Categories
অনুগল্প

এক মুঠো বীজ।

গ্রামের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা মাটির বাড়ি। বাড়িটার সামনে ছিল এক টুকরো অনাবাদি জমি। বর্ষায় সেখানে জল জমত, শীতকালে শুকিয়ে ফেটে যেত মাটি। কেউ কোনোদিন সেই জমিতে কিছু ফলানোর কথা ভাবেনি।

সেই গ্রামেই থাকত ষোলো বছরের মেয়ে—মেঘলা।

মেঘলার বাবা ছিলেন কৃষক। কয়েক বছর আগে অসুখে মারা যাওয়ার পর সংসারের ভার এসে পড়েছিল মায়ের ওপর। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। মেঘলা স্কুলে পড়ার পাশাপাশি মাকে সাহায্য করত।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে মেঘলা রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধকে দেখতে পেল। বৃদ্ধের হাতে ছোট্ট একটা কাপড়ের থলি।

মেঘলা দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, —“দাদু, কী আছে ওতে?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, —“বীজ।”

—“কীসের বীজ?”

—“জানি না সবকটার নাম। তবে জানি, মাটিতে দিলে কোনো না কোনোদিন কিছু একটা জন্মাবে।”

মেঘলা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

বৃদ্ধ বললেন, —“তোর বাড়ির সামনে যে জমিটা পড়ে আছে, সেখানে এগুলো পুঁতে দিস।”

মেঘলা হেসে বলল, —“ওই জমিতে কিছু হয় না দাদু।”

বৃদ্ধ থলিটা তার হাতে দিয়ে বললেন, —“সব মাটি ফলন দেওয়ার জন্য তৈরি থাকে না। কিছু মাটিকে আগে বিশ্বাস করতে হয়।”

কথাটা মেঘলার মনে গেঁথে গেল।

সেদিন সন্ধ্যায় সে জমিটা পরিষ্কার করল। আগাছা তুলে, শুকনো মাটি সরিয়ে ছোট ছোট গর্ত করল। তারপর বৃদ্ধের দেওয়া বীজগুলো পুঁতে দিল।

প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে সে একটু জল দিত।

প্রথম সপ্তাহে কিছুই হল না।

দ্বিতীয় সপ্তাহেও না।

পাড়ার লোকেরা হাসতে শুরু করল।

—“মেঘলা পাগল হয়েছে। শুকনো জমিতে বাগান করবে!”

মেঘলা কিছু বলত না।

একদিন সকালে সে দেখল মাটির বুক চিরে ছোট্ট সবুজ একটা মাথা বের হয়েছে।

তার আনন্দ দেখে মনে হল, সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ পেয়ে গেছে।

এরপর একে একে আরও চারা উঠল।

কয়েক মাসের মধ্যে সেই অনাবাদি জমিটা বদলে গেল। সেখানে শাকসবজি, ফুল আর কয়েক ধরনের ঔষধি গাছ জন্মাল।

মেঘলা নিজের বাড়ির জন্য কিছু রাখত, বাকিটা বাজারে বিক্রি করত। অল্প অল্প করে সংসারে সাহায্য করতে শুরু করল।

কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা হল অন্য জায়গায়।

যে বৃদ্ধ তাকে বীজ দিয়েছিলেন, তিনি আর কোনোদিন গ্রামে এলেন না।

মেঘলা অনেক খুঁজেও তাঁর কোনো সন্ধান পেল না।

একদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাকে বললেন, —“তুই জানিস, কয়েক বছর আগে আমাদের স্কুলে একজন অবসরপ্রাপ্ত কৃষিবিজ্ঞানী এসেছিলেন? তিনি গ্রামের বহু বাড়িতে বিনা পয়সায় বীজ দিয়ে গিয়েছিলেন।”

মেঘলা বুঝল, সেই বৃদ্ধই হয়তো তিনি।

বছর কেটে গেল।

মেঘলা বড় হয়ে কৃষিবিদ্যা পড়ল। চাকরি করার সুযোগ পেলেও নিজের গ্রামে ফিরে এল। বাড়ির সামনে সেই জমিটাকে আরও বড় করল।

একদিন গ্রামের কয়েকজন শিশু তার কাছে এসে বলল, —“দিদি, আমাদেরও একটু বীজ দেবে?”

মেঘলা হাসল।

ঘরের ভেতর থেকে সে একটি কাপড়ের থলি এনে তাদের হাতে দিল।

তারপর বলল, —“শুধু বীজ নিলে হবে না। মাটির ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।”

একটি শিশু জিজ্ঞেস করল, —“দিদি, এই বীজগুলো কোথা থেকে পেয়েছিলে?”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল, —“একজন মানুষ আমাকে দিয়েছিলেন। তাঁর নাম আমি জানি না। কিন্তু তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন—এক মুঠো বীজ কখনও শুধু গাছ জন্মায় না, কখনও একটা ভবিষ্যৎও জন্ম দেয়।”

সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামের সেই অনাবাদি জমিতে অসংখ্য ছোট ছোট চারা দুলছিল।

আর মেঘলার মনে হচ্ছিল—

কখনও কখনও একজন অচেনা মানুষের ছোট্ট বিশ্বাসই একজন মানুষের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *