Categories
গল্প

মেলার দিনে হারিয়ে যাওয়া বাঁশি।

চৈত্রের শেষ সপ্তাহ।

শিমুলডাঙা গ্রামের মাঠে বসেছে বছরের সবচেয়ে বড় মেলা। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসেছে। কোথাও নাগরদোলা, কোথাও মাটির খেলনা, কোথাও জিলিপির গন্ধ। ঢাকের শব্দ আর মানুষের হাসিতে পুরো মাঠটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

এই মেলায় প্রতি বছর একটা ছোট্ট বাঁশির দোকান বসান হরিপদ।

বয়স তাঁর প্রায় সত্তর। সারা বছর তিনি বাঁশ দিয়ে বাঁশি বানান। বাঁশি বিক্রি করে খুব বেশি টাকা হয় না, কিন্তু তিনি বলেন,

—“বাঁশি বিক্রি করি না রে, মানুষের হাতে একটু সুর তুলে দিই।”

হরিপদের নাতি অর্ণব শহরে পড়াশোনা করে। মেলার সময় সে দাদুর কাছে আসে।

এবারও এসেছে।

দাদু তাকে দোকানে বসিয়ে বললেন,

—“দেখিস, বাঁশিগুলো সাবধানে রাখবি।”

অর্ণব হেসে বলল,

—“দাদু, তুমি যেন ভাবছ আমি খুব ছোট!”

—“বড় হয়েছিস, সেটা জানি। কিন্তু বড় হওয়া আর দায়িত্ববান হওয়া এক জিনিস নয়।”

অর্ণব মুখ বাঁকাল।

—“আবার শুরু করলে!”

হরিপদ হেসে ফেললেন।


বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা।

মেলায় ভিড় আরও বেড়ে গেল।

অর্ণব দেখল, একটা ছোট ছেলে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বাঁশিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটার পরনে পুরোনো জামা। পায়ে চটি নেই।

অর্ণব জিজ্ঞেস করল,

—“বাঁশি নেবে?”

ছেলেটা মাথা নাড়ল।

—“টাকা নেই।”

—“তাহলে টাকা ছাড়াই একটা নাও।”

ছেলেটা অবাক।

—“সত্যি?”

অর্ণব একটা ছোট বাঁশি তার হাতে দিয়ে বলল,

—“বাজাতে পারো?”

ছেলেটা বাঁশিটা মুখে তুলল।

প্রথমে কেমন যেন কাঁপা কাঁপা শব্দ হল।

তারপর হঠাৎ একটা সুর বেরিয়ে এল।

হরিপদ দূর থেকে শুনে তাকিয়ে রইলেন।

ছেলেটা কয়েক মুহূর্ত বাজিয়ে থামল।

হরিপদ কাছে এসে বললেন,

—“তোমার নাম কী?”

—“পলাশ।”

—“বাঁশি বাজানো শিখেছ কোথায়?”

—“কোথাও না। নিজে নিজে।”

হরিপদ ছেলেটার মাথায় হাত রাখলেন।

—“নিজে নিজে যে সুর খুঁজে পায়, তাকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না।”

পলাশ কিছু বুঝল না।

তবু হাসল।


রাত বাড়তে লাগল।

মেলার ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ হৈচৈ শুরু হল।

একজন মহিলা চিৎকার করে বললেন,

—“আমার মেয়ে নেই! আমার মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছি না!”

সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করল।

মেলার ঘোষণার মাইক থেকে বারবার শিশুটির বর্ণনা দেওয়া হল।

অর্ণবও খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল।

পলাশও তার পিছু নিল।

হরিপদ বললেন,

—“তুই দোকানটা দেখিস।”

অর্ণব বলল,

—“দাদু, মেয়েটাকে খুঁজে না পেলে দোকান দিয়ে কী হবে?”

হরিপদ মাথা নাড়লেন।

—“যা।”

দুজন ছুটে গেল।

মেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে খুঁজেও মেয়েটিকে পাওয়া গেল না।

অর্ণব বলল,

—“এত ভিড়ে ও কোথায় গেল?”

পলাশ হঠাৎ থেমে গেল।

—“দাদা, একটা কথা শুনছেন?”

—“কী?”

—“বাঁশির আওয়াজ।”

দূরে কোথাও খুব ক্ষীণ বাঁশির সুর ভেসে আসছে।

পলাশ সেই সুরের দিকে দৌড়ল।

অর্ণবও পিছনে।

মেলার মাঠের বাইরে একটা পুরোনো বটগাছের নিচে দেখা গেল ছোট্ট মেয়েটি বসে আছে।

তার পাশে একজন বৃদ্ধ।

বৃদ্ধ লোকটি বাঁশি বাজাচ্ছেন।

মেয়েটি চুপ করে শুনছে।

অর্ণব দৌড়ে গিয়ে বলল,

—“তুমি এখানে?”

মেয়েটি ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াল।

—“আমি মাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না।”

—“তুমি একা এখানে এলে কীভাবে?”

মেয়েটি বলল,

—“আমি কাঁদছিলাম। উনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।”

বৃদ্ধ লোকটি বললেন,

—“ভয় পেও না। আমি মেলায় বাঁশি বাজাচ্ছিলাম। ও কাঁদছিল। তাই নিয়ে এলাম।”

অর্ণব মেয়েটিকে নিয়ে মেলার দিকে ফিরল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন।

চারদিকে স্বস্তির নিঃশ্বাস।


দোকানে ফিরে এসে অর্ণব দেখল হরিপদ একা বসে আছেন।

কিন্তু তাঁর মুখটা চিন্তিত।

—“কী হয়েছে দাদু?”

হরিপদ বললেন,

—“একটা বাঁশি নেই।”

অর্ণব চমকে গেল।

—“কোনটা?”

—“যেটা আমি সবচেয়ে যত্ন করে বানিয়েছিলাম।”

তিনি একটা খালি জায়গা দেখালেন।

অর্ণবের মনে পড়ল—বিকেলে পলাশ সেই বাঁশিটা হাতে নিয়েছিল।

তার মনে সন্দেহ হল।

সে পলাশকে খুঁজতে বেরিয়ে গেল।

কিছু দূরে একটা দোকানের পাশে পলাশ বসে আছে।

অর্ণব কাছে গিয়ে বলল,

—“পলাশ, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

পলাশ মাথা তুলল।

—“কী?”

—“দাদুর একটা বাঁশি নেই। তুমি কি নিয়েছ?”

পলাশ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে পকেট থেকে বাঁশিটা বের করল।

—“হ্যাঁ।”

অর্ণবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

—“চুরি করেছ?”

পলাশ মাথা নিচু করল।

—“আমি… আমি কিনতে পারিনি। কিন্তু বাঁশিটা খুব ভালো লেগেছিল।”

অর্ণব রাগ করেছিল।

কিন্তু ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে তার রাগটা একটু নরম হয়ে গেল।

সে বলল,

—“চুরি করা ঠিক হয়নি।”

—“জানি।”

—“তাহলে নিয়েছিলে কেন?”

পলাশ উত্তর দিল,

—“কারণ আমি বাঁশি বাজাতে চাই।”

অর্ণব থেমে গেল।

ঠিক তখন হরিপদ সেখানে এসে দাঁড়ালেন।

তিনি সব শুনলেন।

তারপর পলাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“বাঁশিটা ফেরত দে।”

পলাশ বাঁশিটা এগিয়ে দিল।

হরিপদ বাঁশিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন।

তারপর বললেন,

—“এবার তুই আমার সঙ্গে চল।”

পলাশ অবাক।

—“কোথায়?”

—“আমার দোকানে।”


দোকানে ফিরে হরিপদ একটা নতুন বাঁশি হাতে নিলেন।

পলাশকে দিয়ে বললেন,

—“এটা তোর।”

পলাশ অবাক হয়ে বলল,

—“কিন্তু আমি তো টাকা দিতে পারব না!”

হরিপদ হেসে বললেন,

—“টাকা চাইনি।”

—“তাহলে?”

—“একটা কথা দিতে হবে।”

—“কী কথা?”

—“বাঁশিটাকে যত্ন করবি। আর যখন বাজাতে শিখবি, তখন এমন কাউকে শেখাবি যার টাকা নেই।”

পলাশের চোখ জলে ভরে উঠল।

সে মাথা নাড়ল।

—“কথা দিলাম।”

অর্ণব পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

হরিপদ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“এবার বুঝলি, দায়িত্ববান হওয়া কী?”

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—“হ্যাঁ দাদু। শুধু দোকান পাহারা দেওয়া দায়িত্ব নয়। মানুষের ভিতরের ভালো জিনিসটাকেও পাহারা দিতে হয়।”

হরিপদ কিছু বললেন না।

শুধু নাতির কাঁধে হাত রাখলেন।


মেলা শেষ হয়ে গেল।

কয়েক মাস পর শিমুলডাঙা গ্রামের স্কুলে একটা নতুন ক্লাস শুরু হল—বাঁশি শেখার ক্লাস।

শিক্ষক হরিপদ।

প্রথম ছাত্র পলাশ।

আর দ্বিতীয় ছাত্র অর্ণব।

প্রতিদিন বিকেলে স্কুলের বারান্দায় বসে বাঁশির সুর ভেসে আসতে লাগল।

পলাশ ধীরে ধীরে ভালো বাজাতে শিখল।

একদিন সে হরিপদকে বলল,

—“দাদু, আমি বড় হয়ে কী হব জানেন?”

—“কী?”

—“আমি বাঁশি বানাব আর বাজাব। আর যাদের টাকা নেই, তাদের বিনা পয়সায় শেখাব।”

হরিপদ মৃদু হেসে বললেন,

—“তাহলেই তো আমার বাঁশিগুলো বেঁচে থাকবে।”

দূরে তখন সন্ধ্যার আলো।

স্কুলের মাঠ পেরিয়ে বাতাসে ভেসে আসছে বাঁশির সুর।

সেই সুরে যেন মিশে আছে একটা ছোট্ট গ্রামের স্বপ্ন—

যেখানে কোনো প্রতিভা শুধু অভাবের কারণে হারিয়ে যাবে না।

আর একটা মেলার রাতে হারিয়ে যাওয়া বাঁশি শিখিয়ে দিয়েছিল—

কখনও কখনও একটা ভুলকে শাস্তি দিয়ে শেষ করা যায়, কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে সেই ভুলকে বদলে দিলে একটি মানুষের পুরো জীবন বদলে যেতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *