ভারতের ইতিহাসে এমন কিছু নারী আছেন, যাঁদের পরিচয় কোনও একটি পেশা বা পদবিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা ছিলেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক নিরন্তর শক্তি। সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষ, অসহায় নারী, অনাথ শিশু কিংবা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত মানুষ—তাঁদের জীবনকে একটু ভালো করার জন্য যাঁরা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের মধ্যে শোভনা রাণাডে ছিলেন অন্যতম।
গান্ধীয় আদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত এই সমাজকর্মী নিজের জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছিলেন নারী ও শিশুকল্যাণ, শিক্ষা, স্বনির্ভরতা এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কাজে। তাঁর কাজের মূল কথা ছিল—মানুষকে শুধু সাহায্য করা নয়, তাকে এমনভাবে সক্ষম করে তোলা, যাতে সে নিজের জীবন নিজেই গড়ে নিতে পারে।
শোভনা রাণাডের জন্ম ১৯২৪ সালের ২৬ অক্টোবর পুনেতে। অল্প বয়সেই তাঁর জীবনে মহাত্মা গান্ধীর চিন্তার গভীর প্রভাব পড়ে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে আগা খান প্যালেসে গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সেই সাক্ষাৎ তাঁর জীবনদর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তী জীবনে গান্ধীর সত্য, অহিংসা, স্বনির্ভরতা ও সেবার আদর্শ তাঁর কাজের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
গান্ধীর আদর্শ থেকে সমাজসেবার পথে
স্বাধীনতার সময় ভারত ছিল গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত। দেশের বহু মানুষ দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিলেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুর পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন।
শোভনা রাণাডে বুঝেছিলেন, সমাজের উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন নারী ও শিশুকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা যাবে। তাই তাঁর কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে নারীশিক্ষা ও নারীস্বনির্ভরতা।
তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনও নারীকে শুধু অর্থ সাহায্য করলে তাঁর সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। তাঁকে শিক্ষা, দক্ষতা এবং কাজের সুযোগ দিতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই তিনি গ্রামীণ নারীদের বিভিন্ন পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন।
কস্তুরবা গান্ধী ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি নারীদের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার কাজে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। গ্রামীণ নারীদের বিভিন্ন কুটিরশিল্প ও পেশাগত দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দেওয়া ছিল তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিনোবা ভাবের সান্নিধ্যে
মহাত্মা গান্ধীর পাশাপাশি আচার্য বিনোবা ভাবের চিন্তাও শোভনা রাণাডের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
তিনি বিনোবা ভাবের পদযাত্রায় অংশ নেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে অসম পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে পদযাত্রায় অংশ নিয়ে গ্রামাঞ্চলের মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। পরবর্তীতে অসমের উত্তর লখিমপুরে মৈত্রী আশ্রম প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তিনি যুক্ত হন। সেখানে নারী ও শিশুদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ শহরের সামাজিক সমস্যার চেয়ে গ্রামীণ ভারতের সমস্যা অনেকটাই আলাদা। সেখানে শিক্ষার অভাব, কর্মসংস্থানের সংকট, নারীস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
শোভনা রাণাডে সেই বাস্তবতাকে কাছ থেকে দেখেছিলেন এবং তাঁর কাজের পরিধি ক্রমশ বিস্তৃত করেছিলেন।
নারীকে সাহায্য নয়, স্বনির্ভর করার চেষ্টা
শোভনা রাণাডের সমাজসেবার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর স্বনির্ভরতার দর্শন।
তিনি মনে করতেন, একজন অসহায় নারীকে যদি চিরকাল দানের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়, তাহলে তার প্রকৃত ক্ষমতায়ন হয় না। বরং তাকে এমন দক্ষতা দিতে হবে, যার মাধ্যমে সে নিজের আয় তৈরি করতে পারে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে।
এই উদ্দেশ্যে তিনি মহিলাদের জন্য প্রশিক্ষণমূলক প্রতিষ্ঠান ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে পুনের আগা খান প্যালেসে গান্ধী ন্যাশনাল মেমোরিয়াল সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে নারী প্রশিক্ষণমূলক কাজকে আরও শক্তিশালী করেন।
গ্রামীণ নারীদের জন্য বিভিন্ন শিল্প ও পেশাগত দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করার চেষ্টা করেন। এই কাজের সঙ্গে নারীশিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতার বিষয়টিও যুক্ত ছিল।
কারণ তাঁর কাছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক মর্যাদা—দুটিই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
শিশুদের জন্য তাঁর অসাধারণ কাজ
শোভনা রাণাডের সমাজসেবার আর একটি বড় অধ্যায় ছিল শিশু কল্যাণ।
অসহায়, অনাথ ও পথশিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, পুষ্টি এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে ওঠে।
মহারাষ্ট্রে ‘বালগ্রাম’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত ছিলেন। অনাথ ও অসহায় শিশুদের জন্য পরিবারসদৃশ পরিবেশ তৈরি করার উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
পুনের হেরম্যান গমাইনার সোশ্যাল সেন্টারের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে পথশিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের কাজও করা হয়। অর্থাৎ শুধু শিশুদের আশ্রয় দেওয়া নয়, তাঁদের ভবিষ্যৎ তৈরি করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এখানেই শোভনা রাণাডের কাজের বিশেষত্ব।
তিনি জানতেন, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র খাবার ও পোশাক দিয়ে তৈরি হয় না। তার প্রয়োজন নিরাপত্তা, শিক্ষা, ভালোবাসা এবং নিজের পরিচয় গড়ে তোলার সুযোগ।
শিক্ষা ছিল পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি
শোভনা রাণাডের কাছে শিক্ষা ছিল সামাজিক পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
বিশেষ করে প্রান্তিক নারী ও শিশুদের শিক্ষার বিষয়ে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। গ্রামীণ এলাকায় বালওয়াড়ি, ক্রেশ এবং শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারেও তাঁর সংগঠনমূলক কাজ ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০০৭ সালে ভারত সরকারের রাজীব গান্ধী মানব সেবা পুরস্কারের স্বীকৃতিতেও শিশু কল্যাণে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের উল্লেখ ছিল।
তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—শিক্ষাকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা।
শুধু বই পড়া নয়, বাস্তব জীবনে টিকে থাকার দক্ষতা অর্জন, আত্মবিশ্বাস তৈরি এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়াকেও তিনি শিক্ষার অংশ হিসেবে দেখতেন।
এই দর্শন আজকের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জীবনমুখী শিক্ষার ধারণার সঙ্গেও অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সমাজসেবায় প্রতিষ্ঠান গড়ার গুরুত্ব
শোভনা রাণাডে শুধু নিজে কাজ করেননি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে তোলা এবং শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
তিনি গান্ধী ন্যাশনাল মেমোরিয়াল সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নারী প্রশিক্ষণ ও শিশু কল্যাণের বিভিন্ন উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যান। পাশাপাশি কস্তুরবা গান্ধী ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কাজেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্সের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং একসময় সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নারীশিক্ষা, নারীস্বনির্ভরতা এবং সামাজিক উন্নয়ন ছিল তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পরিবেশের প্রতিও দায়বদ্ধতা
শোভনা রাণাডের কাজ শুধু নারী ও শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
গঙ্গা দূষণ রোধ এবং নদী সংরক্ষণের উদ্যোগের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। গান্ধী ন্যাশনাল মেমোরিয়াল সোসাইটির মাধ্যমে ‘গঙ্গা বাঁচাও’ ধরনের প্রচেষ্টায় তাঁর অংশগ্রহণ ছিল।
এটি তাঁর চিন্তার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।
মানুষের কল্যাণ এবং পরিবেশের কল্যাণকে তিনি আলাদা করে দেখেননি। কারণ সুস্থ পরিবেশ ছাড়া সুস্থ সমাজ তৈরি সম্ভব নয়।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
দীর্ঘ কয়েক দশকের সমাজসেবার জন্য শোভনা রাণাডে একাধিক সম্মানে ভূষিত হন।
শিশু কল্যাণের জন্য ১৯৮৩ সালে তিনি জাতীয় পুরস্কার পান। ২০০৭ সালে পান রাজীব গান্ধী মানব সেবা পুরস্কার। নারী ও শিশু উন্নয়নে তাঁর কাজের জন্য ২০১১ সালে তিনি জামনালাল বাজাজ পুরস্কারে সম্মানিত হন। একই সময়পর্বে তাঁর সামাজিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পদ্মভূষণও পান।
তাঁর কাজকে বিভিন্ন সময়ে আরও নানা সম্মানে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁর জীবনের প্রকৃত পুরস্কার ছিল বহু মানুষের জীবনে তৈরি হওয়া পরিবর্তন।
এক শতাব্দীর কাছাকাছি এক কর্মময় জীবন
শোভনা রাণাডে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পুনেতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৯৯ বা ১০০ বছর বলা হয়েছে; তবে ১৯২৪ সালের জন্মতারিখ অনুযায়ী তিনি প্রায় এক শতাব্দী দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছেন।
এই দীর্ঘ জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর কাজ।
তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন না। বড় কোনও রাজনৈতিক পদে ছিলেন না। কোনও কর্পোরেট সাম্রাজ্য গড়েননি। কিন্তু অসংখ্য মানুষের জীবনে তিনি যে পরিবর্তন এনেছেন, তার সামাজিক মূল্য অপরিসীম।
তিনি দেখিয়েছেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় পদ বা বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন মানুষের প্রতি বিশ্বাস, দীর্ঘমেয়াদি নিষ্ঠা এবং সমস্যার মূল কারণ বুঝে কাজ করার মানসিকতা।
আজকের প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
শোভনা রাণাডের জীবন থেকে আজকের প্রজন্ম অনেক কিছু শিখতে পারে।
প্রথমত, সমাজসেবা মানে শুধুমাত্র দান করা নয়। মানুষের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করাও সমাজসেবা।
দ্বিতীয়ত, নারীকে ক্ষমতায়ন করতে হলে শিক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তৃতীয়ত, শিশুদের কল্যাণকে সমাজের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে।
আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা—একটি ভালো কাজের ফল হয়তো সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে সেই কাজ চালিয়ে গেলে তা একদিন একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
শোভনা রাণাডে সেই ধৈর্যের উদাহরণ।
তাঁর জীবন যেন একটি দীর্ঘ প্রদীপশিখা—যার আলো নিজের জন্য নয়, অন্যের পথ আলোকিত করার জন্য।
ভারতের সমাজসেবার ইতিহাসে তাই শোভনা রাণাডে শুধু একজন সমাজকর্মী নন; তিনি মানবিকতা, স্বনির্ভরতা এবং সেবার এক জীবন্ত আদর্শ। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সমাজ বদলানোর সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় কখনও কখনও খুব সাধারণ: একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া, একজন নারীর হাতে কাজের দক্ষতা তুলে দেওয়া এবং তাকে বলা—“তুমি নিজেই তোমার ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারো।”