Categories
অনুগল্প

লিফটের চার নম্বর তলা।

বড় শহরের একটা বহুতল আবাসনে থাকত নীলয়।

সকাল থেকে রাত—অফিস, মিটিং, ফোন, ই-মেইল। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে, সেটাও সে জানত না।

একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় লিফটে উঠতেই চার নম্বর তলায় লিফট থেমে গেল।

দরজা খুলতেই এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে ছিলেন।

হাতে ভারী বাজারের ব্যাগ।

নীলয় বলল,

—“দিদা, দিন, আমি নিয়ে দিচ্ছি।”

বৃদ্ধা একটু অবাক হয়ে ব্যাগটা এগিয়ে দিলেন।

—“আপনি চার নম্বরেই থাকেন?”

—“হ্যাঁ।”

—“আমিও।”

দুজন একই তলায় থাকেন—এটাই নীলয় প্রথম জানল।

পরদিন আবার দেখা।

তারপর প্রায় প্রতিদিনই।

বৃদ্ধার নাম কমলা দেবী।

স্বামী নেই। ছেলে বিদেশে থাকে।

কমলা দেবী একা থাকেন।

একদিন নীলয় জিজ্ঞেস করল,

—“আপনার ছেলে কি আসেন না?”

বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।

—“সময় পায় না।”

নীলয় আর কিছু বলল না।

কিন্তু সেদিন থেকে সে মাঝে মাঝে দরজায় কড়া নেড়ে জিজ্ঞেস করত,

—“কিছু লাগবে?”

কমলা দেবীও যেন অপেক্ষা করতেন।

কখনও এক কাপ চা, কখনও বাজার থেকে ওষুধ, কখনও শুধু পাঁচ মিনিট গল্প।

একদিন নীলয় অফিস থেকে ফিরতে দেখল, চার নম্বর তলায় অনেক লোক।

কমলা দেবী পড়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

নীলয় ছুটে হাসপাতালে গেল।

ডাক্তার বললেন,

—“পরিবারের কাউকে খবর দিন।”

নীলয় ফোন করল তাঁর ছেলেকে।

ছেলে বলল,

—“আমি যত তাড়াতাড়ি পারি আসছি।”

কিন্তু বিদেশ থেকে আসতে সময় লাগবে।

পরের কয়েকদিন নীলয়ই হাসপাতাল, ওষুধ, খাবার—সব সামলাল।

এক সপ্তাহ পরে কমলা দেবী বাড়ি ফিরলেন।

দরজার সামনে এসে তিনি নীলয়ের হাত ধরে বললেন,

—“তুই না থাকলে আমি কী করতাম?”

নীলয় হেসে বলল,

—“আপনি তো আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন।”

কমলা দেবী মাথা নাড়লেন।

—“পাশের ফ্ল্যাটে থাকা আর পাশে থাকা এক কথা নয়।”

কথাটা নীলয়ের মনে গেঁথে গেল।

কয়েক মাস পর এক রাতে লিফটে এক নতুন পরিবার উঠল।

তাদের সঙ্গে ছিল এক বৃদ্ধ মানুষ। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল।

লিফট চার নম্বর তলায় থামল।

নীলয় দরজা খুলে বৃদ্ধের ব্যাগটা হাতে নিল।

ঠিক তখন পিছন থেকে কমলা দেবীর কণ্ঠ শোনা গেল,

—“নীলয়, ব্যাগটা একটু আমি নিই।”

নীলয় অবাক হয়ে তাকাল।

—“আপনি পারবেন?”

কমলা দেবী হেসে বললেন,

—“তুই তো আমাকে শিখিয়েছিস।”

বৃদ্ধ লোকটা অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকালেন।

কমলা দেবী বললেন,

—“এই বাড়িতে আমরা সবাই একই তলায় থাকি। কিন্তু চেষ্টা করলে একে অপরের পাশেও থাকা যায়।”

লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

ডিজিটাল স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

৪

নীলয়ের মনে হল, চার নম্বর তলা আসলে শুধু একটা ঠিকানা নয়।

এটা একটা শিক্ষা।

মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী সে নয়, যে সবচেয়ে কাছে থাকে—সে, যে প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ায়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *