
বিনোদবাবু ডাকপিয়নের চাকরি করতেন।
প্রায় তিরিশ বছর ধরে তিনি একই এলাকার বাড়ি-বাড়ি চিঠি বিলি করেছেন। কারও চাকরির নিয়োগপত্র, কারও বিয়ের নিমন্ত্রণ, কারও বিদেশে থাকা ছেলের চিঠি—হাজার হাজার চিঠি তাঁর হাত ঘুরে মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
চিঠি বিলি করা তাঁর কাছে শুধু চাকরি ছিল না।
তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি চিঠির মধ্যে কখনও কখনও একটা মানুষের পুরো পৃথিবী লুকিয়ে থাকে।
সেদিন দুপুরে অফিসে ঢুকেই বিনোদবাবুর নজরে পড়ল একটি অদ্ভুত খাম।
খামের ওপর প্রাপকের নাম লেখা—
“যার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।”
কোনও বাড়ির নম্বর নেই।
রাস্তার নাম নেই।
শহরের নাম নেই।
এমনকি প্রেরকের নামও নেই।
ডাকঘরের কর্মীরা চিঠিটা দেখে হাসাহাসি করছিল।
একজন বলল,
“এটা নিশ্চয়ই কারও মজা।”
বিনোদবাবু চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
“যে পাঠিয়েছে, নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে।”
সেদিন সারাদিন তিনি চিঠিটা ব্যাগে নিয়ে ঘুরলেন।
কিন্তু কাকে দেবেন?
শেষ বিকেলে রাস্তার পাশে একটি বৃদ্ধ লোককে বসে থাকতে দেখলেন।
লোকটির সামনে একটি পুরনো লাঠি।
বিনোদবাবু হঠাৎ ভাবলেন, “হয়তো এই মানুষটিরই দরকার।”
কিন্তু খামটা হাতে নিয়ে আবার থেমে গেলেন।
“না।”
লোকটির কাছে ইতিমধ্যে তার পরিবারের একজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে।
চিঠি তার জন্য নয়।
পরদিন সকালে তিনি দেখলেন, স্টেশনের পাশে এক তরুণী বসে কাঁদছে।
তার হাতে একটি হাসপাতালের রিপোর্ট।
বিনোদবাবু এগিয়ে গেলেন।
“কী হয়েছে?”
মেয়েটি বলল,
“বাবার অপারেশন হবে। টাকা জোগাড় করতে পারছি না।”
বিনোদবাবুর বুকটা কেঁপে উঠল।
তিনি খামটির দিকে তাকালেন।
হয়তো এটাই সেই মানুষ!
কিন্তু আবারও থেমে গেলেন।
তিনি জানতেন, নিজের অনুমানে কারও হাতে চিঠি দেওয়া যায় না।
চিঠির ঠিকানা খুঁজে বের করতেই হবে।
এভাবে তিন দিন কেটে গেল।
চতুর্থ দিন রাতে বাড়ি ফিরে বিনোদবাবু চিঠিটা টেবিলের ওপর রাখলেন।
তাঁর স্ত্রী বললেন,
“এত চিন্তা করছ কেন?”
বিনোদবাবু বললেন,
“চিঠির ঠিকানা নেই। কিন্তু প্রাপক আছে। শুধু আমি তাকে খুঁজে পাচ্ছি না।”
স্ত্রী হেসে বললেন,
“হয়তো চিঠিটা তোমার জন্যই।”
বিনোদবাবু হেসে উড়িয়ে দিলেন।
“আমার জন্য আবার কেন?”
“তুমি সারাজীবন অন্যের চিঠি পৌঁছে দিয়েছ। কখনও কি কেউ তোমার কাছে চিঠি পাঠিয়েছে?”
বিনোদবাবু উত্তর দিলেন না।
সেদিন রাতে তিনি অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারেননি।
পরদিন অফিসে যাওয়ার আগে খামটি আবার হাতে নিলেন।
হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল খামের পেছনে খুব ছোট করে একটি তারিখ লেখা।
৩০ বছর আগে।
বিনোদবাবু অবাক।
ত্রিশ বছর আগে পাঠানো চিঠি এতদিন ডাকঘরে কীভাবে পড়ে ছিল?
তিনি পুরনো রেকর্ড খুঁজতে শুরু করলেন।
দুপুরে একটি পুরনো রেজিস্টার পাওয়া গেল।
সেখানে চিঠিটির কোনও প্রাপকের নাম ছিল না।
শুধু লেখা ছিল—
“বিনোদ দত্তের হাতে পৌঁছলে প্রদান করবেন।”
বিনোদবাবু স্তব্ধ।
চিঠিটা তাঁর জন্যই ছিল!
কিন্তু কে পাঠিয়েছিল?
কাঁপা হাতে খামটি খুললেন।
ভেতরে একটি ছোট্ট কাগজ।
লেখা—
“বিনোদ,
তুমি হয়তো আমাকে মনে রাখোনি।
ত্রিশ বছর আগে এক শীতের রাতে রেললাইনের পাশে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। আমার কাছে টাকা ছিল না। বাড়ি ফেরার উপায় ছিল না।
তুমি আমাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলে।
তোমার মা আমাকে খেতে দিয়েছিলেন।
পরদিন নিজের টাকায় আমাকে বাসে তুলে দিয়েছিলে।
আমি বলেছিলাম, একদিন তোমার টাকা ফেরত দেব।
তুমি বলেছিলে, ‘টাকা ফেরত দিতে হবে না। জীবনে যখন কাউকে অসহায় দেখবে, তখন তাকে সাহায্য করবে।’
আমি সেই কথা রেখেছি।
এই চিঠি লিখেছিলাম ত্রিশ বছর আগে। কিন্তু তোমার ঠিকানা জানতাম না।
আজ তোমার গ্রামের এক পুরনো বন্ধুর কাছ থেকে ঠিকানা পেলাম।
চিঠিটা হয়তো দেরিতে পৌঁছেছে।
কিন্তু কথাটা দেরি করে পৌঁছায়নি।
—অমল”
বিনোদবাবু চেয়ারে বসে রইলেন।
অমল!
নামটা তাঁর মনে পড়ল।
ত্রিশ বছর আগে সত্যিই এক যুবককে তিনি বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।
কিন্তু সেই ঘটনাটা তিনি বহু আগেই ভুলে গিয়েছিলেন।
চিঠির সঙ্গে আরও একটি কাগজ ছিল।
একটি ব্যাংকের রসিদ।
বিনোদবাবুর নামে একটি ছোট্ট মাসিক তহবিল খোলা হয়েছে।
নিচে লেখা—
“যে মানুষ সারাজীবন অন্যের চিঠি পৌঁছে দিয়েছে, তার অবসরের পর যেন কোনও চিঠির অপেক্ষায় থাকতে না হয়।”
বিনোদবাবুর চোখ ভিজে উঠল।
সেদিন সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি ফেরার সময় রাস্তার পাশে সেই তরুণীটিকে আবার দেখলেন।
মেয়েটি এখনও হাসপাতালের রিপোর্ট হাতে দাঁড়িয়ে।
বিনোদবাবু কাছে গিয়ে বললেন,
“আপনার বাবার চিকিৎসার জন্য কত টাকা লাগবে?”
মেয়েটি অবাক হয়ে তাকাল।
বিনোদবাবু মৃদু হেসে বললেন,
“সবটা দিতে পারব না। কিন্তু যতটা পারি, দেব।”
মেয়েটির চোখে জল।
সে বলল,
“আপনি কেন করবেন?”
বিনোদবাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কারণ আজ আমি একটা চিঠি পেয়েছি।”
“কী চিঠি?”
বিনোদবাবু হাসলেন।
“যে চিঠির ঠিকানা ছিল না, কিন্তু ঠিক মানুষটার কাছে পৌঁছে গেছে।”
তারপর তিনি ধীরে ধীরে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলেন।
তাঁর ডাকপিয়নের ব্যাগটা সেদিনও কাঁধে ছিল।
তবে ব্যাগের ভেতরে আর কোনও চিঠি ছিল না।
ছিল শুধু একটি বিশ্বাস—
ভালো কাজ কখনও হারিয়ে যায় না। কখনও না কখনও, কোনও না কোনও পথে, তা মানুষের কাছে ফিরে আসে।
সমাপ্ত।