বৃদ্ধ অশোকবাবুর ঘরে একটা পুরনো রেডিও ছিল।
রেডিওটা প্রায় ত্রিশ বছরের পুরনো। কাঠের গায়ে আঁচড়, ভলিউমের নবটা একটু বেঁকে গেছে, মাঝেমধ্যে শব্দও কেঁপে উঠত।
তবু অশোকবাবু প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় রেডিওটা চালাতেন।
একই সময়ে।
একই চেয়ারে বসে।
একদিন পাশের বাড়ির রিয়া জিজ্ঞেস করল,
—“কাকু, আপনি প্রতিদিন এই রেডিওটা শোনেন কেন?”
অশোকবাবু হেসে বললেন,
—“কারণ এখানে একটা কণ্ঠস্বর আছে।”
—“কার?”
—“যে কণ্ঠস্বরটা আমাকে একদিন বলেছিল—‘অপেক্ষা করো।’”
রিয়া কিছুই বুঝল না।
অশোকবাবু আর কিছু বললেন না।
পরদিনও সন্ধ্যা সাতটায় রেডিও চালু হল।
কিন্তু সেদিন হঠাৎ রেডিওটা বন্ধ হয়ে গেল।
অশোকবাবু অনেক চেষ্টা করেও চালু করতে পারলেন না।
তিনি যেন খুব ভেঙে পড়লেন।
রিয়া বলল,
—“আমি ঠিক করে দেব।”
পরদিন সে রেডিওটা নিয়ে গেল তার পরিচিত এক মেকানিকের কাছে।
মেকানিক রেডিও খুলে বলল,
—“এটা ঠিক করা সম্ভব। তবে পুরনো হওয়ায় একটু সময় লাগবে।”
রিয়া জিজ্ঞেস করল,
—“এর মধ্যে এমন কী আছে?”
মেকানিক একটা ছোট্ট ক্যাসেট বের করল।
—“এটা কোথা থেকে এল?”
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—“রেডিওর ভেতরেই ছিল?”
মেকানিক মাথা নাড়ল।
ক্যাসেটটা অনেক পুরনো।
রিয়া বাড়ি ফিরে অশোকবাবুকে সব বলল।
তিনি ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“চালিয়ে দে।”
রিয়া পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ার জোগাড় করল।
বোতাম চাপতেই ভেসে এল এক তরুণীর কণ্ঠ—
“অশোক, তুমি যদি কোনওদিন এই কথাগুলো শোনো, তাহলে বুঝবে আমি তোমাকে ভুলিনি।”
অশোকবাবুর হাত কেঁপে উঠল।
রিয়া নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
কণ্ঠস্বরটি বলছিল,
“বাবা আমাকে অন্য শহরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি জানি না আবার কখন ফিরতে পারব। কিন্তু তুমি প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় রেডিওটা চালিয়ে রেখো। কোনওদিন যদি আমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাও, বুঝবে আমি ফিরে এসেছি।”
তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।
শেষে সেই কণ্ঠ বলল,
“আর যদি আমি ফিরতে না পারি, তবুও রেডিওটা চালিয়ে রেখো। কারণ অপেক্ষা করা মানে শুধু কাউকে পাওয়ার আশা নয়। অপেক্ষা মানে কাউকে ভুলে না যাওয়া।”
ক্যাসেট থেমে গেল।
ঘরে নিস্তব্ধতা।
অশোকবাবুর চোখ দিয়ে জল পড়ছিল।
রিয়া ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
—“তিনি কোথায়?”
অশোকবাবু জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“জানি না।”
—“আপনি খুঁজেছিলেন?”
—“চল্লিশ বছর।”
পরদিন রিয়া পুরনো রেডিও অনুষ্ঠানের আর্কাইভ খুঁজতে শুরু করল।
কণ্ঠস্বরটি কোনও অনুষ্ঠানের ছিল না।
ক্যাসেটটি ব্যক্তিগত রেকর্ডিং।
তবু ক্যাসেটের বাক্সের নিচে একটি পুরনো কাগজ পাওয়া গেল।
একটি নাম।
মাধুরী সেন।
আর একটি হাসপাতালের নাম।
রিয়া অনেক খোঁজাখুঁজি করে জানতে পারল, মাধুরী সেন নামে একজন বৃদ্ধা এখনও বেঁচে আছেন।
শহরটা অন্য।
ঠিকানা পাওয়া গেল।
দু’দিন পর অশোকবাবু আর রিয়া সেই ঠিকানায় পৌঁছাল।
দরজা খুললেন এক বৃদ্ধা।
অশোকবাবুকে দেখে তাঁর চোখ স্থির হয়ে গেল।
অশোকবাবু শুধু বললেন,
—“রেডিওটা এখনও চালাই।”
বৃদ্ধার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
—“আমি ভেবেছিলাম তুমি আর অপেক্ষা করবে না।”
অশোকবাবু মৃদু হেসে বললেন,
—“তুমি বলেছিলে অপেক্ষা করতে।”
বৃদ্ধা চোখ মুছে বললেন,
—“এত বছর?”
—“কণ্ঠস্বরটা তো প্রতিদিন শুনতাম।”
দু’জনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
রিয়া একটু দূরে সরে গেল।
কারণ কিছু মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া যায়, কিন্তু সেই মুহূর্তের মধ্যে থাকা যায় না।
সন্ধ্যা সাতটায় অশোকবাবুর বাড়িতে আবার রেডিও বাজল।
এবার পুরনো কাঁপা শব্দের সঙ্গে মিশে গেল দুটি বৃদ্ধ কণ্ঠের হাসি।
রেডিওর গান শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু অপেক্ষার গল্পটা সেদিনই যেন শেষ হল।
কারণ কিছু মানুষ আমাদের জীবনে ফিরে আসে দেরিতে—কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন আমরা বুঝতে পারি অপেক্ষাটাও ভালোবাসারই একটি রূপ।
সমাপ্ত।