গ্রামের পোস্ট অফিসটা ছিল রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্তে। ছোট্ট একটা ঘর, সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছ আর পাশে ভাঙা বেঞ্চ।
সেই পোস্ট অফিসে কাজ করতেন হরিদাসবাবু।
চিঠি বিলি করতে করতে তাঁর জীবনের তিরিশ বছর কেটে গিয়েছিল।
কিন্তু অবসর নেওয়ার আগের দিনও একটা চিঠি তাঁর কাছে এসে আটকে গেল।
খামের ওপর লেখা—
“যার হাতে পৌঁছবে, সে যেন পড়ে।”
প্রেরকের নাম নেই।
প্রাপকের নাম নেই।
শুধু ঠিকানা—
“নদীর ধারের পুরনো বাড়ি, যে বাড়ির জানালায় সন্ধ্যায় আলো জ্বলে।”
হরিদাসবাবু অবাক হলেন।
গ্রামে এমন বাড়ি অনেক।
তবু চিঠিটা আলাদা করে তাঁর মনে দাগ কাটল।
পরদিন অবসর।
তবু চিঠিটা তিনি নিজের ব্যাগে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে নদীর ধারে হাঁটতে লাগলেন।
অবশেষে দেখতে পেলেন একটা পুরনো বাড়ি। জানালায় সত্যিই আলো জ্বলছে।
দরজায় কড়া নাড়তেই এক বৃদ্ধা দরজা খুললেন।
হরিদাসবাবু খামটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,
—“আপনার জন্য কিনা জানি না।”
বৃদ্ধা খামটা হাতে নিয়েই কেঁপে উঠলেন।
—“এটা… কোথায় পেলেন?”
—“পোস্ট অফিসে এসেছিল।”
বৃদ্ধা চিঠিটা খুললেন।
মাত্র কয়েকটি লাইন।
“মা,
আমি জানি, ফিরে আসতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে। তুমি যদি এখনও জানালায় আলো জ্বেলে রাখো, তবে বুঝব তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ।
—তোমার অরুণ।”
বৃদ্ধার হাত কাঁপছিল।
তিনি ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।
হরিদাসবাবু জিজ্ঞেস করলেন,
—“আপনার ছেলে?”
বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।
—“ত্রিশ বছর আগে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। তারপর আর আসেনি।”
—“কোনও খবর পাননি?”
—“না।”
বৃদ্ধা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তবু আমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় আলো জ্বেলে রাখতাম।”
হরিদাসবাবু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
হঠাৎ বৃদ্ধা বললেন,
—“চিঠিটা কি আজ এসেছে?”
—“জি।”
তিনি মৃদু হাসলেন।
—“তাহলে ও হয়তো কাছেই আছে।”
সেই রাতেই নদীর ঘাটের দিকে একটা ছায়ামূর্তি দেখা গেল।
একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ ধীরে ধীরে পুরনো বাড়িটার দিকে এগিয়ে আসছিল।
বৃদ্ধা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইলেন।
দুজনেই কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
তারপর বৃদ্ধা শুধু বললেন,
—“এত দেরি করলি কেন?”
লোকটা মাথা নিচু করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“ভয় পেয়েছিলাম মা।”
বৃদ্ধা আর কিছু বললেন না।
ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।
দূরে দাঁড়িয়ে হরিদাসবাবু চোখ মুছলেন।
অরুণ তাঁর কাছে এসে বলল,
—“আপনি না এলে হয়তো আমি সাহস পেতাম না।”
হরিদাসবাবু মাথা নাড়লেন।
—“আমি শুধু চিঠিটা পৌঁছে দিয়েছি।”
অরুণ বলল,
—“না। আপনি একটা ঠিকানা খুঁজে দিয়েছেন।”
পরদিন হরিদাসবাবু তাঁর শেষ কর্মদিবসে পোস্ট অফিসে গেলেন।
টেবিলটা খালি।
চিঠির বস্তা নেই।
স্ট্যাম্প নেই।
শুধু তাঁর পুরনো কলমটা পড়ে আছে।
তিনি কলমটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর সেটি পোস্টমাস্টারের হাতে দিয়ে বললেন,
—“এটা রেখে দিন।”
পোস্টমাস্টার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—“কেন?”
হরিদাসবাবু হাসলেন।
—“এই কলমে অনেক চিঠি লেখা হয়েছে। কিন্তু শেষ চিঠিটা আমাকে শিখিয়েছে—কখনও কখনও একটা চিঠি শুধু কাগজে লেখা থাকে না, মানুষের অপেক্ষার ওপর লেখা থাকে।”
বাইরে তখন কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরছিল।
আর নদীর ওপারের সেই পুরনো বাড়ির জানালায় সেদিনও আলো জ্বলছিল।
তবে সেই আলো আর অপেক্ষার ছিল না।
এবার সেটা ছিল ফিরে পাওয়ার আলো।