Categories
গল্প বিবিধ

শেষ বেঞ্চের ছেলেটির অদ্ভুত আবিষ্কার।

১. যে ছেলেকে কেউ গুরুত্ব দিত না

দক্ষিণবঙ্গের একটি ছোট্ট গ্রামের স্কুলে পড়ত পনেরো বছরের অর্ক। ক্লাসে সে বসত একেবারে শেষ বেঞ্চে। পড়াশোনায় সে খুব খারাপ ছিল না, কিন্তু পরীক্ষায় নম্বরও বিশেষ ভালো পেত না। শিক্ষকরা প্রশ্ন করলে সে বেশির ভাগ সময় চুপ করে থাকত। সহপাঠীদের কেউ কেউ তাকে অলস বলত, কেউ বলত, তার দ্বারা বড় কিছু হবে না।

কিন্তু অর্কের মাথায় সারাক্ষণ নানা প্রশ্ন ঘুরত।

কেন সাইকেলের প্যাডেল ঘোরালে চাকা ঘোরে? দরজার কবজা না থাকলে দরজা খুলত কীভাবে? পুরোনো খেলনা খুলে ফেললে তার ভেতরে এত ছোট ছোট যন্ত্রাংশ থাকে কেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে মাঝেমধ্যে বাড়ির পুরোনো জিনিস খুলে বসত। কখনও নষ্ট টর্চ, কখনও ভাঙা ঘড়ি, কখনও বাতিল রেডিওর বাক্স। জিনিসগুলো আবার আগের মতো জোড়া লাগাতে পারত না সব সময়। তাই বাড়িতে বকুনিও খেতে হতো।

তার বাবা সাইকেল মেরামতের কাজ করতেন। তিনি একদিন বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, —সারাক্ষণ এই ভাঙাচোরা জিনিস নিয়ে পড়ে থাকিস কেন? পড়াশোনায় মন দে। এসব দিয়ে কি সংসার চলবে?

অর্ক মাথা নিচু করেছিল। কিন্তু জিনিসের ভেতরে কীভাবে কাজ হয়, তা জানার আগ্রহ তার কমেনি।

একদিন স্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষক দেবাশিসবাবু ঘোষণা করলেন, আগামী মাসে বিজ্ঞান প্রদর্শনী হবে। প্রত্যেকে নিজের মতো করে একটি মডেল বানাতে পারবে।

ক্লাসের সবাই উত্তেজিত হয়ে উঠল। কেউ আগ্নেয়গিরি বানাবে, কেউ সৌরজগতের মডেল, কেউ আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ছোট প্রকল্প।

অর্কও কিছু একটা বানাতে চাইল। কিন্তু তার কাছে দামি সরঞ্জাম কেনার টাকা ছিল না।

সে ভাবতে লাগল—এমন কী বানানো যায়, যা খুব সাধারণ জিনিস দিয়ে তৈরি হবে, অথচ মানুষের কাজে লাগবে?

২. মায়ের একটি সমস্যা

অর্কের মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন। গ্রামের মহিলাদের ব্লাউজ, পেটিকোট, বালিশের কভার কিংবা স্কুলের পোশাক সেলাই করে সংসারে সাহায্য করতেন।

কিন্তু তাঁর একটি সমস্যা ছিল। কাপড়ের মাপ নেওয়ার সময় অনেক সময় ফিতে সরে যেত। কাপড়ে চক দিয়ে দাগ টানতে গিয়ে মাপের রেখা বেঁকে যেত। বিশেষ করে লম্বা কাপড় মাপার সময় বারবার ফিতে ঠিক করতে হতো।

একদিন মা একটি স্কুলের পোশাক কাটতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে বললেন, —ইস্‌, কাপড়টা যদি একাই ঠিক করে ধরে রাখা যেত! বারবার ফিতে সরছে।

অর্ক কথাটা শুনে মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল।

—মা, তুমি যদি এক জায়গায় ফিতেটা আটকে রাখতে পারতে, তাহলে সুবিধা হতো না?

মা হেসে বললেন, —তা তো হতো। কিন্তু ফিতে তো আর নিজে থেকে আটকে থাকবে না!

সেদিন রাতে অর্কের মাথায় একটি ভাবনা এল। যদি একটি সাধারণ যন্ত্র বানানো যায়, যা কাপড়ের এক প্রান্ত ধরে রাখবে এবং অন্য প্রান্তে ফিতেটিকে নির্দিষ্ট অবস্থানে স্থির রাখতে সাহায্য করবে, তাহলে মাপ নেওয়া সহজ হতে পারে।

সে কাগজে কয়েকটি নকশা আঁকল। প্রথম নকশায় ছিল কাঠের দুটি ছোট টুকরো, একটি ক্লিপ, একটি পুরোনো স্প্রিং এবং একটি সরু দণ্ড।

পরদিন সে বাবার কাজের জায়গায় গিয়ে কিছু বাতিল কাঠের টুকরো চাইল।

বাবা অবাক হয়ে বললেন, —এবার আবার কী বানাবি?

অর্ক বলল, —মায়ের কাজে লাগবে এমন একটা জিনিস বানাতে চাই।

বাবা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কাঠের কয়েকটি টুকরো এগিয়ে দিলেন।

—ঠিক আছে। তবে সাবধানে কাজ করবি। ধারালো জিনিস ব্যবহার করলে আমাকে বলবি।

অর্ক কাঠের টুকরোগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরল। তার মনে তখন নতুন আবিষ্কারের উত্তেজনা।

৩. প্রথম যন্ত্র, প্রথম ব্যর্থতা

অর্ক প্রথমে দুটি কাঠের টুকরো জুড়ে একটি ছোট ভিত্তি তৈরি করল। তার সঙ্গে লাগাল কাপড় আটকানোর ক্লিপ। আরেকটি অংশে এমন ব্যবস্থা রাখল, যাতে মাপের ফিতেটি টানটান অবস্থায় রাখা যায়।

প্রথম পরীক্ষায় ফিতেটি ঠিকমতো আটকাল না। একটু টান দিতেই কাঠের অংশ খুলে গেল।

দ্বিতীয়বার সে আরও শক্ত করে জুড়ল। এবার কাঠ ভাঙল না, কিন্তু কাপড় টানার সময় ক্লিপটি কাপড়ে দাগ ফেলে দিল।

তৃতীয়বার সে ক্লিপের মুখে নরম কাপড় লাগাল। এবার কাপড়ে দাগ পড়ল না, কিন্তু ফিতেটি একটু বেঁকে যাচ্ছিল।

অর্ক হতাশ হয়ে যন্ত্রটি টেবিলে রেখে দিল।

মা এসে জিজ্ঞাসা করলেন, —কী হলো? কাজ হচ্ছে না?

অর্ক বিরক্ত হয়ে বলল, —না। একবার একটা সমস্যা ঠিক করি, আরেকবার অন্য সমস্যা দেখা দেয়।

মা মৃদু হেসে বললেন, —তুই যখন প্রথম সাইকেল চালাতে শিখেছিলি, তখন কি একবারেই পেরেছিলি?

অর্ক চুপ করে রইল।

মা আবার বললেন, —ভুল হচ্ছে মানেই সব শেষ নয়। ভুলটা কেন হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারলে তবেই তো পরেরবার ভালো হবে।

কথাগুলো অর্কের মনে গেঁথে গেল।

সে আবার যন্ত্রটি হাতে নিল। এবার একসঙ্গে সব বদলানোর বদলে একবারে একটি অংশ পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিল। প্রথমে ক্লিপের চাপ কমাল, তারপর ফিতেটি সোজা রাখার জন্য কাঠের ওপর সরু দাগ কাটল।

কয়েকবার পরীক্ষা করার পরে যন্ত্রটি আগের চেয়ে ভালো কাজ করতে শুরু করল।

তবু তার অনেক উন্নতি দরকার ছিল।

৪. শেষ বেঞ্চের বন্ধুরা

স্কুলে অর্কের পাশে বসত রাহুল ও মিঠুন। তারা দুজনেই অর্কের এই অদ্ভুত প্রকল্পের কথা জানত।

একদিন রাহুল তার নকশা দেখে বলল, —তুই যদি ফিতেটা টানার জন্য একটা ছোট ঘূর্ণায়মান চাকা লাগাস, তাহলে হয়তো সহজে টানটান করা যাবে।

মিঠুন বলল, —আর কাঠের বদলে পুরোনো প্লাস্টিকের শক্ত টুকরো ব্যবহার করলে ওজন কম হতে পারে।

অর্ক প্রথমে একটু অস্বস্তি বোধ করল। এত দিন সে ভাবছিল, কাজটি তাকে একাই করতে হবে। কিন্তু বন্ধুদের পরামর্শ শুনে তার মনে হলো, অন্যের ভাবনাও কাজে লাগতে পারে।

তিনজন মিলে নতুন নকশা তৈরি করল। তারা একটি বাতিল প্লাস্টিকের বাক্স থেকে উপযুক্ত অংশ কাটল। ছোট একটি ঘূর্ণায়মান চাকা বানাতে পুরোনো খেলনার অংশ ব্যবহার করল। ফিতেটি টানার সময় যাতে বেশি চাপ না পড়ে, সে জন্য একটি সাধারণ আটকে রাখার ব্যবস্থা যোগ করল।

তবে তারা বুঝতে পারল, যন্ত্রটি সব ধরনের কাপড়ে একইভাবে কাজ করছে না। পাতলা কাপড়ে ক্লিপের চাপ কম রাখতে হচ্ছে, আবার মোটা কাপড়ে একটু বেশি চাপ দরকার।

তারা বিভিন্ন ধরনের কাপড়ে পরীক্ষা করে নোট লিখল।

অর্ক খাতায় লিখল—কোন কাপড়ে যন্ত্রটি ভালো কাজ করছে, কোথায় ফিতেটি সরে যাচ্ছে, আর কোন অংশ আরও মজবুত করা দরকার।

রাহুল বলল, —এবার তো এটা সত্যিই একটা বিজ্ঞান প্রকল্প হয়ে যাচ্ছে!

অর্ক হেসে বলল, —আগে ভাবতাম, আবিষ্কার মানে একবারে দারুণ কিছু বানিয়ে ফেলা। এখন বুঝছি, পরীক্ষা আর ভুলের মধ্য দিয়েই জিনিসটা তৈরি হচ্ছে।

৫. বিজ্ঞানের শিক্ষকের পরামর্শ

দেবাশিসবাবু একদিন ক্লাসের পরে অর্ককে ডেকে তার মডেলটি দেখতে চাইলেন।

অর্ক যন্ত্রটি দেখিয়ে বোঝাল, কীভাবে এটি কাপড়ের এক প্রান্ত ধরে রাখতে এবং ফিতেটিকে নির্দিষ্ট অবস্থানে স্থির রাখতে সাহায্য করে।

শিক্ষক মন দিয়ে পরীক্ষা করলেন। তারপর বললেন, —ভাবনাটা ব্যবহারিক। তবে এটাকে এখনই নিখুঁত যন্ত্র বলা যাবে না। কাপড়ের ক্ষতি হচ্ছে কি না, মাপের নির্ভুলতা কতটা, আর দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে যন্ত্রটি টিকবে কি না—এসব পরীক্ষা করা দরকার।

অর্ক মাথা নাড়ল।

শিক্ষক তাকে আরও কয়েকটি পরামর্শ দিলেন। যন্ত্রটির ধারালো প্রান্ত মসৃণ করতে হবে, ক্লিপের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ব্যবহারকারী যেন সহজে ফিতেটি খুলতে পারেন, সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে।

তিনি আরও বললেন, —বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে শুধু সুন্দর মডেল দেখালেই হবে না। কী সমস্যা সমাধান করতে চাইছ, কীভাবে পরীক্ষা করেছ, কোথায় ব্যর্থ হয়েছ এবং কী শিখেছ—সব ব্যাখ্যা করতে হবে।

অর্কের মনে হলো, এবার সে প্রকল্পটিকে আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারবে।

পরবর্তী দুই সপ্তাহ সে আর তার বন্ধুরা নিয়মিত কাজ করল। কিছু অংশ বদলাল, কিছু অংশ বাদ দিল। তারা বুঝতে পারল, সব জটিল ব্যবস্থা দরকার নেই। সহজ নকশাই অনেক সময় বেশি কার্যকর হয়।

শেষ পর্যন্ত তৈরি হলো একটি ছোট, হালকা যন্ত্র। এটি কাপড়ের এক প্রান্ত স্থির রাখতে এবং মাপের ফিতেটি সোজা রাখতে সাহায্য করত। তবে খুব পাতলা বা পিচ্ছিল কাপড়ে ব্যবহারের সময় এখনও সতর্ক থাকতে হতো।

অর্ক নিজের মডেলের নাম দিল—‘সহজমাপ’।

৬. বিজ্ঞান প্রদর্শনীর দিন

অবশেষে বিজ্ঞান প্রদর্শনীর দিন এল।

স্কুলের হলঘরে সারি সারি টেবিল সাজানো হয়েছে। কোথাও সৌরজগতের মডেল, কোথাও বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা, কোথাও আবার ছোট বৈদ্যুতিক সার্কিট।

অর্ক তার টেবিলে ‘সহজমাপ’ সাজিয়ে রাখল। পাশে ছিল নকশার ছবি, পরীক্ষার নোট এবং যন্ত্রটির বিভিন্ন সংস্করণের কয়েকটি নমুনা।

কিছু ছাত্র তার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।

একজন জিজ্ঞাসা করল, —এটা দিয়ে কী হয়?

অর্ক বোঝাল, —কাপড়ের এক প্রান্ত ধরে রাখতে এবং মাপের ফিতেটি সোজা রাখতে সাহায্য করে। এতে একা মাপ নেওয়া কিছুটা সহজ হতে পারে।

একজন শিক্ষক যন্ত্রটি ব্যবহার করে দেখতে চাইলেন। তিনি একটি কাপড়ের ওপর ফিতে রেখে মাপ নিলেন। তারপর বললেন, —ভাবনাটা ভালো। তবে সব ধরনের কাপড়ে সমানভাবে কাজ করার জন্য আরও পরীক্ষা দরকার।

অর্ক সৎভাবে বলল, —হ্যাঁ স্যার। আমি এখনও সব সমস্যার সমাধান করতে পারিনি। পাতলা কাপড়ে ক্লিপের চাপ আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

বিচারকদের একজন তার নোট দেখে বললেন, —তুমি ব্যর্থ পরীক্ষাগুলোও লিখে রেখেছ কেন?

অর্ক উত্তর দিল, —কারণ কোন পরিবর্তনের পরে কী হয়েছে, সেটা না লিখলে আমি বুঝতে পারতাম না কোন নকশা ভালো কাজ করছে।

বিচারক হাসলেন।

—এই অভ্যাসটাই তোমাকে আরও ভালো উদ্ভাবক হতে সাহায্য করবে।

সেদিন অর্কের প্রকল্পটি ব্যবহারিক উদ্ভাবনের জন্য বিশেষ প্রশংসা পেল। সে প্রথম পুরস্কার পায়নি, কিন্তু তার প্রকল্পটি বিচারকদের নজর কেড়েছিল।

৭. যে মানুষটি সবচেয়ে খুশি হলেন

প্রদর্শনী থেকে বাড়ি ফিরে অর্ক প্রথমে মাকে তার মডেলটি দেখাল।

মা যন্ত্রটি হাতে নিয়ে কাপড় মাপার চেষ্টা করলেন। প্রথমবার ফিতেটি একটু সরে গেল। অর্ক সঙ্গে সঙ্গে সেটি ঠিক করে দিল।

দ্বিতীয়বার মাপ নেওয়া অনেক সহজ হলো।

মা বললেন, —এটা দিয়ে আমার কাজ কিছুটা সহজ হবে। তবে ব্যবহার করতে করতে তুই আরও ভালো করে বানাতে পারবি।

অর্ক মায়ের মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এই কয়েক সপ্তাহের পরিশ্রমের সবচেয়ে বড় পুরস্কার এটাই।

বাবাও দোকান থেকে ফিরে মডেলটি দেখলেন। তিনি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন, —আমি ভাবতাম, ভাঙাচোরা জিনিস নিয়ে সময় নষ্ট করিস। আজ বুঝলাম, জিনিসের ভেতরটা বোঝার চেষ্টা করাটাও একটা শেখা।

অর্ক মৃদু হেসে বলল, —আমি এখনও অনেক কিছু জানি না, বাবা।

বাবা তার মাথায় হাত রেখে বললেন, —কেউই সব জানে না। শেখার ইচ্ছেটা যেন হারিয়ে না যায়।

সেদিন রাতে অর্ক তার নকশার খাতাটি খুলে বসেছিল। সে জানত, ‘সহজমাপ’ এখনও সম্পূর্ণ নয়। কিন্তু তার সামনে এখন নতুন কিছু করার সাহস তৈরি হয়েছে।

৮. ছোট উদ্যোগের বড় প্রভাব

পরবর্তী কয়েক মাস অর্ক তার যন্ত্রটির উন্নতি করতে থাকল। স্কুলের কারিগরি শিক্ষকের সাহায্যে সে ক্লিপের চাপ নিয়ন্ত্রণের আরও সহজ উপায় খুঁজল। কিছু পরীক্ষায় সে দেখল, নরম কাপড়ের আবরণ ব্যবহার করলে কাপড়ে দাগ পড়ার আশঙ্কা কমে।

তবে সে এটাও বুঝল, যন্ত্রটি বাজারে বিক্রি করার আগে আরও পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং বাস্তব ব্যবহারকারীদের মতামত নেওয়া দরকার।

অর্ক গ্রামের কয়েকজন সেলাইয়ের কাজ করা মানুষের সঙ্গে কথা বলল। তাঁরা জানালেন, কোন ধরনের কাপড়ে মাপ নিতে বেশি সমস্যা হয় এবং কোন অংশটি আরও সুবিধাজনক হওয়া দরকার।

সবার মতামত একরকম ছিল না। কেউ যন্ত্রটি পছন্দ করলেন, কেউ বললেন, তাঁদের পুরোনো পদ্ধতিই বেশি সুবিধাজনক। অর্ক বুঝল, একটি আবিষ্কার সবার জন্য সমান উপযোগী নাও হতে পারে।

সে তাদের মতামত লিখে রাখল।

স্কুলে ফিরে রাহুল ও মিঠুনকে নিয়ে নতুন নকশা আঁকল। এবার তারা ঠিক করল, পরের সংস্করণটি আরও সহজ হবে এবং যত কম অংশ ব্যবহার করা যায়, তত ভালো।

অর্কের কাজ দেখে স্কুলের আরও কয়েকজন ছাত্রছাত্রী নিজেদের ছোট প্রকল্প শুরু করল। কেউ কৃষিকাজে ব্যবহারযোগ্য সহজ সরঞ্জামের নকশা করল, কেউ আবার শ্রেণিকক্ষের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার ব্যবস্থা তৈরি করল।

অর্ক তাদের সাহায্য করত, কিন্তু কখনও নিজের ভাবনাকেই একমাত্র সঠিক বলে দাবি করত না।

সে শিখেছিল, অন্যের কথা শোনা এবং নিজের ভুল স্বীকার করাও আবিষ্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৯. শেষ বেঞ্চের বদলে নতুন পরিচয়

পরের শিক্ষাবর্ষে অর্কের আসন আর শেষ বেঞ্চে থাকল না। সে নিজেই সামনের দিকে বসতে শুরু করল। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসনে নয়, আত্মবিশ্বাসে এসেছিল।

আগে কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানলে সে ভয় পেত, বন্ধুরা হাসবে। এখন সে বলতে পারত, —আমি জানি না, কিন্তু খুঁজে দেখব।

শিক্ষকরা লক্ষ্য করলেন, অর্ক শুধু বিজ্ঞানের ক্লাসেই নয়, অঙ্ক ও অন্যান্য বিষয়েও বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। কোনো সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সে ধৈর্য ধরে ধাপগুলো লিখে রাখে।

একদিন দেবাশিসবাবু তাকে বললেন, —তুমি জানো, তোমার সবচেয়ে বড় সাফল্য কী?

অর্ক ভেবে বলল, —আমি একটা যন্ত্র বানিয়েছি?

শিক্ষক মাথা নাড়লেন।

—যন্ত্রটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় হলো, তুমি ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়া বন্ধ করেছ। তুমি সমস্যাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বুঝতে শিখেছ। এই দক্ষতা জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই কাজে লাগবে।

অর্ক কথাগুলো মনে রাখল।

সে জানত, ভবিষ্যতে হয়তো তার অনেক প্রকল্প ব্যর্থ হবে। হয়তো সব আবিষ্কার মানুষের কাজে লাগবে না। তবু প্রতিটি চেষ্টা তাকে নতুন কিছু শেখাবে।

১০. আবিষ্কার আসলে কোথা থেকে শুরু হয়

বছর কয়েক পরে অর্ক যখন উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য শহরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন তার পুরোনো খাতাটি আবার হাতে এল।

খাতার প্রথম পাতায় আঁকা ছিল ‘সহজমাপ’-এর প্রথম নকশা। পাশে লেখা—‘কীভাবে কাপড়ের ফিতেটি আটকে রাখা যায়?’

তার নিচে একের পর এক ব্যর্থ পরীক্ষার বিবরণ। কোথাও ভাঙা কাঠের ছবি, কোথাও ক্লিপের নকশা, কোথাও আবার বন্ধুদের পরামর্শ।

শেষ পাতায় লেখা ছিল—‘সহজ জিনিসও ভালোভাবে তৈরি করতে ধৈর্য লাগে।’

অর্ক খাতাটি বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকাল। তার বাবা তখনও সাইকেল মেরামতের কাজ করতেন। মা এখনও সেলাই করতেন। গ্রামের জীবনেও খুব বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি।

কিন্তু অর্কের নিজের পৃথিবী বদলে গিয়েছিল।

সে আর নিজেকে শেষ বেঞ্চের অযোগ্য ছাত্র বলে ভাবত না। সে জানত, প্রত্যেক মানুষের শেখার নিজস্ব পথ আছে। কেউ বই পড়ে দ্রুত শেখে, কেউ হাতে-কলমে কাজ করে, কেউ প্রশ্ন করতে করতে নিজের পথ খুঁজে পায়।

সবাই একই গতিতে এগোয় না। কিন্তু কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং নিজের ভুল থেকে শেখার ক্ষমতা থাকলে যে কেউ নিজের দক্ষতা বাড়াতে পারে।

অর্ক তার খাতাটি ব্যাগে রাখল।

তার সামনে নতুন শহর, নতুন পড়াশোনা, নতুন সমস্যা আর নতুন সম্ভাবনা অপেক্ষা করছিল।

সে মনে মনে বলল, —আমার প্রথম আবিষ্কার হয়তো ছোট ছিল। কিন্তু এটা আমাকে শিখিয়েছে, বড় কাজের শুরু অনেক সময় খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন থেকে হয়।

আর সেই প্রশ্ন করার সাহসই একদিন মানুষকে নতুন পথ দেখাতে পারে।

শিক্ষা: কাউকে তার পরীক্ষার নম্বর বা শ্রেণিকক্ষের অবস্থান দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। কৌতূহল, ধৈর্য, সহযোগিতা এবং ব্যর্থতা থেকে শেখার মানসিকতা একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকেও নতুন কিছু সৃষ্টি করার পথে এগিয়ে দিতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *