অরিন্দমের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন বাইরে ভোর হয়ে এসেছে।
ঘরের দেওয়ালে ঝুলে থাকা বারোটি ঘড়ির সব কটিতে একই সময়—সকাল পাঁচটা সতেরো। অথচ সিগন্যাল কেবিনের নিচের ঘরে কোনও জানালা নেই। সূর্যের আলো সেখানে পৌঁছোনোর কথাও নয়।
সে ধীরে ধীরে উঠে বসল।
মাথাটা ভারী। ডান হাতের কবজিতে গভীর লাল দাগ। সামনে কাঠের টেবিল, তার ওপরে পুরোনো টেপ রেকর্ডার। কিন্তু অনন্যা নেই। দ্বিতীয় অরিন্দমও নেই।
শুধু টেবিলের মাঝখানে পড়ে আছে একটি সাদা খাম।
খামের ওপরে তার নিজের হাতের লেখায় লেখা—
“অরিন্দম বসু, যখন তুমি সত্যিটা জানতে প্রস্তুত হবে।”
অরিন্দম খামটি খুলল।
ভেতরে একটি চিঠি, একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি এবং একটি ছোট্ট রুপোর পায়েল।
পায়েলটি হাতে নিতেই তার মনে পড়ে গেল অনন্যার কথা। বারো বছর আগে সে এই পায়েলটি নিজের পকেটে রেখেছিল। কিন্তু কেন? কী এমন ছিল ওই পায়েলে, যার জন্য সে নিজের বোনকে আগুনের মধ্যে রেখে এসেছিল?
চিঠিটি খুলে পড়তে শুরু করল।
“অরিন্দম,
যদি এই চিঠি তোমার হাতে এসে থাকে, তা হলে বুঝতে হবে, তেরো নম্বর দরজা আবার খুলেছে। আমি জানি না তুমি এখন কোথায় আছ, কিংবা তুমি এখনও আগের মানুষটি আছ কি না। তবু কিছু কথা তোমাকে জানানো দরকার।
তুমি যখন জন্মেছিলে, তখন তোমার মা দুটি শিশুর জন্ম দিয়েছিলেন। একজন ছিল তাঁর নিজের সন্তান। অন্যজন ছিল এমন একটি শিশু, যার জন্মের কোনও ব্যাখ্যা চিকিৎসাবিজ্ঞান দিতে পারেনি।
দুটি শিশুর শরীর একই রকম ছিল। মুখ, চোখ, হাতের রেখা, এমনকি জন্মদাগও। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি পার্থক্য ছিল। একটি শিশু কাঁদত। অন্যটি শুধু তাকিয়ে থাকত।
তোমার বাবা সেই দ্বিতীয় শিশুটিকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি তাকে হাসপাতালের একটি বিশেষ কক্ষে আটকে রাখেন। কিন্তু কয়েক দিন পর দেখা যায়, শিশুটি আর কক্ষে নেই। তার বদলে দেওয়ালের আয়নায় দেখা যাচ্ছে একটি খালি দোলনা।
সেই দিন থেকেই তোমার জীবনে অস্বাভাবিক ঘটনাগুলি শুরু হয়।
তুমি বড় হতে থাকলে। তোমার স্মৃতি তৈরি হল। তোমার বন্ধু হল, স্কুল হল, পরিবার হল। কিন্তু প্রতি আঠারোই অক্টোবর তোমার মধ্যে কিছু বদলে যেত। তুমি রাতের বেলা ঘুম থেকে উঠে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। কখনও কখনও এমন ভাষায় কথা বলতে, যা আমরা কেউ বুঝতাম না।
তোমার বাবা বুঝেছিলেন, সেই শিশুটি তোমার ভেতরেই কোথাও রয়েছে।
তিনি তাকে বের করে আনতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু তার জন্য দরকার ছিল এমন একটি দরজা, যা সময়ের দুই প্রান্তকে যুক্ত করতে পারে।
সেই দরজার নাম—তেরো নম্বর দরজা।
তোমার বাবা রেলওয়ের সিগন্যাল কেবিনের নিচে একটি পরীক্ষাগার তৈরি করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নির্দিষ্ট সময়ে দুটি জীবনের মধ্যবর্তী ব্যবধান অতিক্রম করা সম্ভব। কিন্তু পরীক্ষার রাতে তিনি নিজেই সেই দরজার ওপারে চলে যান।
আর কোনও দিন ফিরে আসেননি।
তোমার বাবা মারা যাননি, অরিন্দম। তিনি আটকে পড়েছেন এমন একটি জায়গায়, যেখানে অতীত ও ভবিষ্যৎ একসঙ্গে বেঁচে থাকে।
তোমাকে বাঁচানোর জন্য তোমার মা সবকিছু গোপন করেছিলেন।
কিন্তু তিনি একটি ভুল করেছিলেন।
তিনি জানতেন না, কোন শিশুটিকে তিনি বাড়িতে ফিরিয়ে এনেছেন।
—হরিপদ মণ্ডল।”
চিঠিটি পড়ে অরিন্দম অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।
এবার তার কাছে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার। যে মানুষটি তার মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সে হয়তো কোনও সাধারণ প্রতারক নয়। সে তার জীবনের এমন একটি অংশ, যার অস্তিত্ব এতদিন কেউ স্বীকার করেনি।
কিন্তু যদি সেই মানুষটিই আসল অরিন্দম হয়, তবে সে নিজে কে?
তার স্মৃতি কি মিথ্যে? তার ভালোবাসা কি মিথ্যে? মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমোনো, বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া, অনন্যার সঙ্গে ঝগড়া—সবই কি অন্য কারও জীবনের স্মৃতি?
অরিন্দম পায়েলটি মুঠোয় চেপে ধরল।
না।
যে স্মৃতিতে ভালোবাসা আছে, তা শুধু একটি দরজা খুলে মুছে ফেলা যায় না।
সে উঠে দাঁড়াল।
এবার তাকে বাবাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই সে বুঝতে পারল, স্টেশনটি বদলে গেছে।
প্ল্যাটফর্মে আর কোনও বেঞ্চ নেই। টিকিটঘরের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরোনো কাঠের বাড়ি। রেললাইনের পাশে শালগাছগুলির বদলে দেখা যাচ্ছে বিশাল এক মাঠ। দূরে কয়েকটি শিশু খেলছে।
আর সেই মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা।
অরিন্দমের বাবা, অনিরুদ্ধ বসু, মারা গিয়েছিলেন আট বছর আগে—অন্তত সে এতদিন সেটাই জানত।
বাবার পরনে সাদা পাঞ্জাবি। চুলে পাক ধরেছে। মুখে সেই পরিচিত শান্ত হাসি।
“বাবা!”
অরিন্দম দৌড়ে গেল।
কিন্তু কাছে পৌঁছোনোর আগেই তার বাবা হাত তুলে থামালেন।
“আর এক পা এগোবে না।”
অরিন্দম থেমে গেল।
“তুমি বেঁচে আছ?”
“বেঁচে থাকা আর মৃত থাকার মধ্যে পার্থক্য কী, অরিন্দম? যে মানুষকে কেউ মনে রাখে না, সে কি সত্যিই বেঁচে থাকে?”
“তুমি কোথায় ছিলে এতদিন?”
“যেখানে তোমাকে নিয়ে আসার কথা ছিল।”
“কেন?”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“কারণ তোমাকে সত্যিটা জানাতে হবে। তোমার জন্মের সময় যে দুটি শিশু এসেছিল, তাদের মধ্যে একজন ছিল আমার সন্তান। অন্যজন ছিল এমন এক সম্ভাবনা, যা বাস্তবে রূপ নেওয়ার কথা ছিল না।”
“সম্ভাবনা?”
“মানুষের জীবনে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে আরেকটি জীবন তৈরি হয়। তুমি যদি অন্য সিদ্ধান্ত নিতে, অন্য পথে যেতে, তা হলে অন্য একজন অরিন্দম জন্ম নিত। অধিকাংশ সম্ভাবনা কখনও বাস্তব হয় না। কিন্তু কিছু সম্ভাবনা সময়ের ফাঁকে আটকে থাকে।”
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে শুনছিল।
বাবা বললেন, “আমি সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব করতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সময়ের দরজা খুলে তাকে ফিরিয়ে আনতে পারব। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি, যে দরজা খোলে, সে শুধু একজনকে ভিতরে আনে না। অন্য কাউকে বাইরে ঠেলে দেয়।”
“তাহলে আমার সামনে যে মানুষটা এসেছে, সে কে?”
“সে তোমার সেই জীবন, যা তুমি বাঁচোনি।”
অরিন্দমের বুকের মধ্যে কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হল।
“কিন্তু আমি তো বেঁচে আছি!”
“হ্যাঁ। তুমিও বেঁচে আছ। সেও বেঁচে আছে। এটাই সমস্যার মূল।”
“দুজন একই সঙ্গে কীভাবে বেঁচে থাকতে পারে?”
বাবা মাঠের দিকে তাকালেন।
“যতক্ষণ তেরো নম্বর দরজা খোলা থাকে, ততক্ষণ দুটি জীবন পাশাপাশি থাকতে পারে। কিন্তু দরজা চিরকাল খোলা থাকবে না। একদিন সময় নিজের হিসাব চাইবে। তখন একজনকে ফিরে যেতে হবে।”
“কোথায়?”
“যেখানে তার জন্ম হওয়ার কথা ছিল না।”
অরিন্দম বাবার হাত ধরতে গেল। কিন্তু তার আঙুল বাবার শরীরের ভেতর দিয়ে চলে গেল।
সে আতঙ্কিত হয়ে পিছিয়ে এল।
বাবা মৃদু হাসলেন।
“দেখলে? আমি এখানে আছি, অথচ পুরোপুরি নেই। আমি দরজার ওপাশে আটকে থাকা একজন মানুষ।”
“তোমাকে ফিরিয়ে আনব, বাবা।”
“আমাকে নয়। অনন্যাকে ফিরিয়ে আনো।”
“অনন্যা কোথায়?”
“সে সময়ের শেষ কামরায় আটকে আছে। তোমাদের দুজনের মধ্যে যে একজনকে ফিরতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সে মুক্তি পাবে না।”
“কেন ওকে এই সবের মধ্যে টেনে আনা হল?”
বাবার মুখ কঠিন হয়ে উঠল।
“কারণ সে দরজার চাবি।”
অরিন্দম মুঠো খুলে পায়েলটি দেখাল।
“এটাই?”
বাবা মাথা নাড়লেন।
“তোমার মা পায়েলটির ভেতরে একটি ছোট্ট চুম্বক বসিয়েছিলেন। ওই চুম্বক সাধারণ ধাতু নয়। এটি সেই পরীক্ষাগারের বিশেষ যন্ত্রের অংশ। দরজাটি খুলতে পায়েলটি দরকার হয়। কিন্তু দরজা বন্ধ করতে লাগে অন্য কিছু।”
“কী?”
বাবা উত্তর দেওয়ার আগে চারপাশের মাঠে অদ্ভুত পরিবর্তন শুরু হল। শিশুরা একে একে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। গাছের পাতা শুকিয়ে কালো হয়ে যাচ্ছে। আকাশের রং ধূসর হয়ে উঠছে।
বাবা দ্রুত বললেন, “সময় ফুরিয়ে আসছে। তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
“কী সিদ্ধান্ত?”
“তুমি কি নিজের জীবনকে সত্যি বলে মেনে নেবে, নাকি অন্য জীবনের জন্য নিজের অস্তিত্ব ছেড়ে দেবে?”
অরিন্দমের গলা শুকিয়ে গেল।
“যদি আমি নিজের অস্তিত্ব ছেড়ে দিই, তা হলে কী হবে?”
“অন্য অরিন্দম ফিরে আসবে। তার জীবন সম্পূর্ণ হবে। অনন্যা তার ভাইকে ফিরে পাবে। আর তুমি…”
বাবা বাকিটা বললেন না।
অরিন্দম বুঝে গেল।
“আর যদি আমি না করি?”
“তাহলে অন্য অরিন্দম মুছে যাবে। কিন্তু তার সঙ্গে মুছে যাবে তোমার জীবনের সেই সব স্মৃতি, যা তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তুমি হয়তো অনন্যাকে বাঁচাতে পারবে, কিন্তু তোমার বোন তোমাকে আর কোনও দিন মনে রাখতে পারবে না।”
“এ কেমন বিচার?”
বাবা চোখ নামিয়ে নিলেন।
“সময়ের বিচার কখনও মানুষের পছন্দ অনুযায়ী হয় না।”
মাঠের এক প্রান্তে হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
বাবা অস্থির হয়ে উঠলেন।
“এবার যাও। শেষ ট্রেন চলে এলে আর সুযোগ পাবে না।”
“বাবা, তোমাকে ছেড়ে যাব না!”
“তুমি আমাকে ছেড়ে যাচ্ছ না। তুমি এমন একটি জীবনকে বাঁচানোর চেষ্টা করছ, যা তোমার জন্মের আগেই হারিয়ে গিয়েছিল।”
অরিন্দম কিছু বলার আগেই বাবার শরীর কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল।
মাঠটি অদৃশ্য হয়ে গেল।
আবার ফিরে এল শালবন জংশন।
প্ল্যাটফর্মের ঘড়িতে রাত এগারোটা বেয়াল্লিশ।
সময় যেন ঘুরে আবার সেই একই মুহূর্তে ফিরে এসেছে।
কিন্তু এবার অরিন্দম একা নয়।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অনন্যা।
মেয়েটির চোখে জল। হাতে লাল ছাতা।
“দাদা, তুমি কি বাবার সঙ্গে দেখা করেছ?”
অরিন্দম মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
“তাহলে সব জানো?”
“কিছুটা।”
অনন্যা তার হাত ধরল।
“তোমাকে একটা কথা বলতে হবে। তুমি যে-ই হও, তুমি আমার দাদা। আমার স্মৃতিতে তুমি আছ। আমার শৈশবে তুমি আছ। আমার প্রতিটি দুঃখের মধ্যে তুমি আছ। কেউ যদি বলে তুমি সত্যি নও, আমি তা বিশ্বাস করব না।”
অরিন্দমের চোখ ভিজে উঠল।
“কিন্তু যদি আমি সত্যিই তোমার আসল দাদা না হই?”
অনন্যা তার দিকে তাকাল।
“আসল দাদা বলতে কী বোঝায়? যে একই মায়ের গর্ভে জন্মেছে, শুধু সে-ই কি দাদা? যে আমার জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করেছে, সে কি আমার দাদা নয়?”
অরিন্দমের বুকের ভেতর জমে থাকা ভার যেন কিছুটা হালকা হল।
ঠিক তখনই প্ল্যাটফর্মের ওপাশ থেকে দ্বিতীয় অরিন্দম এগিয়ে এল।
তার মুখে ক্লান্তির ছাপ। পোড়া দাগগুলি যেন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সে অনন্যার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি ওকে বেছে নিয়েছ?”
অনন্যা মাথা নাড়ল।
“আমি কাউকে বেছে নিইনি। আমি চাই, তোমরা দুজনেই বেঁচে থাকো।”
দ্বিতীয় অরিন্দম তিক্তভাবে হেসে উঠল।
“তা সম্ভব নয়।”
“কেন নয়?”
“কারণ এই পৃথিবীতে দুটো একই জীবন থাকতে পারে না। একজনকে ফিরতে হবে।”
অরিন্দম এগিয়ে এল।
“তাহলে আমি ফিরব।”
অনন্যা চমকে উঠল।
“না, দাদা!”
দ্বিতীয় অরিন্দমও স্তব্ধ হয়ে গেল।
“তুমি জানো, এর অর্থ কী?”
“জানি।”
“তুমি মুছে যাবে। তোমার কোনও স্মৃতি থাকবে না। কেউ তোমাকে মনে রাখবে না।”
অরিন্দম শান্ত গলায় বলল, “কিন্তু অনন্যা বেঁচে থাকবে। সেটাই যথেষ্ট।”
অনন্যা কাঁদতে কাঁদতে তার হাত চেপে ধরল।
“তুমি সব সময় এমন করো কেন? ছোটবেলায়ও আমার জন্য নিজের প্রিয় খেলনাটা দিয়ে দিতে। স্কুলে কেউ আমাকে কষ্ট দিলে তুমি নিজের দোষ স্বীকার করতে। আমি হারিয়ে গেলে তুমি আমাকে খুঁজতে বেরোতে। আজও তুমি নিজের জীবন দিয়ে আমাকে বাঁচাতে চাইছ।”
অরিন্দম মৃদু হাসল।
“তুই আমার বোন।”
“তাহলে আমাকেও একটা সুযোগ দাও।”
অনন্যা পায়েলটি অরিন্দমের হাত থেকে নিয়ে নিজের বাঁ পায়ে পরল।
তারপর সে দ্বিতীয় অরিন্দমের দিকে তাকাল।
“তুমি কি জানো, তোমার জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল কী ছিল?”
লোকটি চুপ করে রইল।
“তুমি সব সময় ভেবেছ, তোমার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হলে অন্য কাউকে মুছে ফেলতে হবে। কিন্তু তুমি কোনও ছায়া নও। তুমি একটি জীবন। তোমারও স্মৃতি আছে, ভালোবাসা আছে, যন্ত্রণা আছে। তুমি কেন অন্যের জীবন কেড়ে নিয়ে নিজেকে সত্যি প্রমাণ করতে চাইছ?”
দ্বিতীয় অরিন্দমের চোখে জল এসে গেল।
“কারণ আমি কোনও দিন কারও ভালোবাসা পাইনি।”
“তুমি কি নিশ্চিত?”
অনন্যা তার দিকে এগিয়ে গেল।
“আমি তো তোমাকেও ভালোবাসতে পারি।”
কথাটি শুনে লোকটি কেঁপে উঠল।
দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।
প্ল্যাটফর্মের বাতিগুলি একে একে নিভে যাচ্ছে।
হরিপদ মণ্ডল দৌড়ে এসে চিৎকার করলেন, “দ্রুত সিদ্ধান্ত নিন! শেষ ট্রেন এসে গেছে!”
অরিন্দম রেললাইনের দিকে তাকাল।
ট্রেনের শেষ কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা। তাঁর পাশে মা। দুজনেই হাত বাড়িয়ে রেখেছেন।
কিন্তু তাদের চোখ অরিন্দমের দিকে নয়।
তারা তাকিয়ে আছেন দ্বিতীয় অরিন্দমের দিকে।
দ্বিতীয় অরিন্দম ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
“আমি কি সত্যিই বাড়ি ফিরতে পারব?”
বাবা মাথা নাড়লেন।
“পারবে।”
“মা কি আমাকে চিনতে পারবেন?”
মায়ের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“মা কখনও নিজের সন্তানকে ভুলে যায় না।”
দ্বিতীয় অরিন্দম কাঁদতে শুরু করল। তার পোড়া দাগগুলি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। মুখের কঠিন ভাব নরম হয়ে এসেছে।
অরিন্দম বুঝতে পারল, এই মানুষটি কোনও দানব নয়। সে শুধু এমন একটি জীবন, যা কোনও দিন নিজের জায়গা পায়নি।
হয়তো তারও একটি শৈশব ছিল। হয়তো সে-ও কোনও দিন মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমোতে চেয়েছিল।
ট্রেনের দরজা বন্ধ হওয়ার সংকেত বেজে উঠল।
দ্বিতীয় অরিন্দম শেষবারের মতো তার দিকে তাকাল।
“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?”
অরিন্দম উত্তর দিল, “আমি জানি না। কিন্তু তোমাকে ঘৃণা করে আর একটা জীবন নষ্ট করতে চাই না।”
দ্বিতীয় অরিন্দম হাত বাড়াল।
অরিন্দম তার হাত ধরল।
দুজনের হাত মিলতেই প্ল্যাটফর্মের ঘড়ির কাঁটা দ্রুত ঘুরতে শুরু করল। বাতাসে ঝড় উঠল। রেললাইনের ওপর নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল। অনন্যা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর—
সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
পরদিন সকাল।
শালবন জংশনের প্ল্যাটফর্মে এক বৃদ্ধ স্টেশনমাস্টার একটি বেঞ্চে বসে ছিলেন। তাঁর সামনে চায়ের কাপ। দূরে পাখির ডাক।
স্টেশনে স্বাভাবিক জীবন ফিরে এসেছে। লোকাল ট্রেন আসছে, যাচ্ছে। যাত্রীরা ওঠানামা করছে। কেউ জানে না, আগের রাতে এখানে কী ঘটেছিল।
হরিপদবাবু টেবিলের ওপর রাখা রেজিস্টার খুললেন।
গত রাতের লেখা নামটির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, কালির দাগ মিলিয়ে গেছে।
সেখানে এখন লেখা—
“অরিন্দম বসু—বাড়ি ফিরেছে।”
বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।
ঠিক তখনই স্টেশনের বাইরে একটি তরুণী এসে দাঁড়াল। তার হাতে লাল ছাতা। পরনে সাদা-নীল পোশাক। কপালের বাঁ দিকে ছোট্ট একটি দাগ।
“দাদু,” সে বলল, “এখান থেকে কলকাতার ট্রেন কখন?”
হরিপদবাবু মুখ তুলে তাকালেন।
অনন্যা।
বারো বছর পর সে যেন সত্যিই বাড়ি ফিরেছে।
বৃদ্ধ কিছু বলতে পারলেন না। শুধু হাত তুলে প্ল্যাটফর্মের দিকে দেখালেন।
অনন্যা হাসল।
“ধন্যবাদ।”
সে ট্রেনে উঠল।
জানালার পাশে বসে পকেট থেকে একটি ছোট্ট কাগজ বের করল। কাগজটিতে অরিন্দমের হাতের লেখা—
“অনন্যা,
যদি কোনও দিন আমার কথা ভুলে যাও, তবু মনে রেখো—কেউ একজন তোমাকে খুব ভালোবাসত। সে তোমার পাশে ছিল, আছে, থাকবে। হয়তো তুমি তার মুখ মনে রাখতে পারবে না, হয়তো তার নামও ভুলে যাবে। কিন্তু ভালোবাসা সব সময় নামের ওপর নির্ভর করে না।
বাড়ি ফিরে যাস।
দাদা।”
অনন্যা চিঠিটি বুকে চেপে ধরল।
তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সে জানত না কেন কাঁদছে।
ট্রেন চলতে শুরু করল।
শালবন জংশনের ঘড়ির কাঁটা এবার ঠিক সময় দেখাচ্ছে।
সকাল আটটা দশ।
হরিপদবাবু প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ট্রেনটিকে দূরে মিলিয়ে যেতে দেখলেন। তাঁর মনে হল, বহু বছর পর একটি অসমাপ্ত গল্প শেষ হয়েছে।
কিন্তু ঠিক সেই সময় স্টেশনের পরিত্যক্ত টিকিটঘরের ভেতর থেকে একটি শিশুর কান্না শোনা গেল।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন।
ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে একটি ছোট্ট কাঠের দোলনা। তার পাশে একটি আয়না। আর আয়নার ভেতরে দেখা যাচ্ছে এক শিশুর মুখ।
শিশুটি চোখ খুলে হাসল।
হরিপদবাবুর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
কারণ আয়নার ওপাশে থাকা শিশুটির মুখ হুবহু অরিন্দমের মতো।
আর আয়নার নিচে সাদা অক্ষরে ফুটে উঠল একটি বাক্য—
“শেষ ট্রেন কখনও শেষ হয় না।”
— সমাপ্ত —