Categories
গল্প

পুরোনো বইয়ের দোকান।।

কলকাতার কলেজ স্ট্রিট। বইয়ের গন্ধে ভরা এক অনন্য জগৎ। নতুন বইয়ের ভিড়ের মাঝেই একটি ছোট্ট, প্রায় ভুলে যাওয়া দোকান ছিল—”জ্ঞানদীপ বুক স্টল”। দোকানটি এতটাই ছোট যে একসঙ্গে তিনজনের বেশি ঢুকলে নড়াচড়া করাও কঠিন হয়ে যেত।
দোকানের মালিক ছিলেন নির্মলবাবু। বয়স প্রায় আশি। সাদা ধুতি, ধূসর পাঞ্জাবি, নাকে গোল চশমা। তিনি শুধু বই বিক্রি করতেন না, বইকে ভালোবাসতেন। প্রতিটি বইয়ের অবস্থান তাঁর মুখস্থ ছিল।
তিনি বলতেন,
“বই কখনও পুরোনো হয় না, শুধু পাঠক বদলে যায়।”
এক অদ্ভুত বই
একদিন ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করা এক কলেজছাত্র, ঋষভ, দোকানে এল।
— “কাকু, বাংলার ইতিহাসের ওপর কোনো বিরল বই আছে?”
নির্মলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর দোকানের একেবারে উপরের তাক থেকে ধুলো জমা একটি বই নামালেন।
বইটির নাম ছিল—
“সময়ের সিন্দুক”
বইটির কোনো লেখকের নাম নেই।
প্রথম পাতায় শুধু লেখা—
“যে পড়বে, সে নিজের জীবনের উত্তর খুঁজে পাবে।”
ঋষভ অবাক হয়ে বইটি কিনে বাড়ি নিয়ে গেল।
অদ্ভুত আবিষ্কার
বইটি পড়তে পড়তে হঠাৎ সে দেখতে পেল, মাঝখানে একটি হলুদ হয়ে যাওয়া খাম রাখা।
খামের ওপর লেখা—
“যে মানুষ এই বইটি পাবে, তার জন্য।”
ভেতরে একটি হাতে লেখা চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
“জীবনে বড় হওয়ার আগে ভালো মানুষ হও। কারণ বড় মানুষকে সবাই মনে রাখে না, কিন্তু ভালো মানুষকে কেউ ভুলে যায় না।”
ঋষভ চিঠিটি পড়ে গভীরভাবে ভাবতে লাগল।
এত বছর ধরে বইয়ের ভেতর এই চিঠি ছিল, অথচ কেউ খুঁজে পায়নি!
বইও মানুষের মতো
পরদিন সে নির্মলবাবুর কাছে ফিরে এল।
— “কাকু, চিঠিটা কে লিখেছিলেন?”
নির্মলবাবু মৃদু হেসে বললেন,
— “আমি জানি না।”
— “তাহলে?”
— “কিছু প্রশ্নের উত্তর না জানাই ভালো। কারণ উত্তর খুঁজতে গিয়েই মানুষ নতুন কিছু শেখে।”
তারপর তিনি দোকানের চারদিকে তাকিয়ে বললেন,
— “জানো, এই দোকানের প্রতিটি বইয়েরও একটা জীবন আছে।”
ঋষভ বিস্মিত।
— “জীবন?”
— “হ্যাঁ। কোনো বই একজন ডাক্তার তৈরি করেছে, কোনো বই একজন কবি, কোনো বই আবার একজন শিক্ষক। বই শুধু তথ্য দেয় না, মানুষও গড়ে।”
শেষ ইচ্ছা
কয়েক মাস পরে নির্মলবাবু অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
ঋষভ তাঁকে দেখতে গেল।
নির্মলবাবু বললেন,
— “আমি হয়তো আর বেশিদিন দোকানে বসতে পারব না।”
ঋষভের চোখ ভিজে উঠল।
— “আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।”
নির্মলবাবু মৃদু হেসে বললেন,
— “একটা কথা রাখবে?”
— “অবশ্যই।”
— “এই দোকানটা যেন কোনোদিন বন্ধ না হয়।”
একটি নতুন শুরু
কিছুদিন পরে নির্মলবাবু পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
কলেজ স্ট্রিটের মানুষ শোকাহত।
ঋষভ নিজের বন্ধুদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নিল—
দোকানটি বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না।
তারা সবাই মিলে দোকানটির সংস্কার করল।
নতুন রং করা হলো, কিন্তু পুরোনো কাঠের তাকগুলো আগের মতোই রেখে দেওয়া হলো।
দোকানের এক কোণে একটি ছোট্ট পাঠকক্ষ তৈরি করা হলো, যেখানে যে কেউ বিনামূল্যে বসে বই পড়তে পারে।
বইয়ের আলো
একদিন এক দরিদ্র স্কুলছাত্র দোকানে এসে বলল,
— “দাদা, বই কেনার টাকা নেই।”
ঋষভ হাসিমুখে একটি বই এগিয়ে দিয়ে বলল,
— “পড়ে ফেরত দিয়ে যেও।”
ছেলেটি অবাক।
— “টাকা লাগবে না?”
— “না। কারণ জ্ঞান বিক্রি করার জিনিস নয়, ভাগ করে নেওয়ার জিনিস।”
সেই মুহূর্তে ঋষভের মনে হলো, নির্মলবাবু যেন ঠিক তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন।
শেষ দৃশ্য
আজ বহু বছর কেটে গেছে।
“জ্ঞানদীপ বুক স্টল” এখনও কলেজ স্ট্রিটে রয়েছে।
দোকানের দরজার ওপরে নির্মলবাবুর একটি ছোট্ট ছবি ঝুলছে।
তার নিচে লেখা—
“একটি ভালো বই একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।”
প্রতিদিন অসংখ্য ছাত্রছাত্রী সেখানে আসে।
কেউ বই কিনে।
কেউ বই পড়ে।
কেউ শুধু পুরোনো বইয়ের গন্ধ নিতে আসে।
আর দোকানের ভেতরে কোথাও যেন এখনও নির্মলবাবুর কণ্ঠ ভেসে আসে—
“বইকে ভালোবাসো। কারণ বই কখনও তোমাকে একা থাকতে দেবে না।”
ঋষভ যখনই নতুন কোনো পাঠকের হাতে একটি বই তুলে দেয়, তার মনে হয়—
একজন মানুষ হয়তো চলে গেছেন,
কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আজও প্রতিটি বইয়ের পাতায় বেঁচে আছে।
সমাপ্ত। 📚✨❤️

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *