
বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিল রতন।
বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ছোট্ট একটি কাপড়ের দোকান চালায় সে। সারাদিন দোকানে বসে থেকে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরাই তার প্রতিদিনের নিয়ম।
সেদিন আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা ছিল। সন্ধ্যার পর হঠাৎ বৃষ্টি নেমে গেল।
রতনের হাতে ছিল একটা পুরনো কালো ছাতা।
ছাতাটার একটা শিক বাঁকা, কাপড়ের কয়েক জায়গায় সেলাই করা। দেখতে এতটাই পুরনো যে কেউ দেখলে হয়তো ফেলে দিতে বলত।
কিন্তু রতন ছাতাটা ফেলতে পারত না।
কারণ ছাতাটা তার বাবার।
বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর ঘরের আলমারি থেকে এই ছাতাটাই শুধু নিজের কাছে রেখেছিল রতন।
বৃষ্টির মধ্যে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ রতন দেখল, রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন।
বৃদ্ধার হাতে কোনও ছাতা নেই।
বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে।
রতন নিজের ছাতাটা একটু এগিয়ে ধরল।
“মাসিমা, কোথায় যাবেন?”
বৃদ্ধা বললেন,
“আর একটু সামনে। ওই বাঁশবাগানের পরেই আমার বাড়ি।”
রতন বলল,
“চলুন, আমি দিয়ে আসছি।”
দু’জনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধা ছাতাটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ছাতাটা খুব পুরনো দেখছি।”
রতন হেসে বলল,
“হ্যাঁ। অনেক পুরনো।”
“ফেলে দেননি কেন?”
রতন একটু চুপ করে থেকে বলল,
“যার ছিল, সে আমার কাছে খুব দামি ছিল।”
বৃদ্ধা আর কিছু বললেন না।
বাঁশবাগান পেরিয়ে তাঁরা একটি ছোট্ট মাটির বাড়ির সামনে পৌঁছলেন।
বৃদ্ধা দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার আগে বললেন,
“কাল একবার আমার বাড়িতে এসো।”
রতন অবাক হয়ে বলল,
“কেন?”
“একটা জিনিস দেখাব।”
পরদিন বিকেলে রতন সত্যিই গেল।
বৃদ্ধা তাকে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলেন।
দেয়ালের পাশে রাখা ছিল একটি পুরনো কাঠের বাক্স।
বৃদ্ধা বাক্সটা খুললেন।
ভেতরে কিছু পুরনো চিঠি, একটি ঘড়ি আর কয়েকটি সাদা-কালো ছবি।
তারপর একটি ছবি রতনের হাতে দিলেন।
ছবিটা দেখে রতন স্তব্ধ হয়ে গেল।
ছবিতে তার বাবা।
আর বাবার পাশে এই বৃদ্ধা।
রতন কাঁপা গলায় বলল,
“আপনি… আমার বাবাকে চিনতেন?”
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,
“চিনতাম না। তোমার বাবাই একদিন আমাকে চিনেছিলেন।”
রতন কিছু বুঝতে পারল না।
বৃদ্ধা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
“প্রায় পঁচিশ বছর আগে আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি খুব কষ্টে দিন কাটাতাম। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে বাজার থেকে ফিরছিলাম। তখন তোমার বাবা আমাকে নিজের ছাতা দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন।”
রতন চুপ করে শুনছিল।
“আমি ছাতাটা ফেরত দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার বাবা বলেছিলেন, ‘আপনার দরকার বেশি। রেখে দিন।’”
বৃদ্ধা একটু থামলেন।
“কিন্তু আমি রাখিনি। পরদিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে ছাতাটা দিয়ে এসেছিলাম।”
রতন নিজের হাতে থাকা ছাতাটার দিকে তাকাল।
“তারপর?”
বৃদ্ধা বললেন,
“কয়েক বছর পর তোমার বাবা আবার আমার কাছে এসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ছাতাটা কি এখনও আছে?’”
“আমি বলেছিলাম, নেই।”
“তখন তিনি হেসে বলেছিলেন—‘থাক, ছাতা না থাকলেও স্মৃতিটা থাকুক।’”
রতনের চোখ ভিজে গেল।
সে বুঝতে পারল, এতদিন যে ছাতাটাকে সে শুধু বাবার স্মৃতি বলে জানত, তার সঙ্গে আরও একটি মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে।
বৃদ্ধা বাক্স থেকে একটি ছোট্ট কাগজ বের করলেন।
“এটা তোমার বাবার লেখা।”
রতন কাগজটি খুলল।
সেখানে লেখা—
“মানুষের জীবনে বড় কিছু করার সুযোগ সবসময় আসে না। কিন্তু বৃষ্টির দিনে কারও মাথার ওপর নিজের ছাতাটা ধরার সুযোগ প্রায়ই আসে।”
রতন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
চোখের জল মুছে সে বলল,
“মাসিমা, আমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন।”
বৃদ্ধা হেসে বললেন,
“তোমার বাবা ভালো ছিলেন বলেই তো তুমি আজ এই পুরনো ছাতাটা নিয়ে আমার বাড়ি পর্যন্ত এসেছ।”
বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
রতন ছাতাটা খুলে বৃদ্ধার মাথার ওপর ধরল।
বৃদ্ধা বললেন,
“আজ ছাতাটা তোমার।”
রতন মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“না মাসিমা। এটা আমার বাবার ছিল। এখন থেকে এটা আমাদের।”
দু’জন ধীরে ধীরে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে শুরু করল।
পুরনো ছাতাটার নিচে দু’জন মানুষ।
আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল একজন মৃত মানুষের রেখে যাওয়া ভালোবাসা।
সমাপ্ত।