
—ঠাকুমা, আজ আমাকে পাটিসাপটা বানানো শেখাও।
ঠাকুমা হেসে বললেন, —শেখাব, তবে রান্না করতে গেলে ধৈর্য লাগবে। শুধু রেসিপি পড়লেই সব শেখা যায় না।
প্রথমে চালের গুঁড়ো, সামান্য ময়দা, দুধ ও প্রয়োজনমতো জল দিয়ে গোলা তৈরি করা হলো। নারকেল কোরানো ও খেজুরের গুড় দিয়ে পুর বানানো হলো।
মেঘলা খুব উৎসাহ নিয়ে তাওয়ায় গোলা ঢালল। কিন্তু গোলাটি একদিকে বেশি মোটা, অন্যদিকে বেশি পাতলা হয়ে গেল। পুর দিতে গিয়ে পাটিসাপটা ভেঙে গেল।
সে বিরক্ত হয়ে বলল, —আমার দ্বারা হবে না ঠাকুমা!
ঠাকুমা বললেন, —প্রথম পাটিসাপটা ভাঙতেই পারে। রান্নারও নিজস্ব ছন্দ আছে। গোলা কতটা পাতলা হবে, তাওয়া কতটা গরম থাকবে, কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে—এসব হাতে-কলমে শিখতে হয়।
মেঘলা আবার চেষ্টা করল। দ্বিতীয়বারও ঠিক হলো না। তৃতীয়বার পাটিসাপটা কিছুটা ভালো হলো। চতুর্থবার সে একটি সুন্দর পাটিসাপটা বানাতে পারল।
তার আনন্দ দেখে ঠাকুমা হেসে উঠলেন।
—দেখলি? চেষ্টা করলে শেখা যায়।
সেদিন মেঘলা খাতায় শুধু উপকরণের পরিমাণ লিখল না। পাশে লিখল—‘তাওয়া বেশি গরম হলে গোলা দ্রুত শুকিয়ে যায়। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।’
সে বুঝল, ঠাকুমার পুরোনো খাতায় অনেক কিছু লেখা আছে, কিন্তু কিছু অভিজ্ঞতা শুধু হাতে-কলমেই শেখা যায়।
৩. হারিয়ে যাওয়া স্বাদের খোঁজে
পাটিসাপটা শেখার পর মেঘলার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। সে ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করতে লাগল, আগে গ্রামে আর কী কী পিঠে তৈরি হতো।
ঠাকুমা একের পর এক নাম বলতে লাগলেন—চুষি পিঠে, মালপোয়া, ভাপা পিঠে, পাকন পিঠে, সরুচাকলি, আর এক ধরনের ছোট গোল পিঠে, যা তাঁদের গ্রামে বিশেষ উৎসবের সময় বানানো হতো।
কিছু পিঠের নাম মেঘলা আগে কখনও শোনেনি।
সে গ্রামের অন্য প্রবীণ মহিলাদের কাছেও গেল। কমলা মাসি জানালেন, তাঁর মা শীতকালে তালের রস দিয়ে বিশেষ এক ধরনের পিঠে বানাতেন। অন্য এক বৃদ্ধা বললেন, তাঁদের বাড়িতে চালের গুঁড়োর সঙ্গে সামান্য তিল মিশিয়ে একটি সুগন্ধি পিঠে তৈরি করা হতো।
মেঘলা একটি খাতা তৈরি করল। নাম দিল—‘আমাদের গ্রামের পিঠের খাতা’।
সেখানে সে লিখতে শুরু করল পিঠের নাম, উপকরণ, তৈরির পদ্ধতি এবং কার কাছ থেকে রেসিপিটি শিখেছে।
কোনো রেসিপির পরিমাণ জানা না থাকলে সে অনুমান করে লিখত না। বরং সেই মহিলার সঙ্গে আবার কথা বলত। কখনও রান্না করার সময় পাশে বসে পর্যবেক্ষণ করত।
একদিন ঠাকুমা বললেন, —তুই শুধু রান্না শিখছিস না, আমাদের গ্রামের স্মৃতিগুলোও ধরে রাখছিস।
মেঘলা বুঝল, খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, উৎসব, সম্পর্ক আর পারিবারিক ইতিহাস।
৪. একটি ছোট্ট পরিকল্পনা
মকরসংক্রান্তি এগিয়ে আসছিল। মেঘলা প্রস্তাব দিল, এবার তাদের বাড়িতে আবার পিঠে তৈরির ছোট আয়োজন করা হোক। শুধু পরিবারের জন্য নয়, গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষকেও আমন্ত্রণ জানানো হবে।
মা প্রথমে একটু চিন্তায় পড়লেন।
—এত লোকের জন্য পিঠে বানানো সহজ নয়। উপকরণের খরচও তো আছে।
মেঘলা বলল, —আমরা অল্প কয়েক রকম পিঠে বানাব। সবাই যদি একটু করে সাহায্য করেন, তাহলে সম্ভব।
ঠাকুমা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। প্রতিবেশী কমলা মাসি বললেন, তিনি নারকেলের পুর বানাতে সাহায্য করবেন। পাশের বাড়ির রীনা কাকিমা চালের গুঁড়ো তৈরি করবেন। মেঘলার বন্ধু তনুশ্রী বলল, সে আমন্ত্রণপত্র লিখে দেবে।
পরিকল্পনা তৈরি হলো।
তারা ঠিক করল, প্রথমবার খুব বড় আয়োজন করবে না। পাটিসাপটা, দুধপুলি এবং ভাপা পিঠে—এই তিন ধরনের পিঠে বানানো হবে। কিছু পিঠে অতিথিদের খাওয়ানো হবে, আর চাইলে সামান্য পরিমাণে অর্ডারও নেওয়া হবে, যাতে উপকরণের খরচের কিছুটা উঠে আসে।
মেঘলা একটি তালিকা বানাল—কতটা চালের গুঁড়ো লাগবে, কতটা নারকেল, কতটা গুড়, কতটা দুধ এবং কতজন মানুষ কাজ করবেন।
মা হিসাব দেখে বললেন, —এবার তো দেখছি তুই শুধু পিঠে বানাচ্ছিস না, পুরো অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাও করছিস!
মেঘলা হেসে বলল, —সবাই মিলে করলে কাজটা সহজ হবে।
৫. প্রস্তুতির দিন
মকরসংক্রান্তির আগের দিন থেকেই বাড়িতে ব্যস্ততা শুরু হলো।
উঠোনে চালের গুঁড়ো শুকোতে দেওয়া হলো। নারকেল কোরানো হলো। খেজুরের গুড় ছোট ছোট টুকরো করে রাখা হলো। ঠাকুমা সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন, কোন পিঠের পুর আগে তৈরি করতে হবে, কোনটি শেষে বানালে ভালো থাকবে।
মেঘলা প্রতিটি কাজের পাশে নাম লিখে দিল, যাতে কোনো উপকরণ বাদ না পড়ে।
তবু সমস্যা হলো।
দুধপুলির জন্য দুধ জ্বাল দিতে গিয়ে তা একটু বেশি ঘন হয়ে গেল। পাটিসাপটার প্রথম কয়েকটি গোলা ঠিকমতো ছড়াল না। অন্যদিকে, প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মানুষ আসবেন বলে খবর পাওয়া গেল।
মেঘলা এক মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেল।
ঠাকুমা বললেন, —সবকিছু একসঙ্গে নিখুঁত হবে না। আগে যেটা জরুরি, সেটি ঠিক কর।
মেঘলা কাজগুলো ভাগ করে দিল। কমলা মাসি পাটিসাপটার পুর তৈরি করতে লাগলেন। মা দুধের ব্যবস্থা সামলালেন। মেঘলা আর তনুশ্রী ভাপা পিঠে তৈরির কাজ শুরু করল।
যে পিঠেগুলো প্রথমে ভেঙে গিয়েছিল, সেগুলো নষ্ট না করে আলাদা রাখা হলো। পরে সেগুলোকে ছোট টুকরো করে পরিবারের খাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হলো।
ধীরে ধীরে কাজের গতি ফিরে এল।
রান্নাঘর ভরে উঠল নারকেল, গুড় আর গরম দুধের মিষ্টি গন্ধে।
৬. পুরোনো দিনের ফিরে আসা
মকরসংক্রান্তির সকালে বাড়ির উঠোনে পাটি পেতে বসার ব্যবস্থা করা হলো। একে একে গ্রামের প্রবীণ মানুষ, প্রতিবেশী এবং কয়েকজন শিশু এসে উপস্থিত হলো।
ঠাকুমা অনেক দিন পর এত মানুষের মাঝে বসে গল্প করতে লাগলেন। তিনি বললেন, ছোটবেলায় কীভাবে পিঠে তৈরির দিন সবাই একসঙ্গে কাজ করতেন। কেউ রান্না করতেন, কেউ গান গাইতেন, কেউ আবার ছোটদের সামলাতেন।
এক বৃদ্ধা পাটিসাপটার একটি কামড় খেয়ে বললেন, —আহা, এই স্বাদটা কত বছর পরে পেলাম! আমার মাও ঠিক এভাবেই পুর বানাতেন।
আরেকজন বললেন, —আগে আমরা নিজেদের বাড়িতে পিঠে বানাতাম। এখন সময়ের অভাবে অনেক কিছুই আর করা হয় না।
মেঘলা চুপচাপ তাঁদের কথা শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে শুধু খাবার পরিবেশন করছে না; মানুষকে তাঁদের অতীতের সঙ্গে আবার একটু যুক্ত করছে।
ঠাকুমা মেঘলার হাত ধরে বললেন, —আজ তুই আমাকে আমার নিজের ছোটবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে গেলি।
মেঘলার চোখে আনন্দের জল এসে গেল।
কিছুক্ষণ পরে গ্রামের কয়েকজন তরুণী এগিয়ে এসে বললেন, তাঁরা পরের বছর থেকে নিজেদের বাড়িতেও ঐতিহ্যবাহী পিঠে তৈরির চেষ্টা করবেন।
সেদিনের ছোট আয়োজন ধীরে ধীরে গ্রামের একটি আনন্দের অনুষ্ঠানে পরিণত হলো।
৭. যখন পিঠে বিক্রির প্রস্তাব এল
অনুষ্ঠানের পর কয়েকজন প্রতিবেশী মেঘলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তারা কি বাড়িতে খাওয়ার জন্য পিঠে অর্ডার দিতে পারবেন?
মেঘলা প্রথমে দ্বিধায় পড়ে গেল।
বাড়িতে পিঠে তৈরি করা আর অর্ডার অনুযায়ী পিঠে বানানো এক বিষয় নয়। সেখানে সময়, খরচ, উপকরণ সংরক্ষণ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয় রয়েছে।
সে মায়ের সঙ্গে আলোচনা করল। মা বললেন, —চাইলে অল্প করে শুরু করা যায়। তবে পড়াশোনার ক্ষতি করে নয়, আর আমাদের সামর্থ্যের বাইরে অর্ডার নেওয়া যাবে না।
তারা ঠিক করল, সপ্তাহে একদিন সীমিত পরিমাণে পিঠে তৈরি করা হবে। অর্ডার আগে থেকে নিতে হবে। কোন পিঠে কত দামে দেওয়া হবে, তা হিসাব করে ঠিক করা হবে।
মেঘলা উপকরণের খরচ, জ্বালানি, প্যাকেট এবং পরিশ্রমের মূল্য হিসাব করতে শিখল। ঠাকুমা রেসিপি ও স্বাদের দিকে নজর রাখতেন, মা রান্নাঘরের কাজ সামলাতেন, আর মেঘলা অর্ডার ও হিসাব লিখে রাখত।
তারা কখনও পুরোনো পিঠেকে আধুনিক নামে বিক্রি করার চেষ্টা করল না। বরং প্রতিটি পিঠের আসল নাম, উপকরণ এবং গ্রামের কোন পরিবারের কাছ থেকে রেসিপিটি এসেছে, তা জানিয়ে দিত—যাঁরা নিজেদের নাম প্রকাশে সম্মতি দিয়েছিলেন, তাঁদের নামও উল্লেখ করা হতো।
ধীরে ধীরে কয়েকটি পরিবার নিয়মিত অর্ডার দিতে শুরু করল।
তবে মেঘলা জানত, এটি এখনও ছোট উদ্যোগ। উৎসবের সময় চাহিদা বাড়লেও বছরের অন্য সময়ে কমে যেতে পারে। তাই সে কখনও অকারণে বেশি উপকরণ কিনত না।
৮. একটি ভুল, একটি শিক্ষা
একদিন এক ক্রেতা জানালেন, নির্দিষ্ট সময়ে পিঠে পৌঁছায়নি। মেঘলা অর্ডারের খাতা দেখে বুঝল, একই সময়ে তারা বেশি অর্ডার নিয়ে ফেলেছিল।
ঠাকুমা বললেন, —সবাইকে খুশি করতে গিয়ে যদি কাজের মান নষ্ট হয়, তাহলে লাভ কী?
মেঘলা ভুল স্বীকার করল। সে ক্রেতার কাছে ক্ষমা চাইল এবং পরেরবার সময়মতো দেওয়ার ব্যবস্থা করল।
তারপর থেকে তারা প্রতিদিন কতটা পিঠে বানানো সম্ভব, তা আগে হিসাব করে নিত। অতিরিক্ত অর্ডার এলে বিনয়ের সঙ্গে পরের দিনের সময় জানিয়ে দিত।
আরেকদিন দেখা গেল, একটি পিঠের উপকরণ নিয়ে ক্রেতার ভুল ধারণা হয়েছে। মেঘলা বুঝল, খাবারের উপকরণ সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেওয়া জরুরি। তাই অর্ডার নেওয়ার সময় তারা পিঠের উপকরণ জানাতে শুরু করল এবং যেসব উপকরণে কারও অ্যালার্জি থাকতে পারে, সে বিষয়ে ক্রেতাদের সতর্ক থাকতে বলল।
প্রতিটি সমস্যা থেকে তারা কিছু না কিছু শিখল।
মেঘলা বুঝতে পারল, কোনো উদ্যোগ শুধু ভালো স্বাদ দিয়ে টিকে থাকে না। সততা, পরিচ্ছন্নতা, সময় মেনে কাজ করা এবং ক্রেতার সঙ্গে স্পষ্ট যোগাযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
৯. স্কুলের প্রদর্শনীতে পিঠের খাতা
পরের বছর স্কুলে একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো। মেঘলা সেখানে ‘আমাদের গ্রামের পিঠের খাতা’ নিয়ে একটি প্রদর্শনী করল।
টেবিলে রাখা হলো পুরোনো রেসিপির প্রতিলিপি, পিঠে তৈরির ধাপের ছবি, উপকরণের তালিকা এবং প্রবীণ মহিলাদের অনুমতিসহ সংগ্রহ করা স্মৃতিচারণ।
একটি অংশে লেখা ছিল—‘রেসিপি শুধু উপকরণের তালিকা নয়; এটি মানুষের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার।’
প্রদর্শনী দেখতে এসে এক শিক্ষক প্রশ্ন করলেন, —তোমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনটি?
মেঘলা বলল, —আমি বুঝেছি, কোনো ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে হলে সেটি শুধু মনে রাখলেই হবে না। লিখে রাখতে হবে, শিখতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে শেখানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সে আরও বলল, —তবে পুরোনো দিনের সব কিছুই হুবহু ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এখন মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। তাই ঐতিহ্যকে সম্মান করে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং বর্তমানের প্রয়োজন বুঝে এগোতে হবে।
শিক্ষক তার কথা শুনে সন্তুষ্ট হলেন।
মেঘলা সেদিন কোনো বড় পুরস্কার পায়নি। কিন্তু প্রদর্শনী শেষে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী তার কাছে এসে নিজেদের পরিবারের পুরোনো খাবারের গল্প বলতে শুরু করল।
একজন বলল, তাদের বাড়িতে আগে বিশেষ দিনে একটি মিষ্টি তৈরি হতো, যা এখন আর কেউ বানাতে জানে না।
মেঘলা তাকে উৎসাহ দিয়ে বলল, —বাড়ির বড়দের সঙ্গে কথা বলো। যতটা মনে আছে, লিখে রাখো। তারপর সুযোগ পেলে একসঙ্গে বানানোর চেষ্টা করো।
১০. স্বাদের সঙ্গে স্মৃতির বন্ধন
কয়েক বছর পরে মেঘলা আরও বড় হলো। পড়াশোনার পাশাপাশি সে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবার নিয়ে নথি তৈরি করার কাজ চালিয়ে গেল। নতুন নতুন রেসিপি সংগ্রহ করার সময় সে প্রতিটি তথ্য যাচাই করত এবং যাঁদের কাছ থেকে শিখত, তাঁদের সম্মান জানাত।
ঠাকুমার বয়স আরও বেড়েছিল। এখন তিনি বেশির ভাগ সময় উঠোনে বসে থাকতেন। কিন্তু মকরসংক্রান্তি এলেই মেঘলা তাঁর পাশে বসে পুরোনো খাতা খুলে দিত।
একদিন ঠাকুমা বললেন, —আমার হাতে আগের মতো জোর নেই। কিন্তু তুই তো শিখে গেছিস। এখন তোর হাতেই এই কাজ চলবে।
মেঘলা ঠাকুমার হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল, —আমি যত দিন পারি, শিখব আর অন্যদেরও শেখাব। তবে তোমার কাছ থেকে শেখা স্বাদটা কখনও ভুলব না।
সেদিন তারা একসঙ্গে পাটিসাপটা বানাল। প্রথমটি একটু বেঁকে গেল। ঠাকুমা হেসে বললেন, —দেখ, এখনও তোর প্রথম পাটিসাপটার কথা মনে আছে?
মেঘলাও হেসে উঠল।
বাইরে শীতের রোদ উঠোনে পড়েছিল। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছিল নারকেল আর খেজুরের গুড়ের গন্ধ। বাড়ির ছোটরা অপেক্ষা করছিল কখন পিঠে পরিবেশন করা হবে।
মেঘলা বুঝল, একটি খাবারের স্বাদ শুধু জিভে থাকে না। তা মানুষের স্মৃতিতে থাকে, সম্পর্কের মধ্যে থাকে, এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে শেখার মধ্যেও থাকে।
কোনো ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসলে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য সব সময় বড় প্রতিষ্ঠান বা বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। কখনও প্রয়োজন হয় একটি পুরোনো খাতা, একজন অভিজ্ঞ মানুষের গল্প শোনার ধৈর্য এবং শেখা জ্ঞানকে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছা।
মেঘলার ছোট্ট উদ্যোগ গ্রামের সব পুরোনো খাবার ফিরিয়ে আনতে পারেনি। কিন্তু কিছু রেসিপি হারিয়ে যাওয়ার আগে লিখে রাখা সম্ভব হয়েছে। কয়েকটি পরিবার আবার একসঙ্গে পিঠে বানাতে শুরু করেছে। আর গ্রামের ছোটরা জেনেছে, তাদের খাবারের ঐতিহ্যও তাদের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মেঘলা পুরোনো খাতাটি বন্ধ করল। তার মনে হলো, পাতাগুলোর মধ্যে শুধু রান্নার পদ্ধতি লেখা নেই—লেখা আছে বহু মানুষের পরিশ্রম, ভালোবাসা এবং একসঙ্গে থাকার গল্প।
শিক্ষা: ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তার প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজন শেখার আগ্রহ, যত্নসহকারে সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে জ্ঞান ভাগ করে নেওয়া। ছোট উদ্যোগও মানুষের স্মৃতি ও সংস্কৃতিকে নতুন করে জীবন্ত করে তুলতে পারে।