শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে বাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল।
বাড়ির দেওয়ালে শ্যাওলা। জানালাগুলোর কাচ ভাঙা। আর সামনের দরজাটা বহু বছর ধরে তালাবন্ধ।
তবু বাড়িটার সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—দোতলায় একটি নীল দরজা।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেই দরজার নিচ দিয়ে যেন এক ফালি আলো বেরোত।
পাড়ার সবাই বলত,
—“ও বাড়িতে কেউ থাকে না।”
কিন্তু রাহুল বিশ্বাস করত না।
কারণ সে নিজে বহুবার দেখেছে—রাত বাড়লে নীল দরজার নিচে আলো জ্বলে ওঠে।
একদিন প্রবল বৃষ্টির রাতে কৌতূহল সামলাতে না পেরে রাহুল বাড়িটার ভেতরে ঢুকে পড়ল।
দরজাটা আশ্চর্যজনকভাবে খোলা ছিল।
সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে সে নীল দরজার সামনে দাঁড়াল।
ভেতর থেকে টুপটাপ শব্দ আসছে।
রাহুল দরজা ঠেলে খুলল।
ঘরের মাঝখানে একটি পুরনো টেবিল।
তার ওপর কেরোসিনের বাতি।
আর পাশে একটি কাঠের চেয়ার।
কিন্তু ঘরে কেউ নেই।
টেবিলের ওপর রাখা ছিল একটি খাতা।
রাহুল খাতা খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“যে এই খাতা পড়ছ, দয়া করে শেষ পাতাটা পর্যন্ত পড়বে।”
রাহুল পড়তে শুরু করল।
লেখক একজন স্কুলশিক্ষক—নির্মলবাবু।
তিনি লিখেছিলেন, বহু বছর আগে এই ঘরে বসেই তিনি তাঁর এক ছাত্রকে পড়াতেন। ছেলেটির নাম ছিল শুভ।
শুভ অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের ছেলে। পড়াশোনায় ভালো হলেও একদিন বাবার মৃত্যুর পর তাকে স্কুল ছাড়তে হয়।
নির্মলবাবু তাকে বলেছিলেন,
—“তুই পড়া ছাড়বি না। আমি অপেক্ষা করব।”
কিন্তু শুভ আর ফিরে আসেনি।
দিন কেটে বছর।
নির্মলবাবু অবসর নেন।
তারপরও তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই ঘরে বাতি জ্বেলে বসতেন।
কারণ শুভ একদিন বলেছিল,
“স্যার, আমি একদিন বড় হয়ে আপনার কাছে ফিরব।”
রাহুল শেষ পাতার দিকে এগোল।
সেখানে মাত্র একটি বাক্য—
“শুভ, যদি কখনও ফিরে আসিস, দরজার নিচে আলোটা দেখে বুঝবি—আমি এখনও অপেক্ষা করছি।”
রাহুলের বুকটা কেমন করে উঠল।
খাতার নিচে একটা পুরনো ছবি ছিল।
ছবিতে নির্মলবাবু আর এক কিশোর।
ছবির পেছনে একটি ঠিকানা লেখা।
পরদিন রাহুল সেই ঠিকানা খুঁজতে বেরোল।
অনেক খোঁজার পর জানতে পারল, শুভ নামে একজন মানুষ সত্যিই ওই এলাকায় থাকেন।
এখন তাঁর বয়স প্রায় ষাট।
রাহুল তাঁকে সব বলল।
বৃদ্ধ মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
—“স্যার… এখনও অপেক্ষা করছেন?”
রাহুল উত্তর দিতে পারল না।
শুভ পরদিন রাহুলের সঙ্গে সেই বাড়িতে এলেন।
দোতলায় উঠে নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি থমকে গেলেন।
ঘরে ঢুকে টেবিলের ওপর খাতাটা দেখলেন।
তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।
চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।
—“স্যার, আমি ফিরতে এত দেরি করে ফেললাম…”
ঘরের বাতিটা তখনও জ্বলছিল।
হঠাৎ জানালা দিয়ে আসা বাতাসে শিখাটা কেঁপে উঠল।
শুভ খাতার শেষ পাতায় হাত রাখলেন।
তারপর পকেট থেকে একটি ছোট্ট চিঠি বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন।
চিঠিতে লেখা—
“স্যার, আপনি বলেছিলেন আমি একদিন ফিরব। আমি ফিরেছি। শুধু আপনি নেই। কিন্তু আপনার আলোটা এখনও জ্বলছে।”
রাহুল চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
শুভ উঠে যাওয়ার আগে বাতিটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“আজ থেকে এই আলোটা আমি জ্বালাব।”
সেদিনের পর নীল দরজার ঘর আর কখনও অন্ধকার হয়নি।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে একটি বাতি জ্বলত।
কেউ জানত না, সেই আলো কাকে দেখানোর জন্য।
কিন্তু রাহুল জানত—
কিছু প্রতিশ্রুতি মানুষের জীবনের চেয়েও দীর্ঘ হয়।
সমাপ্ত।