Categories
গল্প

আকাশে ওড়া লাল ঘুড়ি।

মাধবপুর গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা বিশাল মাঠ।

শীতের বিকেলে সেই মাঠে ছেলেমেয়েদের ভিড় লেগেই থাকত। কেউ ক্রিকেট খেলত, কেউ দৌড়াত, কেউ ঘুড়ি ওড়াত।

কিন্তু রুদ্র মাঠের এক কোণে বসে শুধু অন্যদের দেখত।

তার হাতে কখনও ঘুড়ি থাকত না।

কারণ রুদ্রের বাবা-মা ঘুড়ি কিনে দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না।

বাবা দিনমজুর। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন।

রুদ্র পড়াশোনায় ভালো। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল—একদিন নিজের হাতে একটা বড় ঘুড়ি বানাবে।

একদিন স্কুল ছুটির পর সে মাঠের পাশে একটা ভাঙা লাল ঘুড়ি দেখতে পেল।

ঘুড়িটার মাঝখান ছিঁড়ে গেছে। বাঁশের কাঠিও ভাঙা।

রুদ্র সেটাকে তুলে নিল।

পাশ থেকে বন্ধু নীলয় বলল,

—“ওটা দিয়ে আর কী হবে?”

রুদ্র বলল,

—“দেখিস, উড়বে।”

নীলয় হেসে বলল,

—“এই ছেঁড়া জিনিস?”

রুদ্র কিছু বলল না।

ঘুড়িটা বগলে নিয়ে বাড়ি চলে গেল।


সেদিন রাতে কেরোসিনের আলোয় বসে রুদ্র ঘুড়িটা মেরামত করতে শুরু করল।

পুরোনো খবরের কাগজ দিয়ে ছেঁড়া অংশ জোড়া লাগাল। ভাঙা কাঠির বদলে সরু বাঁশের কঞ্চি লাগাল।

মা কাজ থেকে ফিরে দেখে বললেন,

—“এত রাতে কী করছিস?”

—“ঘুড়ি বানাচ্ছি।”

মা হেসে বললেন,

—“কাল স্কুল আছে কিন্তু।”

—“জানি।”

মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“স্বপ্ন দেখিস, কিন্তু পড়াশোনাটা যেন ছাড়িস না।”

রুদ্র বলল,

—“দুটোই করব।”


পরদিন বিকেলে রুদ্র ঘুড়িটা নিয়ে মাঠে এল।

আকাশে তখন হালকা বাতাস।

সে দৌড় দিল।

ঘুড়িটা একটু উঠল।

তারপর মাটিতে পড়ে গেল।

নীলয় হেসে বলল,

—“বলেছিলাম না!”

রুদ্র ঘুড়িটা তুলে নিল।

আবার চেষ্টা করল।

এবার একটু বেশি উঠল।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার পড়ে গেল।

তৃতীয় দিনও একই।

চতুর্থ দিনও।

পঞ্চম দিনও।

মাঠের অন্য ছেলেরা হাসতে শুরু করল।

—“রুদ্রের লাল ঘুড়ি কখনও উড়বে না!”

রুদ্র কিছু বলত না।

সে শুধু প্রতিদিন ঘুড়িটাকে একটু একটু করে ঠিক করত।

একদিন স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক অরিন্দম স্যার তাকে মাঠে দেখে বললেন,

—“প্রতিদিন একই কাজ করছিস কেন?”

রুদ্র বলল,

—“স্যার, ঘুড়িটা উড়ছে না।”

স্যার ঘুড়িটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন।

তারপর বললেন,

—“ঘুড়ি উড়ছে না, নাকি তুই ওড়ানোর কৌশলটা এখনও শিখিসনি?”

রুদ্র চুপ করে গেল।

স্যার বললেন,

—“বাতাসকে জোর করে নিজের দিকে টানা যায় না। বাতাসের দিক বুঝে ঘুড়ি ওড়াতে হয়।”

তারপর তিনি রুদ্রকে কয়েকটা সহজ নিয়ম শেখালেন।

সুতো কীভাবে ধরতে হয়।

কখন দৌড়াতে হয়।

কখন সুতো ছাড়তে হয়।

কখন টান দিতে হয়।

রুদ্র মন দিয়ে সব শিখল।


পরের রবিবার রুদ্র আবার মাঠে এল।

আকাশ পরিষ্কার।

হালকা বাতাস।

সে ঘুড়িটা মাটিতে রাখল।

তারপর দৌড় শুরু করল।

একটু পর—

লাল ঘুড়িটা মাটি ছেড়ে উঠল।

আরও উঠল।

আরও ওপরে।

রুদ্র সুতো ছাড়তে লাগল।

কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুড়িটা এত ওপরে উঠে গেল যে মাঠের সবাই তাকিয়ে রইল।

নীলয় অবাক হয়ে বলল,

—“সত্যিই উড়ছে!”

রুদ্র হাসল।

কিন্তু হঠাৎ একটা ঝোড়ো বাতাস এল।

ঘুড়িটা দুলে উঠল।

সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম।

রুদ্র দ্রুত সুতো টেনে ধরল।

কিছুক্ষণ পর আবার ঘুড়ি স্থির হয়ে গেল।

অরিন্দম স্যার দূর থেকে বললেন,

—“এই তো! এবার বুঝলি?”

রুদ্র বলল,

—“কী?”

—“ঘুড়ি যত ওপরে ওঠে, তত বেশি বাতাসের সঙ্গে লড়াই করতে হয়।”

রুদ্র আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে হল কথাটা শুধু ঘুড়ির জন্য নয়।


কয়েকদিন পর স্কুলে ঘোষণা হল—জেলার বিজ্ঞান ও সৃজনশীল মেলায় গ্রামের স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের তৈরি জিনিস নিয়ে যাবে।

রুদ্র এবার একটা পরিকল্পনা করল।

সে শুধু ঘুড়ি নিয়ে যাবে না।

সে এমন একটা ঘুড়ি বানাবে, যেটা বাতাসের গতির সাহায্যে ছোট্ট একটা আলো জ্বালাতে পারবে।

স্যার তাকে সাহায্য করলেন।

পুরোনো খেলনার মোটর, ছোট ডায়নামো, বাঁশের কাঠি, কাগজ—সব জোগাড় হল।

রুদ্র দিনের পর দিন পরীক্ষা করল।

কখনও মোটর ঘুরল না।

কখনও ঘুড়ি উঠল না।

কখনও তার ছিঁড়ে গেল।

কিন্তু রুদ্র থামল না।

মা রাতে বলতেন,

—“ঘুমাবি না?”

রুদ্র বলত,

—“আরেকবার চেষ্টা করি।”


অবশেষে মেলার দিন এল।

জেলার বিভিন্ন স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রীরা এসেছে।

কেউ রোবট বানিয়েছে, কেউ জল পরিশোধনের যন্ত্র, কেউ সৌরশক্তির মডেল।

রুদ্র তার লাল ঘুড়িটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কয়েকজন তার মডেল দেখে হাসল।

—“ঘুড়ি দিয়ে বিদ্যুৎ?”

রুদ্র কিছু বলল না।

বিচারকরা মাঠে গেলেন।

রুদ্র ঘুড়িটা উড়িয়ে দিল।

ঘুড়ি ওপরে উঠতেই তার সঙ্গে লাগানো ছোট্ট ডায়নামো ঘুরতে শুরু করল।

একটা ছোট LED আলো জ্বলে উঠল।

চারপাশে হাততালি পড়ে গেল।

বিচারকদের একজন জিজ্ঞেস করলেন,

—“এটা কীভাবে ভাবলে?”

রুদ্র বলল,

—“আমি প্রথমে শুধু ঘুড়ি ওড়াতে চেয়েছিলাম। পরে স্যার বললেন বাতাসের শক্তি বুঝতে। তখন ভাবলাম, বাতাস শুধু ঘুড়ি উড়িয়ে দেয় না, কাজেও লাগতে পারে।”

বিচারক হাসলেন।

সেদিন রুদ্র প্রথম পুরস্কার পেল না।

সে পেল দ্বিতীয় পুরস্কার।

কিন্তু তার কাছে সেটাই ছিল বিশাল জয়।


বাড়ি ফিরে রুদ্র পুরস্কারটা মায়ের হাতে দিল।

মা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

—“তুই জিতেছিস?”

রুদ্র বলল,

—“দ্বিতীয় হয়েছি।”

মা ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।

—“আমার কাছে তুই প্রথম।”

রুদ্র হাসল।

পরদিন সে মাঠে গেল।

নীলয় বলল,

—“তুই তো এখন বড় বিজ্ঞানী!”

রুদ্র হেসে বলল,

—“না রে। আমি এখনও ঘুড়ি ওড়াতে শিখছি।”

নীলয় বলল,

—“আমাকেও শেখাবি?”

রুদ্র তার হাতে সুতো তুলে দিল।

—“শুধু তোকে নয়। যে কেউ শিখতে চাইলে শেখাব।”

আকাশে আবার সেই লাল ঘুড়ি উঠল।

মাঠের উপর দিয়ে বাতাস বইছিল।

রুদ্র সুতো ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার মনে হচ্ছিল—

মানুষের স্বপ্নও ঠিক ঘুড়ির মতো।

কখনও বাতাস তাকে নামিয়ে দেয়।

কখনও সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি আসে।

কখনও চারপাশের মানুষ হাসে।

তবু যদি মানুষ সুতোটা শক্ত করে ধরে রাখে, বাতাসের দিক বুঝতে শেখে এবং বারবার চেষ্টা করে—

তাহলে একদিন সেই স্বপ্নও আকাশ ছুঁতে পারে।

আর মাধবপুরের আকাশে সেই দিন থেকে শুধু একটা লাল ঘুড়ি নয়,

একটা ছোট্ট ছেলের সাহসও উড়তে লাগল।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *