Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ

সুশীলা নায়ার: চিকিৎসাসেবা, জনস্বাস্থ্য ও দেশসেবায় নিবেদিত এক মহীয়সী নারী।।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন বহু নারী রয়েছেন, যাঁরা শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেননি, মানুষের সেবা, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমেও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন ডা. সুশীলা নায়ার। তিনি ছিলেন একজন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যকর্মী এবং মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তাঁর জীবন চিকিৎসাবিজ্ঞান, মানবসেবা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অনন্য সমন্বয়।

সুশীলা নায়ারের পরিচয় শুধু গান্ধীজির সহযোগী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল সময়ে মানুষের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে দেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি, গ্রামীণ চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষার প্রসারেও কাজ করেন। স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক জীবনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, দেশের সেবা করার জন্য শুধু মিছিল বা আন্দোলনে অংশ নেওয়াই যথেষ্ট নয়। অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য কাজ করাও দেশসেবার গুরুত্বপূর্ণ রূপ।

শৈশব ও পারিবারিক পরিবেশ

সুশীলা নায়ারের জন্ম ১৯১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলে। তাঁর পরিবার শিক্ষার প্রতি আগ্রহী ছিল এবং জাতীয়তাবাদী চিন্তার সঙ্গেও পরিচিত ছিল। তাঁর বড় ভাই প্যায়ারেলাল নায়ার মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন ছিলেন।

ছোটবেলা থেকেই সুশীলা নায়ার শিক্ষার গুরুত্ব বুঝেছিলেন। সেই সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ আজকের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন ছিল। সামাজিক প্রত্যাশা, পারিবারিক সীমাবদ্ধতা এবং নারীর পেশাগত স্বাধীনতা নিয়ে প্রচলিত ধারণা অনেক মেয়ের সামনে বাধা তৈরি করত।

কিন্তু সুশীলা নায়ার নিজের শিক্ষাজীবনকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি চিকিৎসাবিদ্যাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং মানুষের সেবার মাধ্যমে সমাজের কাজে লাগার সুযোগ খুঁজেছিলেন।

তাঁর জীবনের পরবর্তী ঘটনাগুলি দেখায়, চিকিৎসাবিদ্যায় অর্জিত জ্ঞানকে তিনি শুধু ব্যক্তিগত পেশাগত সাফল্যের জন্য ব্যবহার করেননি; বরং জনসাধারণের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

চিকিৎসাশিক্ষা ও পেশাগত প্রস্তুতি

সুশীলা নায়ার চিকিৎসাশিক্ষা গ্রহণ করেন দিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিক্যাল কলেজে। এই প্রতিষ্ঠানটি ভারতে নারী চিকিৎসকদের শিক্ষার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।

চিকিৎসাশিক্ষা ছিল কঠোর অধ্যবসায়ের বিষয়। রোগ নির্ণয়, শারীরবিদ্যা, ওষুধের ব্যবহার এবং রোগীর পরিচর্যা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি চিকিৎসকদের প্রয়োজন ধৈর্য, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ।

একজন চিকিৎসকের কাজ শুধু রোগের লক্ষণ চিহ্নিত করা নয়। রোগীর জীবনযাত্রা, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা, বাসস্থান এবং সামাজিক পরিস্থিতিও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। এই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীকালে সুশীলা নায়ারের জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক কাজের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

চিকিৎসাশিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি এমন এক সময়ে কাজ শুরু করেন, যখন ভারতের বহু অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ছিল সীমিত। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসক, হাসপাতাল, ওষুধ এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতার অভাব ছিল একটি বড় সমস্যা।

এই বাস্তবতা তাঁর কাজের ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছিল।

মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সম্পর্ক

সুশীলা নায়ারের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাঁর বড় ভাই প্যায়ারেলাল নায়ারের মাধ্যমে গান্ধীজির সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ ছিল। পরবর্তী সময়ে সুশীলা নায়ারও গান্ধীজির সেবায় যুক্ত হন।

গান্ধীজির আশ্রমজীবনে পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত জীবনযাপন, সরলতা এবং মানুষের সেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। চিকিৎসক হিসেবে সুশীলা নায়ার এই পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পান।

গান্ধীজির আশ্রমে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলিতেও ভূমিকা পালন করেন। গান্ধীজির দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা সময়ে অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতার ঘটনা ঘটেছিল। সেই পরিস্থিতিতে চিকিৎসা ও পরিচর্যার গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত বেশি।

সুশীলা নায়ারের ক্ষেত্রে গান্ধীজির সঙ্গে সম্পর্কটি কেবল ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিষয় ছিল না। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে চিকিৎসাসেবা ও জনজীবনের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ যোগ তৈরি হয়েছিল।

তবে তাঁর নিজস্ব পরিচয়কে শুধু গান্ধীজির সহযোগী হিসেবে দেখলে তাঁর চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।

স্বাধীনতা আন্দোলনের কঠিন সময়ে চিকিৎসাসেবা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ গ্রেপ্তার, কারাবাস, অসুস্থতা এবং শারীরিক নির্যাতনের ঝুঁকির মুখে পড়েছিলেন। তাঁদের চিকিৎসা ও পরিচর্যার প্রয়োজন ছিল।

সুশীলা নায়ার চিকিৎসক হিসেবে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হন। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গান্ধীজির সঙ্গে যুক্ত থেকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন এবং জাতীয় আন্দোলনের পরিবেশের অংশ হয়ে ওঠেন।

১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ সরকার জাতীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করে। গান্ধীজি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও আটক রাখা হয়। এই সময়কার ঘটনাগুলি স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

সুশীলা নায়ারের জীবনও এই রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিনি চিকিৎসাসেবা ও জনকল্যাণের কাজের মাধ্যমে জাতীয় আন্দোলনের বৃহত্তর উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামে চিকিৎসকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থ মানুষের সেবা করা, স্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াও ছিল আন্দোলনের মানবিক দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আগ্রহ

স্বাধীনতার আগে ভারতের গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। অনেক গ্রামে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের অভাব ছিল। সংক্রামক রোগ, অপুষ্টি, অপরিচ্ছন্ন পানীয় জল এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব মানুষের জীবনকে বিপন্ন করত।

সুশীলা নায়ার উপলব্ধি করেছিলেন যে চিকিৎসা কেবল হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো সম্ভব নয়।

গ্রামীণ মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দিতে হলে স্থানীয় বাস্তবতা বুঝতে হয়। স্বাস্থ্যশিক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টি, নিরাপদ পানীয় জল এবং রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হয়।

এই ভাবনা থেকেই তিনি জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর কাজের মধ্যে চিকিৎসা ও সামাজিক উন্নয়নের সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন আজও ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যকারিতা এবং রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা মানুষের জীবনমান নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে।

সুশীলা নায়ারের কাজ এই বৃহত্তর জনস্বাস্থ্যচিন্তার ইতিহাসে স্মরণীয়।

কুষ্ঠরোগ ও জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা

ভারতে কুষ্ঠরোগকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ভয়, কুসংস্কার এবং বৈষম্য ছিল। অনেক রোগী চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতেন। তাঁদের পরিবার ও সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন করে রাখা হতো।

কুষ্ঠরোগ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং উপযুক্ত চিকিৎসা থাকলেও সামাজিক কলঙ্ক রোগীদের জীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াত। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সুশীলা নায়ার জনস্বাস্থ্যকে বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যশিক্ষার প্রসারের সম্পর্ক ছিল। কুষ্ঠরোগের মতো সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক মনোভাব বদলানোর প্রয়োজনীয়তাও তাঁর সময়ের জনস্বাস্থ্য আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

এই ক্ষেত্রের কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে শুধু ওষুধ যথেষ্ট নয়। রোগীর মর্যাদা রক্ষা করা, কুসংস্কার দূর করা এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।

স্বাধীন ভারতের জনস্বাস্থ্য ভাবনা

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দেশের সামনে বহু বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। দারিদ্র্য, অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু এবং স্বাস্থ্যপরিকাঠামোর ঘাটতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

স্বাধীন ভারতের উন্নয়নের জন্য শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা যথেষ্ট ছিল না। মানুষের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা, চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়ানো এবং গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাও ছিল জরুরি।

সুশীলা নায়ার এই সময়ে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসার কাজে যুক্ত থাকেন। তিনি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতেন। তাঁর দৃষ্টিতে রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি ছিল সমাজের সামগ্রিক উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এতে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসক, শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা থাকে।

সুশীলা নায়ারের কর্মজীবন সেই সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরে।

রাজনীতিতে অংশগ্রহণ

সুশীলা নায়ার শুধু চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেই কাজ করেননি; স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক জীবনেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি সংসদীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলির প্রতি আগ্রহ বজায় রাখেন।

স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি যখন নতুনভাবে গড়ে উঠছিল, তখন চিকিৎসা, শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণের অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সুশীলা নায়ারের মতো ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও রাজনীতির মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল মানুষের জীবনমান উন্নত করার লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে। কারণ স্বাস্থ্যনীতি, হাসপাতাল, চিকিৎসাশিক্ষা এবং রোগ প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলির সঙ্গে সরকারি সিদ্ধান্ত সরাসরি যুক্ত।

রাজনীতিতে তাঁর অংশগ্রহণ দেখায়, একজন পেশাজীবী নিজের ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা বৃহত্তর নীতিনির্ধারণের কাজে ব্যবহার করতে পারেন।

তবে তাঁর পরিচয়ের মূল শক্তি ছিল চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য ও মানবসেবার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক।

নারীর পেশাগত স্বাধীনতার দৃষ্টান্ত

সুশীলা নায়ারের জীবন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি এমন এক সময়ে চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, যখন নারীদের উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত স্বাধীনতার সুযোগ সীমিত ছিল।

চিকিৎসাবিদ্যা এমন একটি পেশা, যেখানে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, অধ্যবসায় এবং নিয়মিত জ্ঞানচর্চা অপরিহার্য। একজন নারী চিকিৎসক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে গেলে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি সামাজিক বাধাও অতিক্রম করতে হতো।

সুশীলা নায়ারের কর্মজীবন দেখায়, নারীরা শুধু নির্দিষ্ট সামাজিক ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। তাঁরা চিকিৎসা, গবেষণা, প্রশাসন, রাজনীতি এবং জনস্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।

আজ বহু নারী চিকিৎসক হাসপাতাল, গবেষণাকেন্দ্র, জনস্বাস্থ্য সংস্থা এবং নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তাঁদের এই অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে বহু প্রজন্মের নারীর অধ্যবসায়।

সুশীলা নায়ারের মতো ব্যক্তিত্বদের জীবন সেই দীর্ঘ ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।

তাঁর জীবন থেকে আজকের প্রজন্মের শিক্ষা

সুশীলা নায়ারের জীবন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

প্রথমত, পেশাগত জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। চিকিৎসাশিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত জীবিকা অর্জনের পথ নয়; তা অসুস্থ মানুষের জীবন রক্ষা এবং সমাজের স্বাস্থ্য উন্নত করার সুযোগও।

দ্বিতীয়ত, জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। হাসপাতাল ও চিকিৎসকের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টি, নিরাপদ জল এবং রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থাও সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, মানবসেবায় সহানুভূতি জরুরি। রোগীকে শুধু একটি রোগের বাহক হিসেবে না দেখে একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে সম্মান করা উচিত।

চতুর্থত, নারীর শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষা নারীদের নিজের পেশা বেছে নেওয়ার, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং সমাজে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করে।

পঞ্চমত, দেশসেবা বহু রূপে সম্ভব। কেউ রাজনীতির মাধ্যমে, কেউ চিকিৎসার মাধ্যমে, কেউ শিক্ষার মাধ্যমে, আবার কেউ সামাজিক কাজের মাধ্যমে মানুষের জীবন উন্নত করতে পারেন।

উপসংহার

ডা. সুশীলা নায়ার ছিলেন চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক উল্লেখযোগ্য নারী। মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তাঁর পরিচিতি থাকলেও তাঁর নিজের অবদান চিকিৎসাসেবা, গ্রামীণ স্বাস্থ্যচিন্তা এবং জনকল্যাণের বৃহত্তর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ মানুষের মর্যাদা ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করার মধ্যেও নিহিত। রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি চিকিৎসার সুযোগ, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং সামাজিক বৈষম্য দূর করার কাজও একটি জাতির উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

আজও ভারতের বহু অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার অসমতা রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে সুশীলা নায়ারের মতো মানুষের কাজ স্মরণ করা আমাদের জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।

মানুষের সেবা তখনই সত্যিকার অর্থে মহৎ হয়ে ওঠে, যখন তা ব্যক্তিগত স্বার্থের সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে নিবেদিত হয়।

সুশীলা নায়ারের জীবন সেই মানবিক আদর্শেরই একটি স্মরণীয় উদাহরণ। তাঁর কর্মজীবন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখায়—জ্ঞান, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলেই সমাজের বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *