
প্রতিদিন রাত ঠিক দশটায় নীলার বাড়ির পাশের পুরনো বাড়িটিতে একটি আলো জ্বলে উঠত।
তারপর রাত বারোটায় ঠিক একইভাবে আলোটি নিভে যেত।
বছরের পর বছর ধরে একই ঘটনা।
বাড়িটা বহুদিন ধরে তালাবন্ধ। জানালাগুলো ধুলোয় ঢাকা, দেওয়ালের রং উঠে গেছে, উঠোনে আগাছা।
নীলা ছোটবেলা থেকেই বাড়িটাকে দেখে আসছে।
তার ঠাকুমা বলতেন,
“ও বাড়ির দিকে বেশি তাকাস না।”
“কেন?”
“কিছু বাড়ির দরজা বন্ধ থাকাই ভালো।”
কিন্তু নীলার কৌতূহল বরাবরই বেশি।
বিশেষ করে সেই আলোটা নিয়ে।
কারণ আলোটা কোনও সাধারণ আলো ছিল না।
প্রতিদিন রাত দশটায় ঠিক একটি জানালার ভেতর থেকে হলুদ আলো দেখা যেত।
কেউ যেন ঘরের মধ্যে বসে আছে।
এক রাতে নীলা সাহস করে বাড়িটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
লোহার গেট তালাবন্ধ।
ভেতরে কেউ নেই।
কিন্তু জানালায় আলো জ্বলছে।
নীলা ফোনের টর্চ জ্বেলে জানালার কাছে গেল।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে একটি শব্দ এল।
টক… টক… টক…
কেউ যেন জানালায় হাত দিয়ে টোকা দিচ্ছে।
নীলা ভয়ে পিছিয়ে এল।
তারপর আবার শব্দ।
টক… টক… টক…
সে দৌড়ে নিজের বাড়িতে ফিরে গেল।
পরদিন সকালে পাশের বাড়ির বৃদ্ধ হরিপদ কাকুকে ঘটনাটা বলল।
হরিপদ কাকু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
“তুই আলোটা দেখেছিস?”
“হ্যাঁ।”
“জানালায় কাউকে দেখেছিস?”
“না।”
হরিপদ কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“এই বাড়িতে একসময় একজন শিক্ষক থাকতেন। নাম ছিল অনিরুদ্ধবাবু।”
“তারপর?”
“একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলেন।”
“কোথায়?”
“কেউ জানে না।”
নীলা জিজ্ঞেস করল,
“আর ওই আলো?”
হরিপদ কাকু বললেন,
“অনিরুদ্ধবাবু প্রতিদিন রাত দশটায় পড়ার টেবিলের বাতি জ্বালিয়ে বসতেন। রাত বারোটায় আলো নিভিয়ে ঘুমোতেন।”
নীলার শরীর শিউরে উঠল।
“কিন্তু উনি তো নেই!”
হরিপদ কাকু বললেন,
“সেটাই তো রহস্য।”
সেদিন রাতে নীলা আর ঘুমোতে পারল না।
রাত দশটা বাজতেই আবার আলো জ্বলে উঠল।
কিছুক্ষণ পর জানালায় আবার—
টক… টক… টক…
নীলা এবার জানালার কাছে গেল।
কিন্তু এবার সে ভয় পেল না।
জানালার কাঁচে কুয়াশার মতো একটা আস্তরণ জমেছিল।
তার ওপর ধীরে ধীরে আঙুলের দাগ ফুটে উঠল।
তারপর তিনটি শব্দ—
“বইটা খুঁজে দেখো।”
নীলা হতভম্ব হয়ে গেল।
পরদিন সে হরিপদ কাকুকে সব বলল।
তিনি অনেকক্ষণ চিন্তা করে বললেন,
“অনিরুদ্ধবাবুর একটা পুরনো লাইব্রেরি ছিল।”
দু’জনে মিলে বাড়ির মালিকের অনুমতি নিয়ে তালা খুললেন।
ঘরের ভেতরে ঢুকতেই পুরনো বইয়ের গন্ধ।
একটি ঘরে শত শত বই।
নীলা বইয়ের তাকগুলো দেখতে লাগল।
হঠাৎ একটি মোটা বই মেঝেতে পড়ে গেল।
বইটির নাম—
“মানুষের কাছে মানুষের ঋণ”
বইটি খুলতেই মাঝখান থেকে একটি পুরনো খাম পড়ে গেল।
খামের ওপর লেখা—
“যে এই চিঠি পাবে, সে যেন সত্যিটা জানে।”
চিঠিতে লেখা ছিল—
অনিরুদ্ধবাবু শিক্ষকতা করার পাশাপাশি গ্রামের দরিদ্র শিশুদের পড়াতেন।
কিন্তু গ্রামের কিছু প্রভাবশালী মানুষ তাঁর এই কাজ পছন্দ করত না। কারণ তিনি গ্রামের গরিব মানুষের জমি দখলের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন।
এক রাতে তাঁকে মারধর করে দূরের একটি শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তিনি কোনওভাবে পালিয়ে বেঁচেছিলেন।
কিন্তু ফিরে আসেননি।
চিঠির শেষ লাইনে লেখা—
“আমি ফিরে আসতে পারব না। কিন্তু আমার বইগুলো যেন গ্রামের বাচ্চাদের কাছে পৌঁছয়।”
নীলার চোখে জল এসে গেল।
কিন্তু রহস্য তখনও শেষ হয়নি।
হরিপদ কাকু হঠাৎ বললেন,
“নীলা, তোর হাতে যে বইটা আছে, সেটা একটু দেখ।”
বইয়ের ভেতরের শেষ পাতায় একটি পুরনো ছবি আটকানো।
ছবিতে অনিরুদ্ধবাবু দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন শিশুর সঙ্গে।
ছবির একেবারে সামনে ছোট্ট একটি মেয়ে।
নীলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থমকে গেল।
মেয়েটি তার মা।
নীলা বাড়ি ফিরে মাকে ছবিটা দেখাল।
মা অনেকক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
“আমি যখন ছোট ছিলাম, উনি আমাকে পড়াতেন।”
“তুমি জানতেও?”
মা মাথা নাড়লেন।
“তোর দাদু মারা যাওয়ার পর সংসারে খুব কষ্ট ছিল। অনিরুদ্ধ স্যার আমাকে বিনা পয়সায় পড়িয়েছিলেন।”
নীলা বলল,
“তাহলে এত বছর ধরে ওই আলো…?”
মা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
“হয়তো আলোটা আমাদের মনে করিয়ে দিতে এসেছে—কেউ চলে গেলেই তার কাজ শেষ হয়ে যায় না।”
সেই রাতেও দশটায় আলো জ্বলল।
কিন্তু এবার নীলা ভয় পেল না।
সে নিজের পড়ার টেবিলে একটি বাতি জ্বালিয়ে বই খুলে বসল।
পরদিন থেকে নীলা গ্রামের কয়েকজন দরিদ্র শিশুকে পড়াতে শুরু করল।
আর আশ্চর্যের বিষয়—
যেদিন প্রথম শিশুটি এসে তার কাছে পড়তে বসল, সেদিন রাত দশটায় সেই পুরনো বাড়ির জানালায় আলো জ্বলল না।
চল্লিশ বছরের মধ্যে সেই প্রথম।
নীলা বুঝল—
আলোটা হয়তো কখনও বাড়ির ভেতরে ছিল না।
আলোটা ছিল একজন মানুষের অসমাপ্ত স্বপ্নে।
আর সেই স্বপ্ন যখন নতুন কারও হাতে পৌঁছে গেল, তখন জানালার ওপাশের আলোটির আর প্রয়োজন রইল না।
সমাপ্ত।