Categories
উপন্যাস

ফেরার রাস্তা (পর্ব ৩ — ফিরে আসার মানে)।

গুলির শব্দটা থেমে যাওয়ার পরও কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না।

সুশান্ত ধরের অফিসের ভাঙা কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল অভীক। রাস্তার ওপারে কয়েকজন মানুষ ছুটে পালাচ্ছে। দূরে একটা মোটরবাইকের শব্দ ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে।

সৌমী ফিসফিস করে বলল,

— ওরা আমাদের দেখেছে।

অভীক ঘুরে তাকাল।

— কারা?

সুশান্ত এবার শান্ত গলায় বলল,

— যাদের কথা তোমার বাবা বারো বছর আগে বলেছিল।

— নাম বলুন।

সুশান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— বিপ্লব রায়।

নামটা শুনে অভীক থমকে গেল।

— বিপ্লব রায়?

সৌমীও চমকে উঠল।

— সেই লোকটা?

সুশান্ত মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ। ২০০৯ সালের উন্নয়ন কমিটির হিসাবরক্ষক। তোমার বাবা ওকে খুব বিশ্বাস করতেন।

অভীকের চোখের সামনে আবার সেই পুরনো ছবিটা ভেসে উঠল।

অরুণ।
সৌমী।
সুশান্ত।
নির্মল।
আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটি।

এবার মুখটা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

বিপ্লব রায়।

অভীক ধীরে ধীরে বলল,

— বাবা ওকে বিশ্বাস করতেন?

— শুধু বিশ্বাস করতেন না। নিজের ভাইয়ের মতো মনে করতেন।

সুশান্তের গলায় একটা দীর্ঘশ্বাস।

— আর সেই বিশ্বাসটাই তোমার বাবার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।


১

রাতের অন্ধকারে তারা সুশান্তের অফিস থেকে বেরিয়ে পিছনের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল।

অভীক সামনে। পাশে সৌমী।

কিছুটা পিছনে সুশান্ত।

হঠাৎ সৌমী বলল,

— নির্মলকাকার কথা মনে আছে?

— আছে।

— তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগের দিন উনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন।

অভীক থেমে গেল।

— কী বললে?

— হ্যাঁ। আমি তখন বাড়িতে ছিলাম। তোমার বাবা ওঁর সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলেছিলেন।

— তুমি আমাকে বলোনি কেন?

সৌমী মাথা নিচু করল।

— তখন তোমাকে বলার সুযোগ পাইনি।

— বারো বছরেও?

সৌমী চুপ।

অভীক এবার একটু কঠিন গলায় বলল,

— তুমি জানতেই যে বাবার মৃত্যুটা দুর্ঘটনা ছিল না?

— পুরো সত্যিটা জানতাম না।

— কিন্তু সন্দেহ ছিল।

— ছিল।

— আর আমাকে একবারও জানাওনি?

সৌমী চোখ তুলে তাকাল।

— জানাতে চেয়েছিলাম।

— তাহলে?

— তোমার চলে যাওয়ার পর তোমার মা আমাকে বলেছিলেন, তোমাকে যেন আর এসবের মধ্যে না টানি।

অভীক আর কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর সৌমী বলল,

— তোমার মা ভয় পেয়েছিলেন। তোমাকে হারানোর ভয়।

অভীক ধীরে বলল,

— আর আমি ভেবেছিলাম সবাই আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল।

সৌমী উত্তর দিল না।

রাস্তার বাতির নিচে দুজনের ছায়া পাশাপাশি পড়েছিল।

বারো বছর পরও ছায়াগুলো যেন পাশাপাশি হাঁটতে জানে।


২

সুশান্ত তাদের নিয়ে গেল শহরের বাইরে তার একটি পুরনো গুদামে।

গুদামটি বহুদিন ব্যবহার হয়নি।

লোহার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে সুশান্ত একটা কাঠের বাক্স সরাল।

তার নিচে ছিল একটি ছোট লোহার আলমারি।

চাবি বের করতে করতে সে বলল,

— তোমার বাবা আমাকে এই জিনিসটা দিয়েছিলেন।

অভীক অবাক।

— আপনাকে?

— হ্যাঁ।

আলমারি খুলতেই বেরিয়ে এল বেশ কয়েকটি ফাইল, কিছু জমির দলিল, পুরনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং একটি পেনড্রাইভ।

সুশান্ত পেনড্রাইভটা অভীকের হাতে দিল।

— এটা তোমার বাবার শেষ সম্পদ।

অভীক ফিসফিস করে বলল,

— তাহলে এতদিন এটা আপনার কাছে ছিল?

— হ্যাঁ।

— আমাকে দেননি কেন?

সুশান্ত কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

— কারণ আমি কাপুরুষ ছিলাম।

ঘরের নীরবতা আরও ভারী হয়ে উঠল।

সুশান্ত বলল,

— তোমার বাবা আমাকে বলেছিলেন, “সুশান্ত, আমি যদি না থাকি, একদিন অভীক ফিরে আসবে। তখন ওকে সব দেবে।”

— আর আপনি অপেক্ষা করছিলেন?

— হ্যাঁ।

— এত বছর?

— ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আর ফিরবে না।

অভীক পেনড্রাইভটা মুঠোয় চেপে ধরল।

— এবার সব খুলে বলুন।

সুশান্ত এবার বসে পড়ল।

— মাধবডাঙা উন্নয়ন প্রকল্পের নামে যে জমিগুলো অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, তার একটা বড় অংশ আসলে কৃষকদের কাছ থেকে জোর করে নেওয়া হয়েছিল। ক্ষতিপূরণের টাকা পুরোটা দেওয়া হয়নি। সরকারি খাতায় অন্য অঙ্ক দেখানো হয়েছে। জমির দলিল বদলানো হয়েছে। মৃত মানুষের নামে সই হয়েছে।

সৌমী বলল,

— আর এই সবের সঙ্গে বিপ্লব রায় যুক্ত ছিল?

— বিপ্লব ছিল হিসাবের লোক। কিন্তু ও একা ছিল না।

— তাহলে?

সুশান্ত বলল,

— ওর ওপরে ছিল একজন।

অভীক জিজ্ঞেস করল,

— কে?

সুশান্ত মুখ তুলল।

— তখনকার প্রকল্প কমিটির চেয়ারম্যান— দেবাশিস মল্লিক।

অভীক নামটা আগে শুনেছে।

কিন্তু কোথায়?

হঠাৎ তার মনে পড়ল বাবার ডায়েরির একটা পাতার কথা।

“দেবাশিস—শেষ পর্যন্ত ওর কাছে পৌঁছতে হবে।”

অভীক দাঁড়িয়ে গেল।

— দেবাশিস মল্লিক এখনও বেঁচে আছেন?

সুশান্ত বলল,

— বেঁচে আছেন। এখন কলকাতায় থাকেন। কিন্তু একটা কথা জানো?

— কী?

— গত দশ বছর ধরে তিনি প্রকাশ্যে কোনো পদে নেই। অথচ মাধবডাঙার সবচেয়ে বড় জমির মালিকদের একজন তিনি।


৩

সেই রাতেই তারা নির্মলকাকাকে খুঁজতে বেরোল।

কিন্তু চারবংশীর বাড়িতে তালা।

পাশের বাড়ির বৃদ্ধ লোকটি বলল,

— নির্মলবাবু কাল রাতে এসেছিলেন। সকালে আবার চলে গেছেন।

— কোথায়?

— জানি না।

অভীক ফিরে আসতে যাচ্ছিল।

তখন বৃদ্ধটি বলল,

— তবে একটা কথা বলেছিলেন।

— কী?

— “অভীক এলে ওকে বলবেন, আমি পালাইনি। আমি অপেক্ষা করছি।”

অভীক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

— কোথায় অপেক্ষা করছেন?

বৃদ্ধ লোকটি উত্তর দিল,

— পুরনো সেচ দফতরের বাংলোয়।


সেচ দফতরের বাংলোটা বহুদিন ধরে পরিত্যক্ত।

ভাঙা দেওয়াল। আগাছায় ঢাকা উঠোন। অন্ধকার বারান্দা।

অভীক একা ভেতরে ঢুকল।

সৌমী বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।

ঘরের ভিতর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল,

— এসেছিস?

অভীক থেমে গেল।

— নির্মলকাকা?

অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলেন নির্মল।

চেহারা আগের মতো নেই।

চুল সাদা। মুখ শুকনো। চোখের নিচে গভীর কালি।

অভীক বলল,

— আপনি কোথায় ছিলেন?

নির্মল ধীরে বললেন,

— পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম।

— কার ভয়ে?

— নিজের অপরাধবোধের ভয়ে।

অভীক এগিয়ে গেল।

— আমার বাবাকে কে মেরেছিল?

নির্মল চোখ বন্ধ করলেন।

অনেকক্ষণ পর বললেন,

— বিপ্লব।

অভীক যেন পাথর হয়ে গেল।

— আপনি নিশ্চিত?

— আমি নিজের চোখে দেখিনি। কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছিল আমার বাইকের সাহায্যে।

— আপনার বাইক?

— হ্যাঁ।

নির্মল মাথা নিচু করলেন।

— সেদিন আমাকে একটা ফোন করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, তোমার বাবাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। আমি রাজি হইনি। কিন্তু আমার ভাইকে অপহরণ করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

— তারপর?

— আমার বাইকটা নিয়ে যায় বিপ্লব।

অভীক দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

— আর আপনি পুলিশকে কিছু বলেননি?

নির্মল কাঁপা গলায় বললেন,

— বলেছিলাম। কিন্তু অভিযোগটা নথিভুক্তই করা হয়নি।

— কেন?

— কারণ থানায় আগেই সব ব্যবস্থা করা ছিল।

সৌমী এবার ভেতরে ঢুকল।

— নির্মলকাকা, আপনি এতদিন চুপ ছিলেন কেন?

নির্মল তার দিকে তাকালেন।

— কারণ আমি কাপুরুষ ছিলাম, মা।

তারপর তিনি একটা পুরনো ফাইল বের করলেন।

— কিন্তু তোমার বাবা কাপুরুষ ছিলেন না।


৪

ফাইলের মধ্যে ছিল একটি কাগজ।

অভীক পড়তে পড়তে থেমে গেল।

এটা ছিল দুর্ঘটনার রাতের একটি গ্যারেজ রসিদ।

তারিখ—অরুণের মৃত্যুর আগের রাত।

বাইকের ব্রেক পরীক্ষা করা হয়েছিল।

কিন্তু ব্রেকের তার কেটে দেওয়া হয়েছিল তার আগেই।

নির্মল বললেন,

— তোমার বাবা সেদিন বাইকে ছিলেন না।

অভীক তাকাল।

— কী?

— দুর্ঘটনাটা ঘটানো হয়েছিল অন্য গাড়ি দিয়ে। পরে তোমার বাবার বাইকটা ঘটনাস্থলে রেখে দেওয়া হয়।

সুশান্ত, যে এতক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, এবার বলল,

— আর সেই কারণেই CCTV-তে সবকিছু মেলেনি।

অভীক বুঝতে পারল।

— তাহলে যে লোকটা মোটরবাইকে এসেছিল, সে শুধু প্রমাণ সাজাতে এসেছিল?

সুশান্ত মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ।

নির্মল বললেন,

— তোমার বাবা শেষ মুহূর্তে একটা কাজ করেছিলেন।

— কী?

— তিনি আসল হিসাবের খাতা একজনের কাছে রেখে গিয়েছিলেন।

অভীক প্রশ্ন করল,

— কার কাছে?

নির্মল সৌমীর দিকে তাকালেন।

সৌমী অবাক।

— আমার কাছে?

— তোমার বাবা জানতেন, তোমাকে ওরা সন্দেহ করবে না।

সৌমী কাঁপা গলায় বলল,

— কিন্তু আমার কাছে তো কিছু ছিল না!

নির্মল বললেন,

— ছিল। তুমি জানোনি।


৫

সৌমীর পুরনো বাড়িতে ফিরে তারা তার ঘর খুঁজতে শুরু করল।

একসময় সৌমী আলমারির নিচের কাঠের অংশে হাত দিল।

একটা ফাঁকা শব্দ হল।

কাঠটা সরাতেই বেরিয়ে এল ছোট্ট টিনের বাক্স।

ভেতরে একটি খাতা।

অভীক খাতাটা খুলল।

প্রথম পাতায় অরুণের হাতের লেখা—

“যে মানুষকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি, সে-ই হয়তো আমাকে শেষ করে দেবে। কিন্তু সত্যিটা একদিন অভীকের কাছে পৌঁছবেই।”

পরের পাতাগুলোতে জমির হিসাব।

নাম।

টাকার অঙ্ক।

তারিখ।

স্বাক্ষর।

সবশেষে তিনটি নাম আলাদা করে লেখা—

বিপ্লব রায়।
দেবাশিস মল্লিক।
নির্মল চক্রবর্তী।

নির্মল নিজের নাম দেখে চোখ নামিয়ে নিলেন।

অভীক বলল,

— আপনার নামও কেন?

নির্মল বললেন,

— কারণ আমি সেই রাতে সত্যিটা জানতাম। অথচ থামাতে পারিনি।

অভীক চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— কিন্তু আপনি বাবাকে মারেননি।

— না।

— আপনি জানতেন কে মেরেছে?

— হ্যাঁ।

— তাহলে এবার পুলিশে যাবেন?

নির্মল অভীকের চোখের দিকে তাকালেন।

— এবার তুই সঙ্গে থাকলে যাব।


৬

পরের দিন সকালেই তারা থানায় গেল।

পুরনো অভিযোগ পুনরায় খোলার দাবি জানানো হল।

প্রথমে পুলিশ গড়িমসি করল।

কিন্তু সুশান্তের দেওয়া CCTV, বাবার হিসাবের খাতা, হাসপাতালের নথি, গ্যারেজ রসিদ এবং নির্মলের লিখিত বয়ান—সব একসঙ্গে জমা পড়তেই পরিস্থিতি বদলে গেল।

তদন্ত শুরু হল।

বিপ্লব রায়কে খুঁজে পাওয়া গেল তার শহরের বাড়ি থেকে।

দেবাশিস মল্লিকও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হলেন।

তদন্তে বেরিয়ে এল আরও অনেক তথ্য।

বছরের পর বছর ধরে কৃষকদের জমি কম দামে কেনার জন্য ভুয়ো নথি তৈরি করা হয়েছে।

সরকারি প্রকল্পের টাকা অন্য খাতে সরানো হয়েছে।

আর অরুণ মুখোপাধ্যায় সেই হিসাব হাতে পেয়ে যাওয়ার পরই তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হয়।

বিপ্লব সবশেষে ভেঙে পড়ল।

জেরায় সে স্বীকার করল—

অরুণকে সে অনুসরণ করেছিল।

দেবাশিসের নির্দেশে।

কিন্তু গাড়ি চালিয়েছিল অন্য একজন।

সেই চালকও পরে গ্রেফতার হল।

বারো বছর পর অরুণের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে পুনরায় নথিভুক্ত করা হল।


৭

সবকিছু শেষ হতে কয়েক মাস লেগে গেল।

মামলা চলল।

নথি যাচাই হল।

কৃষকদের জমির পুরনো কাগজ বের হল।

অনেক পরিবার ক্ষতিপূরণের নতুন দাবি জানাল।

মাধবডাঙার মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, বারো বছর আগে একজন সাধারণ মানুষ নিজের জীবন দিয়ে যে সত্যিটা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, সেটাই আজ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

অভীক মাঝে মাঝে বাবার পুরনো বাড়িতে যেত।

একদিন সন্ধ্যায় সে উঠোনে বসেছিল।

সৌমী এসে পাশে দাঁড়াল।

— কী ভাবছ?

অভীক হাসল।

— ভাবছি, এত বছর আমি কেন ফিরিনি।

— হয়তো তখন ফিরতে পারতে না।

— তুমি যদি তখন আমাকে সত্যিটা বলতে?

সৌমী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— তাহলে হয়তো তুমি আরও বিপদে পড়তে।

অভীক তার দিকে তাকাল।

— আর আমাদের সম্পর্ক?

সৌমী মৃদু হেসে বলল,

— কিছু সম্পর্ক শেষ হয় না, অভীক। শুধু অনেক দূরে চলে যায়।

অভীক বলল,

— তুমি কি এখনও আমাকে ভালোবাসো?

সৌমী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— উত্তরটা জানতে এত বছর লাগল?

অভীক হেসে ফেলল।

সৌমীর চোখে জল।

— তবে একটা শর্ত আছে।

— কী?

— এবার যদি কোথাও যাও, আমাকে না জানিয়ে যাবে না।

অভীক মাথা নাড়ল।

— আর তুমি?

— আমিও না।

দুজনেই হেসে উঠল।


৮

এক বছর পর মাধবডাঙায় একটা ছোট্ট পাঠাগার তৈরি হল।

নাম—

“অরুণ মুখোপাধ্যায় স্মৃতি পাঠাগার।”

উদ্বোধনের দিন গ্রামের বহু মানুষ এসেছিল।

সামনে দাঁড়িয়ে অভীক বলল,

— আমার বাবা বড় কোনো নেতা ছিলেন না। তিনি শুধু একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন, যিনি ভুলের সামনে মাথা নত করেননি। তাঁর কাছে সত্যি মানে ছিল নিজের নিরাপত্তার থেকেও বড় কিছু।

কিছুক্ষণ থেমে সে বলল,

— আমি বারো বছর আগে এই গ্রাম ছেড়েছিলাম ভেবেছিলাম, এখানে আমার কিছুই নেই। আজ বুঝেছি, আমি ভুল ছিলাম।

পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল সৌমী।

তার চোখে হাসি।

অভীক বলল,

— বাড়ি শুধু সেই জায়গা নয় যেখানে আমরা জন্মাই। কখনও কখনও বাড়ি সেই জায়গা, যেখানে ফিরে এসে আমরা নিজেদের হারানো অংশটুকু আবার খুঁজে পাই।

তালি পড়ল।

নির্মল এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

বয়স তাকে অনেকটাই নুইয়ে দিয়েছে।

কিন্তু আজ তার মুখে অদ্ভুত শান্তি।

অভীক এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরল।

— কাকা।

নির্মল বললেন,

— কী?

— এবার আর পালাবেন না তো?

নির্মল মৃদু হেসে বললেন,

— না।

তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— এবার আমার ফেরার পালা।


সন্ধ্যা নেমে আসছিল।

মাধবডাঙার সেই পুরনো রাস্তা ধরে অভীক আর সৌমী পাশাপাশি হাঁটছিল।

যে রাস্তা দিয়ে বারো বছর আগে অভীক চলে গিয়েছিল।

সেদিন তার মনে ছিল রাগ।

অভিমান।

হতাশা।

আজ সেই একই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল—

কিছু রাস্তা আমাদের কোথাও নিয়ে যায় না।

কিছু রাস্তা আমাদের ফিরিয়ে আনে।

ফিরিয়ে আনে মানুষের কাছে।

স্মৃতির কাছে।

ভালোবাসার কাছে।

আর সবচেয়ে বড় কথা—

নিজের কাছে।

সৌমী হঠাৎ বলল,

— অভীক?

— হুম?

— সামনে কিন্তু রাস্তা দুদিকে ভাগ হয়েছে।

অভীক তাকিয়ে হাসল।

— জানি।

— কোন দিকে যাবে?

অভীক কিছুক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর সৌমীর হাতটা ধরল।

— এবার যেদিকেই যাই, একসঙ্গে যাব।

সৌমী কিছু বলল না।

শুধু হাতটা শক্ত করে ধরে রইল।

পেছনে পড়ে রইল মাধবডাঙা।

সামনে খুলে গেল নতুন রাস্তা।

আর বারো বছর পর—

অভীক বুঝতে পারল,

ফিরে আসা মানে অতীতে ফিরে যাওয়া নয়।

ফিরে আসা মানে—

অতীতকে মেনে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে হাঁটা।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *