Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

প্রফেসর রাজেশ্বরী চট্টার্জি: ভারতের মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির পথপ্রদর্শক এক মহীয়সী নারী।

আজ আমরা মোবাইল ফোনে কথা বলি, দূর থেকে টেলিভিশন দেখি, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য আদানপ্রদান করি, বিমান ও আবহাওয়ার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করি। রাডার, অ্যান্টেনা, বেতার যোগাযোগ—এই প্রযুক্তিগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে এগুলোর পেছনে থাকা বিজ্ঞানীদের কথা আমরা অনেক সময় ভাবিই না।

কিন্তু ভারতে যখন এই প্রযুক্তিগুলোর গবেষণা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে, তখন হাতে গোনা কয়েকজন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী নিজেদের পরিশ্রমে এই ক্ষেত্রের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রফেসর রাজেশ্বরী চট্টার্জি

তিনি ছিলেন ভারতের মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিং ও অ্যান্টেনা গবেষণার অন্যতম পথপ্রদর্শক। শুধু গবেষণাই নয়, শিক্ষকতা, গবেষণাগার গড়ে তোলা এবং নতুন প্রজন্মের প্রকৌশলী তৈরি—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স বা IISc-এর ইতিহাসেও তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়; তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম দিকের মহিলা প্রকৌশলী ও প্রথম মহিলা ফ্যাকাল্টি সদস্যদের একজন।

শিক্ষার পরিবেশ থেকেই শুরু

রাজেশ্বরী চট্টার্জির জন্ম ২৪ জানুয়ারি ১৯২২ সালে তৎকালীন মাইসোর রাজ্যের নঞ্জনগুড়ে। এমন এক সময়ে তাঁর জন্ম, যখন ভারতে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ আজকের তুলনায় অনেক সীমিত ছিল।

তবে তাঁর পরিবার শিক্ষার গুরুত্ব বুঝত। তাঁর ঠাকুমা কামলাম্মা দাসাপ্পা নিজেই ছিলেন শিক্ষার প্রসারে সক্রিয় একজন নারী। তিনি মহিলাদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পক্ষে কাজ করেছিলেন এবং একটি বিশেষ ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই শিক্ষামুখী পরিবেশ রাজেশ্বরীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—তিনি ভবিষ্যতে কী নিয়ে পড়াশোনা করবেন?

ইতিহাসের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বিজ্ঞানকে বেছে নেন।

গণিত ও পদার্থবিদ্যা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং

রাজেশ্বরী চট্টার্জি বেঙ্গালুরুর সেন্ট্রাল কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি গণিত ও পদার্থবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় তিনি মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। তাঁর মেধার স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন পুরস্কারও পান।

১৯৪৩ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে গবেষণার কাজে যোগ দেন। তখন তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়।

এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ সেই সময়ে ভারতে ইলেকট্রনিক্স ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এখনও বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে।

রাজেশ্বরী এমন একটি ক্ষেত্র বেছে নিয়েছিলেন, যার ভবিষ্যৎ তখনও পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত স্বাধীনতার দিকে এগোচ্ছিল। দেশের ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গড়ে তুলতে দক্ষ গবেষক তৈরির প্রয়োজন ছিল।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি সরকারি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। তিনি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি মাস্টার্স এবং পরে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর ডক্টরেট সম্পন্ন হয়।

বিদেশে যাওয়ার সেই যাত্রাও ছিল সহজ নয়। সে সময় ভারত থেকে একজন তরুণীর একা বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা ছিল যথেষ্ট বিরল ঘটনা।

কিন্তু রাজেশ্বরী সেই সুযোগকে শুধু নিজের শিক্ষার জন্য ব্যবহার করেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল দেশে ফিরে সেই জ্ঞান কাজে লাগানো।

দেশে ফিরে নতুন অধ্যায়

১৯৫৩ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করে রাজেশ্বরী চট্টার্জি ভারতে ফিরে আসেন এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে ফ্যাকাল্টি হিসেবে যোগ দেন। তিনি ইলেকট্রিক্যাল কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হন।

এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার অধ্যায়।

মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিং তখন ভারতে নতুন ক্ষেত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাডার ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মাইক্রোওয়েভের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছিল। কিন্তু ভারতে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো খুবই সীমিত ছিল।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি এবং তাঁর স্বামী, বিজ্ঞানী এস. কে. চট্টার্জি, মিলে সেই পরিস্থিতি বদলানোর উদ্যোগ নেন।

ভারতে মাইক্রোওয়েভ গবেষণাগার গড়ে তোলা

রাজেশ্বরী ও তাঁর স্বামী IISc-তে ভারতের প্রথম মাইক্রোওয়েভ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সরঞ্জাম তখন পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে অনেক যন্ত্র ও উপাদান দেশীয়ভাবে তৈরি করতে হয়েছিল।

আজকের অত্যাধুনিক গবেষণাগারের সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা করলে পার্থক্যটা সহজেই বোঝা যায়।

এখন কোনও গবেষক প্রয়োজনীয় যন্ত্র অনলাইনে বা বিশেষ সরবরাহকারীর কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু পঞ্চাশের দশকে ভারতে অনেক ক্ষেত্রেই গবেষকদের নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেদেরই করতে হতো।

রাজেশ্বরীর গবেষণাগার তাই শুধু একটি ল্যাবরেটরি ছিল না। সেটি ছিল ভারতের নতুন একটি প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রের প্রথম দিকের কর্মশালা।

মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি আসলে কী?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, মাইক্রোওয়েভ হল তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের একটি নির্দিষ্ট অংশ, যা যোগাযোগ, রাডার, স্যাটেলাইট এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়।

এই তরঙ্গ কীভাবে তৈরি হবে, কীভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবে, কীভাবে অ্যান্টেনা তা গ্রহণ বা প্রেরণ করবে—এসবই মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

রাজেশ্বরী চট্টার্জির গবেষণার সঙ্গে এই বিষয়গুলোর গভীর সম্পর্ক ছিল।

তিনি বিশেষভাবে অ্যান্টেনা, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তত্ত্ব এবং মাইক্রোওয়েভ ডিভাইস নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর কাজ পরবর্তীকালে রাডার ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

শুধু গবেষক নন, অসাধারণ শিক্ষক

রাজেশ্বরী চট্টার্জির অবদানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর শিক্ষকতা।

তিনি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক থিওরি, ইলেকট্রন টিউব সার্কিট, মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি এবং রেডিও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতেন।

তাঁর কাছে শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি ছিল না। তিনি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করেছিলেন যারা পরবর্তীকালে ভারতের ইলেকট্রনিক্স, রাডার ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করেন।

IISc-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় ২০ জন পিএইচডি গবেষককে গাইড করেছিলেন এবং ১০০-র বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর লেখা প্রযুক্তিগত বইয়ের সংখ্যাও ছিল একাধিক।

একজন গবেষকের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার অনেক সময় তাঁর নিজের আবিষ্কার নয়—তাঁর তৈরি করা পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকরা।

এই অর্থে রাজেশ্বরী চট্টার্জির প্রভাব তাঁর নিজের কর্মজীবনের অনেক পরে পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

অ্যান্টেনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ

রাজেশ্বরী চট্টার্জির অন্যতম পরিচিত কাজ ছিল অ্যান্টেনা প্রযুক্তি।

অ্যান্টেনা ছাড়া আধুনিক বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না। মোবাইল ফোন থেকে স্যাটেলাইট যোগাযোগ, রেডিও থেকে রাডার—বিভিন্ন প্রযুক্তির সঙ্গে অ্যান্টেনার সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি অ্যান্টেনা তত্ত্ব ও তার ব্যবহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন এবং এ বিষয়ে বইও লেখেন। তাঁর Antenna Theory and Practice বইটি দীর্ঘদিন ধরে প্রকৌশল শিক্ষায় পরিচিত একটি গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

তাঁর গবেষণা শুধু তাত্ত্বিক ছিল না। বাস্তব প্রযুক্তিতে কীভাবে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করা যায়, সেটিও ছিল তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্যাটেলাইট যোগাযোগের শিক্ষা

ভারতে যখন মহাকাশ ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল, তখন মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছিল।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি ও তাঁর সহকর্মীরা ষাটের দশকে মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ নিয়ে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। IISc-এর ঐতিহাসিক নথিতে এই উদ্যোগের উল্লেখ রয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ একটি নতুন প্রযুক্তি দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য শুধু গবেষণা যথেষ্ট নয়। সেই প্রযুক্তি শেখানোর জন্য শিক্ষক, পাঠ্যক্রম এবং গবেষণার পরিবেশও তৈরি করতে হয়।

রাজেশ্বরী এই তিন ক্ষেত্রেই কাজ করেছিলেন।

পুরুষ-প্রধান পরিবেশে এক নারী

তাঁর কর্মজীবনের শুরুতে ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তির ক্ষেত্র ছিল অত্যন্ত পুরুষ-প্রধান।

IISc-এর ইলেকট্রিক্যাল কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে তিনি দীর্ঘ সময় একমাত্র মহিলা হিসেবে কাজ করেছিলেন।

একজন নারী গবেষক হিসেবে তাঁকে শুধু নিজের গবেষণার মান প্রমাণ করলেই চলত না; একই সঙ্গে তাঁকে প্রতিষ্ঠানের ভিতরেও নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়েছিল।

তিনি সেই কাজ করেছেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে।

পরবর্তীকালে তিনি ওই বিভাগের নেতৃত্বের দায়িত্বও পালন করেন এবং ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বিভাগটির চেয়ারপারসন ছিলেন।

গবেষণার স্বীকৃতি

রাজেশ্বরী চট্টার্জির গবেষণা ও শিক্ষাদানের জন্য তিনি একাধিক পুরস্কার লাভ করেন।

এর মধ্যে ছিল Mountbatten Prize, J. C. Bose Memorial Prize এবং Ramlal Wadhwa Award

২০১৭ সালে ভারতের নারী ও শিশুবিকাশ মন্ত্রক তাঁকে মরণোত্তর ‘First Women Achievers of India’-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

তবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হয়তো এই পুরস্কারগুলোর বাইরেই।

ভারতে মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি গবেষণাগার দাঁড় করানো, নতুন প্রকৌশলী তৈরি করা এবং অ্যান্টেনা প্রযুক্তির ভিত্তি শক্ত করা—এই কাজগুলোই তাঁর স্থায়ী উত্তরাধিকার।

অবসরের পরেও থেমে থাকেননি

১৯৮২ সালে IISc থেকে অবসর নেওয়ার পরও রাজেশ্বরী চট্টার্জি সক্রিয় ছিলেন। তিনি নারী অধিকার ও নারীশিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। Indian Association for Women’s Studies-এর মতো সংগঠনের কাজেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল।

অর্থাৎ প্রযুক্তির জগত থেকে অবসর নেওয়ার পরও সমাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ শেষ হয়ে যায়নি।

বিজ্ঞান তাঁকে যে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিল, সামাজিক জীবনেও সেই অনুসন্ধিৎসা বজায় ছিল।

একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণা

রাজেশ্বরী চট্টার্জির জীবন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তরুণীদের জন্য, যারা ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রযুক্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চায়।

তিনি দেখিয়েছেন, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রবেশ করার জন্য শুধু মেধা নয়—প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অধ্যবসায়।

একটি নতুন বিষয় শিখতে হবে, বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে হবে, দেশে ফিরে গবেষণাগার তৈরি করতে হবে, নতুন ছাত্রছাত্রীকে শেখাতে হবে—এই পুরো যাত্রাটাই তিনি সম্পন্ন করেছিলেন।

তাঁর জীবনের বিশেষত্ব ছিল তিনি শুধু নিজের জন্য দরজা খুলে থেমে থাকেননি। তাঁর পরের প্রজন্ম যাতে সেই দরজা দিয়ে আরও সহজে প্রবেশ করতে পারে, সেই ব্যবস্থাও তৈরি করেছিলেন।

শেষ কথা

প্রফেসর রাজেশ্বরী চট্টার্জির জীবন ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তিনি এমন সময়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এসেছিলেন, যখন এই ক্ষেত্র ছিল পুরুষ-প্রধান এবং গবেষণার পরিকাঠামো ছিল সীমিত। তবুও তিনি পিছিয়ে যাননি।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে দেশে ফিরে তিনি ভারতের মাইক্রোওয়েভ গবেষণার প্রাথমিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। অ্যান্টেনা প্রযুক্তি ও তড়িৎচুম্বকীয় গবেষণায় অবদান রাখেন। শিক্ষক হিসেবে বহু গবেষককে তৈরি করেন। বই লেখেন, গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন এবং পরবর্তীকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাবিভাগের নেতৃত্বও দেন।

তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় দিক হল—তিনি এমন একটি ভবিষ্যতের জন্য কাজ করেছিলেন, যার পূর্ণ রূপ হয়তো তাঁর কর্মজীবনের শুরুতে কল্পনাও করা কঠিন ছিল।

আজকের বেতার যোগাযোগ, রাডার ও অ্যান্টেনা প্রযুক্তির বিশাল জগতের দিকে তাকালে সেই অগ্রদূতদের কথা মনে পড়ে, যাঁরা সীমিত সুযোগের মধ্যে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি তাঁদেরই একজন—যিনি প্রমাণ করেছিলেন, নতুন প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ তৈরি করতে কখনও কখনও একজন মানুষের সাহসী প্রথম পদক্ষেপই যথেষ্ট।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *