Categories
গল্প

স্টেশনের লকার নম্বর ১৭।

প্রতিদিন সকালে স্টেশনে এসে একই কাজ করত বিজয়।

প্ল্যাটফর্মে চা বিক্রি করত সে।

চা, বিস্কুট আর কয়েকটা খবরের কাগজ—এই ছিল তার ছোট্ট সংসার।

এক শীতের সকালে চা দিতে গিয়ে সে দেখল, প্ল্যাটফর্মের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন।

বিজয় জিজ্ঞেস করল,

—“কাউকে অপেক্ষা করছেন?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

—“হ্যাঁ। তবে জানি না সে আসবে কি না।”

—“কতক্ষণ ধরে?”

—“বিশ বছর।”

বিজয় অবাক হয়ে গেল।

বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।

সেদিন সন্ধ্যায় ট্রেন চলে যাওয়ার পর বিজয় দেখল, বেঞ্চের নিচে একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স পড়ে আছে।

বাক্সের ওপর লেখা—

“লকার ১৭।”

স্টেশনের পুরনো লকারঘরে গিয়ে সে ১৭ নম্বর লকারটা খুঁজে পেল।

লকারটি তালাবন্ধ।

কিন্তু পাশে একটি ছোট্ট চাবি পড়ে ছিল।

বিজয় চাবিটা দিয়ে লকার খুলল।

ভেতরে একটি কাপড়ে মোড়ানো বাক্স।

আর একটি চিঠি।

চিঠির ওপর লেখা—

“যে মানুষ এটি পাবে, সে যেন চিঠিটা পড়ে।”

বিজয় চিঠি খুলল।

“আমি জানি না, এই চিঠি কার হাতে পৌঁছবে।

বিশ বছর আগে আমি এই স্টেশনে আমার ছেলেকে শেষবার দেখেছিলাম। আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। সে রাগ করে চলে যায়।

যাওয়ার আগে বলেছিল, ‘বাবা, কোনওদিন যদি মনে হয় আমি তোমাকে ভুলে গেছি, লকার ১৭ খুলবে।’

কিন্তু আমি কখনও লকারটা খুলিনি।

কারণ মনে হয়েছিল, সে নিজেই একদিন ফিরে এসে খুলবে।

যদি আমি না থাকি, তবে এই বাক্সটা তার হাতে পৌঁছে দিও।”

বিজয়ের বুকটা কেঁপে উঠল।

বাক্স খুলে দেখা গেল—একটি পুরনো ঘড়ি, একটি শিশুর ছবি এবং কিছু টাকা।

আর একটি কাগজ।

তাতে লেখা—

“তোর পড়াশোনার জন্য জমিয়েছিলাম। তুই হয়তো নিতে আসিসনি। কিন্তু টাকা এখনও তোরই।”

বিজয় বুঝল, এই বাক্সটি কোনও সাধারণ বাক্স নয়।

সে পরদিন সেই বৃদ্ধকে খুঁজতে শুরু করল।

দু’দিন পর জানতে পারল, বৃদ্ধের নাম নরেন।

তিনি স্টেশনের কাছেই একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন।

বিজয় ছুটে গেল।

নরেনবাবু চিঠিটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“তুমি লকার খুলেছ?”

—“জি।”

—“আমার ছেলে?”

—“আমি জানি না।”

বৃদ্ধের মুখটা ম্লান হয়ে গেল।

ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।

একজন মাঝবয়সি মানুষ দাঁড়িয়ে।

হাতে পুরনো ব্যাগ।

তিনি ভেতরে ঢুকে বললেন,

—“বাবা…”

নরেনবাবু যেন পাথর হয়ে গেলেন।

মানুষটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তাঁর সামনে বসে পড়ল।

—“আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি।”

নরেনবাবু কাঁপা গলায় বললেন,

—“তুই এলি?”

ছেলেটি মাথা নিচু করে বলল,

—“আজ লকার ১৭ খুলতে এসেছিলাম।”

বিজয় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

ছেলেটি বলল,

—“বাবা, আমি জানতাম না তুমি এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছ।”

নরেনবাবু হেসে বললেন,

—“বাবারা অপেক্ষা করার জন্য কোনও কারণ খোঁজে না।”

ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

বিজয় বেরিয়ে আসার সময় নরেনবাবু তাকে ডাকলেন।

—“বিজয়।”

—“জি?”

—“তুই না থাকলে হয়তো আমার ছেলে আর আমার দেখা হতো না।”

বিজয় মাথা নাড়ল।

—“আমি শুধু লকারটা খুলেছি।”

নরেনবাবু বললেন,

—“না। তুই একটা দরজা খুলেছিস।”

বিজয় কিছু বুঝতে না পেরে চলে গেল।

পরদিন সকালে স্টেশনে এসে সে নিজের চায়ের দোকান খুলল।

কিছুক্ষণ পর এক তরুণ ছুটে এসে বলল,

—“দাদা, এক কাপ চা দেবেন?”

বিজয় চা এগিয়ে দিল।

তরুণটি হাসল।

—“বাবা বলেছে, আপনার কাছে একদিন চা খেতেই হবে।”

বিজয় তাকিয়ে দেখল—নরেনবাবুর ছেলে।

দু’জনেই হেসে ফেলল।

স্টেশনে তখন ট্রেন ঢুকছে।

মানুষ ছুটছে।

ঘোষণার শব্দ ভেসে আসছে।

আর প্ল্যাটফর্মের এক কোণে, লকার নম্বর ১৭ নীরবে বন্ধ হয়ে গেছে।

কারণ তার ভেতরের অপেক্ষাটা অবশেষে শেষ হয়েছে।

কিছু তালা চাবি দিয়ে খোলা যায়। আর কিছু তালা খুলতে লাগে শুধু একজন মানুষের একটু সাহস।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *