বিকেল হলেই স্টেশনের পাশের পুরনো বটগাছটার নিচে বসত একজন মানুষ। নাম তার নিত্যানন্দ। বয়স প্রায় সত্তর। পরনে সাদা ধুতি, ফিকে নীল পাঞ্জাবি আর হাতে একটা পুরনো বাঁশি।
প্রতিদিন একই সময়ে তিনি বাঁশি বাজাতেন।
কেউ শুনত, কেউ শুনত না। কেউ দু’মিনিট দাঁড়িয়ে আবার চলে যেত, কেউবা বিরক্ত হয়ে বলত,
—“এই বুড়ো মানুষটা প্রতিদিন একই জায়গায় বসে কী করে যে!”
নিত্যানন্দ কারও কথায় কান দিতেন না।
সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে একটু হেলে পড়ত, তিনি বাঁশিটা ঠোঁটে তুলতেন। খুব ধীরে একটা সুর ভেসে উঠত।
সুরটা ছিল অদ্ভুত মায়াময়।
কিন্তু সেই সুরের মধ্যে যেন কোথাও একটা অপেক্ষা লুকিয়ে থাকত।
একদিন স্টেশনে নতুন চায়ের দোকান দিল বিশ বছরের ছেলে রুদ্র। প্রথম কয়েকদিন সে-ও নিত্যানন্দকে দেখে অবাক হতো।
একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করল,
—“কাকু, আপনি প্রতিদিন এই একই সুর বাজান কেন?”
নিত্যানন্দ একটু হাসলেন।
—“কারও জন্য।”
—“কে সে?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“যে শুনলে বুঝবে।”
রুদ্র আর প্রশ্ন করল না।
তারপর থেকে সে প্রতিদিন চুপ করে সেই সুর শুনত।
একদিন প্রবল বৃষ্টি নামল। স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। রুদ্র দোকান গুটিয়ে ফেলছিল। হঠাৎ দেখল, বটগাছের নিচে নিত্যানন্দ এখনও বসে আছেন।
রুদ্র ছুটে গিয়ে বলল,
—“কাকু, আজ আর বাজাবেন না। ভিজে যাবেন।”
নিত্যানন্দ মাথা নাড়লেন।
—“আজ বাজাতেই হবে।”
—“কিন্তু কেন?”
বৃদ্ধ বাঁশিটা হাতে নিয়ে বললেন,
—“আজ পঁয়তাল্লিশ বছর আগে, এমনই এক বৃষ্টির সন্ধ্যায়, আমার মেয়ে মেঘলা বাড়ি থেকে রাগ করে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে বলেছিল—‘বাবা, একদিন ফিরে আসব। তুমি বাঁশিটা বাজিয়ে রেখো।’”
রুদ্র স্তব্ধ হয়ে গেল।
—“তারপর?”
—“তারপর আর আসেনি।”
বৃদ্ধের গলাটা কেঁপে উঠল।
—“অনেক খুঁজেছি। কোথাও পাইনি। কিন্তু কথা দিয়েছিলাম, তাই বাঁশিটা বাজানো বন্ধ করিনি।”
রুদ্র কিছু বলল না।
সেদিন বৃষ্টির মধ্যে সে বৃদ্ধের পাশে বসে রইল।
পরদিনও নিত্যানন্দ এলেন।
তার পরদিনও।
এভাবেই কয়েক মাস কেটে গেল।
এক শীতের বিকেলে রুদ্র দেখল, স্টেশনে এক অপরিচিত মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। বয়স প্রায় পঞ্চাশ। হাতে ছোট একটা ব্যাগ। তিনি চারপাশে তাকাচ্ছেন।
হঠাৎ দূর থেকে বাঁশির সুর ভেসে এল।
মহিলার মুখটা কেঁপে উঠল।
তিনি ধীরে ধীরে বটগাছটার দিকে এগিয়ে গেলেন।
নিত্যানন্দ তখন চোখ বন্ধ করে বাজাচ্ছিলেন।
মহিলা কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন,
—“বাবা…”
বাঁশির সুর থেমে গেল।
নিত্যানন্দ চোখ খুললেন।
প্রথমে যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
—“মেঘলা?”
মহিলা দৌড়ে এসে বাবার পায়ে পড়ে গেলেন।
পঁয়তাল্লিশ বছরের অপেক্ষা এক মুহূর্তে চোখের জলে ভেসে গেল।
রুদ্র দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
কিছুক্ষণ পরে নিত্যানন্দ মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—“আমি জানতাম, তুই একদিন ফিরবি।”
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“আমি অনেকবার ফিরতে চেয়েছিলাম বাবা। কিন্তু সাহস হয়নি। আজ স্টেশনে নামার পর হঠাৎ সেই সুরটা শুনলাম। বুঝলাম, তুমি এখনও অপেক্ষা করছ।”
নিত্যানন্দ বাঁশিটা রুদ্রের হাতে দিয়ে বললেন,
—“এবার এটা তুই রাখ।”
রুদ্র অবাক হয়ে বলল,
—“আমি?”
—“হ্যাঁ। আমার অপেক্ষা শেষ হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে, যারা এখনও কারও ফেরার অপেক্ষায় আছে।”
রুদ্র বাঁশিটা হাতে নিল।
সেদিন প্রথমবার বটগাছের নিচে বাঁশির সুর বাজল না।
কিন্তু আশ্চর্যভাবে, সেদিন স্টেশনটা যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত ছিল।
কারণ কিছু অপেক্ষার শেষ হয় শব্দে নয়—
ফিরে আসা একজন মানুষের নিঃশব্দ আলিঙ্গনে।