দ্বিতীয় পর্ব — জন্মের রাত
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটেনি।
নীলবাড়ির মাটির নিচের ঘরে অদ্রিজা আর সায়ন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
টেলিফোনের ওপাশের কণ্ঠস্বর অনেকক্ষণ আগেই থেমে গেছে।
কিন্তু শেষ কথাটা এখনও অদ্রিজার কানে বাজছে—
“তোমাদের দুজনের মধ্যে একজন আমার সন্তান নয়।”
সায়ন ধীরে ধীরে বলল,
“ফোনটা আমাকে দাও।”
অদ্রিজা রিসিভারটা এগিয়ে দিল।
“ওটা আমার বাবার গলা ছিল।”
সায়ন মাথা নাড়ল।
“আমি জানি।”
“তুমি জানো?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে এতদিন আমাকে কিছু বলোনি কেন?”
সায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না।”
“কিসের ব্যাপারে?”
“তোমার জন্ম নিয়ে।”
অদ্রিজা দেয়ালে হেলান দিল।
“সবাই আমার জন্মের কথা জানে। শুধু আমি জানি না।”
সায়ন তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার জন্মের রাতটা অদ্ভুত ছিল।”
“কী হয়েছিল?”
“সেটা জানতে হলে আমাদের এই বাড়ির আরেকটা ঘর খুঁজতে হবে।”
“আরেকটা?”
“হ্যাঁ।”
সায়ন টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো বাক্সের দিকে এগিয়ে গেল।
বাক্সের নিচে হাত ঢুকিয়ে সে একটা লুকোনো লিভার টানল।
দেয়ালের একটা অংশ ধীরে ধীরে সরে গেল।
তার পেছনে ছোট একটা ঘর।
ঘরের মধ্যে একটা লোহার আলমারি।
অদ্রিজা অবাক হয়ে বলল,
“এটা আগে দেখিনি।”
“কারণ এটা কেউ দেখতে পাবে না বলেই বানানো হয়েছিল।”
সায়ন পকেট থেকে একটা চাবি বের করল।
আলমারি খুলতেই অসংখ্য ফাইল।
পুরোনো হাসপাতালের কাগজ।
জন্মনিবন্ধন।
ছবি।
আর একটা কালো ডায়েরি।
ডায়েরির মলাটে লেখা—
“১৭ জুলাই ১৯৯৮।”
অদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।
“এটাই?”
“হ্যাঁ।”
সে ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম পাতায় তার বাবার হাতের লেখা।
“আজ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।”
অদ্রিজা পড়তে শুরু করল।
“রাত ১টা ৪০ মিনিট। হাসপাতালে পৌঁছলাম।
মাধবীর অবস্থা খুব খারাপ।
ডাক্তার বললেন, শিশুটিকে বাঁচানো যাবে কি না নিশ্চিত নন।”
অদ্রিজা নিঃশ্বাস আটকে পড়ছিল।
পরের পাতায়—
“রাত ২টা ১৭ মিনিট।
শিশুটি জন্মেছে।
মেয়ে।
সুস্থ।”
অদ্রিজা থেমে গেল।
“মেয়ে?”
সায়ন তার দিকে তাকাল।
“তুমি।”
অদ্রিজা পরের পাতা উল্টাল।
“অমিতাভ এসেছে।
সে শিশুটিকে কোলে নিয়েছে।
তার চোখে এমন আনন্দ দেখলাম, যা আগে কখনও দেখিনি।”
অদ্রিজার চোখ ভিজে উঠল।
“তাহলে বাবা… অমিতাভ?”
“ডায়েরি তাই বলছে।”
আরেকটি পাতা।
“রাত ৩টা ১০ মিনিট।
অমিতাভ বলল, শিশুটিকে নিয়ে সে চলে যাবে।
আমি তাকে বাধা দিলাম।”
তারপর লেখাটা কাঁপা।
“কারণ আমি জানি, নীলাদ্রি তাকে খুঁজছে।”
অদ্রিজা থমকে গেল।
“নীলাদ্রি আবার?”
সায়ন মাথা নাড়ল।
“এই নামটাই সব জায়গায়।”
অদ্রিজা পড়তে লাগল।
“রাত ৩টা ৪৫।
অমিতাভ চলে গেছে।
শিশুটি আমার কাছে।
মাধবী অজ্ঞান।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, অদ্রিজাকে আমি নিজের মেয়ে হিসেবে বড় করব।”
অদ্রিজার হাত কেঁপে উঠল।
“তিনি আমাকে নিজের মেয়ে করেছিলেন।”
সায়ন বলল,
“হ্যাঁ।”
“তাহলে উনি আমার বাবা ছিলেন না?”
“রক্তের সম্পর্কের বাবা নয়।”
অদ্রিজা ডায়েরির পরের পাতা খুলল।
কিন্তু সেখানে শুধু একটা বাক্য—
“আমি জানতাম না, সেই রাতেই আরেকটি শিশু জন্মেছিল।”
অদ্রিজা তাকাল।
“আরেকটি শিশু?”
সায়নও বিস্মিত।
“আমি জানতাম না।”
অদ্রিজা দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল।
পরের পৃষ্ঠাগুলো ছেঁড়া।
শুধু শেষ পাতায় লেখা—
“যদি কখনও সত্যি জানতে চাও, পুরোনো নার্সিংহোমে যাও। রুম নম্বর ১৭।”
অদ্রিজা বলল,
“কোন নার্সিংহোম?”
সায়ন উত্তর দিল,
“আমি জানি।”
“কোথায়?”
“শহরের বাইরে। এখন আর হাসপাতাল নেই।”
অদ্রিজা ডায়েরিটা বন্ধ করল।
“তাহলে চল।”
সায়ন বলল,
“এখন?”
“হ্যাঁ।”
“বাইরে যারা আছে?”
“তারা আমাদের খুঁজছে।”
“তাহলে আরও সাবধানে যেতে হবে।”
অদ্রিজা তাকিয়ে বলল,
“সায়ন, তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?”
প্রশ্নটা হঠাৎ।
সায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“উত্তরটা শুনতে চাও?”
“হ্যাঁ।”
“আমি পাহাড়ে ছিলাম।”
“কেন?”
“একজন মানুষ আমাকে লুকিয়ে রেখেছিল।”
“কে?”
সায়ন জানালার বাইরে তাকাল।
“নীলাদ্রি।”
অদ্রিজা স্তব্ধ।
“তাহলে সে তোমাকে বাঁচিয়েছিল?”
“কখনও বাঁচিয়েছে। কখনও বন্দি রেখেছে।”
“কেন?”
“কারণ আমি যা দেখেছিলাম, সেটা সে জানত।”
“খুন?”
“হ্যাঁ।”
“কাকে খুন করতে দেখেছিলে?”
সায়ন ধীরে বলল,
“একজনকে।”
“কে?”
“অমিতাভ সেনকে।”
অদ্রিজার শরীর অবশ হয়ে গেল।
“তুমি… আমার আসল বাবাকে খুন হতে দেখেছিলে?”
সায়ন মাথা নাড়ল।
“আমি ভেবেছিলাম তিনি মারা গেছেন।”
“আর এখন?”
“এখনও জানি না।”
অদ্রিজা বলল,
“তাহলে তুমি এতদিন কেন বলোনি?”
“কারণ আমি পুরো ঘটনা দেখিনি।”
“কী দেখেছিলে?”
সায়ন বলল,
“আমি দেখেছিলাম অমিতাভকে একটা গাড়িতে তোলা হচ্ছে।”
“তারপর?”
“গাড়িটা নদীর দিকে গিয়েছিল।”
“তারপর?”
“একটা বিস্ফোরণ।”
অদ্রিজার গলা শুকিয়ে গেল।
“কিন্তু কোনও দেহ পাওয়া যায়নি?”
“না।”
“তাহলে?”
সায়ন বলল,
“এই কারণেই আমি আজও মনে করি, অমিতাভ হয়তো বেঁচে ছিলেন।”
সকাল আটটা।
নীলবাড়ি থেকে তারা বেরিয়ে পড়ল।
সায়ন একটা পুরোনো মোটরবাইক নিয়ে এসেছিল।
অদ্রিজা পিছনে বসে।
রাস্তা ভিজে।
আকাশ মেঘলা।
শহর পেরিয়ে তারা গ্রামাঞ্চলের দিকে এগিয়ে গেল।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে একটা পরিত্যক্ত ভবনের সামনে পৌঁছল।
ভাঙা সাইনবোর্ডে এখনও লেখা—
“মাধবী নার্সিংহোম।”
অদ্রিজা সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মাধবী?”
সায়ন মাথা নাড়ল।
“তোমার মায়ের নাম।”
অদ্রিজা স্তব্ধ হয়ে গেল।
“আমার মা কি এই নার্সিংহোমেই ছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
দরজাটা ভাঙা।
ভেতরে ঢুকতেই ধুলো আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।
দেয়ালে পুরোনো পোস্টার।
এক পাশে ভাঙা রিসেপশন।
সায়ন একটা পুরোনো রেজিস্টার বের করল।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে থামল।
১৭ জুলাই ১৯৯৮।
অদ্রিজা তার পাশে দাঁড়াল।
রেজিস্টারে লেখা—
মাধবী সেন — কক্ষ ১৭।
অদ্রিজা চমকে উঠল।
“সেন?”
“তোমার মায়ের বিয়ের আগের পদবি।”
সায়ন বলল।
আরেকটু নিচে—
সহযোগী ব্যক্তি: অমিতাভ সেন।
অদ্রিজা চোখ বন্ধ করল।
সবকিছু যেন ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে।
তারপর রেজিস্টারের শেষ লাইনে—
দ্বিতীয় প্রসূতি: রীনা দত্ত।
অদ্রিজা তাকাল।
“রীনা দত্ত কে?”
“জানি না।”
রেজিস্টারের পাশে একটা ছোট নোট।
“শিশু—পুরুষ।”
অদ্রিজা স্তব্ধ।
“একই রাতে আরেকটা ছেলে জন্মেছিল।”
সায়ন বলল,
“হ্যাঁ।”
“এই ছেলেটার কী হয়েছিল?”
রেজিস্টারের পাতা ছিঁড়ে নেওয়া।
কোনও তথ্য নেই।
হঠাৎ পাশের ঘর থেকে একটা শব্দ হলো।
দুজনেই চমকে উঠল।
সায়ন অদ্রিজাকে পিছনে সরিয়ে দিল।
“কে ওখানে?”
কোনও উত্তর নেই।
সে ধীরে ধীরে দরজাটা খুলল।
ঘরের মধ্যে একটা পুরোনো কাঠের আলমারি।
আর মেঝেতে পড়ে থাকা একটা ছবি।
অদ্রিজা ছবিটা তুলে নিল।
ছবিতে চারজন।
তার মা।
অমিতাভ।
একজন নার্স।
আর একজন পুরুষ।
অদ্রিজা পুরুষটির মুখ দেখে স্থির হয়ে গেল।
“এই লোকটা…”
সায়ন ছবিটা নিল।
তার মুখও বদলে গেল।
“নীলাদ্রি।”
অদ্রিজা বলল,
“কিন্তু উনি এখানে কেন?”
সায়ন ছবির পেছনটা দেখল।
সেখানে লেখা—
“রাত ৩টা ৩০ — শিশুকে বদলানো হলো।”
অদ্রিজার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“শিশুকে বদলানো?”
“মানে?”
সায়ন ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“অদ্রিজা… সম্ভবত তোমার জন্মের রাতেই তোমাকে অন্য একটা শিশুর সঙ্গে বদলে দেওয়া হয়েছিল।”
“কেন?”
“কারণ কাউকে একটা শিশুকে লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল।”
“কাকে?”
সায়ন উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে গাড়ির শব্দ।
দুজনেই জানালার কাছে গেল।
একটা কালো গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে।
গাড়ি থেকে তিনজন লোক নামল।
সায়ন বলল,
“আমাদের এখান থেকে বেরোতে হবে।”
“কিন্তু সত্যিটা?”
“সত্যি এখানেই আছে।”
সে আলমারির পেছনে একটা গোপন খোপ খুঁজে পেল।
ভেতরে একটা ছোট ধাতব বাক্স।
বাক্স খুলতেই একটা পুরোনো অডিও ক্যাসেট।
সায়ন সেটাকে হাতে নিল।
“এটা নিয়ে চল।”
“কিন্তু এটা শুনব কোথায়?”
“যেখানে কেউ আমাদের শুনতে পাবে না।”
তারা পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে দৌড়ল।
কিছুদূর গিয়ে একটা পুরোনো গুদামের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
বাইরে লোকগুলো নার্সিংহোমে ঢুকেছে।
সায়ন ক্যাসেটটা বের করল।
তার ব্যাগে ছোট একটা ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল।
সে চালু করল।
প্রথমে নার্সের কণ্ঠ।
“সময় রাত তিনটে পঁয়তাল্লিশ।”
তারপর অমিতাভের গলা।
“তুমি নিশ্চিত?”
নার্স বলল,
“হ্যাঁ।”
অমিতাভ—
“তাহলে শিশুটাকে এখনই নিয়ে যাও।”
নার্স—
“কিন্তু মাধবী?”
অমিতাভ—
“ওকে কিছু জানানো যাবে না।”
তারপর আরেকটা কণ্ঠ।
নীলাদ্রি।
“শিশুটাকে আমার হাতে দাও।”
অমিতাভ বলল,
“না।”
নীলাদ্রি—
“তুমি জানো না তুমি কী করছ।”
অমিতাভ—
“আমি জানি। আর আমি এটাও জানি, তুমি ওকে খুঁজে পেলে ও বাঁচবে না।”
তারপর হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ।
একটা শিশুর।
অদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।
তারপর অমিতাভ বলল—
“এই শিশুটাকে বাঁচাতে হলে ওকে আমার সন্তান হিসেবে দেখানো যাবে না।”
নীলাদ্রি বলল,
“তাহলে?”
অমিতাভ—
“ওকে অন্য পরিবারের হাতে দাও।”
অদ্রিজা ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে…”
ক্যাসেট চলতে থাকে।
নীলাদ্রি বলল,
“আর দ্বিতীয় শিশুটার?”
অমিতাভ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“ওকে আমি নিয়ে যাব।”
সায়ন হঠাৎ প্লেয়ার বন্ধ করে দিল।
অদ্রিজা তার দিকে তাকাল।
“দ্বিতীয় শিশুটি কে?”
সায়ন বলল,
“আমরা এখনও জানি না।”
ঠিক তখন তার ফোন বেজে উঠল।
অজানা নম্বর।
সায়ন ফোন ধরল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর এক বৃদ্ধ কণ্ঠ—
“দ্বিতীয় শিশুটাকে খুঁজছ?”
সায়ন উঠে দাঁড়াল।
“আপনি কে?”
“যে মানুষটা তোমাদের জন্মের রাতটা দেখেছিল।”
অদ্রিজা ফোনের দিকে তাকাল।
“আপনি কোথায়?”
“পুরোনো রেলস্টেশনে।”
“কোনটা?”
“যেখানে তোমার বাবা শেষবার গিয়েছিল।”
কল কেটে গেল।
অদ্রিজা সায়নের দিকে তাকাল।
“চলো।”
পুরোনো রেলস্টেশন।
বছরের পর বছর ট্রেন দাঁড়ায় না এখানে।
প্ল্যাটফর্মে আগাছা।
ভাঙা বেঞ্চ।
দূরে একটা সিগন্যাল এখনও দাঁড়িয়ে।
একজন বৃদ্ধ বেঞ্চে বসে ছিলেন।
অদ্রিজা কাছে যেতেই তিনি মাথা তুললেন।
“তুমি অদ্রিজা?”
“হ্যাঁ।”
“তোমার চোখ তোমার মায়ের মতো।”
অদ্রিজা চুপ।
বৃদ্ধ বললেন,
“আমি সেই রাতের নার্স।”
অদ্রিজার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“দ্বিতীয় শিশুটার কী হয়েছিল?”
বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন।
“তাকে নিয়ে গিয়েছিল অমিতাভ।”
“কোথায়?”
“আমি জানি না।”
“আর প্রথম শিশুটি?”
“তোমাকে।”
অদ্রিজা চুপ করে গেল।
“কিন্তু কেন বদলানো হয়েছিল?”
বৃদ্ধ বললেন,
“কারণ নীলাদ্রি তখন তোমার মাকে খুঁজছিল। সে জানত মাধবীর সন্তান অমিতাভের দুর্বলতা।”
“তাহলে?”
“অমিতাভ তোমাকে বাঁচাতে নিজের সন্তান পরিচয় ছেড়ে দিয়েছিল।”
“কিন্তু দ্বিতীয় শিশুটি?”
বৃদ্ধ ধীরে বললেন,
“সেটাই আসল রহস্য।”
সায়ন বলল,
“আপনি জানেন?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“জানি।”
“কে সে?”
বৃদ্ধ অদ্রিজার দিকে তাকালেন।
তারপর বললেন—
“সায়ন।”
অদ্রিজা স্থির।
সায়নও।
বৃদ্ধ বললেন,
“তোমরা যে দুজনকে এত বছর ধরে আলাদা মানুষ ভেবেছ, সেই রাতেই তোমাদের ভাগ্য এক হয়ে গিয়েছিল।”
সায়ন ধীরে বলল,
“আমি?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু আমি তো…”
বৃদ্ধ বললেন,
“তোমাকে অন্য পরিবারে দেওয়া হয়েছিল। পরে নীলাদ্রি তোমাকে খুঁজে পায়।”
অদ্রিজা সায়নের দিকে তাকাল।
সবকিছু যেন এক মুহূর্তে নতুন অর্থ পেল।
সায়নের চোখে জল।
“তাহলে…”
বৃদ্ধ বললেন,
“তুমি অমিতাভের ছেলে।”
অদ্রিজা স্তব্ধ হয়ে গেল।
তার নিজের জন্মের রাতের রহস্যের সঙ্গে সায়নের জীবন জড়িয়ে আছে।
কিন্তু এখনও একটা প্রশ্ন।
অদ্রিজা বলল,
“তাহলে আমরা…”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“না। তোমরা ভাই-বোন নও।”
অদ্রিজা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
“তাহলে?”
বৃদ্ধ বললেন,
“তুমি মাধবীর সন্তান। আর সায়ন রীনা দত্তের সন্তান।”
“কিন্তু অমিতাভ?”
“অমিতাভ সায়নকে নিজের সন্তানের মতো বড় করতে চেয়েছিল।”
সায়ন ফিসফিস করে বলল,
“তাহলে আমার বাবা কে?”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,
“রীনা দত্তের স্বামী।”
“অমিতাভ নন?”
“না।”
সায়ন চোখ বন্ধ করল।
এত বছরের রহস্যের একটা বড় অংশ খুলে গেল।
অদ্রিজা আর সায়ন রক্তের সম্পর্কে জড়িত নয়।
কিন্তু অমিতাভ তাদের দুজনের জীবনেই ছিলেন।
হঠাৎ দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
“আমার কাজ শেষ।”
“কোথায় যাবেন?”
“যেখানে সব সত্যি একদিন শেষ হয়।”
তিনি হাঁটতে শুরু করলেন।
অদ্রিজা চিৎকার করে বলল,
“অমিতাভ কোথায়?”
বৃদ্ধ থামলেন।
পেছন ফিরে বললেন—
“যাকে তোমরা মৃত ভেবেছ, সে হয়তো তোমাদের সামনে আসতে চলেছে।”
তারপর তিনি অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।
অদ্রিজা সায়নের পাশে এসে দাঁড়াল।
সায়ন তার দিকে তাকাল।
“অদ্রি…”
“হ্যাঁ?”
“এত বছর আমি ভেবেছিলাম তোমাকে হারিয়েছি।”
অদ্রিজা মৃদু হাসল।
“আমিও।”
“কিন্তু এখন?”
অদ্রিজা তার হাত ধরল।
“এখন মনে হচ্ছে, আমরা আসলে কখনও একে অপরকে হারাইনি।”
ঠিক তখনই দূরে একটা গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠল।
গাড়ি ধীরে ধীরে তাদের সামনে এসে থামল।
দরজা খুলল।
একজন মানুষ নেমে এলেন।
বয়স হয়েছে।
চুলে পাক।
মুখে ক্লান্তি।
কিন্তু চোখ—
অদ্রিজা সেই চোখ ছবিতে দেখেছে।
সায়নও তাকিয়ে রইল।
লোকটি কয়েক পা এগিয়ে এসে থামলেন।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন—
“অদ্রি…”
অদ্রিজার চোখে জল এসে গেল।
সায়ন নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে।
লোকটি বললেন—
“আমি অমিতাভ।”
দূরে আবার বৃষ্টি শুরু হলো।
আর বারো বছর ধরে হারিয়ে থাকা একটি মানুষের ফিরে আসার সঙ্গে—
অদ্রিজার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের শেষ দরজাটিও খুলে গেল।
চলবে…