হাসপাতালের তৃতীয় তলার করিডরের শেষ প্রান্তে একটা কাঠের বেঞ্চ ছিল।
সকাল থেকে রাত—প্রায় সারাদিনই সেখানে কেউ না কেউ বসে থাকত।
সেদিন রাত দুটোয় বেঞ্চটায় বসে ছিল সমীর।
হাতে একটা ছোট্ট কাগজ।
তাতে লেখা—
“অপারেশন থিয়েটার—৩।”
তার স্ত্রী ভিতরে।
সমীরের বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপা ভয়।
ঠিক তখন পাশের দরজা দিয়ে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এসে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসলেন।
বৃদ্ধের হাতে একটা পুরনো কাপড়ের ব্যাগ।
তিনি সমীরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
—“আপনারও?”
সমীর বুঝতে না পেরে বলল,
—“জি?”
—“অপেক্ষা।”
সমীর মাথা নাড়ল।
বৃদ্ধ বললেন,
—“আমার মেয়ে ভিতরে।”
দু’জনেই চুপ করে রইল।
কিছুক্ষণ পর সমীর জিজ্ঞেস করল,
—“কতক্ষণ হলো?”
—“চার ঘণ্টা।”
সমীর অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি একা?”
বৃদ্ধ হেসে বললেন,
—“আমি আর কে আছি?”
সমীর আর প্রশ্ন করল না।
ভোরের দিকে নার্স এসে সমীরকে ডাকল।
—“আপনার রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। রক্তের গ্রুপ?”
সমীর বলল।
নার্স চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর আবার এসে বলল,
—“আপনার সঙ্গে কেউ রক্ত দিতে পারবেন?”
সমীর মাথা নিচু করল।
—“আমি নিজেই দিতে পারব।”
বৃদ্ধ পাশ থেকে বললেন,
—“আপনি চাইলে আমি দিতে পারি।”
সমীর অবাক হয়ে তাকাল।
—“আপনি?”
—“হ্যাঁ।”
—“কিন্তু আপনার মেয়ে তো ভিতরে!”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
—“রক্ত দিতে আধঘণ্টা লাগে। মানুষের পাশে থাকতে সারাজীবন লাগে।”
সমীর কিছু বলতে পারল না।
পরীক্ষা করে দেখা গেল, বৃদ্ধের রক্তের গ্রুপ মিলে গেছে।
রক্ত দেওয়ার পর বৃদ্ধ আবার সেই বেঞ্চে এসে বসলেন।
সমীর তাঁর হাত ধরে বলল,
—“আমি আপনার কাছে ঋণী হয়ে গেলাম।”
বৃদ্ধ বললেন,
—“ঋণী হবেন না।”
—“তাহলে?”
—“কেউ একদিন আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। আজ আমি আপনার পাশে দাঁড়ালাম। এটাই জীবন।”
সকাল আটটার দিকে ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন,
—“অপারেশন সফল হয়েছে।”
সমীর চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর বৃদ্ধকে খুঁজতে গেল।
বেঞ্চটা খালি।
কাপড়ের ব্যাগটাও নেই।
শুধু বেঞ্চের ওপর একটা ছোট্ট কাগজ পড়ে আছে।
সমীর তুলে পড়ল—
“আপনার স্ত্রী ভালো হয়ে উঠুন। আর যদি কোনওদিন কাউকে হাসপাতালে একা বসে থাকতে দেখেন, তার পাশে একটু বসবেন। সব রোগের ওষুধ হয়তো আপনার কাছে থাকবে না, কিন্তু একাকীত্বের ওষুধ আপনার কাছে থাকতেই পারে।”
সমীর কাগজটা বুকপকেটে রেখে দিল।
বছর দুয়েক পর।
একই হাসপাতাল।
একই করিডর।
একই বেঞ্চ।
সমীর এবার একা নয়।
তার সঙ্গে তার স্ত্রী।
দু’জনেই হাসপাতালের করিডরে বসে আছে।
হঠাৎ তারা দেখল, এক তরুণী একা বেঞ্চের কোণে বসে কাঁদছে।
সমীর উঠে তার পাশে গিয়ে বসল।
—“ভয় লাগছে?”
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
সমীর বলল,
—“ভয় পেলে একা থাকতে হয় না।”
তার স্ত্রী দূর থেকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
করিডরের পুরনো বেঞ্চটা তখনও একই জায়গায় ছিল।
শুধু সেখানে বসা মানুষগুলো বদলে গিয়েছিল।
আর অদৃশ্যভাবে এক মানুষের ছোট্ট মানবিকতা থেকে আরেক মানুষের জীবনে ছড়িয়ে পড়ছিল আরেকটি আলো।
সমাপ্ত।