Categories
উপন্যাস

নীরব সাক্ষী (দ্বিতীয় পর্ব)।

দ্বিতীয় পর্ব — বাবার লুকোনো ঘর

ছবিটা হাতে নিয়ে ঈশানী অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

তার ঘরের টেবিলের ওপর মোবাইলের আলো জ্বলছিল।

স্ক্রিনে সেই পুরনো ছবিটা।

দেবাশিস রায়ের স্টাডি রুম।

মৃত্যুর রাত।

দরজার পাশে তিনজন মানুষ।

একজন দেবাশিস রায় নিজে।

একজন হরিপদ পাল।

আর তৃতীয়জন—

ঈশানীর বাবা, অরুণ সেন।

ঈশানী বাবাকে শেষবার দেখেছিল ছয় মাস আগে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটি তখন এতটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন যে কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছিল।

তবু সেই মানুষটি মৃত্যুর আগে তাকে একবার বলেছিলেন—

“ঈশানী, একটা কথা মনে রাখিস।”

“কী?”

“সব সত্যি সবার সামনে বলতে নেই।”

তখন ঈশানী ভেবেছিল, মৃত্যুর আগে মানুষ অনেক অদ্ভুত কথা বলে।

আজ মনে হচ্ছে—

বাবা হয়তো তাকে সাবধান করে গিয়েছিলেন।


পরদিন সকালে ঈশানী বাবার পুরনো বাড়িতে গেল।

বাড়িটা শহরের দক্ষিণ প্রান্তে।

একতলা বাড়ি।

সামনে ছোট বাগান।

বাবা মারা যাওয়ার পর বাড়িটা বন্ধই পড়ে ছিল।

মা অনেক বছর আগেই মারা গিয়েছিলেন।

বাবা একাই থাকতেন।

ঈশানীর কাছে বাড়ির সমস্ত চাবি ছিল।

দরজা খুলতেই পুরনো কাঠ আর বইয়ের গন্ধ নাকে এল।

সবকিছু প্রায় একই রকম।

ড্রয়িংরুমে বাবার চেয়ার।

দেয়ালে পুরনো ঘড়ি।

বইয়ের তাক।

টেবিলের ওপর এখনও পড়ে আছে বাবার চশমা।

ঈশানী ধীরে ধীরে বাবার স্টাডি রুমে ঢুকল।

এই ঘরেই বাবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন।

আইনের বই।

পুরনো ফাইল।

সংবাদপত্রের কাটিং।

ডায়েরি।

সবকিছু সুশৃঙ্খল।

ঈশানী আলমারি খুলল।

প্রথম তাক—

আইনের বই।

দ্বিতীয় তাক—

পুরনো কাগজপত্র।

তৃতীয় তাক—

খালি।

কিন্তু তাকের পেছনে কাঠের একটা অংশ অন্যরকম।

ঈশানী হাত দিয়ে চাপ দিতেই সেটি একটু নড়ল।

সে অবাক হয়ে গেল।

কাঠের পাতটা সরিয়ে দেখা গেল ছোট্ট একটা গোপন খোপ।

ভেতরে একটি লোহার বাক্স।

চাবি নেই।

ঈশানী বাক্সটা হাতে তুলে নিল।

খুব ভারী নয়।

কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বাক্সটির ওপর কোনও তালা নেই।

শুধু একটা কাগজ আটকানো।

বাবার হাতের লেখা।

“যেদিন ওরা আবার খুঁজবে, সেদিন খুলবে।”

ঈশানীর বুক কেঁপে উঠল।

“ওরা?”

কারা?


বাক্স খুলতেই প্রথমে একটি পুরনো ফাইল বেরিয়ে এল।

তার ওপর লেখা—

“৪২/২০১১”

ঈশানী চেয়ারে বসে পড়ল।

বাবা এই ফাইল লুকিয়ে রেখেছিলেন!

ফাইলের ভিতরে আদালতের নথি নয়।

ছিল ব্যক্তিগত নোট।

প্রথম পাতায় বাবার লেখা—

“দেবাশিস রায়ের মৃত্যু আত্মহত্যা নয়। কিন্তু তাকে খুন করার উদ্দেশ্য শুধু সম্পত্তি নয়।”

পরের পাতায়—

“দেবাশিস কিছু জানতে পেরেছিল।”

আর তার পরের পাতায় মাত্র একটি নাম—

“প্রতাপ মজুমদার।”

ঈশানী নামটা চিনত।

শালুকপুরের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী।

শহরের বড় হাসপাতাল থেকে শুরু করে নির্মাণ সংস্থা, পরিবহন ব্যবসা—সবখানেই তার প্রভাব।

এখন তাঁর বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি।

ঈশানী ছোটবেলায় তাঁকে কয়েকবার দেখেছে।

বাবা কখনও তাঁর নাম বাড়িতে বলতেন না।

আরও পড়তে পড়তে ঈশানী জানতে পারল—

২০১১ সালে দেবাশিস রায় এবং প্রতাপ মজুমদার একটি বড় জমি প্রকল্পে অংশীদার ছিলেন।

প্রকল্পের নাম—

“শালুক আবাসন প্রকল্প।”

শহরের নদীর ধারের বিশাল জমিতে বহুতল নির্মাণের পরিকল্পনা।

কিন্তু প্রকল্পের মাঝপথে দেবাশিস রায় হঠাৎ আপত্তি তুলেছিলেন।

কারণ জমির একটি অংশ ছিল সরকারি খাসজমি।

আর কিছু পরিবারকে উচ্ছেদ করার পরিকল্পনাও ছিল।

দেবাশিস নাকি বলেছিলেন—

“আইন ভেঙে এই প্রকল্প আমি করব না।”

তারপরই তাঁর মৃত্যু।

ঈশানী ধীরে ধীরে ফাইলটা বন্ধ করল।

এত বছর ধরে সবাই যেটাকে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক বিরোধ ভেবেছিল, তার পেছনে আরও বড় ব্যাপার ছিল।

কিন্তু তার বাবা এতে কীভাবে জড়ালেন?


ফাইলের শেষ পাতায় একটি ফোন নম্বর ছিল।

নাম নেই।

ঈশানী নম্বরটিতে ফোন করল।

কয়েকবার রিং হওয়ার পর একজন মহিলা ফোন ধরলেন।

“হ্যালো?”

“আমি ঈশানী সেন বলছি।”

ওপাশে নীরবতা।

“আপনি কি অরুণ সেনকে চিনতেন?”

মহিলা এবার ধীরে বললেন—

“আপনি তাঁর মেয়ে?”

“হ্যাঁ।”

দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর মহিলা বললেন—

“তাহলে এত বছর পরে সত্যিটা জানার সময় হয়েছে।”

ঈশানী উঠে দাঁড়াল।

“আপনি কে?”

“আমার নাম মাধবী রায়।”

ঈশানীর বুক ধক করে উঠল।

দেবাশিস রায়ের স্ত্রী।

“আপনি কোথায় আছেন?”

“আমার বাড়িতে।”

“আমি আসতে পারি?”

“এখনই আসুন।”


মাধবী রায়ের বাড়িটা শহরের পুরনো অংশে।

একসময় বড়লোকের বাড়ি ছিল।

এখন জীর্ণ।

দেয়ালের রং উঠে গেছে।

বাগানে আগাছা।

দরজা খুললেন একজন বৃদ্ধা।

চুল সম্পূর্ণ সাদা।

চোখের নিচে গভীর কালি।

কিন্তু চোখদুটো এখনও তীক্ষ্ণ।

তিনি ঈশানীকে দেখে বললেন—

“তোমাকে দেখলে অরুণের কথা মনে পড়ে।”

ঈশানী চুপ করে রইল।

মাধবী তাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।

ড্রয়িংরুমের দেওয়ালে দেবাশিস রায়ের বড় ছবি।

ঈশানী ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল—

“আপনি জানতেন আমার বাবা এই মামলায় জড়িত ছিলেন?”

“শুধু জড়িত ছিলেন না।”

মাধবী ধীরে বললেন,

“তোমার বাবা আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন।”

“কীভাবে?”

মাধবী জানলার দিকে তাকালেন।

“তোমার বাবাই প্রথম আমাকে বলেছিলেন যে দেবাশিসকে খুন করা হয়েছে।”

“কিন্তু পুলিশ?”

“পুলিশ সব জানত।”

“তাহলে মামলা আত্মহত্যা বলে শেষ হল কেন?”

মাধবী এবার ঈশানীর দিকে সরাসরি তাকালেন।

“কারণ প্রমাণ গায়েব হয়ে গিয়েছিল।”

“কী প্রমাণ?”

“একটা ভিডিও।”

ঈশানী থমকে গেল।

“ভিডিও?”

“হ্যাঁ।”

মাধবী বললেন,

“দেবাশিস মৃত্যুর আগের রাতে নিজের স্টাডি রুমে একটা ক্যামেরা বসিয়েছিল। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল কেউ তাকে অনুসরণ করছে।”

“তারপর?”

“ক্যামেরায় সব রেকর্ড হয়েছিল।”

“কী হয়েছিল সেই রাতে?”

মাধবী উত্তর দিলেন না।

বরং উঠে পাশের ঘরে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর একটা ছোট বাক্স নিয়ে ফিরে এলেন।

বাক্সটা ঈশানীর সামনে রেখে বললেন—

“এটা তোমার বাবার কাছে ছিল।”

ঈশানী বাক্স খুলল।

ভেতরে একটি পুরনো মেমরি কার্ড।

আর একটি চিঠি।

চিঠির ওপর লেখা—

“ঈশানীর হাতে ছাড়া অন্য কারও কাছে নয়।”

ঈশানীর হাত কাঁপতে লাগল।

“আপনি এটা এতদিন ধরে রেখেছিলেন?”

“তোমার বাবা আমাকে রাখতে দিয়েছিলেন।”

“কেন?”

“কারণ তিনি জানতেন, তাঁর ওপরও নজর রাখা হচ্ছে।”


সেদিন রাতে ঈশানী বাড়ি ফিরে মেমরি কার্ডটি কম্পিউটারে লাগাল।

কার্ডে মাত্র একটি ভিডিও ফাইল।

তারিখ—

১৬ জুন, ২০১১।

রাত ১১টা ৪৩ মিনিট।

ভিডিও চালু হলো।

স্টাডি রুম।

দেবাশিস রায় টেবিলে বসে কিছু লিখছেন।

ঘড়িতে ১১টা ৫৬।

দরজায় শব্দ।

দেবাশিস মাথা তুললেন।

একজন মানুষ ঘরে ঢুকল।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

দেবাশিস বললেন—

“তুমি এসেছ?”

লোকটি কিছু বলল না।

দেবাশিস উঠে দাঁড়ালেন।

“আমি কাগজগুলো কাউকে দেব না।”

লোকটি এবার বলল—

“আপনি জানেন না, আপনি কী নিয়ে খেলছেন।”

দেবাশিস বললেন—

“আমি জানি। আর সেই কারণেই সবকিছু রেকর্ড করছি।”

লোকটি ধীরে ধীরে ক্যামেরার দিকে এগিয়ে এল।

ঈশানী স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।

লোকটির মুখ এখনও অন্ধকারে।

তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।

ভিডিও কালো।

কয়েক সেকেন্ড পর বিদ্যুৎ ফিরে এল।

দেবাশিস মেঝেতে পড়ে আছেন।

আর ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একজন—

হরিপদ পাল।

ভিডিও শেষ।

ঈশানী স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর বিষয় ছিল—

ভিডিওর শেষ তিন সেকেন্ডে ক্যামেরার তারিখের নিচে একটি ডিজিটাল টাইমস্ট্যাম্প দেখা যাচ্ছিল।

১৬ জুন ২০১১ — ১২:১৭ AM

আর বাবার নোটে লেখা ছিল—

“হরিপদ খুনি নয়। সে শুধু কাউকে বাঁচাতে এসেছিল।”

ঈশানীর চোখ বড় হয়ে গেল।

তাহলে হরিপদ কেন পালিয়েছিল?

কাকে বাঁচাতে?

আর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কে?


পরদিন সকালেই ঈশানী আদালতে গেল।

হরিপদকে খুঁজতে।

বটগাছের নিচে কেউ নেই।

টাইপিস্টদের জিজ্ঞেস করল।

কেউ কিছু জানে না।

একজন বলল—

“ও তো মাঝেমধ্যে আসে।”

“কোথায় থাকে?”

“জানি না।”

ঈশানী আদালতের পুরনো কর্মচারীকে বলল—

“হরিপদ পালকে আপনি চেনেন?”

বৃদ্ধ কর্মচারী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—

“চিনি।”

“তাঁর বাড়ি কোথায়?”

“নদীর ওপারে।”

“ঠিকানা?”

বৃদ্ধ একটা কাগজে ঠিকানা লিখে দিলেন।

ঈশানী সেদিকে রওনা হলো।

প্রায় এক ঘণ্টা পরে সে পৌঁছল নদীর ধারের একটি ছোট্ট গ্রামে।

একটা ভাঙা টিনের বাড়ি।

দরজা খোলা।

ভেতরে কেউ নেই।

টেবিলের ওপর কালো খাতাটা পড়ে আছে।

ঈশানী খাতাটা খুলল।

প্রথম পাতায়—

“আমি হরিপদ পাল। আমি ২০১১ সালের রাতটা ভুলিনি।”

পরের পাতায়—

“দেবাশিস বাবু আমাকে বলেছিলেন, যদি কিছু হয়, অরুণবাবুর মেয়েকে সত্যিটা জানাতে।”

ঈশানীর শ্বাস আটকে গেল।

আরও পড়ল।

“কিন্তু সেই সত্যি জানার আগে তোমাকে জানতে হবে—তোমার বাবা কেন মারা গেলেন।”

ঈশানীর চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

তার বাবা তো অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিলেন!

নাকি—

সে এতদিন যা ভেবেছে, সব ভুল?

শেষ পাতায় লেখা ছিল—

“তোমার বাবা স্বাভাবিকভাবে মারা যাননি।”

ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে একটা শব্দ হলো।

ঈশানী ঘুরে দাঁড়াল।

দরজার সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে।

পরনে সাদা শার্ট।

চোখে কালো চশমা।

সে শান্ত গলায় বলল—

“হরিপদকে খুঁজে লাভ হবে না।”

ঈশানী বলল,

“আপনি কে?”

লোকটি চশমা খুলল।

ঈশানী তাকে চিনতে পারল।

প্রতাপ মজুমদার।

শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যবসায়ী।

তিনি ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকলেন।

তারপর বললেন—

“তোমার বাবা একটা ভুল করেছিলেন।”

“কী ভুল?”

“তিনি ভেবেছিলেন সত্যি প্রকাশ করলে সব বদলে যাবে।”

ঈশানী তাকিয়ে রইল।

প্রতাপ মজুমদার এবার খুব নিচু গলায় বললেন—

“কিন্তু সত্যি কখনও একা থাকে না, ঈশানী।”

“তার সঙ্গে অনেক মানুষের জীবন জড়িয়ে থাকে।”

তিনি টেবিলের ওপর একটা পুরনো ছবি রাখলেন।

ছবিতে চারজন মানুষ।

দেবাশিস রায়।

অরুণ সেন।

হরিপদ পাল।

আর—

একজন তরুণী।

ঈশানী ছবিটার দিকে তাকিয়ে জমে গেল।

কারণ তরুণীটি—

তার মা।

প্রতাপ মজুমদার বললেন,

“তোমার মা শুধু এই মামলার সাক্ষী ছিলেন না।”

এক মুহূর্ত থেমে তিনি বললেন—

“তিনি ছিলেন পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *